বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

অনলাইনে কেন সক্রিয় পাচার চক্র

আজ, আন্তর্জাতিক মানব পাচার-বিরোধী দিবস। এই পাচার চক্রের শিকার হতে হয় অগুনতি দেশের নাবালিকা অথবা পরিণত বয়সের তরুণীদের একটা বড় অংশকে।

যুগ বদলায়। উন্নতি হয়। কিন্তু মানব পাচার চক্রের চক্রটা চক্রাকারে চলতেই থাকে। হাত বদলে অসংখ্য মেয়ে বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়ে যৌনপেশায়। পাশাপাশি শারীরিক, মানসিক নির্যাতন তো আছেই। নিজের পরিবার হঠাৎ কবে অচেনা হয়ে যায়, মেয়েরা বুঝতেও পারে না। কেউ যদি কোনওভাবে মুক্তির দিশা খুঁজেও পায়, তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিবার বা সমাজ তখন তাকে ‘ব্রাত্য’ বলে দায় সারে, মেয়েটির জীবনে সংগ্রাম বা লড়াইটা তখন একটা ধ্রুবকের মতো। সেই লড়াই করে অনেকে জীবনের অন্য মানে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন মেয়েদের পাশে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। কিন্তু পাচার চক্র আগের মতোই সক্রিয়। তাই প্রতি বছর পরিসংখ্যান বদলায়। বদলায় না বাস্তবটা।
এবারের আন্তর্জাতিক মানব পাচার-বিরোধী দিবসে রাষ্ট্রসংঘের ‘অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমস’ ঠিক করেছে এবারের থিম। যাতে নজর দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তির ভূমিকার উপর। অর্থাৎ মানব পাচার রুখতে প্রযুক্তি কীভাবে সহায়ক হতে পারে কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে মানব পাচার চক্রের কারবারিরা কতটা সুবিধে পাচ্ছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে এ বছর। রাষ্ট্রপুঞ্জের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার দিনে দিনে বেড়েছে, বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল জীবনই প্রকট। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সুযোগ নিতে নেমে পড়েছে পাচার চক্রে জড়িত লোকজনও। কীভাবে পাচারের জন্য ‘শিকার’ খোঁজা হবে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তাদের যাতায়াত থাকার ব্যবস্থা ইত্যাদি সামলানো হবে, উপযুক্ত ক্রেতার হাতে মেয়েদের তুলে দেওয়া হবে, পাচারকারীদের মধ্যে নিজস্ব যোগাযোগ রাখা হবে— এসবই প্রযুক্তির দৌলতে খুব দ্রুত গতিতে চালানোর সুযোগ চলে এসেছে চক্রের কাণ্ডারিদের কাছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, সমস্তটা সবার চোখের আড়ালে রেখে অপরাধ সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাওয়া। তাছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুযোগ নিয়েই চক্রীরা আন্তর্জাতিক স্তরে সক্রিয় থাকতে পারছে। চট করে ধরে ফেলার সুযোগ নেই তাদের। রাষ্ট্রপুঞ্জের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মানব পাচারের চক্রীরা ‘উপযুক্ত’ মেয়েদের খুঁজে বার করে, এমনকী শিশুদেরও ট্র্যাক করা হয় এভাবেই। তারপর হয় গ্রুমিং, তারও পরে যথাস্থানে পাঠিয়ে তাদের দিয়ে কাজ করানো। গোটা প্রক্রিয়ায় ক্রেতার সন্ধানে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কাজও চলে এই একই পদ্ধতিতে। 
যে দেশে যত সংকট, সেখানে পাচার কারবারীদের লাভ তত বেশি, বলছে রাষ্টপুঞ্জ। কারণ সংকট মানেই গোটা ব্যবস্থাটা ধসে পড়া। দেশের অবস্থা যত টলোমলো হয়, তার আঁচ লাগে পরিবারগুলোতে। সেখানে আর্থিক অব্যবস্থায় কোনও পরিবার একজোট থাকতে পারে না। কোথাও মা ছেড়ে যান শিশুকে। কোথাও বাড়ির কর্তা উধাও, পড়ে রইলেন বাচ্চা কোলে মায়েরা। এইভাবে টুকরো হয়ে যাওয়া পরিবার খুঁজে নেয় পাচারকারীদের শিকারী চোখ। বিচ্ছিন্ন পরিবারে কে কাকে কোথায় খুঁজবে? কার আছে সামর্থ্য বা লোকবল? এভাবেই হারিয়ে যায় হাজার হাজার মেয়ে।
অনেক সময় অনলাইন পোর্টালে ভুয়ো চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েও ফাঁসানো হয় মেয়েদের। এই সব ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রশাসনিক নজরদারি কীভাবে বাড়িয়ে তোলা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।   
এব্যাপারে আমরা কথা বলেছিলাম এ শহরে মানব পাচার বিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। তাঁদেরই একজন বললেন, প্রযুক্তির যত উন্নতি হচ্ছে, তা সৎ মানুষেরও কাজে লাগছে, অসৎ মানুষও কাজে লাগাচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তির অপব্যবহারে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির মতো ঘটনা যেমন বেড়ে গিয়েছে, সেইরকমই ইন্টারনেট সদ্বব্যবহার করে মানব পাচারও বাড়ছে। মানব পাচার সংগঠিত অপরাধের মধ্যে পড়ে। সাইবার স্পেস ব্যবহার করায় সে অপরাধের মাত্রা বাড়বে সন্দেহ নেই।
আর একজন প্রশ্ন তুললেন চাইল্ড পর্নোগ্রাফি কেন হয়? তাঁর মতে, ডার্ক ওয়েবে এসবের চাহিদা তুঙ্গে। আর চাহিদা আছে বলে মানব পাচার চক্রও সক্রিয় থাকছে। এক একটা ক্লিপ দেখার জন্য লোকে হাজার হাজার টাকা খরচ করতেও রাজি। তাহলে এতটা চাহিদা যেখানে, সেখানে জোগান দেওয়ার জন্য চক্র তো কার্যকর হবেই। সেই তালিকায় নয়া সংযোজন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ধরে নেওয়া যাক, যে মানুষটি সশরীর ক্রয় করছেন না, তিনি ভার্চুয়াল জগতে এভাবে চাহিদা মেটাচ্ছেন। তাই লোকচক্ষুর আড়ালে, বলা ভালো বাস্তব দুনিয়ার অন্তরালে এই চক্র চলছে সমান্তরালভাবে। 
মানব পাচার অনেকদিন ধরেই হচ্ছে। আগে সেটা ধরা অনেক সহজ ছিল, জানালেন তিনি। যেমন ধরুন, কোনও গ্রামে নতুন একজন ছেলে এল। সে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাল। একটি মেয়েকে বিশেষ বন্ধু বানাল। তাকে স্বপ্ন দেখাল, বাইরে নিয়ে বিয়ে করবে। তাকে মুম্বই শহর দেখাবে। মোটরবাইকে দু’দিন ঘোরাল। এই চেনা ছকে পা দিয়ে বহু মেয়ের সর্বনাশ হয়েছে। সেটাকেই ভালোবাসা ভেবে বহু মেয়ে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গিয়েছে ঘর ছেড়ে। তারপর ফেরার পথ অনেকের জন্যই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে বিক্রি হয়ে হাত বদলে চলে গিয়েছে যৌনপেশায়। এবার এই যে পাচারচক্রের প্রতিনিধি হিসেবে ছেলেটি কাজ করেছে, তাকে কোনও না কোনওভাবে ধরা সম্ভব হলেও হতে পারত। কিন্তু এখন বাস্তবটা এতটাই প্রযুক্তিনির্ভর যে এই অপরাধের জাল সহজে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। তার পাশাপাশি এত লোক আড়াল থেকে চক্রের হয়ে কাজ করছে, তাদের সহজে ধরা মুশকিল। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় না বুঝে না জেনে বিদেশি কোনও নাগরিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। অথবা বাইরের দেশে সহজলভ্য চাকরির লোভ দেখানো তো আছেই। এগুলির কোনটা ভুয়ো আর কোনটা ঠিক, তা বোঝার মতো কোনও পরিকাঠামো নেই। গ্রামে স্মার্টফোন, সবার হাতে সস্তায় ইন্টারনেট— কোনওভাবেই সরকারি নজরদারি সর্বত্র কার্যকর করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ আগে এই চক্রে সশরীরে এজেন্টরা যেভাবে কাজ করত, সেটা একই নকশায় আরও সূক্ষ্মভাবে চলছে। 
এর সঙ্গে কিছু সামাজিক কারণও দায়ী। আমাদের সমাজে এধরনের কোনও সমস্যার কথা খোলাখুলি আলোচনা করা যায় না। অর্থাৎ ধরা যাক, একটি মেয়ে কোনও ছেলে অর্থাৎ এজেন্টের পাল্লায় পড়ল। সে কিন্তু ভয়ে বা লজ্জায় বাড়িতে সে কথা কাউকে জানাবে না। কারণ ছোট থেকে কথা চেপে রাখতে শেখানো হয় মেয়েদের। অথচ সেটা যদি অভিভাবকদের গোচরে আসত, তাঁরা ভালোমন্দ হয়তো বা বিচার করতে পারতেন। মেয়েটিকে গাইড করতে পারতেন।
এই ধরনের সমস্যাগুলো রোজকার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাদের চিনতে শেখা, বুঝতে শেখা এবং সেইমতো মানব পাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দরকার। অনলাইনে যেভাবে অসদুদ্দেশ্যে মানব পাচার চক্র সক্রিয় হচ্ছে, তেমনই এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করেই এ প্রসঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটিও করা যায়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে অনেকের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। তাই শহর হোক বা গ্রাম, শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়িয়ে তুলে এই চক্রের শিকার হওয়া থেকে শিশু তথা মেয়েদের বাঁচানো আশু প্রয়োজন।  

30th     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ