বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

দুর্গাপুজোর  মাহাত্ম্য

শরতের সোনার আলোয় মা আনন্দময়ীর আগমন। বর্ষে বর্ষে আসেন তিনি আমাদের ঘরে, তাঁর ছড়ানো সংসারে। বাঙালির একান্ত প্রিয় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপুজো আগত প্রায়। শারদীয় দেবীর আবির্ভাবের মধ্য দিয়েই জাতির আত্মিক শক্তির উদ্বোধন। এই মঙ্গলময়ী মাতৃমূর্তির আবাহন, উপাসনা আর পুজোর মধ্যে নিহিত আছে জাতীয় জীবনের মর্মগাথা। দুর্গাপুজোর মধ্যে তাই খুঁজে পাই আদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমন্বয়। মূর্তির পরিকল্পনায়, পুজোর মন্ত্রে ও উপচারে বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্বের যে সুরটি দেখা যায় তা অনবদ্য ও অতুলনীয়।
আমাদের শারদীয় দুর্গোৎসবকে মহাপুজো নামে চিহ্নিত করা হয়। ‘শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে যা চ বার্ষিকী।’ মহাস্নান, পুজো, বলিদান আর হোম এই চারটি অনুষ্ঠান সমন্বিত হলেই তবে সে পুজো মহাপুজো বলে চিহ্নিত হবে। একমাত্র দুর্গাপুজো ছাড়া এইসব আচার, উপচার ও অনুষ্ঠানের একত্র সমাবেশ আর কোনও দেব-দেবীর পুজোয় দেখা যায় না। দুর্গাপুজোর বিধানে সংকল্প সাত প্রকার। এর মধ্যে সমগ্র বঙ্গদেশে দুর্গাপুজোর সংকল্পে ষষ্ঠাদি কল্প প্রচলিত। এই কল্পে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় বিল্ব বৃক্ষে দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হয়। এরপরেই হয় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিন দিন দেবীকে বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন উপচার দিয়ে পুজো করা হয়। মহাপুজোয় অনুষ্ঠেয় চারটি কর্মছাড়া নবপত্রিকা পুজো, কুমারী পুজো ও সন্ধিপুজোর আড়ম্বর ও মাহাত্ম্য খুব সুন্দর।
মহামায়ার মহাপুজোয় প্রথমেই স্নানের কথায় আসি। মা দুর্গার স্নানপর্ব ‘মহাস্নান’ নামে পরিচিত। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রত্যহ দেবীর পুজো আরম্ভের আগে সঙ্গীত, নৃত্য ও বাদ্যাদি সহযোগে সুরভিত দ্রব্যসম্ভারে জগদম্বার মহা অভিষেক সম্পন্ন করতে হয়। মহাদেবীর মহাস্নানের বিশেষত্ব হল এর ক্রম ও উপচারে এক অখণ্ড সংহতি বিদ্যমান। ভারতের নদনদী, সাগর-সরোবরের জলে দেবীর মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়।
পতিতার গৃহের মৃত্তিকা সহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত মাটি দ্বারা দেবীর অঙ্গমার্জন হয়ে থাকে। এছাড়া পঞ্চগব্য, পঞ্চশস্য, পঞ্চরত্ন ইত্যাদি ও নানাবিধ সুগন্ধি তৈলদ্রব্য মহাস্নানে অর্পিত হয়। সেই সঙ্গে লাগে প্রায় ৭৫ রকমের উপকরণ। মহাপুজোর মহাস্নানের অন্যতম বিশেষত্ব হল অষ্টকলস জল সহযোগে স্নান। এই স্নানের সময় ভিন্ন ভিন্ন রাগরাগিণীতে গান ও বাদ্য বাজানোর রীতি মন্ত্রে উল্লেখ আছে। যেমন মালব রাগে বিজয় বাদ্য, ললিত রাগে বেদ বাদ্য, বিভাস রাগে দুন্দুভি বাদ্য, ভৈরব রাগে ভীম বাদ্য, কেদার রাগে ইন্দ্রাভিষেক বাদ্য, বারারি রাগে শঙ্খ বাদ্য, বসন্ত রাগে পঞ্চশব্দ বাদ্য ও ধানসি রাগে ভৈরব বাদ্য। মনে রাখা দরকার বিভিন্ন দ্রব্যদ্বারা যে পবিত্র মন্ত্রে মাকে স্নান করানো হয়, তার প্রতিটি মন্ত্র অতি সজীব ও প্রাণস্পর্শী। 
মহাস্নানের পর আরম্ভ হয় দেবীকে বিবিধ উপচারাদি দ্বারা আরাধনা। পুজোর উপচার সামর্থ্যানুসারে তিন প্রকারের হতে পারে। পঞ্চোপচার, দশোপচার ও ষোড়শোপচার। কালিকাপুরাণ ও মহানির্বাণ তন্ত্র প্রভৃতিতে ষোড়শোপচারের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে। মহাপুজোর বিধি কিন্তু ষোলোটি উপচারে। চিরশুভকারিণী হরমনোরমার উদ্দেশে নিবেদিত হয় আসন, স্বাগত, পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, মধুপর্ক, পুনরাচমনীয়, স্নানীয় জল, বস্ত্র, ভূষণ, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ও বন্দনা— ক্রম অনুযায়ী এই ষোলোটি পুজোর উপচার। এইসব উপচারের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গ মনস্বী সন্ন্যাসী ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী তাঁর কালজয়ী ‘চণ্ডীচিন্তা’ বইতে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ‘বহুদিন যাহার আশাপথ চাহিয়া আছি, এইরূপ কোনও অতীব প্রীতির পাত্র, অথচ মর্যাদাসম্পন্ন নিতান্ত নিজজন যদি আমাদের গৃহে আসিয়া উপনীত হন, তাহা হইলে আমরা তাঁহাকে যেভাবে গ্রহণ করি, সেই ভাবটি লইয়াই দেবতার পূজা। উপচার সকল ও সেইভাব লইয়াই নির্ণীত হইয়াছে। ঈশ্বর আমাদের কত আপনজন, কত প্রেমের পাত্র, অথচ তিনি কত বিরাট বস্তু। আজ তিনি আমাদের দুয়ারে নামিয়া আসিয়াছেন তাঁহার দিব্যধাম হইতে। তাঁহাকে সম্মান করিতে হইবে, সংবর্ধনা করিতে হইবে, পরম যত্নে সেবা করিতে হইবে। আমাদের নিজের যে রূপ স্নান, আহার, বিশ্রাম প্রয়োজন তাঁহারও সেই রকমই দরকার— এই বোধে আত্মবৎ পরিচর্যা তাহাই পূজার প্রধান দিক্‌।’
মহাপুজোর অন্যতম অঙ্গ বলিদান। বলি শব্দের অর্থ উপহার। দেবী ভাগবতের মতে, একমাত্র দেবী পুজোতেই বলিদান সম্মত। মহানবমীতে বলিদানের বিধান দেখা যায়। আবার অনেক জায়গায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর মাঝরাতে বলিদানের মাধ্যমে রহস্য পুজো রীতিসিদ্ধ।
বৈদিক বিধিতে হোম দুর্গাপুজোর বিধি। সচ্চিদানন্দময়ী দেবী দুর্গার অবস্থান প্রজ্বলিত হোমাগ্নিতেও। সেই চিন্তা করে মহাজননীর সম্মুখে অগ্নি স্থাপন করে তাঁর উদ্দেশেই হব্যাদি অর্ঘ্য দিয়ে অগ্নিতে তা সমর্পণ করতে হয় আচার ভেদে বৈদিক ও তান্ত্রিক হোমের বিধান বর্তমান। সাধারণত মহানবমী পুজোর শেষে হোমপর্ব সম্পন্ন হয়। সপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত তিনদিনও হোমের বিধান আছে। আবার অনেক সময় মঠ, মন্দির ও গৃহস্থবাড়িতে মহাষ্টমীর দিন শ্রীশ্রীচণ্ডীর সাতশত মন্ত্রে বেলপাতা দ্বারা আহুতি হয়ে থাকে। এটি ‘সপ্তশতী’ যজ্ঞরূপে খ্যাত।
এবার আসি দেবী মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে। মহাপুজো দুর্গা পুজোর অন্যতম প্রধান অঙ্গ শ্রীশ্রীচণ্ডীপুজো ও পাঠ। আদ্যাশক্তি মহামায়ার প্রদীপ্তলীলার চরম ও পরম তত্ত্বটি আমরা পাই মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী অংশে। মহামহিমময়ী দুর্গার নামান্তর চণ্ডী বা চণ্ডিকা। তাঁর মাহাত্ম্যসূচক পুস্তকের নামও চণ্ডী। এই গ্রন্থ নিত্যপাঠ্য ও গীতার ন্যায় সমাদৃত। শরৎকালীন মহাপুজোয় দেবী মাহাত্ম্য অবশ্য পাঠ করা উচিত তা চণ্ডীতেই বলা আছে। কোথাও কোথাও চণ্ডীপাঠ কল্পারম্ভের দিন থেকে আরম্ভ হয়। প্রায় বেশিরভাগ জায়গায় সপ্তমী থেকে পাঠ শুরু হয়ে মহানবমী পর্যন্ত হয়ে থাকে। দুর্গা প্রতিমার সামনে চণ্ডীপাঠ করা ও ভক্তিভরে শোনার রেওয়াজ রয়ে গিয়েছে স্মরণাতীতকাল থেকে। এক্ষেত্রে এখন মণ্ডপগুলিতে মহিলাদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। চণ্ডীতে আছে সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্যের কাহিনি। দেবী কীভাবে মহিষাসুর, মধুকৈটভ, শুম্ভ-নিশুম্ভ, ধূম্রলোচন, চণ্ডমুণ্ড বধ করলেন তার সুনিপুণ বর্ণনা। এছাড়া চণ্ডীর মধ্যে আছে দেবতাদের মনোহারিস্তবগাথা। আর আছে অর্গলা স্তোত্র। দার্শনিক তত্ত্ব, ভক্তিরস আর কাব্য মাধুর্যের উপাদানে স্তবগুলির গুরুত্ব ও অপূর্বতা সর্বাধিক পরম প্রসন্নগম্ভীর। এই মন্ত্রগুলির আবেদন আমাদের মহামাতৃকার কাছে ভক্তিনতচিত্তে আনত করে। আর দেবী মণ্ডপে সৃষ্টি করে এক অপূর্ব স্বর্গীয় পরিবেশ।
শক্তিরূপিণী বিশ্বমাতৃকা বন্দিতা নারী মূর্তিতে। ভগবতী চণ্ডিকার স্তুতিতে ঋষিগণ বলেছেন, ‘স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু।’— জগতে যেখানে যত নারী মূর্তি আছে, তা মহামায়ার জীবন্ত বিগ্রহ। সকল নারীর মধ্যে সেই মহাজননীর ছায়া প্রতিবিম্বিত দেখে তাঁকে জগন্মাতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করাই চিন্ময়ী জননীর সাক্ষাৎ চরণ বন্দনা। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।’

24th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ