বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

একটা স্বপ্ন থাকা দরকার 

সম্প্রতি ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মিতালি রাজ। তাঁর কথায় কমলিনী চক্রবর্তী।  

‘ভারতের লোগো লাগানো নীল জার্সি গায়ে চাপিয়ে যখন যাত্রাটা শুরু করেছিলাম তখন আমি নেহাতই বাচ্চা। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্বে গরবিনী। সেই পথে বাধা যে একেবারে আসেনি, তা নয়। তবে সুখস্মৃতিগুলোই মনে জ্বলজ্বল করছে। ভালো আর মন্দের মধ্যে ভালোর পাল্লাই ভারী। ২৩ বছরের যাত্রাপথে এবার সীমারেখা টানছি। সকলের ভালোবাসা চিরজীবন সঙ্গে থাকবে বলেই আশা।’ মিতালি রাজ, ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক অবসরের সময় এমনই টুইট করেন। ২০১২ সালে রাহুল দ্রাবিড়ের আবেগঘন অবসর বার্তা শুনে মনে মনে নিজের খেলোয়াড় জীবনের শেষের মুহূর্তগুলো যেন অনুশীলন করতে শুরু করেন মিতালি। তবে সেটা নেহাতই মুহূ্র্তের ভাবনা। তার দশ বছর বাদে ৩৯ বছর বয়সে অবসর কি ভবিতব্য ছিল? মিতালির কথায়, ‘ভবিতব্য বলা উচিত নয়। তবে সব পথেরই একটা শেষ থাকে। আমার ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল। মহিলা বিশ্বকাপের পর টি২০ খেলতে গিয়ে মনে হল সেই প্যাশনটা মিসিং। তখনই অবসরের কথা ভাবি। তবে ভাবনা আর বাস্তবে মধ্যে তো বেশ খানিকটা ফারাক থাকে। বাস্তবে অবসরের সিদ্ধান্তটা এখনও ঠিক মনে বসেনি।’ 
খেলোয়াড়ি সফর
মনকে অলস রাখা উচিত নয়। সবসময় একটা স্বপ্ন মনে মনে জিইয়ে রাখতে হয়। মিতালি বলেন, যে মেয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে সে কঠিন থেকে কঠিনতম পরিস্থিতির মোকাবিলাও করতে পারে। নিজের জীবন দিয়ে এই উপলব্ধিটা করেছেন তিনি। বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুধু একটাই জিনিস মন দিয়ে করেছি— একটা ব্যাট হাতে নিজের স্বপ্নের পিছনে ছোটা। তাতেই আজ আমি মিতালি রাজ। আমায় ঩নিয়ে সিনেমা বানানো হচ্ছে। ‘শাবাশ মিঠু’ টিম, পরিচালক ও তাপসী পান্নুকে অনেক ধন্যবাদ।’ প্রাক্তন অধিনায়কের এই স্বপ্ন দেখার পিছনে বেশ কিছু মানুষের ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবার আগে যাঁর নাম উল্লেখ করা উচিত তিনি মিতালির প্রথম প্রশিক্ষক সম্পত কুমার। ‘আমার ভিতরের সেরাটা বের করে আনার পিছনে একজন লোকের ভূমিকা যদি উল্লেখ করতে হয় তবে তিনি আমার কোচ সম্পত’, বললেন মিতালি। কোচের সাহায্যেই ব্যাটিং স্টাইল ও ফিল্ডিংয়ের সূক্ষ্মতার মাধ্যমে তাঁর চরিত্রের সেই দৃঢ়তা বেরিয়ে এসেছে বলে জানালেন তিনি। পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে সেরাটা বের করে আনতেও তাঁর কোচই সাহায্য করেছেন। শুধু সম্পত নয়। ভারতীয় দলের কোচের কাছেও তিনি কৃতজ্ঞ। খেলোয়াড় থেকে ক্যাপ্টেন হয়ে ওঠার  সফরেও কোচই ছিলেন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। 
নিজস্বতার সঙ্গে
মেয়েদের সৌন্দর্য তাদের নিজস্বতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, বলেন মিতালি। নিজস্বতা বজায় রাখতে পারলে পাঁচজনের একজন হয়ে ওঠা যায়। আর দেশের প্রতি একটা শ্রদ্ধাও ওই নিজস্বতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর সাফল্য? সে তো কিছু নিয়মানুবর্তিতা আর অভ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  রোজনামচায় একটা ডিসিপ্লিন অভ্যাস করতে হয়। তাহলেই সাফল্য সম্ভব। ‘এই যে ডিসিপ্লিনের কথা বললাম, তার মধ্যে কিন্তু রিল্যাক্সেশনও থাকবে। রোজ সকালে উঠে একটু সময় নিজের জন্য রাখা দরকার। আর দিনের শেষে আবারও সেই নিজের জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন। দেখবেন বাকি দিনটা তরতাজা থাকবেন,’ বললেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। অল্প বয়সে যখন ক্রিকেট ব্যাট প্রথম হাতে ধরেছিলেন তখনই বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল তাঁর সারা শরীরে। মনে মনে স্বপ্ন দেখার সেই শুরু। বাড়ির গলিতে ক্রিকেট খেলার সময়ও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখতেন। বললেন, ‘আমরা সবাই নিজ ক্ষেত্রে সফল হতে চাই। সেক্ষেত্রে লক্ষ্যে অবিচল থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ 
সাফল্যের পথে
‘সাফল্য একটা আপেক্ষিক শব্দ। আমার মন কতটা স্বপ্ন দেখতে শিখেছে তার উপর নির্ভর করে আমার সাফল্যের মাপকাঠি’, বললেন মিতালি। তাঁর ক্ষেত্রে যেমন ভারতের হয়ে খেলাই ছিল সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি অবশ্য মনে করেন সাফল্যের স্বাদ যতই মধুর হোক না কেন, তা পাওয়ার পথ অত্যন্ত কঠিন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন, সাফল্য পেতে কী অসম্ভব পরিশ্রম আর একাগ্রতা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘ছোটবেলায়, যেদিন থেকে ব্যাট হাতে ধরেছি আমি খেলাকেই জীবনের ধ্রুবতারা করার চেষ্টা করেছি। তার বাইরে আর কিছু ভাবিনি। আমার সৌভাগ্য, লক্ষ্যে স্থির থেকে জীবনে একটা উল্লেখযোগ্য জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি।’  
সবার সাহায্যে
একদিনে যেমন তিনি মিতালি রাজ হয়ে ওঠেননি, তেমনই একাও তিনি কিছুই নন। সবার সহায়তা ছাড়া তিনি কোনও স্বপ্নই দেখতে পারতেন না। মিতালি রাজ হয়ে ওঠা তো দূরের কথা, মহিলা হয়ে ক্রিকেট খেলার সাহসই তাঁর হতো না, যদি না পরিবার প্রতিপদে তাঁর সঙ্গে থাকত। জীবনের প্রথম ধাপে যে সাহায্য ঩তিনি পরিবারের কাছ থেকে পেয়েছেন তা-ই আবার পরবর্তীতে বন্ধুবান্ধব, টিমমেট, মেন্টরদের কাছ থেকেও পেয়েছেন। ‘এক্ষেত্রে ঝুলন (গোস্বামী) বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ও একাধারে আমার কলিগ এবং বন্ধু। আমরা দু’জন যখন মেয়ে হয়ে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখেছিলাম তখন মহিলা ক্রিকেটের কোনও সমাদর ছিল না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে করতেই নিজেদের স্বপ্ন লালন করেছি’, বললেন মিতালি। ক্রীড়াজীবনের সিনিয়রদের কাছেও তিনি যথেষ্ট সাহায্য ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর পূর্বসূরী শান্তা রঙ্গস্বামীর কথা উল্লেখ করলেন মিতালি। শান্তার ব্যাটিং স্টাইলের ভীষণ ভক্ত তিনি। 
পড়াশোনা বনাম খেলাধুলো
‘ছোটবেলায় আমার হাতে ব্যাট আর চোখ ভরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে অনেকেই বলতেন খেলাধুলো ছেড়ে পড়াশোনায় মন দেওয়া উচিত। তাঁদের ধারণাগুলোকে বরাবর পুরোনোপন্থী মনে হতো আমার। মেয়ে বলে খেলা বাদ, ছেলে হলে কিন্তু এমন কথা তাঁরা বলতেন না। এই গতানুগতিকতা বা স্টিরিওটাইপগুলো ভাঙার চেষ্টা করেছি সবসময়। শুধু খেলা নয়, মেয়েদের মনে যে কোনও ‘আউট অব দ্য বক্স’ ধারণাকেই উৎসাহ দেওয়া উচিত। না হলে সমাজ এগবে না।’ তবে তিনি মনে করেন জীবনে এগিয়ে যেতে গেলে বাধার মুখোমুখি হতেই হয়। না হলে নিজের মধ্যে জেদ তৈরি হয় না, সেই জেদ যা নিজেকে উন্নত করতে, এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।   
বেড়ানোর টান
বেড়ানো বরাবরই  মিতালির ভীষণ প্রিয়। নিজের ফেসবুক ওয়ালে প্রকৃতির মাঝে নিজের ছবি সহ ফরাসি ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার-এর একটা উক্তিও তিনি শেয়ার করেছেন। সেখানে ফ্লবেয়ার বলেছেন, বেড়ানোর নেশা থাকা দরকার। মনের ঔদার্য বাড়ে তাতে। বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে তুলে ধরলেই একমাত্র বোঝা যায় মানুষ কত নগণ্য। কত ক্ষুদ্র তার অস্তিত্ব। তবে শুধু ওই উক্তিটিই যে তাঁর বেড়ানোর পাথেয় তা কিন্তু নয়। এর পরেই তিনি নিউজিল্যান্ডের একটি হোটেলের ঘরে নিজের ছবি দিয়েছেন। প্রশস্ত কাচের দেওয়ালের সম্মুখে কফির কাপ হাতে বসে আছেন মিতালি। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন গরম কফি আর প্রকৃতি। ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘গরম কফি আর প্রকৃতি ... রিল্যাক্সেশনের জন্য আর কী চাই?’ জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বেড়ানোর জায়গা এবং পরিস্থিতির বদল, তা-ই বা কেমন লাগে মিতালির? জানালেন, ছোট থেকেই যে কোনও পরিস্থিতি উপভোগ করতে শিখেছেন। যখন অসংরিক্ষত কামরায় চড়তেন তখনও যেমন যাত্রাপথের খুঁটিনাটি দেখতে দেখতে যেতেন তেমনই এখন বিজনেস ক্লাসে এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়ার সময়ও পরিস্থিতির বদলটা খুঁটিয়ে নজর করেন, ভালোবাসেন।   
বদলের অণুঘটক
ক্রীড়াজগতে মেয়েরা আসলে ক্যাটালিস্টের কাজ করে, বললেন মিতালি। তাঁর কথায়, ‘সমাজের যে পরিবর্তন আমরা চোখের সামনে দেখছি তা কিন্তু আমাদের হাত ধরেই হয়। এই যে মেয়েদের হাত ধরে সমাজের পরিবর্তন আসা, এতে প্রচণ্ড গর্ব বোধ করি আমি। আর শুধু সমাজই বা বলি কেন? একজন সফল নারী আরও অজস্র মেয়েকে সাফল্যের পথ দেখায়। সামাজিকভাবে দেখতে গেলে মেয়েদের উন্নতির মাধ্যমেই সমাজ উন্নত হচ্ছে এবং এগিয়ে চলেছে। আর মেয়েদের উন্নতির কথা বলতে হলে বলব, আমার সাফল্য শুধু আমার একার নয়, বরং আরও অজস্র মেয়ের। যারা আমায় দেখে নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। আর পাঁচটা মেয়ের জীবনের আইডল হয়ে ওঠাই আমার জীবনের সার্থকতা।’ 

25th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ