বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

বয়সকালের বাঁচা

বয়স্ক মহিলাদের স্বনির্ভর ও রোজগেরে করে তুলছে হেল্পেজ ইন্ডিয়া। কীভাবে? খোঁজ নিলেন কমলিনী চক্রবর্তী।

অবসর গ্রহণের পরেও বেশ কর্মঠ কোলাঘাটের মুর্শিদা বেগম। তাই ঘরে বসে না থেকে বরং কাজ করতেই আগ্রহী তিনি। কাজের সন্ধান করতে করতে ‘হেল্পেজ ইন্ডিয়া’র সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। সেখানেই নতুন করে তাঁকে কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পোলট্রি ফার্মিং শিখে এখন দিব্যি রোজগেরে মুর্শিদা।
এমনই বিভিন্ন বয়স্ক মহিলার পাশে দাঁড়ানোর জন্য হেল্পেজ ইন্ডিয়া একটা প্রকল্প শুরু করেছে, নাম ‘এলডারলি হেল্প’। কথা হচ্ছিল সংস্থার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আধিকারিক শর্মিলা মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘অল্প বয়সে আমরা ভাবি বয়সকালে অবসর গ্রহণটাই বুঝি স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স যতই বাড়তে থাকে ততই ওই অবসর শব্দটা ঘিরে একটা আতঙ্ক তৈরি হয় মনে মনে। সমাজের বয়স্ক মানুষদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি এঁরা সকলেই কিছু না কিছু করতে চান। অবসর গ্রহণে কেউ-ই ঠিক ইচ্ছুক বা স্বচ্ছন্দ নন।’ এই বিষয়ে বিশেষভাবে মহিলাদের কথা উল্লেখ করলেন শর্মিলা। তাঁর বক্তব্য, মহিলারা ঘর সংসারে আবদ্ধ থাকতে ভালোবাসেন— এই ধারণাটা একেবারেই ভুল। একটা বয়সের পর শুধুই সংসারের চার দেওয়ালে তাঁরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন না। তখন অন্য কিছু করার জন্য তাঁরা উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। 
কাজের নানারকম
একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে, বললেন শর্মিলা। কাগজের ঠোঙা বানানোর কারখানায় কাজ করতেন ঝর্ণা রায়। ষাট বছরে অবসর নেওয়ার পর কী করবেন ভাবছিলেন। সেই সময় হেল্পেজ ইন্ডিয়ার তরফে একটা স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকে কুড়ি হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ঝর্ণা। তা দিয়ে নিজের বাড়ির বারান্দাটা ঘিরে নিয়ে শুরু করেন মুদির দোকানের ব্যবসা। ছেলে ও বউমা খুবই সহযোগিতা করেছিল ঝর্ণাকে। জিনিস এনে দেওয়া, বিক্রির হিসেব রাখা সবই করত তারা। এখন তো বড় নাতনি ঠাকুরমার সঙ্গে দোকানে বসে। দোকানটা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ঘরে দুটো বাড়তি পয়সাও আসছে। আর ঝর্ণার স্বনির্ভরতাও অটুট রয়েছে।
হেল্পেজ ইন্ডিয়ার সাহায্যে বহু বয়স্ক মহিলাই অবসরের পরেও নতুন ভাবে স্বনির্ভর হয়েছেন। তাঁদের কেউ খাবার তেলের ব্যবসা করেন, কেউ বা ধূপকাঠি বানিয়ে বেচেন, কেউ আবার ফুলের দোকান দিয়ে হয়ে উঠেছেন রোজগেরে। এছাড়াও মাশরুম চাষ, বিড়ি বাঁধার কাজ, ঘর সাজানোর সরঞ্জাম বিক্রি ইত্যাদি নানাবিধ উপায় রয়েছে রোজগারের, জানালেন শর্মিলা। গ্রামাঞ্চলে ঝুড়ি বোনা, মাদুর বোনার মতো কাজও বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। আর একটু শিক্ষিত হলে বাড়ির একটা ঘরে প্রাইমারি স্কুলও খুলে ফেলছেন অনেকেই। কেউ বা বাড়িতেই চা আর বৈকালিক টুকটাক খাবারের আয়োজন করে বসেছেন। মোটমাট অবসরকে মোটেও পেয়ে বসতে দিচ্ছেন না এঁরা কেউ-ই। 
পারিবারিক সহায্য
‘অবসরের পর বাড়ির উঠোনে হাঁস, মুরগি পুষে ডেয়ারি ফার্মিংয়ের ব্যবসা শুরু করেছেন কৃষ্ণা দাস। কাজ করে যা না আয় হতো তার চেয়ে ঢের বেশি আয় করেন এখন কৃষ্ণা’, বললেন শর্মিলা। এর আগে কৃষ্ণার ছিল দুধ বিক্রির ব্যবসা। কিন্তু তাতে তেমন কিছু আয় হচ্ছিল না। তাই আটান্ন বছর বয়সে পৌঁছে পোলট্রি ফার্মিংয়ের পাঠ নেন তিনি। আপাতত সেই ব্যসায় দারুণ রোজগার করছেন কৃষ্ণা। বললেন, ‘শেখার কোনও বয়স নেই। মন দিয়ে আর সদিচ্ছা নিয়ে কোনও কাজ করতে চাইলে বয়স কখনওই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না।’ মা হাঁস, মুরগির ব্যবসা করছে বলে ছেলেও পাশেই একটা মাংসের দোকান খুলে বসেছে। ব্যবসা থেকে মোটামুটি ৫০০০ টাকা লাভ করেন তাঁরা প্রতি মাসে। 
পুরুষের পাশে মেয়েরা
ব্যবসার কাজে বয়স্ক মহিলাদের অংশগ্রহণ বয়স্ক পুরুষদের সমতুল্য? শর্মিলা বলেন, ‘বেশি বই কম নয়। হেল্পেজ ইন্ডিয়া বরাবরই বয়স্কদের নিয়ে কাজ করে। কিন্তু বছর কুড়ি আগেও চিত্রটা এমন ছিল না। বয়স্ক মহিলারা সংসারের গণ্ডি ছেড়ে রোজগারের পথ ধরতে সংকোচ বোধ করতেন সেই সময়। এখন কিন্তু পরিস্থিতি একেবারেই বদলে গিয়েছে। মহিলারাও পুরুষদের পাশাপাশি বয়সকালে নিজেদের সামর্থ্য মতো কাজ খুঁজছেন। নিজেদের মতো করে রোজগার করতে তাঁরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। অনেক মহিলা এমনও আছেন যাঁরা হয়তো অল্প বয়সে সংসার সামলেছেন শুধু, কিন্তু ছেলে মেয়েরা বড় হওয়ার পর জীবনের সায়াহ্নে পৌঁছে এখন কাজের খোঁজ করছেন। এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে বলছেন, জীবনটাকে কাজে লাগানোই উদ্দেশ্য। আগে সংসার সামলেছেন এখন সংসারের কাজ কমে গেলে অন্যভাবে নিজেকে কর্মঠ রাখার চেষ্টা করছেন।’ 
অর্থনৈতিক সাফল্য
এই যে নিজেদের কর্মঠ রাখা, রোজগারের পথ খোঁজা, এতে মহিলারা তো লাভবান হচ্ছেন বটেই, পাশাপাশি তাঁদের পরিবারেও একটা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসছে। আর আমাদের সমাজ যেখানে আজও মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত, সেখানে মহিলাদের স্বনির্ভর হওয়া আরও বেশি দরকার। তাতে সমাজে এবং সংসারে তাঁদের আলাদা সম্মান বজায় থাকে। বহুদিন পর্যন্ত মেয়েদের ক্ষেত্রে বলা হতো তারা কখনও বাবা, কখনও স্বামী কখনও বা পুত্রের অধীনে জীবন কাটায়। সেটা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। অল্পবয়সি মহিলারা যেমন নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই জয় করছেন, স্বনির্ভর হচ্ছেন। তেমনই বয়স্করাও তা-ই করছেন। না হলে সমাজ এগবে কীভাবে? আর হেল্পেজ ইন্ডিয়া সেই কাজটাই সহজ করে দিতে বয়স্ক মহিলাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এতে ক্রমশ বয়স্কদের স্বনির্ভরতা এবং রোজগারের ব্যাপারটা সহজ হয়ে উঠছে। প্রথম দিকে তাঁদের পরিবারের মনে একটা দ্বিধা কাজ করত। পরে যখন সেই রোজগারের মাধ্যমে সংসারে সচ্ছলতা এল তখন পরিবার সহযোগিতা করতে শুরু করল এবং এখন তো অনেক পরিবারেই বাড়ির বয়স্ক মহিলাটির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর কাজে সাহায্য করছে, নিজেরাও সেই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও ব্যবসা খুলে বসছে— সব মিলিয়ে একটা পারিবারিক রোজগারের উপায় তৈরি হচ্ছে। এর ফলে জীবনযাপনে একটা সার্বিক উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে ছোটখাট ব্যাপারে ঝগড়াঝাটি বন্ধ হচ্ছে, শাশুড়ি বউমার মনোমালিন্য কমে যাচ্ছে। সংসারে স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি একধরনের সুখও বিরাজ করছে। আর নিজেকে সংসারে এবং সমাজে উপযুক্ত করতে পেরে মহিলাদের মধ্যেও একটা ভালোলাগা তৈরি হচ্ছে। প্রান্তে পৌঁছেও জীবনের নতুন স্বাদ খুঁজে পাচ্ছেন তাঁরা। 
ঠিক যেমনটি হয়েছে আঙুর রুইদাসের ক্ষেত্রে। স্বামীর সঙ্গে মাঠে চাষ করতেন আঙুর। কিন্তু স্বামীর হঠাৎ অসুস্থতার ফলে চাষের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ছেলেদের দ্বারস্থ হলে তাঁরা কেউ-ই বাবা মায়ের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। তখনই হেল্পেজ ইন্ডিয়ার দ্বারস্থ হন আঙুর রুইদাস। অল্প টাকা ঋণ নিয়ে তিনি রান্নার বাসন বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। এখন তিনি স্বনির্ভর তো বটেই, এমনকী নিজের রোজগারের টাকায় স্বামীর চিকিৎসাও চালাচ্ছেন। এইভাবেই মহিলাদের আত্মসম্মান সহ বাঁচার রসদ জোগাতে সাহায্য করছে হেল্পেজ ইন্ডিয়া। শর্মিলার আশা, পরবর্তীতে আরও বেশি সংখ্যক মহিলার মধ্যে স্বনির্ভর হওয়ার তাগিদ জাগিয়ে তুলতে পারবেন তাঁরা।
 

30th     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ