বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

অভিযান না ট্যুরিজম?

বীরেশ্বর বেরা: প্রথম এভারেস্ট জয়ী তেনজিং নোরগের ছেলে জামলিং তেনজিং নোরগে ২০০৩ সালে একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘আমার বাবা বর্তমানের এভারেস্ট অভিযান দেখলে হতবাক হয়ে যেতেন!’ হঠাৎ এই কথা বললেন কেন জামলিং? তারপর সকলকে চমকে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বড়লোক রোমাঞ্চ-সন্ধানীরা পর্বতারোহণের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই এখন এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে যাচ্ছেন।’ 
পর্বতারোহণ এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। যে কোনও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের জন্য যতটা দক্ষতা লাগে, এক্ষেত্রে তার থেকে কিছুটা বেশিই প্রয়োজন। কিন্তু অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও সত্যি এই যে, আজকের দিনে পকেটের জোর থাকলে এভারেস্ট জয়ীর তকমা পাওয়া অনেকটাই সহজ। অবশ্যই প্রাথমিক নিয়মকানুন, কৌশল ও পদ্ধতি সবাইকেই জানতে হয়। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষের দিকেও বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করতে গেলে দক্ষতার যে পর্যায়ে পৌঁছতে হতো, আজকের দিনে তা অর্জন না করেও এভারেস্ট জয়ীর তকমা পাওয়া যায়। শৃঙ্গ আরোহণের পর নেমে আসার পথে ক্যাম্প-২ থেকে হেলিকপ্টারে ফিরিয়ে আনারও সুব্যবস্থা রয়েছে। বেসক্যাম্পে মিলতে পারে হোটেলের মতোই সুব্যবস্থা। উপযুক্ত অর্থ দিলে ‘পরিষেবা’র অভাব হয় না সেখানে। পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে অন্যতম কাজ ‘রোপ ফিক্স’ করা। সেই দড়ি ধরে খাদগুলি পেরতে হয়। সেই কাজও এখন নিজেরা না করলে চলে। নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে অভিজ্ঞ শেরপারা সেই কাজ করে রাখেন আগে থেকেই। ফি-বছর মে মাসে বহু মানুষ এখন এভারেস্ট অভিযানে যান। নেপালের সার্বিক অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে এর উপর। বিভিন্ন পর্বতারোহণ সংস্থায় নাম লেখাতে হয় বিশাল টাকার বিনিময়ে। অভিযাত্রীদের নানা সুযোগসুবিধা পাইয়ে দিতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে সংস্থাগুলির মধ্যে। একজন পর্বতারোহী চাইলে তাঁর সঙ্গে চারজন শেরপাও নিয়ে যেতে পারেন। নিজেরা বেসক্যাম্প থেকে ক্যাম্প-১, ক্যাম্প-২ তে লোড ফেরি না করলেও শেরপা বা পোর্টাররা তা করে দেন। এসব ‘পরিষেবা’ পাইয়ে দিতে রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। কোনও কোনও পর্বতারোহী বলছেন, নেপাল সরকারের অনুমতিক্রমেই সবটা হয়। এর ফলে যা ছিল দুর্গম অভিযান, অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যতের দিকে অতি সন্তর্পণে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাওয়া, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানিকে অস্বীকার করার জীবনবোধ— তা এখন স্রেফ ‘ট্যুরিজম’-এ পরিণত হয়েছে। 
এসব বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল রাজ্যের প্রবীণ পর্বতারোহী গৌতম দত্তের সঙ্গে। ১৯৯১ সালে গৌতমবাবুরা এক বিশেষ এভারেস্ট অভিযান করেছিলেন। তাঁরাই ভারতের প্রথম অভিযাত্রী দল, যাঁরা এভারেস্টের উত্তর দিক থেকে অর্থাৎ চীনের দিক থেকে অভিযান শুরু করেছিলেন। এছাড়া এই অভিযানে কোনও শেরপা বা গাইডের সাহায্য ছাড়াই যাওয়া হয়েছিল। এভারেস্টের উত্তর গাত্রের এই রাস্তা প্রায় ২০টি রুটের মধ্যে সবচেয়ে দুরূহ বলা যেতে পারে। গৌতমবাবুর কথায়, ‘আমরা ২৫ হাজার ৫০০ ফুট উঠে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রবল তুষারঝড়ের মধ্যে পড়ি। তিন রাত, চার দিন বাঙ্কার তৈরি করে তার মধ্যে কোনওরকমে বেঁচে থেকে তারপর নেমে আসতে বাধ্য হই। ওই পথে আমাদের আগে মাত্র দু’জন এভারেস্ট জয় করতে পেরেছিলেন। আমরা শেষ পর্যন্ত এভারেস্ট শৃঙ্গে পৌঁছতে না পারলেও সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রকৃত পর্বতারোহণের মানে কী! একজন পর্বতারোহীর সত্যিকারের অভিযাত্রী মননের যে প্রকাশ, তা টের পেয়েছিলাম ওই অভিযানে। আজকের দিনে ব্যাপারটা মূলত সিন্ডিকেট অপারেটেড ট্যুরিজম-এ এসে দাঁড়িয়েছে। নেপাল সরকারের পূর্ণ মদতে কিছু ব্যবসায়ী বাণিজ্য করছেন। তাঁরা সারাক্ষণ অভিযাত্রী নয় বরঞ্চ কাস্টমার খুঁজছেন বলা ভালো। আপনার ইচ্ছে এবং পকেটের জোর থাকলেই হবে। বাকিটা তাঁরা ব্যবস্থা করবেন। কারণ, মাসমাইনে দিয়ে শেরপাদের রেখেছে ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি। সত্যি কথা বলতে কী, একজন অভিযাত্রীকে যা যা করতে হতো, সবটাই এখন আপনি কিনে নিতে পারেন। এখন আর সেই অ্যাডভেঞ্চার নেই। বরং এসবের নাম করে সস্তায় নাম কেনার ব্যবস্থা হয়েছে। ২০১৯ সালে সাউথ কল রুটে একদিনে ৩২৪ জনকে সামিট করানো হয়েছে। এভারেস্টে ওঠার এখনও পর্যন্ত ১৮-২০টি রুট আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দু’টি রুটেই সিন্ডিকেট বা সংস্থার মাধ্যমে অনেক কম কষ্টে এভারেস্ট জয়ের ব্যবস্থা আছে। তবে বাকি রুটগুলিতে যেতে হলে আপনাকে প্রকৃতই অভিযাত্রী হতে হবে এবং পর্বতারোহণের এ-বি-সি জানতেই হবে। এখন তো বেসক্যাম্পে এলাহি ব্যবস্থা থাকেই। আপনি হোটেলে যা যা পেতে পারেন, সবটাই আপনি এখন ওখানেও পাবেন। এই জন্যই ব্যাপারটি এখন ট্যুরিজম বলে মনে হয়।’ 
এভারেস্ট জয়ী দেবরাজ দত্ত বলছিলেন, ‘আমার মতে, এভারেস্ট অভিযানের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। সে বছর ডেভিড ব্রেসিয়ারসের নেতৃত্বে একটি দল বাণিজ্যিক অভিযানের মাধ্যমে এভারেস্ট শীর্ষে পৌঁছেছিল। এই দলে ছিলেন রিচার্ড বাস নামে বছর  ৫৫-র এক তেল ব্যবসায়ীও। তাঁর মাত্র চার বছর পর্বত আরোহণের অভিজ্ঞতা ছিল। ন’য়ের দশকের গোড়ার দিকে বেশ কয়েকটি কোম্পানি এভারেস্টে গাইডেড অভিযান অফার করছিল। ১৯৯৬ সালের দুর্যোগে মারা যাওয়া পর্বতারোহীদের অন্যতম একজন হলেন রব হল। সেই ঘটনার আগে পর্যন্ত সফলভাবে তিনি ৩৯ জন ক্লায়েন্টকে এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্য, প্রত্যেককে এখনও নিজের পায়েই পর্বতে উঠতে হয়। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের চেতনাটাই হারিয়ে গিয়েছে। এমন লোকও এখন অর্থের জোরে শীর্ষে আরোহণ করতে পারছেন, যাঁদের সম্যক ধারণা নেই কীভাবে ক্র্যাম্পন পরতে হয়।’ 
দেবরাজবাবু কথায় কথায় আরও জানান, পর্বতারোহীদের এভারেস্টের মতো সুউচ্চ পর্বতে ওঠার জন্য আগে ছয় ও সাত হাজার মিটার উচ্চতার পর্বতে বারে বারে উঠে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হতো। কারণ বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের অর্থ,  হাল না ছাড়ার ইস্পাত-কঠিন মনোভাব, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, চারিত্রিক উদারতা, যেকোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সহ আরোহীদের পাশে থাকার মানসিকতা—এসব মানবিক বৈশিষ্ট্যের সম্মিলিত উদযাপন। যেসব সুবিধা পাওয়া যায়, তা আপনি নেবেন কি নেবেন না, সেটা তো আপনার ব্যাপার। যেরকম পয়সা ঢালবেন, সেরকম সুবিধা পাবেন। স্বপ্নপূরণের ইচ্ছা থাকলে হয়ে যাবে। বেসক্যাম্পেই মূলত নানা সুবিধা পাওয়া যায়। অনেকে  ক্যাম্প ২ থেকে কপ্টারে নেমে যান। এর সঙ্গে বিমা সংস্থার নানা কারসাজিও জড়িত থাকে। ভুয়ো ডাক্তারি রিপোর্ট দিয়েও ক্যাম্প ২ থেকে নামিয়ে আনা হয় অনেক সময়। আবার এটাও ঠিক যে, নেপাল সরকারের কিছু নিয়ম বাদ দেওয়া কার্যত অসম্ভব। নেপালের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে এর উপর। আমরা যে টাকা দিই, তার অংশ দিয়ে নেপাল সরকার ৩০ জন শেরপার একটি দল ঠিক করে দেয়। এসপিসিসি (সাগরমাথা পলিউশন কন্ট্রোল কমিটি) এই দায়িত্ব পালন করে। দড়ি বারবার লাগাতে হয়। কোথাও তারা বেসক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ২ পর্যন্ত রোপ ফিক্স করে। ক্যাম্প ২ থেকে সামিট পয়েন্ট পর্যন্ত এই কাজগুলি করার জন্য বেসক্যাম্পে সবাই মিলে দক্ষ ও সেরা শেরপাদের নিয়ে ১০-১২ জনের টিম করা হয়। এর জন্য চার্জ দিতে হয় আলাদা। তবে এসব এড়িয়ে কেউ যেতে চাইলে অন্য রুটও রয়েছে।  দু’রকমের অভিযাত্রী আছেন। সকলকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। রাজ্যের আরেক এভারেস্ট জয়ী বসন্ত সিংহ রায় বলেন, ‘ন’য়ের দশকেও আমরা দেখেছি, এভারেস্টে যাওয়ার আগে প্রি-এভারেস্ট অভিযান হতো। সেখানে যারা কৃতিত্ব দেখাতে পারত, তাদেরই সিলেক্ট করা হতো মূল অভিযানের জন্য। ওই মহড়াতে কেউ সুযোগ পেলেও তাঁর গর্ব করার অনেক কারণ ছিল। কারণ তখন এতটা সহজ ছিল না বিষয়টি। তবে এখনও যে খুব সহজ—তা বলব না। যদি এতটাই সহজ হতো, তাহলে অনেক অভিজ্ঞ পর্বতারোহী বিগত কয়েক বছরে এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে আর ফিরতে পারলেন না কেন? এটা ঠিক যে, এখন বেসক্যাম্পে বসে আবহাওয়ার একেবারে সঠিক পূর্বাভাস পাওয়া যায়। সেই মতো বেরনো যায় পরবর্তী অভিযানে। স্যাটেলাইট ফোন, মোবাইল ইত্যাদির হাত ধরে সবটাই অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু এভারেস্টের দুর্গমতা তাতে কিছু কম হয়নি। প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার হাত ধরে এভারেস্ট অভিযানের সাকসেস রেট বেড়েছে বলা যেতে পারে।’
 গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : স্বাগত মুখোপাধ্যায়

29th     May,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা