বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

হাতের কাজেই স্বনির্ভর

ভারতের নানা রাজ্যের গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাজ করে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। উদ্দেশ্য গ্রামের মহিলাদের নানা গুণ তুলে ধরা ও তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলা। মহিলাদের স্বনির্ভরতার এই বিপুল কর্মকাণ্ডের খোঁজ নিলেন কমলিনী চক্রবর্তী।  

নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশে একটা ছোট্ট গ্রামে নলিনী দেবীর বাড়ি। প্রায় ৭০ ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধার হাতের কাজের কদর একসময় করত গোটা গ্রাম। বছর তিরিশ আগে সুতোর গয়না বানানো শুরু করেছিলেন নলিনী। রেশম ও সুতির খুবই সরু সুতো, আর তা দিয়ে হাতেই নকশা তুলতেন নানারকম। আঙুলে সুতো জড়িয়ে চলত টানাপোড়েন। আর তাতেই তৈরি হতো কানের দুল, গলার হার বা লকেট। পাড়াপড়শিদের উপহার দিতেন নিজের হাতে তৈরি এইসব গয়না। ক্রমশ এই কাজের জনপ্রিয়তা বাড়লে গ্রামেই নলিনীর কাজ বিক্রিও হতে শুরু করে। তবে সেই রোজগারে জিনিস বানানোর সুতোর খরচও উঠত না। হাতের কাজের কত দাম ধার্য করলে লাভের সামান্য মাত্রা রাখা সম্ভব, তা বোঝার মতো ক্ষমতাই ছিল না নলিনীর। কিন্তু অল্পবয়সি মেয়ে-বউদের কাজ শেখার আগ্রহ দেখে তাঁরও মনে সাধ হল এই নিয়ে ব্যবসা করবেন। কিছুদিন মোটামুটি রোজগারপাতি ভালোই হল। তারপর আবার যে কে ঩সেই। এর মাঝে নলিনীরও বয়স বেড়ে গিয়েছে। হাতের জোর কমেছে। আঙুলগুলোও আর আগের মতো সরে না। চোখের জ্যোতিও কমেছে। সূক্ষ্ম নকশা তুলতে বেশ অসুবিধে হয়। ফলে গুণ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায় ততটা সাফল্য তিনি পাননি। একইরকম অবস্থা রাজস্থানের জোহরা মেহতার। গ্রাম্য মেয়ে জোহরা আচার তৈরিতে পারদর্শী। যে কোনও ফল বা সবজি দিয়েই আচার বানাতে পারেন তিনি। কিন্তু আচার বানিয়েও বিক্রি করে ব্যবসা করার মতো লোকবল বা দূরদৃষ্টি কোনওটাই তার নেই। ফলে জোহরার এই গুণের কদর বিশেষ ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামেও যে জোহরার আচার বানানোর ক্ষমতার বিশেষ কদর হয়, তাও নয়। পড়শিদের বক্তব্য আচার বানানো আর এমন কী কাজ? গাঁয়ে গঞ্জে এমন গুণ তো ঘরে ঘরে। কথাটা একেবারে মিথ্যে তো নয়। তবে জোহরার মতো যে কোনও ফল বা সবজি দিয়েই আচার বানানোর কায়দা হয়তো বা সকলের জানা নেই। যাইহোক, জোহরার গুণের কদরও কিন্তু ছড়িয়ে পড়েনি।
হাতের কাজের কদর 
এইরকম বিভিন্ন গুণ রয়েছে গ্রামের মহিলাদের মধ্যে। কিন্তু সঠিক প্রচারের অভাবে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে না। লোকে সেই গুণের কথা জানতেও পারে না। ফলে তা ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। গ্রামের এই ধরনের মহিলাদের নিয়েই কাজ করছে ‘নাদাথুর এস রাঘবন সেন্টার ফর অন্ত্রোপ্রনরাল লার্নিং’ (এনএসআরসিএল)। বহু বছর ধরেই এনএসআরসিএল মহিলাদের স্বনির্ভর করার কাজে ব্রতী। তার জন্য মেয়েদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে এই সংস্থা। এবার গ্রামের মহিলাদের নিয়ে কাজে নেমেছে তারা। সংস্থার সিওও আনন্দ শ্রী গণেশ বললেন, ‘আমাদের দেশের প্রতিটি গ্রামই শিল্পের আঁতুড়ঘর। কিন্তু সেই শিল্প বা গুণের কদর করা হয় না। গ্রামের মহিলাদের সঠিক লেখাপড়া নেই বলে তাঁরা নিজেদের কাজের প্রচারও করতে পারেন না। অনেকেই হয়তো কাজের মূল্যও সঠিক জানেন না। ফলে ঠকে যান। অনেক ক্ষেত্রে যেটুকু প্রচার তাঁরা পান তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। অর্থাৎ কাজের কদর শহরে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে খুবই কম দামে এঁদের কাজ কেনা হয়, এবং তা চড়া দামে বিক্রি করে লাভ করেন শহরের ব্যবসাদাররা। কিন্তু গ্রামের শিল্প যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আবার সঠিক প্রচারের অভাবে গ্রামের কাজের কদরই হয় না। এই পরিস্থিতিটা বদলানোর আশায় আমরা গ্রামের মহিলাদের নিয়ে কাজ শুরু করেছি।’ 
এই কাজের জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সহায়তা নেওয়ার কথাও ভাবছেন আনন্দ। তাঁর মতে যে কোনও কাজই সঠিকভাবে করতে গেলে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এবং এই যে প্রশিক্ষণ তা ভালোভাবে পেতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়। সেই ধরনের পড়াশোনা করার জন্য যেমন লোকের দরকার তেমন লোক দিয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়ানো হবে গ্রামের মহিলাদের। তাঁদের কাছে পৌঁছনোর জন্য যে ভাষা ব্যবহার করার দরকার ঠিক সেই ভাষাই ব্যবহার করার কথা ভাবছে এই সংস্থা। বড় বড় বক্তৃতা বা সভার মাধ্যমে এক্ষেত্রে তেমন কাজ হবে না বলে মনে করছেন কর্তৃপক্ষ। হাতেকলমে প্রশিক্ষণের দিকটাই তাঁরা বেছে নিয়েছেন। এই হাতেকলমে প্রশিক্ষণেরও আবার ধরন রয়েছে। যেমন কোনও গ্রামে হয়তো চাষবাস ভালো হয়, সেক্ষেত্রে সেখানে চাষের দিকটাকেই তুলে ধরতে হবে। সংস্থার তরফে নতুন করে কোনও শিল্প শেখানো হয় না। বরং যে শিল্পে গ্রামের মহিলারা পারদর্শী সেটাকে সম্বল করেই তার ব্যবসায়িক দিকটা পোক্ত করা হয়। 
ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ
প্রশিক্ষণের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত, কোনও জিনিস বানানোর পর তাতে কীভাবে দাম ফেলা হবে সেটা অঙ্ক কষে শেখানো হয়। এই যে দাম ধার্য করা, এরও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। জিনিসের দাম, শ্রমের হিসেব ইত্যাদির উপর নির্ভর করে একটা দাম ফেলা হয় যাতে বিক্রির পর কিছুটা লাভ থাকে। অনেক মহিলা একা ব্যবসা করেন, কেউ আবার মিলিতভাবে করেন। সেক্ষেত্রে দাম নির্ধারণে হেরফের হয়। অনেকে মিলে একটা জিনিস বানালে শ্রমের হিসেবটা বেড়ে যায়। এই সব খুঁটিনাটি গ্রামের মহিলাদের শেখানোর জন্য ভিডিও টেপ তৈরি করে এনএসআরসিইএল। দ্বিতীয়ত তা বিক্রির বিভিন্ন মাধ্যম শেখানো হয়। কিছু উপায় বা স্ট্র্যাটেজি মেনে চললে বিক্রির হার ভালো থাকে। গ্রামের মহিলাদের কাছে সেই উপায়গুলো পৌঁছে দেওয়া হয় সংস্থার তরফে। তৃতীয়ত গ্রামের মহিলাদের ব্যবহারের দিকটাকেও একটু পালিশ করা হয়। তার জন্য কিছু গ্রুমিং ক্লাসও নেওয়া হয়। মহিলাদের বিভিন্ন দলে ভেঙে দেওয়া হয়। এই দলগুলো মহিলাদের স্কিলের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। কেউ জিনিসটা তৈরি করেন, কেউ বা তা বিক্রি করেন। যাঁরা ক্রেতার সামনে থাকেন তাঁদের কথা বলার ধরন, জিনিসটা দেখানোর সময় তার গুণগুলো কীভাবে তুলে ধরতে হবে, সামগ্রীটাকে কীভাবে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা যায় — এই সবই শেখানো হয়। 
ছোট থেকে বড়
গ্রামের মহিলাদের অনেক গুণ। কিন্তু সেই গুণটাকে ব্যবসায় বড় করে কাজে লাগানোর ক্ষমতা তাঁদের নেই, বললেন আনন্দ। সেই ক্ষমতাটাই তাঁদের হাতে তুলে দিতে চায় এই সংস্থা। তার জন্য কোথাও হয়তো সেলাই মেশিন বসিয়ে হাতের কাজ তৈরির মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়, কোথাও বা অন্য কোনও মেশিনের সাহায্যে প্রোডাকশন বাড়ানো হয়। কোথাও আবার জিনিসটা তৈরির পর তার প্যাকেজিংয়ের উপর জোর দেওয়া হয়। এইভাবে মহিলাদের ক্রমশ স্বনির্ভর করে তোলাই এনএসআরসিইএল-এর লক্ষ্য। এই সংস্থার বিশ্বাস মেয়েরা উন্নত না হলে সমাজ কিছুই এগতে পারে না। ফলে তাদের উন্নতিসাধনই একমাত্র লক্ষ্য। মহিলাদের  সম্পূর্ণভাবে স্বনির্ভর করতে পারলে দেশের অর্থনীতিও অনেকটা উন্নত হবে বলেই মনে করেন সংস্থার সিওও আনন্দ শ্রী গণেশ।       

9th     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ