বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

সিক্রেটের সিলেবাস পাঠ

কোন কথা গোপন, আর কোনটা বলতে হবে বাবা-মাকে? ‘সিক্রেট’ শব্দটার ব্যবহারিক অর্থ সন্তানকে বোঝান ছোট থেকে। লিখেছেন স্বরলিপি ভট্টাচার্য।

ঘটনা এক: পড়ার বইয়ের মাঝে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ত ক্লাস ফোরের অদ্রিজা (নাম পরিবর্তিত)। সেটা তার সিক্রেট। দেখেও না দেখার ভান করতেন মা। একদিন মা নিজেই মেয়েকে বললেন, আমি সব জানি। মেয়ে আবদার করল, এটা তোমার-আমার সিক্রেট থাক? মেনে নিলেন মা। কিন্তু পরীক্ষার আগেও যখন সেই একই কাণ্ড চলছে, মা তখন শাসন করতে গেলে ফল হল উল্টো। কারণ? মা এ কাজ করতে বারণ করেননি কখনও। ফলে অদ্রিজা শিখেছে এটাই ঠিক। এছাড়াও তার এবং মায়ের সিক্রেট যে বাড়ির সকলে জেনে গেলেন, এতে সিক্রেট শব্দটাই বড় গোলমেলে হয়ে গেল মেয়েটির কাছে।
ঘটনা দুই: ছোট থেকে পলাশ (নাম পরিবর্তিত) শিখেছে কেউ বিশ্বাস করে সিক্রেট কিছু বললে সেটা গোপন রাখতে হয়। ক্লাস এইটে পাড়ার সে এক দাদার হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হল। ভয়ে, লজ্জায় বিহ্বল সে ছেলে গোপন রাখল এই ঘটনা। কারণ দাদা বুঝিয়েছিল, এটা নাকি সিক্রেট! ক্রমশ নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে লাগল। নিজের ভিতর কুঁকড়ে যেতে লাগল পলাশ।
উপরের কোনও ঘটনাই কাম্য নয়। সিক্রেট অতি বিষম বস্তু। আবার সঠিক পথে সিক্রেট ধরে রাখতে পারলে এ শব্দ শ্রদ্ধাও আদায় করে নেয়। শিশুকে এ পাঠ দিতে হবে ছোট থেকেই। বাবা-মায়ের গুরুদায়িত্ব। কীভাবে এগবেন এ পথে? 
পেরেন্টিং কনসালটেন্ট পায়েল ঘোষ মনে করেন, সিক্রেট এমনিতেই একটু গোলমেলে শব্দ। কিছু কিছু জায়গায় বাচ্চাকে সিক্রেটের সিলেবাস যদি বলে না দেওয়া হয় তাহলে অনেক সময় বাচ্চারা কিছু জিনিস মনের মধ্যে রেখে দিয়ে সমস্যায় পড়ে। প্রথমে খেলার ছলে শেখাতে হবে। এমন খেলা যেখানে অপরপক্ষ কোনও সিক্রেট প্ল্যান করছে। সেটা ফাঁস হয়ে গেলে খেলার মজা চলে যাবে। ধীরে ধীরে যখন বাচ্চা অভ্যস্ত হলে দৈনন্দিন জীবনের সিক্রেট সম্পর্কে জানাতে হবে। ধরা যাক, বাড়ির কোনও সদস্যের প্রতি বাচ্চার ভয় রয়েছে। সেক্ষেত্রে অন্য অভিভাবকের কাছে সে হয়তো একটু সহজভাবে সব কিছু বলতে পারে। তখন মাকে বলতে হবে, তুমি আমাকে বলো। এটা তোমার, আমার সিক্রেট। এভাবে বাচ্চা অন্তত একজনকে বিশ্বাস করে সিক্রেট বলবে। মায়ের দায়িত্ব তিনি সেটাকে সঠিক ভাবে মেনটেন করবেন। ‘মনে রাখতে হবে, যখন এই শব্দটা বাচ্চার জীবনে নির্মাণ করছি, ওর কাছে সিক্রেট বিষয়টা বিশ্বাসের। ধরা যাক, বাচ্চা কোনও দুষ্টুমি করে মাকে বলছে, এটা তোমার আর আমার সিক্রেট। বাবাকে বোলো না। হয়তো মা বললেন বাবাকে। কিন্তু সচেতন থাকতে হবে, বাবার রিঅ্যাকশন যদি হয়, তুমি এটা করেছ, আমি মায়ের কাছে শুনলাম। তখন কিন্তু বাচ্চার বিশ্বাস ভেঙে যাবে এবং সিক্রেট শব্দটা বিভ্রান্তি তৈরি করবে,’ বললেন তিনি। 
ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রি কলকাতা, এসএসকেএম-এর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তথা মনোবিদ সুজিত সরখেল বললেন, ‘বাচ্চা যখন বড় হয় তখন গুড টাচ, ব্যাড টাচ শেখানো হয়। একইভাবে সিক্রেটের বিষয়টাও ওদের বলতে হবে। কেউ যদি ওকে বিরক্ত করে, লুকিয়ে ভয় দেখায় সেই সিক্রেটটা বলে ফেলতে হবে। বাবা, মা একসঙ্গে দু’জনে বসে ঘটনাগুলো উদাহরণ হিসেবে সন্তানকে বলবেন। এক্ষেত্রে সিক্রেটটা বজায় রাখলে ওরই ক্ষতি হতে পারে, সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে।’ 
বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়ামাত্র সিক্রেটের সিলেবাসও বেড়ে যায়। সেই সিলেবাসে বাবা, মাকে সচেতনভাবে বাচ্চাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে বলে মনে করেন পায়েল। ‘ধরা যাক বন্ধুর সঙ্গে আপনার টিনএজার সন্তান কথা বলছে। সেক্ষেত্রে সবসময় যদি পক্ষীমাতার মতো কান খাড়া করে বসে থাকেন, সিক্রেট কথা কী, জানতে চান, তখন সিক্রেট কনসেপ্টে ভাঙন ধরবে। কারণ ছোটবেলায় আপনিই শিখিয়েছেন সিক্রেট তোমার-আমার মধ্যে থাকবে। সেই স্পেস বাচ্চাকে দিতে হবে। তোমার কোনও ফোন এলে আমরা উঠে যাব। আমাদেরও কোনও দরকারি ফোন এলে তুমি নাকের ডগায় বসে থাকবে না। এভাবে ওপেন গেটওয়ে ওদের দেওয়া উচিত।’ 
কোনও অন্যায়কেই প্রশ্রয় দেওয়া কাম্য নয়। কিন্তু শিশুকে যখন তার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, বাবা-মায়ের বলার মধ্যে যেন কোনও খারাপ আচরণ না থাকে, সেদিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেন সুজিত। তাঁর কথায়, ‘কাউকে কিছু না করতে বলাটা এক ধরনের অ্যাসারটিভনেস। বলতে দ্বিধাবোধ করলে হবে না। বাচ্চা ভাবতে পারে, আমাকে বলছে না মানেই আমি যা করছি ঠিক আছে। অথবা আমি এত সুন্দর করে সিক্রেট মেনটেন করতে পারছি, ধরা পড়ছি না। তারপর জমতে জমতে একটা সময় যখন বাড়াবাড়ি হবে, তখন আর বাচ্চা কথা শুনবে না। কারণ তখন নিজের ভ্যালু সেট হয়ে গিয়েছে। খেয়াল রাখবেন, বলার ধরনে যেন বাচ্চা আরও বেশি অফেন্সিভ বা ডিফেন্সিভ না হয়ে যায়।’
এ পথে স্কুলেরও খানিক দায় থেকে যায় বলে মনে করেন পায়েল। তিনি বললেন, ‘ধরা যাক কোনও বাচ্চা ক্লেপ্টোম্যানিয়াক, বা অন্য কোনও সমস্যা আছে যেটা বাকি বন্ধুদের সামনে দেখাতে চায় না। তার বাবা, মা হয়তো আলাদাভাবে শিক্ষককে সেই বিষয়টা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক সহ-অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। আলাদা করে ডেকে জানতে চান, তুমি কি এই ঘটনাটা ঘটিয়েছ? এইরকম কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় শিক্ষক সিক্রেট মেনটেন করে বাচ্চাটিকে স্বস্তি দিতে পারেন।’ 
কোন সিক্রেটটা অভিভাবককে জানাতেই হবে, এ বোধও সন্তানের মধ্যে তৈরি করে দিতে হবে বাবা-মাকে। কীভাবে বোঝাবেন? সহজভাবে পায়েল বললেন, ‘বাচ্চাকে বলতে হবে, যখন মনে হচ্ছে কোনও কিছু সিক্রেট রেখে সেটার জন্য ভয় পাচ্ছ, তখন বুঝবে সেটা বড় কাউকে বলতে হবে। যাদের এই ধরনের অভিজ্ঞতা হলেও হতে পারে। যদি মনে হয় আমি সেই ঘটনা গ্রহণ করতে পারব না, তুমি আমাকেই বলবে আমাকে বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে চলো।’   
আপাত সহজ সিক্রেট যেন জীবনবোধে কঠিন না হয়ে ওঠে, তা প্রতি পদক্ষেপে সন্তানকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আপনারই। সহজ এ পাঠ শুরু হোক এখন থেকেই। 

মডেল: সঙ্ঘমিতা রায়চৌধুরী, অনুরাগ রায়চৌধুরী, আর্য রায়চৌধুরী। 

22nd     April,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ