বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

কঠিন দিনের সহজ পাঠ

ক্যানসারে বদলে যাওয়া বহিরঙ্গ পাল্টে ফেলেছেন ফ্যাশনের হাত ধরে। মন শক্ত করে নেহাতই সাধারণ রিনি শীল-এর সে লড়াই কেমন ছিল? কথোপকথনে স্বরলিপি ভট্টাচার্য।

ন্যাড়া হওয়ার পর প্রথম চুল উঠেছে যেন। ছোট খোঁচা চুলে ভরেছে মাথা। দূর থেকে দেখলে টুপি মনে হতে পারে! আবার কদমফুলও বলতে পারেন। অথবা কয়েক বছর আগেও ছোটবেলার গরমের ছুটিতে ন্যাড়া হওয়া যখন বেশিরভাগ বাড়িতে বাধ্যতামূলক ছিল, শৈশবের সেই ন্যাড়া মাথা যেন ফিরে এসেছে পরিণত বয়সে। 
এহেন ছবি সাম্প্রতিক অতীতে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। যাঁদের ছবি, তাঁরা পরিচিত মুখ। তথাকথিত সেলিব্রিটি। বলিউডের মহিমা চৌধুরী, সোনালি বেন্দ্রে, মনীষা কৈরালা, তাহিরা কাশ্যপ বা এখানকার ঐন্দ্রিলা শর্মা— তালিকা দীর্ঘ। সকলেই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। মনের জোরে ফিরে এসেছেন জীবনের লড়াইয়ে। তাঁদের ন্যাড়া মাথা কখনও হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের নতুন পাঠ। কখনও বা কেমোথেরাপির পরে বদলে যাওয়া বাহ্যিক পরিবর্তনকে বদলে ফেলেছেন ফ্যাশনের গালিচায়। তাঁদের সাহসকে কুর্নিশ। তাঁরা পরিচিত, তাই  তাঁদের নিয়ে আলোচনাও বেশি। কিন্তু তথাকথিত পরিচিত মুখ নন, এমন ক্যানসার আক্রান্তও নিজের শর্তে বাঁচছেন হইহই করে। কেমোথেরাপির পরে চুল পড়ে যাওয়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বদলে ফেলেছেন লুক। রোগের চোখে চোখ রেখে জীবনের ছন্দে। ফিরেছেন ফ্যাশনের হাত ধরে। তিনি রিনি শীল।
ফ্যাশন যখন স্টেটমেন্ট
মর্ডান হাই স্কুল, লেডি ব্রেবোর্ন, এনআইএফটি-র প্রাক্তনী রিনি আগামী আগস্টে ৪০-এ পা দেবেন। ২০০৯-১০ থেকে পেশাদার ফ্যাশন ডিজাইনার। অন্যদের সাজানো তাঁর পেশা। নিজেও সাজতে ভালোবাসেন। হঠাৎই শরীরে বাসা বাঁধল ক্যানসার। কেমোথেরাপি বদলে দিল বহিরঙ্গ। তা বলে চেহারার বদল সাজের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ন্যাড়া মাথায় তিনি জড়িয়ে নিলেন রংবাহারি স্কার্ফ। উঠে যাওয়া ভুরু এঁকে নিলেন সযত্নে। আর তাতেই যেন ফিরে এল জীবনের স্বাভাবিক চলন। ‘আমি ফ্যাশন ডিজাইনার। ওয়ার্ডরোব স্টাইলিং আমার ব্র্যান্ড। লকডাউনের সময় থেকে ফার্ম হাউজ প্রোজেক্টও শুরু করেছি। ফলে জামাকাপড়, অ্যাকসেসরিজ বরাবর ভালোবাসি। সব সময়ই ফ্যাশনের মধ্যেই ছিলাম। যখন চুলটা পড়ে গেল, প্রথমে খুব খারাপ লেগেছিল। ধীরে ধীরে বুঝলাম এটা অনেক দিনের ধাক্কা। এতদিন তো আপসেট হয়ে থাকা যাবে না। তখন এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যেটা দেখতে ভালো লাগে, আর আমার নিজেরও ভালো লাগবে। অসুখটাকে নিজের মতো করে ফ্যাশন স্টেটমেন্টে বদলে ফেললাম’, বললেন তিনি।
লড়াইয়ের শুরু
জীবনকে একটু অন্যভাবে দেখতে ভালোবাসেন রিনি। ২০২০-র সেপ্টেম্বরে প্রথম চিকিৎসকের কাছে যান। তখন ভুল ডায়াগনোসিস হয় বলে জানালেন। ২০২১-এর এপ্রিলে ফের ডাক্তার দেখান। তখনও চিকিৎসকের তরফে আশ্বাস পান, চিন্তার কিছু নেই। ‘শেষ পর্যন্ত ২০২১-এর ডিসেম্বরে ডাক্তার  যখন বললেন, বায়োপসি করতে হবে, আমি বুঝে গিয়েছিলাম গণ্ডগোলের ব্যাপার। তারপর থেকে বিভিন্ন টেস্ট শুরু হয়। আমার বাবা ডাক্তার, ইউরোলজিস্ট। যাঁর কাছে গিয়েছিলাম তিনি যেহেতু বলেছেন, চিন্তা নেই তাই তাঁকে বিশ্বাস করেছিলেন বাবা। ওটা নিয়ে পরে আর মাথা ঘামাইনি। ওই বছর ডিসেম্বরেই সার্জারি এবং বায়োপসি করে জানা যায় ব্রেস্ট ক্যানসার, স্টেজ থ্রি। জানুয়ারি থেকে কেমোথেরাপি শুরু। এখন রেডিওথেরাপি হচ্ছে’, লড়াইয়ের শুরুটা এমনই ছিল বললেন তিনি।
চেহারা নিয়ে লজ্জা
ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে মনখারাপ কাটিয়ে ওঠার হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাশনকে বেছে নেন রিনি। তাঁর কথায়, ‘প্রথম থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করতে শুরু করি সচেতনতার জন্য। কারণ এখন ক্যানসার অনেকেরই হচ্ছে। এত ব্রেস্ট ক্যানসার হয়, কিন্তু বেশিরভাগ রোগী কাউকে বলতে চায় না। লজ্জা পায়। নিজেদের চেহারা দেখে লজ্জা লাগে তাদের। মাথার চুল, ভুরুর চুল পড়ে যাওয়ার পর দেখতে খারাপ লাগছে বলে মনে করে। সত্যি কথা বলতে আশপাশের লোকজনও অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে দেখে। ‘স্বাভাবিক’ মানুষদের মতো দেখতে না হলেই বেশি করে যেন তাকিয়ে থাকে।’ 
সেসব তাকিয়ে দেখা এড়িয়ে যেতেই কি নিজেকে নতুন লুক দিলেন? হেসে রিনি বললেন, ‘মাথায় স্কার্ফ পরে, আইব্রাও এঁকে যখন যাই, কেউ হয়তো দেখে বুঝতে পারবে না, ক্যানসার হয়েছে। কিন্তু হেড গিয়ারটা দেখে সবাই একবার তাকায়। এটা কী পরেছে! এমন ভাব। এই মনোযোগ না চাইতেও দেন সকলে। যাঁরা দেখছেন, তাঁরা যে সব সময় জাজমেন্টাল, তা হয়তো নয়। কিন্তু আমি যে কিছুটা আলাদা সেটা বুঝিয়ে দেন। খালি মাথা নিয়ে আমি বাইরে খুব একটা বেরইনি। সেটা একটু অদ্ভুত হয়তো। এমন কিছু করতে চাইনি যেটা করলে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে দেখবেন। স্কার্ফ পরে বেরলে কিছু কম মানুষ তাকান। এত গরমের জায়গা, ন্যাড়া মাথা রাখাটা প্র্যাকটিকাল নয়। রোদ্দুর, ধুলো, জল লাগবে। শুধু ফ্যাশনের জন্য নয়, আরাম এবং বাস্তবটা মাথায় রেখেও এটা করা। ভুরুটা হঠাৎ চলে গেলে মানুষের মুখটা অদ্ভুত দেখতে হয়ে যায়। নিজেকে বোঝাই বিশাল কিছু হয়নি। আইব্রাও এঁকে নিজেকে দেখলে মনে হয়, এই তো নর্মাল, ঠিকই লাগছে দেখতে। ভিতর থেকে তখন ভালো লাগে।’ 
ফলস আইল্যাশ, উইগও কিনেছেন রিনি। কিন্তু সেসব ছাড়াই নিজেকে সাজান। ‘যখন প্রথম চুল পড়ে যায় বাবা দেখে খুব আপসেট হয়ে পড়েছিলেন। মেয়ে কেমোথেরাপির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, চুল পড়ে যাচ্ছে, বাবার খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বাবা বলেছিলেন, ভালো উইগ কেনো। সেসব কিনলাম। ওসব পরব, শীতে। এখন স্কার্ফ পরে আরাম লাগছে’, গেরস্থালির একমুঠো উঠে এল তাঁর কথায়। 
পজিটিভ চ্যালেঞ্জ
পার্কসার্কাসের বাড়িতে বাবা, মা, দিদি, বোনঝির সঙ্গে থাকেন রিনি। ক্যানসার ধরা পড়ার পর আত্মবিশ্বাস এক সময় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো নেহাত সহজ ছিল না। সে সব দিন পেরিয়ে এসে এখন অনেক সহজে রিনি বলছেন, ‘প্রথম দিকে আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়েছিল। তারপর মনে হল, আর কী করা যাবে? তখন থেকে ঘটনাটা পজিটিভ ভাবে দেখেছি। চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। প্রথম কেমোর ১৪ দিন পরেই গোছা গোছা চুল পড়তে শুরু করে। সেটা অনেক বেশি মনখারাপের। তার থেকে পুরো শেভ করে নেওয়া ভালো। সেটা এমপাওয়ারিং।’ যখন চুল কেটে ফেলতেই হবে, তখনও স্টাইলিং করতে চেয়েছিলেন। কারণ নেশা এবং পেশার নাম তো ফ্যাশন ডিজাইনিং। হাসতে হাসতে বললেন, ‘কখনও  ভাবিনি নিজের মাথা শেভ করতে হবে। প্রথমে একটু স্টাইল করব ভেবেছিলাম। মাঝখানে চুল রাখব। পাশের চুল কেটে ফেলব। তেমন করেওছিলাম। পরে তো পুরোটাই কেটে বের করতে হল। তখন খারাপ লাগেনি। মনে হয়েছিল, এটা আমাকে করতে হবে।’
মনের জোরে
নিজের লড়াইয়ের কথা সহজভাবে রিনির মতো বলতে পারেন ক’জন? তাঁর কথা পড়ে, তাঁকে দেখে যদি একজন ক্যানসার আক্রান্তও মনে জোর পান, জীবনের নতুন মানে খুঁজে পান, তাতেই তিনি খুশি। তাঁর ভালো থাকার দাওয়াই কী? ‘মনের জোর এবং সদর্থক ভাবনা। ভেঙে পড়লে চলবে না। ক্যানসার হয়েছে তো কী হয়েছে? আমি আমার জীবন চালনা করব। যা করার করব। কেমোর পর এক সপ্তাহ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। সে সময় ওয়ার্কশপ, বাগানবাড়ির কাজ কিছুই করতে পারি না। বাকি সময় কাজ করি। আমি সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকি। সারাক্ষণ যদি রোগ হয়েছে, এটা ভাবতে থাকি, সেটা খুব ডিপ্রেসিং। শরীর খারাপ হচ্ছে, আবার ঠিক হয়ে গেলে নিজেকে ব্যস্ত রাখাই ভালো থাকার উপায়। কঠিন সময়টা পিছনে ফেলে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। যিনি অসুস্থ এবং তাঁর বাড়ির লোক এটা মনে রাখলেই যথেষ্ট’, বললেন তিনি।  
অসুখ এসেছে আচমকা। সেরে ওঠার ইচ্ছে প্রবল এই কন্যের। রিনির সেই ইচ্ছেডানার অক্সিজেনের ভাগ আপনিও খুঁজে নিতে পারেন নিজের মতো করে।

9th     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ