বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

স্মৃতির গলিপথে ফেরিওয়ালারা
কলহার মুখোপাধ্যায়

এখন ন’মাসে ছ’মাসে ডাক শোনা যায়... শিল কাটাও। কিন্তু কেউ শিল কাটানোর জন্য তাকে ডাকে না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে গিয়েছে ফেরিওয়ালারা। অথচ, কলকাতার ইতিহাস লিখতে বসলে একটি বড় অধ্যায় ফেরিওয়ালাদের জন্য অবশ্যই বরাদ্দ রাখতে হবে। অনেকের স্মৃতিপটে আজও উঁকি দিয়ে যায় ফেরিওয়ালার হারিয়ে যাওয়া হাঁক।

ধুতি মেরজাই পরে ধামা মাথায় গলি গলি ঘুরত। পাঁচ পয়সায় এক চ্যাঙারি মতিচুর লাড্ডু, ফিনফিনে গজা, দানাদার, খাস্তা কচুরি পেতাম। তিনজনে দিব্যি খাওয়া যেত। ফাউ চাইলে এক খাবলা সাদা বোঁদে ঢেলে দিত ময়রা। —বক্তা, পঞ্চাশের দশকে বেড়ে ওঠা শোভাবাজার রাজবাড়ির এক বংশধর। তিনি এখন পঁচাত্তর।
খুব ছোট তখন। উনিশশো সাতাত্তর-আটাত্তর হবে। ছাগলের দুধ নিয়ে আসত হাতিবাগানে আমাদের বাড়ির দরজায়। মাকে দেখতাম ঘটি ভরে নিয়ে চার আনা পয়সা দিত। —বক্তা, বছর পঞ্চান্নর এক প্রৌঢ়া।
পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে দুটো তিলকুটে সন্দেশ কিনে দিত দিদা। তার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ি যেতে হতো ফি শনিবার। মিষ্টির লোভ দেখিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেত। বিবেকানন্দ স্ট্রিটে চ্যাপ্টা ধরনের বড় হাঁড়ি নিয়ে ঘুরত একটা লোক। তাকে হরি বলে ডাকতে শুনেছি দিদাকে। পরে সেই লোকটাকে আমাদের গিরিশ পার্কের বাড়িতেও যেতে দেখেছি। — বক্তার বয়স চল্লিশ। 
কলকাতার ইতিহাস লিখতে গেলে একটি বড় অধ্যায় ফেরিওয়ালাদের জন্য অবশ্যই বরাদ্দ রাখতে হবে। একশো বছর আগেও ফেরিওয়ালা ছাড়া কলকাতার কথা কল্পনা করা যেত না। রসরাজ অমৃতলাল বসুর ‘স্মৃতিকথা পুরাতন’ ধার করাই যায়... ‘মধ্যাহ্নে দইওয়ালারা প্রকাণ্ড ধামা মাথায় চাই গো দই হাঁকিতে লাগল। তারা একপয়সায় এক মালসী দুই মালসাঁ এই দিত। মালসাঁ উপুড় করে দেখাত যে দই ভূমে পড়ে না। এক পয়সার এক মালসাঁতে দু’জনের বেশ দু’পাত ভাত মেখে খাওয়া চলত, আবার মালসীর তলায় একটু সম্বলের জন্য-ও লেগেও থাকত।’ রাজপথের সেই সেলসম্যানরা এখন বিলুপ্তপ্রায়। ‘শিল কাটাও’ ডাক রাজপথে প্রায় বিলুপ্ত। সে রাস্তায় এখন ধোঁয়া উড়িয়ে চলে ‘ফুড অ্যাপের’ স্কুটি। 
ধরন বদলেছে। বদল এসেছে কায়দায়। মহানগরের চরিত্রে এখন পরিবর্তনের ঢেউ। চাহিদা? তারও তারতম্য বিপুল। প্রয়োজনটাই যে বদলে গিয়েছে। ফলে বদল বিস্কুটের মতো বদলে গিয়েছে কলকাতার ফেরিওয়ালারাও। শৌখিন জিনিসপত্তর নয়, এখন ফেরি হয় দৈনন্দিন প্রয়োজন। শাক-সব্জি, মাছ, ডাব থেকে প্লাস্টিকের তৈরি হরেক মাল তিরিশ টাকা। উত্তর, দক্ষিণ, মধ্য ও বৃহত্তর কলকাতায় এ হল সকালবেলার নিত্য-চিত্র। সবটাই বড্ড রুটিনমাফিক, বড়ই কাঠখোট্টা। নেই তাতে নতুনের চমক, অপ্রত্যাশিতের আনন্দ। রোমান্স মাখা সে ফেরিওয়ালা হারিয়েছে কলকাতার গলিপথেই। মন কেমনের কুলুঙ্গিতে সেঁধিয়েছে চিরতরে। কারা আসতেন বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত? কারা ছিলেন কলকাতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ? 
রসরাজ অমৃতলাল বসুর ‘স্মৃতিকথা পুরাতন’ লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, সকাল সাড়ে ন’টা থেকে পাড়ায় ধোপ দুরস্ত কাপড়, পরিষ্কার মেরজাই, আর জরি বসানো টুপি পরা দেশলাইওয়ালা ‘লে দেশ্লাই’ বলে হেঁকে যেত। প্রথম প্রথম সব বিষয়েই মানুষের আশঙ্কা থাকে। ঠিক তেমনটাই হয়েছিল রাস্তার বুকে প্রথমবার ফেরি করা দেশলাই দেখে। নানাবিধ ভয়, আর সন্দেহ—‘এ আবার কী সর্বনেশে জিনিস এল রে বাবা!’ তাঁর লেখায় দেখা যাচ্ছে, ‘কম্বুলে টোলায় লোকজনের কানে ভেসে আসত ‘কু-উ উ উ ও ও ওর ঘ টি তো ও ও লা।’ বাড়িতে বাড়িতে কুয়ো। আর তাতে ঘটি পড়ে মাথায় হাতের চল ছিল গতে বাঁধা। ফলে ঘটি তো তোলাতেই হবে! অতুলচন্দ্র সুর আবার লিখছেন মেয়ে ফেরিওয়ালার কথা। কলকাতার রাস্তায় মেয়ে ফেরিওয়ালারা ‘মিশি লেবে গো’-বলে ডাক দিত। তখন মহিলাদের মধ্যে দাঁতে মিশি দেওয়ার চল ছিল। সেই সময় হরেক জিনিস ফেরির প্রচলনও ছিল। অমৃতলাল বসুই জানিয়েছেন এমন কয়েকটা—‘সরাগুড় তিলকুটো সন্দেশ’, ‘মুকুন্দ মোয়া’, ‘বাত ভালো করি’, ‘দাঁতের পোকা বের করি’, ‘চাই ঘোল’, ‘মাজন মিশি মাথা ঘষা’, ‘চাই শাঁখা’, ‘চাই সিন্দুর’, ‘চাই মধু’, ‘ধনে সরষে লেবে গো’, ‘চাই শুকনো দই’ ইত্যাদি। শুধু কি এই? গত শতকের প্রথম দিককার দশকগুলিতে ছোটবেলা কাটানো প্রবীণদের স্মৃতিকথা ঘাঁটলে হাজারো ফেরিওয়ালা বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। কিন্তু তারও আগে, কলকাতায় কবে দেখা গেল ফেরিওয়ালাদের? সেটা অনুসন্ধান করা যাক।  
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন তাঁর বিচিত্র সাধ কবিতায়, ‘আমি যখন পাঠশালাতে যাই/ আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে/ দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই/ ফেরিওয়ালা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে/ ‘চুড়ি চা-ই, চুড়ি চাই’ সে হাঁকে,/ চিনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে।’ ১৮৬১-তে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। কলকাতায় ফেরিওয়ালাদের আনাগোনার সময়কালের একটা আন্দাজ এই লেখা থেকে পাওয়া যেতে পারে। ‘আ কালেকশন অব টু হান্ড্রেড অ্যান্ড ড্রেসেস অব হিন্দুজ’ বইয়ে ফ্রান্সিস বালথাজার সলভিনস-এর আঁকা কয়েকটি ছবি দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে একটি কলকাতার রাস্তায় ফেরিওয়ালা। প্রামাণ্য নথি হিসেবে এটাকেই সব থেকে পুরনো ধরা যেতে পারে। হুতোমের লেখায় চোখ বুলনো যাক, ‘শোভাবাজারে রাজাদের ভাঙ্গা বাজারের মেচুনীরা প্রদীপ হাতে করে রাত্রে পাড়ায় পাড়ায় এঁরা পচা মাচ আর লোনা ইলিস নিয়ে ক্রেতাদের...’। কিংবা ‘ও খেরা গুপো মিনসে চার আনা দিবি, বলে আদর কচ্চে...’ তিনি আরও লিখছেন, ‘এ দিকে সহরে সন্ধ্যাসূচক কাঁশোর ঘণ্টার শব্দ থামলো। ঈদের সমুদায় আলো জ্বালা হয়েছে। বেলফুল বরফমালাই চীৎকার শুনা যাচ্ছে।’ আর রবীন্দ্রনাথে ফিরলে তো দেখা যাচ্ছেই, ‘দই দই, ভালো দই! দইওয়ালা, দইওয়ালা ও দইওয়ালা!’ তিনিই কাবুলিওয়ালা ও মিনির গল্প আমাদের শুনিয়েছেন। সেই সময়সারণি বেয়ে এসে চলে আসা যায় যদি প্রেমেন্দ্র মিত্রের দুনিয়ায়। লিখছেন তিনি ‘কাগজ বিক্রি’তে, ‘হাঁকে ফেরিওলা-কাগজ বিক্রী,/ পুরনো কাগজ চাই!’ সনৎ সিংহ লিখছেন, ‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি/এতে রাম, রাবণ আছে...এ সুযোগ পাবে না আর/বলো ভাই কি দাম দেবে?/পুতুল নেবে গো পুতুল।’ বদলেছে সময়। কিন্তু বদলায়নি নস্টালজিয়া। সুমন, অঞ্জন থেকে চন্দ্রবিন্দু... কেউ বলেছেন ‘ছেলেবেলার সেই বেহালা বাজানো লোকটা’র কথা, কারও ছিল ‘রাজপথে গান শেখার স্কুল’, আবার কারও ফেরিওয়ালা ‘লেবু লজেন্সের শিশিটা হাতে’  ইস্টিশান অথবা রাজপথের রূপকথা শুনিয়েছে। 
ফেরির দুনিয়া সন্ধানে অবশ্যই এসে পড়ে আলাদিন। ‘সহস্র এক আরব‌্যরজনী’র গল্পে পুরাতনের বদলে নতুন প্রদীপ বিক্রি করা ফেরিওয়ালার দেখা পাওয়া যায়। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত লিখেছেন, ‘কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ’। উঠে এসেছে ত্রয়োদশ শতকের প্যারিসের রাস্তার সঙ্গে কলকাতার গলির অদ্ভুত সাদৃশ্যের ছবি। সেটির বর্ণনা এরকম—‘প্যারিসের রাস্তায় অলিতে গলিতে চমৎকার ভালো ভিনিগার, মাস্টার্ড ভিনিগার, মাস্টার্ড সস, গার্লিক সস, স্ক্যালিয়ান সস, ভেরজুস সস বলে চিৎকার করে ছুটে ছুটে বেড়াত। সেই ডাক শুনে গিন্নিরা জানালা খুলে মাংসের সঙ্গে মেখে খাবার জন্যে পছন্দমতো রাই আর সস কিনতেন।’ এবার নিশ্চয় করে প্রশ্ন জাগে, ফেরিওয়ালাদের উদ্ভব কীভাবে? প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় বিনিময় প্রথা যখন চালু হল, তখন থেকেই সম্ভবত ফেরিওয়ালারা রাস্তায়। অর্থাৎ বলাই যায়, মানব সভ্যতার গোড়াপত্তনের সময়কাল থেকেই জিনিস ফেরির প্রচলন শুরু।
প্রবীণদের স্মৃতিকথা ছেড়ে আসা হয়েছিল মাঝপথে। ফেরা যাক সেই ফেরিতে। সেকালের কলকাতার সাহেবপাড়ায় দেখা যত চীনা ফেরিওয়ালাদের। সিল্কের জামাকাপড়, চীনে কোট, পাজামা... খদ্দের মূলত কলকাতায় বসবাসকারী সাহেব-মেমরা। কাবুলিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি হিং, মেওয়া, গরম মশলা বিক্রি করতে আসত। অর্থাৎ বিদেশিদের কাছ থেকেও তখন সংসারের জিনিস কিনত গেরস্থরা। ‘ছাতা সারাই, জুতো সারাই, খবরের কাগজ ও শিশি বোতল সংগ্রহ করা, চুল কাটার নাপিত, লোহার হাঁড়ি, কড়াই, ঘটি, বাটির ফুটো সারাই, ছুরি কাঁচি, বঁটিতে শান দেওয়া, তালা-চাবি নিয়ে বাড়ির সমস্যা মেটানো, বাটনা বাটার শিল নোড়া কাটিয়ে নেওয়া ইত্যাদি কাজের লোকের ভিড় লেগেই থাকত দিনভর। গরমকালে  হাজির হতো বরফওয়ালা... ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে গোলা বানানোর উপকরণ নিয়ে। উঁচু কাঠের টেবিলের উপরে কাঠের ভুসির মধ্যে থাকত বরফের বড় বড় খণ্ড। ওটা একটু ধুয়ে একটা করাতের মতো জিনিসের গায়ে ঘষে ঘষে বরফের গুঁড়ো বের করা হতো। তারপর গোল একটি কাঠির আগায় দিয়ে তৈরি হতো গোলা। পড়ত তাতে নানা রঙের সিরাপ। জলি চ্যাপ, হ্যাপি বয় নামে কোম্পানির আইসক্রিম মিলত হাতে টানা ছোট ছোট ঠেলাগাড়িতে। এরপরই হাজির শোনপাপড়িওয়ালা। হাতের থালায় শোনপাপড়ি সাজিয়ে নেচে নেচে বিক্রি করত ফেরিওয়ালা। আর ছিল শীতকালে খেজুর গুড়। মাথায় মাটির হাঁড়ি, কিংবা কাঁধের বাঁকে মাটির কুঁজোর মতো জালায় নলেন গুড়ের পাটালি থাকত। এছাড়া জয়নগরের বিখ্যাত মোয়া তো ছিলই। খই আর ক্ষীর দিয়ে সুস্বাদু এই মোয়ার কদর সন্দেশ, রসগোল্লার চেয়েও ছিল ঢের বেশি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল... কাচের বাক্সে তিলে তৈরি খাওয়ার সামগ্রী নিয়ে হাজির হতো ফেরিওয়ালা। পাড়া টের পেত ছোট ঘণ্টার আওয়াজে। তিলকুট, তিলের তক্তি, তিলের নাড়ু, কদমা। বিকেলে আরও একজন আসত। তার বাক্সে চাকতি ঘুরিয়ে গোলাপি রঙের শনের মতো একগুচ্ছ তুলোর মতো খাওয়ার জিনিস। সে মুখে দিলেই গলে যেত। আমরা বলতাম বুড়ির চুল বা হাওয়াই মেঠাই। ফেরিওয়ালা বলত, গোলাপি রেউড়ি। শেষ নয়... বাঁশের ডান্ডার মধ্যে জড়ানো একরকম রংবেরঙের চটচটে খাবার জিনিস আনত মোটা একটা লোক। সেখান থেকে নানা রকমের জিনিস... যেমন পাখা, টেবিল, চেয়ার, নৌকা বানিয়ে দিত সে। অনেকটা চিটে গুড়ের মতো। খেতে অদ্ভুত। হাতঘড়ি চেটে খেয়ে নিতাম আমরা। জিভে লেগে থাকত সেই রং।
একটু সন্ধ্যা হতেই টিনের বাক্স গলায় ঝুলিয়ে হাজির ঘুগনিওয়ালা। শালপাতায় ঘুগনি দিয়ে শালপাতারই চামচ বানিয়ে দিত সে। আর আসত হরিদাসের বুলবুল ভাজা। হাতে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে সে নেচে নেচে বলত, ‘হরিদাসের বুলবুল  ভাজা/খেতে ভারী মজাই মজা/ফুরিয়ে গেলে আর পাবে না/এ খাবার মজা কোথাও পাবে না।’ তেকোনো মোড়কে সেই হরিদাসের বুলবুল ভাজা হার মানায় যে কোনও চানাচুরকে।
গরমের দিনে একটু রাতে উদাস ডাক—‘কুলফি  মা লা ই বরফ’। হাঁড়িতে বরফের ভিতরে টিনের চোঙায় এই কুলফি ভরা থাকত। সেগুলি বের করে ভালো মতন হাতের মধ্যে ঝাঁকিয়ে নিয়ে উপরের মুখ খুলে শালপাতার মধ্যে ঢেলে দিত ভিতরের মালাই বরফ। গরমের রাতে বেল ও জুঁইফুলের মালা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াত অনেকে। ক্রেতা বাড়ির মেয়েরা, বউয়েরা। রামকুমারের বিখ্যাত একটি গান তাদের নিয়ে, ‘আমি বেলফুল ফেরি করি পাড়ায় পাড়ায়।’ আর আচমকা এসে হাজির হতো বাঁদর নিয়ে খেলা। দূর থেকে ডুগডুগির আওয়াজ শুনলেই ছোটদের মুখ উঁকি দিত জানলা-দরজায়। মাঝে মাঝে দেখা যেত ভালুক নিয়ে খেলাও। ভালুকের দুলে দুলে নাচ, ডিগবাজি খাওয়া, শুয়ে গড়াগড়ি, সে ছিল ভারী আমোদের। তাছাড়া গৃহস্থালির নানারকম জিনিস নিয়ে নিলামওয়ালার ‘সাড়ে ছ’আনা’ হাঁক। এদের নিয়েই ‘নিলামওয়ালা’ গান। মাথায় করে বড় ঝুড়ির মধ্যে দেবদেবীর মূর্তি নিয়েও দেখা যেত কয়েকজন ফেরিওয়ালাকে। 
ম্যাজিক দেখাতে  দুটো লোক কখনও সখনও পা রাখত গলিতে। চারিদিকে তখন বেজায় ভিড়। এছাড়া গলির রস্তায় বাঁশ খাড়া করে রোপট্রিক দেখাতে আসত যাযাবর ছেলে ও মেয়ের দল। দড়ির উপর দিয়ে হাঁটত তারা, দড়ি বেয়ে ওঠা, নানারকম ব্যালান্সের খেলা। এরই মাঝে একটি লোককে ধীরে ধীরে ‘রিপ, রিপ’ আওয়াজ করে যেতে দেখতাম। অনেকদিন পর্যন্ত বুঝতেই পারতাম না যে ওই লোকটি কি বলতে চাইছে আর ও কী বিক্রি করতে চাইছে। পরে জানলাম যে, ও রিফুর কাজ ভালো করতে পারে। 
দুপুর অথবা বিকেলের দিকে হাজির হতো ‘আইকম বাইকম বায়োস্কোপওয়ালা’। মাথায় করে একটি টিনের বড় বাক্স। সেটির গায়ে গোল গোল কতগুলো গর্ত। কাচ লাগানো। তাতেই রাখতে হতো চোখ। ভিতরে অনেক রকমের সুন্দর সুন্দর ছবি। আর ছিল রথের সময় পাড়ায় পাড়ায় তালপাতার বাঁশি বিক্রিওলা। তখন প্রায় সবাইয়ের বাড়িতে বাঁশির প্যাঁ পোঁ। সেই আওয়াজে বাড়ির লোকের কানের মাথা খাওয়ার জোগাড়। এই বাঁশিওয়ালার কাছে থাকত আরও দু’টি জিনিস। মাটির তৈরি গোল মতো একটা বাটিতে উপরে লাগানো বেশ কিছু কাঠি। এমনভাবে যে, দড়ি দিয়ে টানলে সেটিতে চট পট করে বেশ মজাদার শব্দ হতো। ছিল মাটি আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো বেহালা। ছড় দিয়ে ওরা দারুণ সুরে সেই বেহালা বাজাত। শেষ কবে দেখেছি সেই গানওয়ালাকে? সময়ের চাকায় হারিয়েছে সেই হিসেবও। অবসর দুপুরে, বা রবিবার সকালে এখন আর বলা যায় না... ‘আর একটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাবার নেই। কিচ্ছু করার নেই’। সেই বেহালাবাদক যে চিরতরে চলে গিয়েছে। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে শৈশব। নিয়ে গিয়েছে হঠাৎ ভালো লাগার অকারণগুলো। ছোটবেলাটা সবারই স্মৃতি ভার করে মনে পড়ায়। কিন্তু ফিরে দৈনন্দিনতায় কোনওদিনও আসে না। যেমন আসে না ফেরিওয়ালারাও। হয়তো কোথাও কোথাও এখনও ন’মাসে ছ’মাসে ডাক শোনা যায়... শিল কাটাও। উত্তর কলকাতার গলিতে বা দক্ষিণের স্টেশন ধারে। কিন্তু কেউ শিল কাটানোর জন্য তাকে ডাকে না। কাল পরশু থেকে আর ডাকবে না তারাও।
মনের গলিপথগুলো খাঁ খাঁ করে। একটা লম্বা অপেক্ষা, তারপর আবার ছোট হব। ফেরিওয়ালা তুমি সেদিন আলাদিনের প্রদীপটা নিয়ে এস। কলকাতাটাকে তার শৈশবে ফেরিয়ে নিয়ে যেও। সেদিন আমরা আবার ছোটবেলা হব।
‘সারাজীবন বসে খাবেন’-প্রবল চিৎকার ঘোরাফেরা করছে গলিপথে। ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি। সত্যিই কি এসে গেল জাদু প্রদীপ! ও হরি, ঠোঁটে ফিচেল হাসি ঝুলিয়ে লোকটা বিক্রি করছে বেতের মোড়া। মনে পড়ে গেল, ‘সকলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ জমা হবে’ প্রতিশ্রুতি। বোকা বানানোর ফেরিওয়ালারা এখন বেজায় সক্রিয় দুনিয়াজুড়ে। পরখ করে তবেই কেনাকাটা করবেন কিন্তু। সাবধানে পা ফেলবেন মা জননী, বাবাজীবনরা।

12th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা