বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

আদুর বাদুড়
চালতা বাদুড়

মাম্পস-র‌্যাবিস-নিফা-ইবোলা-হেন্ড্রা-সার্স-মার্স-কোভিড প্রভৃতি মারণ ভাইরাসের সূতিকাগার বাদুড়ের শরীর। অথচ বাদুড়ের টিকিটিও কস্মিনকালে তারা স্পর্শ করতে পারেনি। বাদুড় থেকে মানুষে সরাসরি সংক্রমণের নেই কোনও প্রাক-ইতিহাস। মধ্যবর্তী পোষক উট-ঘোড়া-শিম্পাঞ্জি-শুয়োর-পিপীলিকাভুক থেকেই সংক্রমিত হয়েছে মানুষ। নির্বিচারে অরণ্যনিধন, জীববৈচিত্র্যের সমূল বিনাশই প্রতিটা মহামারীর নেপথ্যের এক এবং অদ্বিতীয় কারণ। মানুষের কি সম্বিত ফিরবে না? সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি মৃন্ময় চন্দ।

 সাল ১৯৯৯, মালয়েশিয়া। রবিবার। দিগন্ত লাল আবিরে রাঙা। অস্তায়মান সূর্য। মন্দাক্রান্তা ছন্দে গড়িয়ে চলেছে জীবন। বিনা মেঘে বজ্রপাত। সেদিন হঠাৎই মারা গেলেন এক্কেবারে সুস্থ সবল নীরোগ কিছু মানুষ। প্রথমে এনসেফেলাইটিস, তারপরে পক্ষাঘাত এবং মহাপ্রয়াণ। মারা যাওয়া মানুষের সিংহভাগই যুক্ত শুয়োর প্রতিপালনে। অদৃশ্য ঘাতক কোনও ভাইরাস? সারাদিনে পেটে কিছু পড়েনি ডাঃ ক্য বিঙ চুয়ার। কুয়ালালামপুরের মালয়া ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজির ছাত্র চুয়া তখন গবেষণাগারে মগ্ন মৃত এক রোগীর দেহরস পরীক্ষায়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে, ‘ডাইয়ের’  অপার্থিব উজ্জ্বল সবুজ আলোর ঝলকানিতে অকস্মাৎ তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেল ঠান্ডা স্রোত।   
সরকার বলল আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মশার কামড় থেকেই এনসেফেলাইটিস এবং মৃত্যু। মশা-নাশক ছড়ানো হচ্ছে, অচিরেই শান্তিকল্যাণ হবে মালয়েশিয়া। চুয়ার খটকা লাগল। শুয়োরের সংস্পর্শে আসা খ্রিস্টান মালয়েশীয়রাই কেবল মারা যাচ্ছেন! মুসলিমরা মারা যাচ্ছেন না মোটেই। মশা তো মুসলিম, খ্রিস্টান দেখে কামড়াবে না। মালয়েশিয়া সরকারের হাতে পায়ে ধরে ভয়ঙ্কর বিপদের সম্ভাবনা অগ্রিম আঁচ করেই চুয়া অদৃশ্য রোগের নমুনা ব্যাগে ভরে তড়িঘড়ি ছুটলেন কলোরাডোর ফোর্ট কলিনসের সিডিসি-তে। চিহ্নিত হল হামের স্বজাতীয় এক  ‘প্যারামাইক্সোভাইরাস’। যমদূত ‘প্যারামাইক্সোভাইরাস’ সবসময়ই ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে, নয় মশা-বাহিতও। মালয়েশিয়া সরকারের মশা মারতে কামান দাগাকে চুয়া সত্বর বন্ধ করলেন।   মালয়েশিয়ার ‘নিফা’ বলে একটি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি শুয়োর পালন করা হতো। রোগটির ব্যাপক হানাদারিও সেখানেই। অগুনতি মানুষ মারা যাচ্ছেন নিফা অঞ্চলেই। চুয়া বুঝতে পারলেন রোগটি মানুষের শরীরে থাবা দিচ্ছে শুয়োর থেকেই। নির্বিচারে জঙ্গল সাফা করে শুয়োরের খামার নির্মিত হচ্ছিল। বিভিন্ন ফল গাছের সঙ্গে নিফার জঙ্গলে বট, কলা, পাইন, কেরোসিন প্ল্যান্ট বা তালগাছের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। ফ্লাইং ফক্স বা উড়ুক্কু শেয়াল গোত্রের রাতচরা ফলখেকো ‘টেরোপাস’ বাদুড়দের প্রাকৃতিক বিচরণভূমি ছিল নিফা। জঙ্গল সাফা হওয়ায় গৃহহীন হল বাদুড়েরা। সেই বছরে ‘এলনিনো’র প্রাবল্যে দুর্বিষহ খরাতেও ছারখার হয়েছিল মালয়েশিয়া। ফল, পোকামাকড়ের অভাবে বাদুড়দের খাবারে টান পড়ল। ফলখেকো বাদুড়েরা উড়তে উড়তেই অর্ধ-ভক্ষিত ফল ফেলে দেয়। বুভুক্ষু শুয়োর বাদুড়দের আধ-খাওয়া ফেলে যাওয়া ফল গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল। বাদুড়দের লালারসে সম্পৃক্ত ভাইরাস শুয়োরদের শরীরে হানা দিল নিঃশব্দে। 
শুয়োরদের শরীরে ভাইরাসটি দাঁত ফোটাতে পারল না। কিন্তু শুয়োর থেকে যে মুহূর্তে ভাইরাসটির মানবশরীরে উল্লম্ফন সেই মুহূর্তেই ভাইরাসটি খেল দেখাতে শুরু করল। ‘নিফা’ অঞ্চলে প্রথম মেলায় বহির্বিশ্বে ‘নিফা ভাইরাস’ হিসাবেই পরিচিতি মিলল। নিফায় মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ। তিনটি পরিবার-পিছু একজনের প্রাণ কাড়ল মহামারী নিফা। নিফার শুয়োরের খামার পর্যবসিত হল ভাইরাস কারখানায়। আসরে নামল সেনাবাহিনী। ১০ লক্ষ শুয়োরকে রাতারাতি মেরে ফেলা হল। বিশাল গভীর গর্তের  মৃত্যুকূপে জ্যান্ত কবর দেওয়া হল লক্ষ লক্ষ নিষ্পাপ-নিরপরাধ শুয়োরকে। বাদবাকি শুয়োরদের গুলি করে মারল সেনা জওয়ানরা। অন্তিম পরিণতির কথা আন্দাজ করে অসহায় নিরপরাধ প্রাণীগুলোর চোখ থেকে নাকি অঝোরে জল ঝরত! গাল বেয়ে সেই জল গড়িয়ে নামত। বিবিসি সাক্ষী ছিল মর্মন্তুদ সেই ঘটনার। গোটা বিপর্যয়ের অন্তরালে একমেবাদ্বিতীয়ম খলনায়ক কিন্তু বাদুড়। গায়ে-গতরে বাদুড়ের শরীরে বেড়ে, শুয়োরকে শিখণ্ডী বানিয়ে নিফা ঢুকে পড়েছিল মানুষের শরীরে।   

বাদুড়, ভাইরাস সূতিকাগার
নিফা শুধু নয়, মাম্পস-র‍্যাবিস-সার্স-মার্স-ইবোলা-মারবার্গ-হেন্ড্রার মতো ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী সব রোগের ভাইরাসদেরও কোলেকাঁখে করে বড় করে বাদুড়েরা। যেমন ইবোলা। ১৯৭৬ সালে প্রথম ধরা পড়েছিল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে। ২০২০-র জানুয়ারি পর্যন্ত, কঙ্গোতে ৩ হাজার ৩০৪ জন ইবোলা রোগীর মধ্যে মারা গেলেন ২ হাজার ২৪৪ জন। কঙ্গোর ইবোলা নদীর দু’ধারেই ভাইরাসটির হানাদারির কারণে নাম হল ইবোলা। এক্ষেত্রেও গল্পটা মোটামুটি এক। নির্বিচারে অরণ্য নিধন। বাদুড় ভেজে খাওয়া। উদ্বাস্তু বাদুড় প্রাণভয়ে পালিয়ে কঙ্গোর বিভিন্ন অপাপবিদ্ধ জঙ্গলে বাসা-বাধা শুরু করল। বাদ গেল না পশ্চিমী দুনিয়ার ধনকুবেরদের টাকায় গরিলাদের প্রমোদভ্রমণে তৈরি ‘লসি স্যাংচুয়ারিও’। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরায় গরিলাদের খাবারে টান পড়ল। আবারও হামলে পড়ে বাদুড়দের ফেলে যাওয়া আধ-খাওয়া ফল ভক্ষণ গরিলাদের। টপাটপ ইবোলায় আক্রান্ত হওয়া। ২০০২-’০৪-এ ‘লসি অভয়ারণ্যে’ই ইবোলায় মারা পড়ল ৫ হাজার ৫০০টি গরিলা। ১৯৯৪ সালে আইভরি কোস্টের ‘তাই জাতীয় উদ্যানে’ এবং ১৯৯৬ সালে গ্যাবন-এ বেশ কিছু শিম্পাঞ্জি আর গরিলাও মারা গিয়েছিল ইবোলায়। শিম্পাঞ্জির অসতর্ক অটোপ্সি (ময়নাতদন্ত) আর গরিলার ‘এক্সোটিক’ মাংসের ডিশ খাওয়ার লোভে মানুষ সাড়ম্বড়ে তার শরীরে ইবোলাকে আহ্বান জানাল।

মহামারী, দায়ী বাদুড়
মহামতি পাঠক, বাদুড়দের থেকে কখনও কোনও মারণ ভাইরাসই কিন্তু সরাসরি মানব শরীরে হানা দেয়নি। কোনও অন্তর্বর্তী পোষক বা আশ্রয়দাতার শরীরে নবযৌবন লাভের পরেই প্রবল প্রতাপান্বিত ভাইরাসটি মানুষকে পেড়ে ফেলেছে। করোনা মহামারীর ভাইরাসটিও গোকুলে বাদুড়ের শরীরে বেড়েছিল। উহানের বাজারে বাদুড়কে কেটেকুটে ছাল ছাড়িয়ে খেতে গিয়েই বিপদ বাধল। বাদুড়ের শরীর থেকে প্রাণে বাঁচতে নভেল করোনা নাকি আশ্রয় নিয়েছিল প্যাঙ্গোলিনের শরীরে! সেই প্যাঙ্গোলিনকেও ঘচাং ফু করে খাওয়ার ফন্দি আঁটার সময়েই প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে মানুষের শরীরে চুপিসারে সেঁধিয়ে গেল কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত নভেলকরোনা।
উহান, কম্বোডিয়া, গিনি, লাইবেরিয়া, কঙ্গো, আইভরিকোস্ট, ভারত —সর্বত্রই বন উজাড় করে বাদুড়কে গৃহহীন করার চক্রান্তেই গোটা পৃথিবী আজ থরহরি কম্প। বাদুড় উপযাচক হয়ে কোভিডকে উপহার দেয়নি। 
যত বেশি অরণ্যনিধন, সয়াবিন চাষ, মাংসের জন্য গো-পালন, তত উচ্চকিত মহামারীর সম্ভাবনা। যত বেশি বন্যপ্রাণী নিধন, তত বেশি প্রজ্বলিত চিতার লেলিহান আগুনের আগ্রাসী  আস্ফালন। বাদুড়ের অবর্তমানে মানুষ নিজের গ্রাসাচ্ছাদনে দু’বেলা দুমুঠো অন্নও জোগাতে পারবে না। ২ কিলো ওজনের একটি ‘ফ্লাইং ফক্স’ প্রজাতির বাদুড় প্রতি রাতে ৬-৮ হাজার পোকামাকড় ভক্ষণ করে রক্ষা করে ফসলকে। কেবল রাতেই প্রস্ফুটিত হয় এরকম ৫২৮টি প্রজাতির ফুলের পরাগ-সংযোগ ঘটায় মৌ-পিয়াসী বাদুড়। ধরিত্রীকে রাখে সুফলা। বাদুড়ের অভাবে দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে বাটি হাতে বসতে হবে মনুষ্য-প্রজাতিকে। গোগ্রাসে মশা (প্রতি রাতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মশা খায় একটি বাদুড়) গিলে বাদুড় ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়াকে প্রতিহত করে। বাদুড়ের অবর্তমানে মশক-বাহিত রোগেই ছারখার হবে বসুন্ধরা। 

অত্যাশ্চর্য প্রাণী—বাদুড় 
বিশ্বে প্রায় ১ হাজার ২৩৩ প্রজাতির বাদুড় বিরাজমান। বাদুড় বহুবর্ষজীবী। ব্রানট বাদুড় (মায়োটিস ব্রানটি) ৪১ বছর পর্যন্ত বাঁচে। বাদুড়, মেগা এবং মাইক্রোচিরোপেট্রা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। বিশালকায় ফলখেকো উড়ুক্কু শেয়াল গোত্রের বাদুড়ের দুটো ডানার বিস্তৃতি প্রায় ৫ ফুট। ওজন আড়াই কেজি। মাইক্রোচিরোপেট্রা, ‘মেক্সিকান ফ্রি টেলড’ বাদুড় (চামচিকের মতো) সাকুল্যে ৬ ইঞ্চির। ওজন ৮ গ্রাম। তিন ধরনের রক্তচোষা বা ‘ভাম্পায়ার ব্যাটের’ হদিশও মিলেছে। যূথবদ্ধ, সামাজিক প্রাণী বাদুড়। একমাত্র উড়ন্ত স্তন্যপায়ী। বেশিরভাগ স্ত্রী বাদুড় স্বামী অনুগত, বহুগামী নয়। বাদুড়রা সাধারণত একটিই সন্তান প্রসব করে। সন্তানরা মাতৃদুগ্ধ পান করে। বিশেষ পরিবেশ পরিস্থিতিতে, খাদ্যাভাব, বৃক্ষচ্ছেদন বা মনুষ্যকৃত বাদুড়-নিধন যজ্ঞে দ্রুত বাদুড়দের সংখ্যার ক্রমাবনমণ ঘটতে থাকলে দু’টি বা তিনটি সন্তানের জন্মও অস্বাভাবিক নয়। 
একমাত্র বাদুড়রাই ‘ইকোলোকেশন’ বা উচ্চ-কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গের আদানপ্রদানে ‘ট্রু ফ্লাইট’-এ অভ্যস্ত। ১০০ কিমি পথও তারা একরাতে হেসেখেলে পাড়ি দিয়ে নির্বিঘ্নে গোঠে ফিরে আসতে পারে স্রেফ ‘ইকোলোকেশনের’ সৌজন্যে। শব্দই তাদের দৃষ্টিশক্তি। নিশাচর ফলে ‘ইকোলোকেশন’ ছাড়া গতিও নেই। সাধারণত ল্যারিঙ্কস ও জিভ দিয়েই বাদুড় শব্দ সৃষ্টি করে। এরোসলের মাধ্যমে ভাইরাসও তখন ছড়িয়ে পড়ে। অশ্বখুর বাদুড়  (রাইনোলোফিডি) বা লিফ-নোজড বাদুড়েরা (হিপ্পোসাইডারিডি) নাক দিয়ে শব্দ করে ‘ইকোলোকেশন’ সৃজন করে। ২০-২০০ কিলো হার্ৎজ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ বাদুড় তৈরি করে। মানুষ সর্বোচ্চ ২০ কিলো হার্ৎজ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। দুটো পাথর ঠোকাঠুকি করলে যেমন শব্দ হয়, চকরাবকরা বা চিত্রাঙ্গ বাদুড় (ইউডার্মা ম্যাকুউলেটাম) ঠিক সেরকম শব্দে ওড়ে। 
কনস্ট্যান্ট (সিএফ) ও ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেটেড (এফএম) স্বর প্রক্ষেপণেও চোস্ত বাদুড়। উচ্চ কম্পাঙ্কের ‘ইকোলোকেশন’ নিকটবর্তী একটা অতিক্ষুদ্র পোকার গতিবিধিও নিখুঁতভাবে বাতলে দেয় বাদুড়কে। বলে দেয় সামনে আখাম্বা কোনও বাঁশ বা মূর্তিমান কোনও জগদ্দল রয়েছে কি না! ছোট্ট বাদামি বাদুড় (মায়োটিস লুসিফুগাস) ৫০-১২০ ডেসিবেলের জোরালো শব্দ উৎপন্ন করে। বাঁচোয়া, মানুষ সুপারসনিক সাউন্ড মোটেই শুনতে পায় না। অশ্বখুর বাদুড়দের কানে রয়েছে বিশেষ রিসেপ্টর, তার ফলে ০.০০০১ কিলো হার্ৎজ ব্যবধানের অতিসূক্ষ্ম শব্দের তারতম্যও কর্ণগোচর করতে কোনওই অসুবিধা হয় না তাদের। বাদুড়দের কান কখনও বিশাল ঘোড়ার কানের মতো, কখনও বা অদ্ভুত কোঁচকানো। কানের গঠনগত প্রকারভেদেই শব্দতরঙ্গের গ্রহণ সদা সর্বদা থাকে নিখুঁত-ত্রুটিমুক্ত।     
৬টি প্রজাতি বাদে সব বাদুড় মাথা নীচের দিকে করে ঘুমোয় বা বিশ্রাম নেয়। ‘পাওয়ার ফ্লাইটে’ স্থির অবস্থা থেকে সটান উড়ে যেতে তাতে সুবিধা হয়। পাখির মতো পা বা লেজে ভর দিয়ে বাদুড় লাফ মেরে উড়ে যেতে পারে না। তাই হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ হয়েই শয়ন বা বিশ্রাম। লম্বা উড়ানের প্রস্তুতিও সেই সময় সেরে নেয় বাদুড়। বাদুড়ের অবতরণ চরম নৈঃশব্দে, ফলে খুব কাছাকাছি থাকা পতঙ্গ বা সদা সজাগ ইঁদুরও ঘুণাক্ষরেও বাদুড়ের উপস্থিতি টের পায় না। নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ উড়ানে বাদুড়ের অঢেল শক্তির প্রয়োজন। তাই বাদুড়ের খাদ্যে প্রচুর সুষম পুষ্টিকর উপাদান জরুরি। পতঙ্গ বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণী থেকে বাদুড় সংগ্রহ করে পর্যাপ্ত প্রোটিন আর ফ্যাট। বাদুড়ের দেখাদেখি মানুষও সম্প্রতি শুরু করেছে ‘ইনসেক্ট ফার্মিং’। ফল থেকে মেলে কার্বোহাইড্রেট-ভিটামিন-খনিজ লবণ। আধঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে কিলোখানেক খাবার হজম করে ফেলতে পারে বাদুড়। তার ফলেই মেলে ‘পাওয়ার ফ্লাইটের’ অক্ষৌহিণী শক্তি। 
বাদুড়ের বর্জ্য ‘গুয়ানো’ নামে পরিচিত। পটাশিয়াম নাইট্রেটে পরিপূর্ণ দুর্মূল্য ‘গুয়ানো’ সার হিসাবে অত্যুৎকৃষ্ট। কম্বোডিয়ায় ‘বাটামব্যাঙে’ বড় বড় গাছে ফলপাকড় আর পোকামাকড়ের প্রলোভনে বাদুড়দের আমন্ত্রণ জানিয়ে, গাছের নীচের গর্তে জমানো হচ্ছে ‘গুয়ানো’। একশ্রেণীর মানুষ ‘গুয়ানো’ বেচেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন। পূর্বেই বর্ণিত, বাদুড়েরা ওড়ে ‘ইকোলোকেশনে’। তবে বৃহদায়তন ফলখেকো বাদুড়দের চোখের দৃষ্টিশক্তি মানুষের থেকে উন্নত। চোখ বাদুড়দের ক্ষেত্রে অভিশাপ। কাচের জানলার বাইরের আলো দেখে বাদুড়েরা ভাবে জানলার বাইরেটা উন্মুক্ত। ক্বচিৎ সে ঢুকেও পড়ে। তারপর কাচে ঠোক্কর খায়। কিন্তু ‘ইকোলোকেশন’ বা শব্দতরঙ্গের ব্যবহারে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কোনও সম্ভাবনাই নেই। কারণ কাচের জানলায় প্রতিধ্বনিত শব্দ ফিরে আসলেই বাদুড় বুঝতে পারে সামনে বাধা, দিকপরিবর্তন জরুরি।  

গ্রীষ্মে বাদুড়ের ‘শীতঘুম’
ভরা ফলের মরসুমে বাদুড়ের খাবারের অভাব হয় না, পোকামাকড়ও যথেচ্ছ মেলে। কিন্তু ঘোর নিদাঘ বা প্রবল ঠান্ডায়, খাবারদাবারের অভাবে বাদুড় শীতঘুমে যায় (গ্রীষ্মকাল হলেও)। ৭৫ দিন পর্যন্ত চলে শীতঘুম। গুহার মধ্যে বা বড়গাছের পাতার আড়ালে জড়াজড়ি করে দিনগুজরান করে বাদুড়। সেইসময় তাদের দেহের তাপমাত্রা নেমে আসে ৪৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। আবার ফল পাকলে, খাবারের সন্ধানে বেরলে, বাদুড়ের দেহের তাপমাত্রা একলাফে বেড়ে হয় ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। বিপাক ক্রিয়ার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাদুড়ের দেহের তাপমাত্রাও বাড়ে। তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি রুখতেই বাদুড় নিশাচর। শীতঘুমের সময় বিরাট লম্বা ডানা কম্বলের মতো বাদুড়ের সারা শরীরকে ঢেকে তাপ-নিরোধক জ্যাকেটের কাজ করে। গ্রীষ্মে বা খাবারের সন্ধানে বিস্তর পথ অতিক্রমণে বাদুড়দের ঘাম হয়, কুকুরদের মত গা চেটে বাদুড় দেহকে ঠান্ডা রাখে। জিভ বের করে হাঁপায়। ডানার নীচের রক্তজালকের প্রাচুর্য সাহায্য করে তাপ বিকিরণে।  

বিপন্ন বাদুড়ের মৃত্যু
‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দি কনজার্ভেশন অফ নেচার’-এর হিসাব অনুযায়ী ২৪টি বাদুড় প্রজাতি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত। ১০৪টি বিপন্ন প্রজাতি দিন গুনছে অন্তিম যাত্রার। ২০৪টি বাদুড় প্রজাতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে কোনও তথ্যই নেই। অগুনতি মারণ রোগের ভাইরাস শরীরে বহন করেও কখনও যে কাবু হয় না, সেই বাদুড়ই ছত্রাক-ঘটিত সংক্রমণ হোয়াইট নোজ সিনড্রোমে দলে দলে মারা পড়ছে। সিউডোজাইগোমোনাস্কাস ডেসট্রাকট্রান্টস বা ‘পিডি’ নামক ছত্রাকই হোয়াইট নোজ সিনড্রোমের জন্য দায়ী। ২০০৭ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথম রোগটির দেখা মেলে। উত্তর আমেরিকার ১৩টি বাদুড় প্রজাতি ‘পিডিতে’ নিশ্চিহ্ন। আরও দুটি প্রজাতিও প্রহর গুনছে অবলুপ্তির। খাবারের অভাবে বাদুড়রা যখন শীতঘুমে, তখনই রোগটির প্রলয়ঙ্কর প্রাদুর্ভাব ঘটে। একসঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকায়, মল-মূত্রের মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মারা যায় লক্ষ লক্ষ যূথবদ্ধ বাদুড়। 

বাদুড়রা কেন নীরোগ
প্রায় সব ধরনের আরএনএ মারণ ভাইরাসের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাদুড়ের শরীরে। কিন্তু কোনও ভাইরাসই নীলমাধব  বাদুড়ের টিকিটিও ছুঁতে পারে না। উড়ানকালে বাদুড়ের দেহের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অকস্মাৎ ৬০ ডিগ্রি তাপমান বৃদ্ধি যে কোনও ভাইরাসের পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পক্ষে যথেষ্ট। প্রক্রিয়াটি ‘ফ্লাইট অ্যাজ ফিভার’ নামে পরিচিত। বাদুড়ের আগুনে জ্বরই নাকি ভাইরাসদের কোতল করে। মানুষের রোগ তাড়াতেও জ্বর দরকারি। বাদুড়ের শরীরে PYHIN বর্গের একটি জিন অনুপস্থিত। জিনটি না থাকায় সাইটোকাইনসের ঝড় থেকেও মুক্ত বাদুড়েরা। নভেল করোনার ক্ষেত্রে সাইটোকাইনস বা কেমোকাইনসের প্রবল ঝড়েই মারা পড়ছেন অধিকাংশ মানুষ। 

অরণ্যনিধন, মহামারী ও বাদুড়
১৯৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ছোট-বড়-মাঝারি মাপের ৩ হাজার ৮৮৪টি মহামারীর ১১৬টি ‘জুনোটিক’ অর্থাৎ বাদুড়, শুয়োর, প্যাঙ্গোলিন, উট, শিম্পাঞ্জি, গরিলাবাহিত সার্স-মার্স-নিফা-লাইম-ইবোলা প্রভৃতি। ওই সময়েই ১ হাজার ৯৯৬টি রোগের প্রাদুর্ভাবের মূলেও ছিল ৬৯টি ‘ভেক্টর-বর্ণ’ বা বাহক-বাহিত সংক্রমণ। যেমন ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া প্রভৃতি। জুনোটিক অথবা ভেক্টর-বর্ণ—দু ধরনের সংক্রামক রোগের তুমুল বাড়বৃদ্ধির একমাত্র কারণ বিশ্বব্যাপী নির্বিচার অরণ্য ধ্বংস। তার ফলে অ্যানোফিলিস, ডারলিঙ্গি, ডাইরাস, মিনিমাস, বালবেসিয়েনসিস-এর মতো গোবেচারা মশারাও বীরবিক্রমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ম্যালেরিয়া ছড়াতে শুরু করেছে। মশারা উত্তর আমেরিকা ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে সুদূর এশিয়ায়।   
অরণ্যনিধন শুধু নয়, জঙ্গলের গাছ কেটে ফেলার পর যে ধরনের গাছ লাগিয়ে বনসৃজন করা হচ্ছে, তাও অনুঘটকের কাজ করছে মশাদের ব্যতিক্রমী কিম্ভুত আচরণের। সেগুন-পাম-সয়া চাষের জন্য বন-বিনাশ করে যে ধরনের গাছ, ঘাস বা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের চাষ হচ্ছে তা জীববৈচিত্র্যের পক্ষে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। কৃষির পণ্যায়নে, দু’পয়সা আয় করতে গিয়ে শুয়োরের ব্যবসা বা পাম চাষ—মহামারীতে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। বন কেটে বসতের পর সবুজ প্রতিস্থাপনের বেসামাল খোয়াবে যে বনসৃজন তাও চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক-বিধ্বংসী। ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি গাছ পুঁতে বন-দফতর যে দায়সারা বনসৃজন করছে তা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের পক্ষে যে কোনও সময় বুমেরাং হতেই পারে। শতাব্দী প্রাচীন অরণ্যে যে আদিম মহাদ্রুমদের একচ্ছত্র আধিপত্য, তা ধ্বংস করে নতুন প্রজাতির কোনও গাছ লাগালে পূর্বের জীব-বৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনা কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া নতুন গাছেরা উপহার দেবে নতুন কোনও মারণ রোগের পরজীবী। 
চীন বা ভিয়েতনামে এই অপরিকল্পিত বনসৃজনে স্যান্ডফ্লাই বাহিত ‘লাইসম্যানিয়া’ বা টিক বর্ণ এনসেফেলাইটিস বা স্ক্র্যাব টাইফাস দুদ্দাড় গতিতে ফিরে আসছে। স্থানীয় দেশজ প্রজাতি বাদ দিয়ে, ভিন্ন প্রজাতির কিছু গাছ পুঁতে, অভয়ারণ্যে ঠাঁইহারা কিছু হরিণের চারণভূমি বানিয়ে খোদ আমেরিকাই সাদরে বরণ করছে ‘টিক বর্ণ এনসেফেলাইটিস’কে। জৈব জ্বালানির অবান্তর আত্মঘাতী বিলাসে, সয়া-পাম-সেগুন চাষে দু’দিনে বড়লোক হওয়ার বাসনা বাদ দিয়ে বন ও বন্যপ্রাণকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করলেই টিকে থাকবে মনুষ্য-প্রজাতি। বুনো জংলিদের খেয়ে, খেদিয়ে, অযৌক্তিক বৃক্ষরোপণে, মেকি বনসৃজনে, বছর বছর নতুন নতুন মহামারীকেই না-হলে নব ধারাজলে আমন্ত্রণ জানান হবে।

27th     June,   2021
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021