বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবসার পথ

গড়িয়াহাটের বাজার ঘুরে ঘুরে শাড়ি বা ঘর সাজানোর জিনিস তো অনেক কিনেছেন। সেই অভ্যাসে ইদানীং যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় শপিং-পর্ব। যাঁরা অনলাইনে জিনিসপত্র বিক্রি করেন, কেমন তাঁদের অভিজ্ঞতা? লিখেছেন উপাসনা সরকার।

কটা সময় ছিল যখন চেনা-পরিচিত বন্ধুবান্ধব কিংবা আত্মীয়-পরিজন বাইরে ঘুরতে যেত, তখন চুপিসারে তাদের হাতে মা-কাকিমাদের তরফে ধরিয়ে দেওয়া হতো ছোট্ট একখানি ফর্দ। সেই টুকরো ফর্দতে কখনও থাকত বিশেষ কোনও একটা শাড়ির নাম, কখনও আবার রকমারি গয়না, কখনও আবার টুকিটাকি ঘর-সাজানোর জিনিসের নাম। যেমন, বন্ধুদের মধ্যে কেউ পুরী ঘুরতে গেলে তার ঘোরার তালিকার পাশেই শোভা পেত কটকি শাড়ি, কখনও আবার দক্ষিণ ভারতে গেলে তেলিয়া কটন, কাঞ্জিভরম আর কাঞ্চিপুরম শাড়ি একটা-দুটো বেছে নিয়ে আসা প্রিয় মানুষগুলোর জন্য। এমনই আরও কত কিছু মনের সুপ্ত বিকিকিনির হাট-বাজারে উঁকি দিয়ে যেত। কেউ কেউ অবশ্য বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়-পরিজনের আশায় খুব একটা থাকত না, নিজেরাই দু’-একটা ছোটখাট শখ পূরণ করতে কলকাতার সুদৃশ্য বিভিন্ন সরকারি এম্পোরিয়ামে চলে যেতে বেশি পছন্দ করত। বিভিন্ন রাজ্যের বাছাই করা হরেক পসরার ভিড়ে পছন্দের শাড়ি আর ঘর সাজানোর জিনিস কিনে এনে সযত্নে সেগুলোর জায়গা করে দিত বাড়ির নির্দিষ্ট কোণে বা ওয়ার্ডরোবে। এখন অবশ্য বাঙালিকে আলাদা করে এদিকে-ওদিকে ছুটতে হয় না। ঘরে বসেই মোবাইলের একটা ক্লিকে পছন্দের জিনিসটা সে স্বচ্ছন্দে কিনে নিতে পারে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের দৌলতে এই সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনই আবার রয়েছে কোভিড এবং কোভিড পরবর্তী সময়ে ফেসবুক লাইভে পছন্দের জিনিস কিনে নেওয়ার উপরি পাওনা। এখন অনেক বাঙালিই গড়িয়াহাটের বাজার ঘুরে শাড়ি বা ঘর সাজানোর জিনিস না কিনে সোশ্যাল মিডিয়াতেই শপিং পর্ব সেরে নিচ্ছে। 
আর যাঁরা এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিক্রিবাটা করছেন? এই অন্ত্রপ্রনরশিপ (নিজস্ব উদ্যোগে কাজ) প্রসঙ্গেই কথা হচ্ছিল দীপান্বিতা সামন্তর সঙ্গে। দীপান্বিতা এবং তাঁর বন্ধু অরুণজ্যোতি সাহা নিজেদের উদ্যোগে শুরু করেন তাঁদের নিজস্ব শাড়ির ব্যবসা। মূলত কোভিড পরবর্তী বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কিছু করার তাগিদ থেকেই তাঁদের এমন ব্যবসার শুরু। ছোট থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল দীপান্বিতার। বন্ধু অরুণজ্যোতির ছিল রং নিয়ে আগ্রহ। এই দুইয়ের মিশেলেই হ্যান্ডলুম শাড়ি নিয়ে ওদের চিন্তা-ভাবনার সূচনা। দীপান্বিতা জানালেন, শুরুর দিকে হাতে মোটামুটি ৮০ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ওঁরা। দু’প্যাকেট শাড়ি সম্বল করেই তাঁদের প্রথম ফেসবুক লাইভ। সোশ্যাল মিডিয়ার বিকিকিনির হাট-বাজারে প্রথম দিকে অর্ডার এসেছিল সর্বসাকুল্যে একটা! কিন্তু ওই একটাই তখন ছিল অনেক। হার না মানা মনোভাব নিয়েই ওঁরা এগিয়ে চলেন। বেগমপুরি বা ফুলিয়ার মতো বাংলা শাড়ির পাশাপাশি আরও বিভিন্ন হ্যান্ডলুম শাড়ি নিয়ে ওঁদের ব্যবসা শুরুর যে পথটা তৈরি হয়েছিল, তা এই তিন বছরে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। এখন ওঁরা নিজেরাই নিজেদের শাড়ির ডিজাইন করছেন। অত্যাধুনিক মানের সুতো দিয়ে হাতে বোনা ওই শাড়ি এখন তৈরি করেছে নতুন স্টাইল-স্টেটমেন্ট— ব্লকপ্রিন্ট, আজরাখ, লিনেন, কটন মলমল থেকে শুরু করে আরও হরেকরকমের শাড়ি নিয়ে প্রতিদিন কাজ করার পাশাপাশি  দীপান্বিতা আস্থা রাখেন বিভিন্ন প্রদর্শনীর উপরেও। প্রদর্শনীতেও অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপ-পরিচিতির মাধ্যমে একটা অন্য ধরনের প্রচার হয় বলেই মনে করেন ওঁরা। বিকিকিনির হাটবাজারে নিজেদের পসরার জনপ্রিয়তা বাড়াতে প্রদর্শনীরও গুরুত্ব রয়েছে বলেই মনে করেন দীপান্বিতা। 
আর এক কমবয়সি উদ্যোগপতি, মৌমিতা ঘোষের চিন্তাভাবনা আবার কিছুটা আলাদা। মৌমিতা নিজে শাড়ি পরতে ভালবাসেন। আর শাড়ি পরার প্রতি ভালবাসা থেকেই ওঁর শাড়ির ব্যবসার সূচনা। কোভিড পরবর্তী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যে বিরাট একটা ভূমিকা পালন করেছে, সেকথা মৌমিতাও মানেন। তবে শুরুতেই খুব দামি শাড়ি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেননি। জমানো ১৬ হাজার টাকা দিয়েই শাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। আর ধীরে ধীরে যখন ওঁর বাছাই করা শাড়ি এক শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে শুরু করে দেয়, তখন থেকেই ধীরে ধীরে নিজের সংগ্রহে যোগ করতে থাকেন দামি শাড়ি। ব্যবসা শুরুর দিন থেকেই গুণগত মান নিয়ে কোনও আপস করেননি তিনি। গুণগত মান বজায় থাকলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবসা ভালো চলে বলেই মনে করে মৌমিতা। তিনি জানালেন, শাড়ি নিয়ে কাজ করতে করতে এখন শাড়ি, সুতো, রং ইত্যাদি নিয়ে ধারণা আরও বদলেছে। নতুন চিন্তাভাবনা দিয়ে মৌমিতাও এখন শাড়ির ডিজাইন তৈরিতে বেশ পারদর্শী। তাই কখনও সখনও ক্রেতার আবদার মেটাতে রকমারি ডিজাইনও জুড়ে দিচ্ছেন চিরচেনা শাড়ির ছাঁদে। বিদর্ভ তসর থেকে কাঠিপেড়া, তেলিয়া থেকে কটন খাদি, ধনেখালি থেকে কটকি আরও সব রকমারি শাড়িতে আজ সেজেছে ওঁর পসরা। 
প্রদর্শনী প্রসঙ্গে অবশ্য মৌমিতার মত আলাদা। ওঁর মতে, প্রদর্শনী করলে অবশ্যই একটা অন্য ধরনের প্রচার পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে সবসময় ব্যবসায় খুব যে বেশি লাভ হয়, তা নয়। অনলাইন ব্যবসার প্রতি আপাতত আস্থা রেখে পুঁজি বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগী মৌমিতা।
শুধু শাড়ি নয়, অনলাইন ব্যবসায় বেশ জনপ্রিয় গয়নার ক্ষেত্রটিও। একটা সময়ে শূন্য থেকে শুরু করে রুপোর গয়না বিক্রি করে এখন বেশ সফল উদ্যোগপতি শ্রেয়া লাহিড়ি। গোড়ায় পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা না পেলেও আজ শ্রেয়া নিজ যোগ্যতায় অনলাইন ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। অনলাইন হোক কিংবা অফলাইন— ব্যবসার প্রচার এবং প্রসারের ক্ষেত্রে শ্রেয়া মনে করছেন, ভবিষ্যতে যারা ব্যবসা শুরু করতে চায়, তারা যেন অবশ্যই এমন কোনও বিষয় নিয়ে কাজ করে, যাতে নিজস্ব আগ্রহ রয়েছে। কারণ ব্যবসা তখনই সফল হবে, যখন সেই বিষয়ের প্রতি নিজেরও উৎসাহ থাকে। শ্রেয়া নিজে গয়না পরতে ভীষণ ভালোবাসেন। সেই আগ্রহ থেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বেছে নেন জার্মান সিলভার-এর জুয়েলারি। তারপর তাঁর তালিকায় যুক্ত হয় নিজস্ব হ্যান্ডমেড জুয়েলারি। জার্মান সিলভার জুয়েলারি নিয়ে কাজ করে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তখনই নিজে হাতে গয়না বানাতে উদ্যোগী হন তিনি। কখনও নিজের হাতে বানিয়ে, কখনও আবার আশপাশের জিনিস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রকমারি ডিজাইনের গয়নায় মন ভরিয়ে তুলেছেন ক্রেতাদের। অনলাইন এবং অফলাইন দু’ধরনের ব্যবসারই গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন শ্রেয়া। অনলাইনে যেমন বাড়িতে বসেই জুয়েলারি পেয়ে যাওয়ার সুবিধা রয়েছে, তেমন অফলাইনে আবার জিনিস নিজের হাতে বেছে নেওয়ার একটা ভালো পরিসর রয়েছে। 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল ঘটছে আমাদের চাহিদার, চিন্তা-ভাবনার। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসার পরিসরও প্রতিদিনই পাল্টে যাচ্ছে। রকমারি পসরার ভিড়ে সেরাটা খুঁজে নেওয়ার তাগিদ যেমন ক্রেতার রয়েছে, তেমনই বিক্রেতারও রয়েছে সেরাটা বেচে নিজের ব্যবসাকে জনপ্রিয় করে তোলার ইচ্ছে। বহু ব্যবসায়ী এভাবেই সফল। মনের গভীরে অনেক আশা নিয়ে তাই এগিয়ে যাচ্ছেন ছোট ছোট উদ্যোগপতিরা।   

20th     January,   2024
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ