বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

মায়ের যতনে

দুর্গামূর্তির গায়ে মাটির প্রলেপ পড়ে গিয়েছে। এবার রং আর সাজগোজ বাকি। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে মায়ের সাজ বিষয়ে জানালেন কমলিনী চক্রবর্তী। 

কালীঘাট মন্দিরের গেটের কোনাকুনি উল্টোদিকের রাস্তায় প্রতি বছরের মতোই পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সাজ সাজ রব। খড়ের কাঠামোর উপর মাটির প্রলেপ বহু দিন আগেই পড়ে গিয়েছে। এবার প্রতিমার গায়ে রং লাগবে। তারপর শুরু হবে মায়ের সাজ। রথের পর থেকেই পোটোপাড়ার বাচ্চাদের মনে এক অসম্ভব রোমাঞ্চ শুরু হয়। বাবা কাকারা মূর্তি গড়ার কাজে লেগে পড়েন। পুজো আসার ঢের আগে থেকেই কালীঘাটের পোটোপাড়ায় শুরু হয়ে যায় পুজো পুজো ভাব। এভাবেই যুগে  যুগে চলছে এঁদের পুজোর প্রস্তুতি।
শুরুর কথা
‘সব উৎসবের সেরা দুর্গাপুজো নিয়ে বাঙালির উৎসাহের জুড়ি মেলা ভার। তবু পোটোপাড়ার উন্মাদনা যেন এই সবের ঊর্ধ্বে। দেবী দুর্গা আমাদের হাতে তৈরি হন। তাঁর আকার থেকে সাজগোজ সবই আমরা জীবন্ত করে তুলি। এই উত্তেজনা অন্যরকম। আর তারই পাশাপাশি চলতে থাকে মনকেমন করা এক অনুভূতি। পুজো যতই এগিয়ে আসে আমাদের মনকেমন ততই বাড়তে থাকে। সবশেষে চতুর্থী বা পঞ্চমীতে শহরে যখন আলোর মেলা আমাদের পোটোপাড়ায় তখন আঁধার নেমে আসে। ভেতরের মনখারাপটাকে বাইরের সাজগোজের আতিশয্যে ঢেকে আমরা ঠাকুর দেখতে বেরই ঠিকই তবু মনের বিষাদ যেন কিছুতেই কাটে না। প্রতি বছর আমরা মেয়ের বিয়ে দিয়ে তাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর অনুভূতি টের পাই রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কিন্তু আজ সে কথা থাক। বরং মায়ের রূপ বর্ণনার সাজসরঞ্জামের গল্প বলি’,  গল্পটা বলছিলেন কালীঘাটের পোটোপাড়ার মেয়ে কৃষ্ণা পাল। 
‘নিশুতি রাতে বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি পড়ত। দালানে ত্রিপল খাটিয়ে আলো জ্বালিয়ে বাবা ঠাকুর গড়তেন অবিরাম। আর ঘরের ভেতর ঠাকুরমার কোলের কাছে শুয়ে আমি দেবী দুর্গার অসুর বধের গল্প শুনতাম। বাবার হাতের টানে দেবী যখন মৃন্ময়ী রূপ পাচ্ছেন, তখন ঠাকুরমার মুখে পৌরাণিক গল্প আমার মনে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। একটু বড় হয়ে ঠাকুর গড়ার কারিগর হব বলে কাজ শিখতে শুরু করলাম। কিন্তু বাবা ঠিক মত দিলেন না। তাই ঠাকুরের সাজগোজ তৈরির দিকে মন দিলাম’, বললেন কৃষ্ণা। ছোটবেলা থেকেই আঁকতে ভালোবাসতেন। তাই ঠাকুরের সাজের ক্ষেত্রে শাড়ির ডিজাইন আঁকায় মন দিলেন। প্রথম শাড়িটা যখন আঁকেন তখন তাঁর বয়স ষোলো বছর। একটা বড় সাদা কাপড়ে পৌরাণিক গল্প এঁকেছিলেন কৃষ্ণা। বাবা দেখে বললেন, ‘কিচ্ছু হয়নি। দেবীর অসুরবধের গল্প নিয়েই তো দুর্গাপুজো। মায়ের শাড়িতে কখনও সেই গল্প আঁকা যায়?’ মন খারাপ করে ঘরে দোর দিল মেয়ে। রাত বাড়লে বাবা এলেন মেয়ের কাছে। হাতে একটা কাগজ। তাতে ফুলের নকশা আঁকা। বললেন, ‘দুর্গাপুজোর জমক মায়ের শাড়িতে ধরতে হবে। দেখ তো এই নকশাটাকে আরও উজ্জ্বল করতে পারিস কি না।’ বাবার কথা শুনে প্রবল উৎসাহে কৃষ্ণা আবারও বসল কাপড়ের উপর নকশা আঁকতে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রং আর তুলির টানে ফুলের নকশা তৈরি হল। নিখুঁত নকশা আঁকতে প্রায় সারা রাত লেগে গিয়েছিল। তবু মেয়ের চোখে কোনও ক্লান্তি নেই। পরের দিন বাবা দেখে দারুণ খুশি। এবার শাড়ির নকশা তাঁতে বোনার জন্য দিতে হবে। একটু উজ্জ্বল চকচকে থানের কাপড়ে জরির কাজে ফুটে উঠবে দেবী দুর্গার শাড়ির রংরূপ। শাড়ির থানগুলো সিন্থেটিক আর সেমি সিল্ক সুতোয় বোনা হয়। তাতে কাপড়ের ঔজ্জ্বল্য চোখে পড়ে। 
‘প্রথম শাড়ির থানটা যখন ডেলিভারি নিলাম উত্তেজনায় চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। কমলা রঙের উপর আমার আঁকা ফুল লতা পাতার নকশাই জরির সুতোয় বুনেছেন কারিগর। দেবী দুর্গা আমার আঁকা শাড়ি পড়ে মণ্ডপে যাবেন। ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।’
নকশা বদল 
কিন্তু দেবীর শাড়ির নকশায় তো আজকাল নানা বিবর্তন চোখে পড়ছে, প্রশ্ন করলাম কৃষ্ণাকে। বললেন, যত দিন যাবে লোকের রুচিও বদলাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তবু কিছু জিনিস থাকে যেগুলোর সৌন্দর্য সনাতন। মায়ের শাড়ি ও সাজের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। আসল ব্যাপার হল চোখে পড়া। দুর্গাপুজোর সময় মণ্ডপে সাধারণত মাকে দাঁড় করানো হয় একটা স্টেজের উপর। নীচ থেকে দর্শনার্থীরা তাঁকে প্রণাম করেন। সেক্ষেত্রে নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ কী করে তাঁদের চোখে পড়বে? যদি দূরে দূরে ফুলের নকশাও আঁকা থাকে তাহলে শাড়িটা অনেকটাই খালি খালি লাগবে। মায়ের রূপের যে জমক সেটা হারিয়ে যাবে। সেই কারণেই সনাতনী সজ্জাই দেবী দুর্গার পক্ষে আদর্শ। তাতে ফুলের নকশা থাকতে পারে অথবা কলকা। কিন্তু উজ্জ্বল রং আর গা ঘেঁষা জরির কাজ খুবই দরকার। আজকাল অবশ্য অনেকেই  মায়ের শাড়িতে পুঁতির কাজ চাইছেন। বড় বড় পুজোগুলোয় সাজের তারতম্য আনা হচ্ছে পুঁতি ও চুমকির নকশায়। তবে সেক্ষেত্রেও জরির কাজের পাশাপাশি বসানো হচ্ছে কনট্রাস্ট রঙের পুঁতি। অনেকে মুক্তোর ছোট বিডস বসাতে চাইছেন, কেউ বা সাতরঙা চুমকির কাজ চাইছেন পুঁতির সঙ্গে। সেক্ষেত্রে কাজটা এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে মায়ের বুকের কাছে সেই পুঁতি ও চুমকির কারুকাজটা পড়ে। তাতে এই কাজ বেশি নজরে পড়বে। আর ব্লাউজের হাতাতেও অনেক সময় জরির পাড়, চুমকির লাইন ইত্যাদি টানা হয়। 
রঙের বাহার
দেবী দুর্গার শাড়ির ক্ষেত্রে রঙের চাহিদা কেমন? কৃষ্ণা বললেন, ‘সাধারণত লাল রঙের শাড়িতে জরির ফুলেল নকশার অর্ডার সবচেয়ে বেশি   আসে। অনেকে অবশ্য কমলা, গোলাপি বা সবুজ রংও চান। এছাড়াও আছে সাদা সাজ। সেক্ষেত্রে  সাদা শাড়ির উপর রুপোলি জরির নকশা করা হয়। মায়ের সেই শ্বেতশুভ্র রূপ দেখে চোখ ফেরানো দায়। এখন আবার রানি কালারের চাহিদা খুব বেড়ে গিয়েছে। আর লক্ষ্মী ও সরস্বতীর জন্য সাদা, হলুদ, সবুজ আর নীল রঙের শাড়ি চান সবাই। লক্ষ্মীর  পরনে ওঠে নীল বা সবুজ শাড়ি আর সরস্বতী পান সাদা বা হলুদ। অনেকে তো কার্তিক ও গণেশের ধুতিতেও নকশা চান। বেনারসি ধুতি চান কার্তিকের জন্য। আর গণেশের ধুতিতে পাড়ের আতিশয্য ভালোবাসেন। তবে দেবী দুর্গার শাড়ি ও গয়নাতেই সবচেয়ে বেশি ফোকাস করা হয়।’
গয়না কথা
গয়নার প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন পোটোপাড়ার আর এক কন্যার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি রত্না পাল। সম্পর্কে কৃষ্ণার ভ্রাতৃবধূ। বললেন মায়ের সাজের প্রতি অনেক ছোটবেলা থেকেই তাঁর আকর্ষণ। তবে এই কাজ শিখে পেশাদারভাবে তা করতে শুরু করেছেন বিয়ের পর। রত্নার কথায়, দেবী দুর্গার গয়নার সঙ্গে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর গয়নার একটা সামঞ্জস্য রাখতে হয়। 
একটু চোখে পড়ার মতো বড় হার বানানো হয় দেবীর জন্য। সোনালি বা রুপোলি জরির সঙ্গে একই রঙের ঝিলমিল রাংতা দিয়ে তৈরি হয় মায়ের গলার হার। বাইরের দিকে একটা ঝালরের মতো দেওয়া হয়। তাতে দূর থেকেও চোখে পড়ে। যে রঙের জরিই ব্যবহার করা হোক না কেন, তার চেনের অংশটা বেশ মোটা হওয়া চাই। অনেক সময় আবার এই জরির উপর অন্য জরি কেটে জুড়ে নকশা বানানো হয়। তাতে দূর থেকেও হারের চেনের অংশ উজ্জ্বলভাবে দেখা যায়। 
এরপর তৈরি হয় লকেট। পান পাতার আকারে বা গোলাকারে জরির নকশা করা হয় লকেটের উপর। লকেটের বিভিন্ন স্তর থাকে। বড় থেকে ছোট হয়ে একবারে মধ্যম঩ণিতে একটা বিন্দু এসে দাঁড়ায় সেইসব স্তরের কারুকাজ। অনেক সময় মধ্যমণির নকশায় একটা বড় মুক্তো সেলাই করে বসানো হয়। গোটা হারের চারপাশ দিয়ে জরির ঝিলমিল রাংতা বসানো হয়। এটা হল মূল হার। এছাড়াও পুঁতি ও মুক্তোর হারও পারানো হয় মাকে। অনেকে রঙিন পুঁতির মিলমিশ কাজ চান। সেক্ষেত্রে একটা প্যাটার্ন মেনে রঙিন পুঁতি ব্যবহার করা হয়। যাঁরা সোনালি জরির নকশা চান তাঁরা এই ধরনের রঙিন পুঁতি মিলমিশ হার পরান মায়ের গলায়। কিন্তু সাদা জরির নকশায় যখন মায়ের সাজ সম্পূর্ণ হয় তখন রুপোলি গয়নার সঙ্গে ছোট-বড় মুক্তোর হারই মানানসই। হাতের গয়না প্রায় সবই আর্মলেট-এর মতো বানানো হয়। তাতে শলমা চুমকি, গোল কাচ সবই লাগানো থাকে। পাশে থাকে জরির নকশা। এই ধরনের গয়নার স্টাইলে খুব একটা বদল আসেনি বলেই  জানালেন রত্না। নথে সাধারণত মুক্তোর স্ট্রিং থাকে। 
ডাকের সাজ
অনেকে আবার ডাকের সাজ ভালোবাসেন। সেই সাজের খুব একটা বদল হয়নি, জানালেন কৃষ্ণা। তাঁর কথায়, এই সাজ অনেকটা বর্ম স্টাইলে তৈরি হয়। আগে যখন দুর্গাপুজো ছিল জমিদারি আতিশয্য ও প্রতিপত্তির প্রতীক তখন এই সাজ মায়ের জন্য ডাক মারফত আনানো হতো। সেই থেকেই ডাকের সাজের প্রচলন। এই সাজ তখন ভাগে ভাগে আসত এবং মায়ের অঙ্গে তা একে একে তোলা হতো। মুকুট থেকে পোশাক সবই বিভিন্ন ভাগ বিশিষ্ট। মায়ের এই সাজ কিন্তু আজও একইরকম রয়ে গিয়েছে। ভেতরের নকশায় হয়তো টুকটাক বদল এসেছে। কেউ শোলার ফুল ব্যবহার করছেন, কেউ বা কলকার কাজ করছেন, কিন্তু মূল সাজের তেমন তারতম্য চোখে পড়ে না। তবে এই ধরনের সাজের সঙ্গে মায়ের তেজবর্ণা রূপই বেশি মানায়। স্নিগ্ধ রূপে ডাকের সাজ ততটা মানানসই হয় না বলেই মনে করেন কৃষ্ণা। কালীঘাটের পোটোপাড়ায় পুজোর প্রস্তুতি মধ্যগগনে। মায়ের মৃন্ময়ী রূপের উপর রঙের কাজের নানা জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। মায়ের গায়ের রং ও তার সঙ্গে মানানসই সাজগোজ নিয়ে আলোচনা চলছে শিল্পীদের মধ্যে। পোটোপাড়ার ঘরে ঘরে মেয়ে বউদের হাত এখন দেবীর সাজসজ্জা তৈরিতে ব্যস্ত অবিরাম। সপ্তাহ দুয়েকের আর সামান্য বেশি প্রতীক্ষা। তারপর শহর জুড়ে আলোর মালায় সেজে মা আসবেন মণ্ডপে। শুরু হবে বাঙালির সেরা উৎসব, দুর্গাপুজো।

ছবি: তাপস কঁাড়ার ও সায়ন্তন সেনগুপ্ত

10th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ