বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

কবে আইল জামাই
রজত চক্রবর্তী

হুতুম বাংলার যাবতীয় উৎসব তথা ‘উজ্জুগ’ নিয়ে লিখে গিয়েছেন। কিন্তু জামাইষষ্ঠী নিয়ে একটি শব্দেরও উল্লেখ নেই। বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত পুরনো কলকাতার যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে লিখে গিয়েছেন। সেখানে ষষ্ঠী পুজোর কথা উল্লেখ করলেও ‘জামাইষষ্ঠী’ বলে কোনও আচারের উল্লেখ পাওয়া যায় না। পুরনো ব্রতকথার তালিকায় ‘অরণ্যষষ্ঠী’ নারীব্রত বলেই উল্লেখ আছে। বীজধারণ তথা সন্তানলাভের ব্রত। অরণ্যের কাছে গিয়ে এই ব্রত পালনের মূল কথা হল— প্রকৃতি এই সময়ে ফলে ফলে যৌবনোচ্ছলা। অরণ্যে অরণ্যে সেই সব ফলের বীজ ধারণ করবে ধরিত্রী মা। নতুন বৃক্ষের ভ্রুণ আসবে। বর্ষার জল তাকে সমৃদ্ধ করবে। প্রকৃতিতে এই গর্ভসঞ্চারের সময় নারী প্রকৃতির আকুতি তৈরি হয় সন্তানধারণের এই জ্যৈষ্ঠ মাসে। পাকে ফল রাঙা হয়ে দিগ্বিদিকে। অরণ্যষষ্ঠী ব্রত পালনে তারই প্রার্থনা। সন্তানবতী হওয়া ও সন্তানের মঙ্গলকামনা। তখন জীবন ছিল অরণ্যনির্ভর। কিন্তু সেখানে ‘জামাই বাবাজীবন’ কীভাবে সেঁদিয়ে গেল এবং ঠিক কোন সময় থেকে বলা মুশকিল! ১৮৭২ সালে দীনবন্ধু মিত্র লিখলেন ‘জামাই বারিক’ প্রহসন। কিন্তু সেখানেও ‘জামাইষষ্ঠী’র উল্লেখ ছিল না।
নাটকের কথা যখন উঠলই তখন সিনেমা বাদ যায় কেন! কলকাতার ক্রাউন সিনেমা হলে প্রথম সবাক বাংলা সিনেমার পথচলা শুরু হয় ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল। পরিচালক ছিলেন অমর রায়চৌধুরী। জামশেদজি ফ্রেমজি ম্যাডন-এর ‘ম্যাডন থিয়েটার কোম্পানি’র প্রথম বাংলা সবাক ছবি— ‘জামাইষষ্ঠী’। নায়ক জামাই কুবেরের   ভূমিকায় অমরবাবু নিজে, তাঁর স্ত্রীয়ের ভূমিকায় মিস গোলাপ আর শাশুড়ির চরিত্রে রানিসুন্দরী দেবী। স্ল্যাপস্টিক ধরনের মজার ছবি। সে প্রথম সবাক ছবিই বা জামাইদের নিয়েই কেন! কারণ বোধহয় ততদিনে চুনোট করা ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরা জামাইয়ের টাইপ চরিত্র মার্কেটে এসে পড়েছে। কারণ, ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত ষষ্ঠী পুজোর আচার থাকলেও জামাইয়ের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ‘শ্বশুর বধ পালা’ দেখার সুযোগ বাঙালির হয়নি বলেই মনে হয়। তাহলে বাবাজীবনের ভুঁড়ি নিয়ে ভূরিভোজে প্রবেশের দিনকাল যথেষ্ট আধুনিক।
সমার্থ শব্দকোষে দেখা যাচ্ছে ‘জামি’ বা ‘জামী’ মানে পতিব্রতা স্ত্রী, কুলবধূ, এয়োস্ত্রী। এয়োস্ত্রীদের এই ব্রতকে ‘জামিষষ্ঠী’ বলা হতো লোকসংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে। ‘জামি’ বা ‘জামী’ শব্দের বহুবচন ‘জাময়’। ‘জাময় ষষ্ঠী’ মূলত মা ষষ্ঠীর ব্রত, সন্তানলাভের ব্রত, অরণ্যষষ্ঠী। ফলমূল আহার বিধেয় এই ব্রতে। কালে কালে পুরুষতান্ত্রিকতার চাপে একটি সম্পূর্ণ নারীব্রত পুরুষের দিকে ঢলে পড়ল বলেই অনুমান করা যায়। ‘জাময় ষষ্ঠী’ কালে কালে অপভ্রংশে হয়ে গেল ‘জামাই ষষ্ঠী’। জামাইরা কোমর বেঁধে নেমে পড়ল ফিল্ডে। মেয়ে-জামাই-সন্তান-সন্ততি গুরুজন নিয়ে এক সুন্দর মিলনোৎসবে পরিণত হল একটি ঘরোয়া আচার। বাঙালির বেঁচে থাকার প্রাণসুধা হল উৎসব, মিলনোৎসব। যে কোনও পালা-পার্বণকে বাঙালি সেইদিকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাওয়ায় দক্ষ। এক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। 
লোকাচারে ষষ্ঠী পুজোর প্রচলন বহু প্রাচীন। অরণ্য সভ্যতার ইতিহাসে আছে অরণ্যষষ্ঠী ব্রতের কথা। সেখানে সাকার কোনও দেবীমূর্তি নেই। পরবর্তী কালে বৈদিক পূজা প্রকরণ চালু হতেই দেব-দেবীর আবির্ভাব পুরাণের পাতা থেকে মানুষের উঠোনে উঠোনে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ষষ্ঠীর বর্ণনা দিয়েছেন— 
‘দুয়ারে বান্ধিল জল বেত্র উপনাদে
ফেরিয়া চালের খড় জ্বালিল আঁতুরি
গো-মুণ্ডে থুইয়া দ্বার পূজে ষষ্ঠী বুড়ি।’
সন্তানের মঙ্গলকামনায় এই ষষ্ঠী পুজোর চল আঁতুরঘরে। ঘটস্থাপনে এই পুজো। ষষ্ঠীদেবীর আগমন ঘটেছে অনেক পরে। যা ছিল মেয়েদের ঘরোয়া ব্রত তাই পরিণত হল দেবীর পুজোয়। দেবী দ্বিভুজা, গৌরবর্ণা, সালঙ্কারা যুবতী, প্রসন্নবদনাং, বামকোলে শিশু ইত্যাদি ইত্যাদি বর্ণনা আছে।‌ সঙ্গে আছে নানা গল্প। সেই লোভী বউয়ের গল্প যে ষষ্ঠীর পুজোর জন্য রান্না করা খাবার খেয়ে বিড়ালের নামে দোষারোপ করত। তার সাত-সাতটা নবজাতক সন্তান বিড়ালে নিয়ে যায়। শেষ সন্তানকে যখন বিড়াল নিয়ে যাচ্ছে বউটি দেখতে পেয়ে পিছু পিছু তাড়া করে। পৌঁছে যায় দেবী ষষ্ঠীর কাছে। বকাঝকা ক্ষমা চাওয়া কান্নাকাটি আশীর্বাদ এইসবের পর সাত সন্তান নিয়ে সুখে ঘর করা। বিড়াল হল ষষ্ঠীর বাহন। তাও আবার কালো বিড়াল।
যাই হোক। জামাই আসবে। সক্কাল সক্কাল শ্বশুর-শাশুড়ি রেডি। ১০৮টি দূর্বা, ঘটে জল, আম্রপল্লব, সাত রকম ফল, সাদা সুতো, হলুদ বাটা। জামাই বসেছে কাজকরা আসনের উপর সিল্কের ধুতি পাঞ্জাবি সামলে। দূর্বার আঁটি দিয়ে ঘটের গঙ্গাজল ছিটিয়ে ষাট, ষাট, ষাট তিনবার বললেন শাশুড়ি। সোনার কাঁকন-বালা ফর্সা হাতে ঠুনঠুন বেজে উঠল জমিদার গিন্নির। তেলিনীপাড়ার ব্যানার্জি জমিদার বাড়িতে জামাইষষ্ঠীর ধূম লেগেছে বাড়িময়। প্রথম জামাইষষ্ঠী বলে কথা! ১৮১৮ সাল মতান্তরে ১৮১৪। চন্দননগরের সূর্য মোদকের ডাক পড়েছিল— ‘জামাই ঠকানো সন্দেশ তৈরি করতে হবে তোমায় বলে দিনু!’ জমিদার গিন্নির অর্ডার। সন্দেশের ভিতরে রাখা হল গোলাপজল। জামাই সন্দেশ হাতে তুলে কামড় দিতেই গোলাপজল গড়িয়ে পড়ল পাঞ্জাবি কাপড়ে। অপ্রস্তুত জামাই। খিলখিল হাসিতে পায়রা উড়ল উঠোনে। জামাইষষ্ঠীতে তৈরি হল ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ ‘জলভরা সন্দেশ’।
জামাইরা যবেই ঢুকে পড়ুক নারীদের ব্রতে, তবে তাদের বীরত্ব ব্যঞ্জক প্রবেশের পর জমজমাট হয়ে উঠেছে ‘জামাইষষ্ঠী’ পার্বণটি। দিকে দিকে তার ঘটা এই উত্তর-আধুনিক যুগেও।       

5th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা