বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

জীবনের হার না
মানা জয়গান

সৌরাংশু দেবনাথ : মানসিক কাঠিন্য। হার-না-মানা স্পিরিট। নিজের উপর অটুট আস্থা। প্রবল টেনশনকে উড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনা। লর্ডসের বাইশ গজে ডান হাতে ব্যাট উঁচিয়ে ধরা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি সতীর্থদের কাছে এটাই। কোথাও গিয়ে ফ্রেমটা জীবনের সঙ্গে একাকার।  চ্যাম্পিয়নদের আটকানো যায় না!  ১৯৯৬ থেকে ২০২১। কেটে গিয়েছে ২৫ বছর। তবু সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে তা উজ্জ্বল। কেন অনন্য সৌরভের সেই ইনিংস? এখন জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির বোলিং কোচ পরস মামরে শোনালেন, ‘ওই সেঞ্চুরিতে প্রতিফলিত মনের জোর। চার বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর প্রত্যাবর্তন বলেই মারাত্মক চাপে ছিল। এই সুযোগটা কাজে লাগাতেই হতো। এত প্রতিকূলতা টপকে রান করেছিল বলেই তার গুরুত্ব অপরিসীম। না হলে কি আর এত বছর পরেও ওই ইনিংস মনে থাকত।’ অর্থাৎ, সময়কে হারিয়ে টিকে থাকাই ওই শতরানের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। আর তা সম্ভব করে তুলেছিল মানসিক কাঠিন্য। যা পরবর্তীকালেও জীবনের নানা ওঠা-পড়ায় সুরক্ষাকবচ হয়ে উঠেছিল।বল হাতে ১৫ ওভার হাত ঘুরিয়ে নাসের হুসেন ও গ্রেম হিককে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশনে যখন ব্যাট করতে গিয়েছিলেন, তখন ভারতের ২৫ রানে পড়ে গিয়েছে বিক্রম রাঠোরের উইকেট। ক্রিজে গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন যাঁর সঙ্গে, তাঁর আবার দেশের বাইরে  টেস্টে ওপেন করার অভিজ্ঞতা নেই। নন-স্ট্রাইকার প্রান্ত থেকে কেমন লেগেছিল অভিষেককারীকে? নয়ন মোঙ্গিয়া বললেন, ‘আত্মবিশ্বাসী লাগছিল। মনেই হচ্ছিল না যে, প্রথম টেস্টে ব্যাট করতে এসেছে। অথচ, প্রচুর বিতর্ক ছিল ওর দলে আসা নিয়ে। চাপে থাকারই কথা। কিন্তু, তার কোনও প্রভাব দেখা যায়নি বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। যেন নিশ্চিত ছিল যে বড় রান আসবেই।’
অভিষেকের দু’দিন পর, ২২ জুন এসেছিল শতরান। মহারাজকীয় শতরানের পর জিওফ্রে বয়কট নামকরণ করেছিলেন ‘প্রিন্স অফ কালকুটা’। যদিও, কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। উল্টোদিকে, একের পর এক পড়ছিল শচীন তেণ্ডুলকর, অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজার উইকেট। কিন্তু, অবিচল ছিলেন সৌরভ। দ্বিতীয় দিনের শেষে ২৬ নট আউট। তৃতীয় দিনের লাঞ্চে অপরাজিত ৬৫ রানে। ক্রিকেটের প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ হল, ব্রেক মানেই মনঃসংযোগে টান। জীবনের প্রথম টেস্ট ইনিংসে তাই মারাত্মকভাবে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। আর তাই ড্রেসিং-রুমে ফিরে লাঞ্চ পর্যন্ত করেননি। দ্বাদশ ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, খাবার তিনি নিজে গিয়ে এনে দেবেন কি না। রাজি হননি সৌরভ। একবেলা না খেয়ে থাকা যাবে, কিন্তু, মনঃসংযোগে চিড় পড়ার সামান্যতম আশঙ্কাকেও ধারেকাছে ঘেঁষতে দেওয়া যাবে না! 
অথচ, স্কোরবোর্ডে শুধুই রসকষহীন পরিসংখ্যান। সব বাধা পেরিয়ে জীবনের এমন জয়গান সেখানে অনুপস্থিত। ছাপার অক্ষরে শুধুই তিন নম্বরে নেমে ৩০১ বলে ১৩১ রানের শুষ্ক তথ্য। ২৩ বছর বয়সি কী পাহাড়প্রমাণ বোঝা দু’কাঁধে নিয়ে ক্রিজে গিয়েছিলেন, তা গরহাজির। অনুপস্থিত প্রেক্ষাপটও। ছয় ঘণ্টার ইনিংসে ডমিনিক কর্ক, ক্রিস লুইস, অ্যালান মুলালি, পিটার মার্টিনদেরই তো নয়, খেলতে হয়েছে অনেক অদৃশ্য বোলারকেও। ওই সফরে নেটে তো বটেই, প্রস্তুতি ম্যাচ থেকে সুযোগ পাওয়া একমাত্র ওয়ানডে, সর্বত্রই ব্যাট হাতে নজর কেড়েছিলেন সৌরভ। কিন্তু, তারপরও ঠাঁই হয়নি বার্মিংহামে সিরিজের প্রথম টেস্টে। সেখানে দুই স্পিনার খেলানোর বিলাসিতা দেখিয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। অথচ, ফর্মে থাকা বাঁহাতিকে বসতে হয়েছিল রিজার্ভ বেঞ্চে!
ইতিহাস সাক্ষী, সেবারের ইংল্যান্ড সফর বঙ্গসন্তানের কাছে ছিল কেরিয়ারের ‘ডু অর ডাই’ অ্যাসিড টেস্ট। হয়, সাফল্যের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়া। না হলে, কলঙ্ক গায়ে মেখে চিরদিনের মতো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া। একটা ভুল মানেই ধারালো গিলোটিন নেমে আসা। 
অনন্ত চাপ মাথায় নিয়ে কেমন ব্যাটিং করেছিলেন সৌরভ? প্রাক্তন পেসার মামরের স্মৃতিচারণ, ‘ক্রিজে গিয়ে সব ব্যাটসম্যানই শুরুতে নার্ভাস থাকে। কিন্তু, সৌরভকে তা মনে হয়নি একটুও। অভিষেক টেস্টে ব্যাট করছে বলে বোঝাই যায়নি। অফসাইডে ও যে মারাত্মক শক্তিশালী, পরাস্ত করা মুশকিল, জানা ছিল। তার সঙ্গে শর্টপিচ ডেলিভারিগুলোও দারুণভাবে সামলেছিল। অভিষেকে টেস্ট শতরান মানে তো দুরন্ত পারফরম্যান্স। আর স্বপ্নের ব্যাটিংই করেছিল সৌরভ। দলের মধ্যেও নানা সমস্যা ছিল। কিন্তু, সেসব যেন নাগালই পায়নি। একেবারে অন্য জগতে দেখাচ্ছিল সৌরভকে।’ ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরলেন মোঙ্গিয়াও, ‘ভারতীয় ক্রিকেটের পক্ষে সেই টেস্ট ছিল যুগান্তকারী। ফের হেরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল একটা পর্বে। যে দাপটে সৌরভ ব্যাট করেছিল, তা ভোলার নয়। কে বলবে, সেটা ওর জীবনের প্রথম টেস্ট ছিল! দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। সৌরভের ইনিংসই স্বস্তি আনে শিবিরে।’
ক্রিকেট নয়, এ যেন জীবনেরই কাহিনি। খাদের কিনারা থেকে উঠে এসে বাজিমাত। বা, এ যেন বক্সিং রিংয়ে লড়াই। বিপক্ষ ক্রমাগত মেরে চলেছে ঘুষি। রক্তাক্ত শরীরে পড়ে যাওয়া বক্সার শুনতে পাচ্ছে রেফারির কাউন্টডাউন। আর তখনই অদম্য মানসিক শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে নক-আউট পাঞ্চে জয় ছিনিয়ে নেওয়া। সবুজ ঘাসে ছিটকে যাওয়া সুরভিত স্ট্রোকগুলোর প্রতিটা সেজন্যই হয়ে উঠেছিল অবিচারের প্রতিবাদ। শতরানের উদযাপনে তাই মিশেছিল কারাগার থেকে মুক্তির স্বতঃস্ফূর্ততা।
মামরের কথামতো সেই সফরে পারিপার্শ্বিক আবহও অস্বস্তির ছিল। ক্রমাগত পরাজয়ে গুমোট বাড়ছিল ড্রেসিং-রুমে। নভজ্যোত সিং সিধুর দেশে ফিরে আসা বাড়িয়েছিল অশান্তি। অথচ, ধ্যানমগ্ন সাধকের মতোই ছিলেন সৌরভ। অর্জুনের পাখির চোখে দেখেছেন বোলারের হাত থেকে ছিটকে বেরনো লাল গোলাকে। ব্যাট করতে যাওয়ার আগেই কল্পনায় স্টান্স নিয়ে খেলেছেন ডমিনিক কর্কদের। কেমন বল আসতে পারে, মনে মনে করে গিয়েছেন শ্যাডো। শতরানের পর চায়ের বিরতিতে হাততালির বন্যার মধ্যে ড্রেসিং-রুমে ফিরছেন সৌরভ। তাঁকে সামনে এগিয়ে দিলেন আর এক অভিষেককারী রাহুল দ্রাবিড়। ড্রেসিং-রুমে ঢুকছেন, অভিনন্দনে ভরিয়ে দিলেন সতীর্থরা। টুকরো টুকরো মুহূর্ত। যাতে প্রতিফলিত স্বীকৃতি। শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নয়, দলের অন্দরমহল থেকেও। অপমান থেকে মর্যাদা। পাল্টে গেল সৌরভের দুনিয়া, ওই একটা ইনিংসেই। লর্ডসে সুরভিত অভিষেক তাই জীবনের হার-না-মানা জয়গানই!

20th     June,   2021
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021