বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

মোটরের টানে

হাতে কালি মেখে মোটরবাইক সারান একজন আর, অন্যজন ট্রাক মেরামত করেন। দু’জনেই মেকানিক। জীবিকার সন্ধানে কালিঝুলি মাখাই এঁদের দস্তুর। কলকাতার সোনালি মিস্ত্রি আর দিল্লির শান্তি দেবীর কথায় কমলিনী চক্রবর্তী। 

উৎসাহ আর আগ্রহ
 মিলে গেল কাজে

আনোয়ার শাহ রোডের মোড়ে মাজার-মন্দিরের গায়ে আব্দুল কালাম অটো ক্যাপিটাল-এর দোকান। বাইক, স্কুটার, স্কুটি ইত্যাদি সারানো হয় সেখানে। দু’চাকা সারানোর এমন আস্তানা তো শহরে আরও অনেক আছে। তবু এই দোকানটি আর পাঁচটা দোকানের চেয়ে আলাদা। কেন জানেন? এখানেই কাজ করেন কলকাতার একমাত্র মহিলা মেকানিক সোনালি মিস্ত্রি। একথা শুনে তিনি অবশ্য একটু শুধরে দিলেন। মহিলা মেকানিক বলাটা ঠিক হল না, বরং বলা উচিত মহিলা বাইক মেকানিক। সোনালি কেবলই দু’চাকার গাড়ি সারান। বললেন, ‘কাজের অভিজ্ঞতা যা হয়েছে সবই কিন্তু প্রায় দেখে দেখে শেখা। কিছুটা বা ঠেকেও শিখেছি। হাতেকলমে কাজ করতে গিয়ে যতটা শেখা যায়, বই পড়ে তার অর্ধেকও শেখা যায় কি না জানি না।’
কিন্তু এত কাজ থাকতে হঠাৎ গাড়ি সারানোর কাজে লাগলেন কেন সোনালি? গাড়ির প্রতি কি তাঁর বিশেষ কোনও ভালোবাসা ছিল? সোনালির কথায়, ‘একেবারেই না। ভালোবাসা ছিল এক মেকানিকের সঙ্গে। ভালোবেসে ঘর বাঁধলাম দু’জনে। বাড়ি থেকে আপত্তি করল। না মানলে সম্পর্ক ত্যাগ। ব্যস, তখন তো দু’জনেই একে অপরের ভরসা। আমার স্বামীর সঙ্গে দিনরাত কারখানায় কাটাতাম। হাতে হাতে রেঞ্জ, প্লায়ার্স, তার, নাট ইত্যাদি তুলে দিতাম। কোনটা দিয়ে কী সারাচ্ছে খুব নজর করে দেখতাম। সেই থেকেই টুকটাক কাজ শিখতে লাগলাম। তারপর আর দেখে মন ভরত না। তখন হাতেকলমে অর্জিত বিদ্যা কাজে লাগাতে শুরু করলাম। আমার স্বামীর উৎসাহ আর আমার আগ্রহ দুইয়ে মিলে আমি হয়ে গেলাম মহিলা মেকানিক!’
পুরুষতান্ত্রিক একটা পেশায় এসে কাজ করতে অসুবিধে হয়নি? সোনালি বললেন, অসুবিধের পাহাড় জড়ো হয়েছিল প্রথম দিকে। কাস্টমাররা তাঁর উপর ভরসা করতে পারতেন না। ভদ্র হলে তাঁকে দেখেই স্কুটার নিয়ে সটান প্রস্থান করতেন। কিন্তু মুখে কিছু বলতেন না। আবার অনেকে সামনেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেও ছাড়েননি। হাসির খোরাক, ঠাট্টার পাত্র সবই হয়েছেন তিনি। কিন্তু তাই বলে ঘরে বসে থাকেননি। লোকে নাকি মজা করে বলেছেন পুরুষের কাজে আবার কোমল হাত কেন? অবাক হয়েছেন সোনালি। বললেন, ‘ছোট থেকেই শুনতাম ছেলে আর মেয়ের মধ্যে নাকি কোনও বিভেদ নেই। ছেলেদের কাজ আর মেয়েদের কাজ বলে আলাদা কিছু হয় না। অথচ পেশায় এসে দেখলাম নিজেদের এলাকায় মহিলাদের পা পড়লেই পুরুষরা গেল গেল আওয়াজ তোলে। সৌভাগ্য, আমার স্বামী সেই দলে পড়েন না। তিনিই উৎসাহ দিয়ে আমায় কাজ শিখিয়েছেন। তাঁর আগ্রহেই আমি আজ শহরের একমাত্র মহিলা মেকানিক— আমাদের দোকানের কর্মীদের মিস্ত্রি দিদি।’
ইউনাইটেড মিশনারি স্কুলে পড়তেন সোনালি। আব্দুল কালাম (শঙ্কর)-এর সঙ্গে আলাপের সেখান থেকেই সূত্রপাত। বললেন, ‘আমাদের ভাব ভালোবাসা হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। বাড়ি থেকে স্কুলের পথে যেতে একটা বাইক সারানোর দোকান ছিল। শঙ্কর সেখানেই কাজ করত। তখন ও আমার এক বন্ধুর বয়ফ্রেন্ড। আমি ওর গার্লফ্রেন্ডের অন্যতম বন্ধু। তারপর ওদের সম্পর্ক কেটে যায়। ও মুসলিম জেনে আমার বান্ধবীটি আর এগল না। বরং আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্বটা বেড়ে গেল। বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক মেনে নিল না। শেষকালে বাড়ির অমতেই বিয়ে করলাম। প্রচণ্ড সমস্যায় পড়েছিলাম। স্কুলের পড়া শেষ করিনি। চাকরি নেই, সংসার সামলানো দায় হয়ে উঠেছিল। শঙ্করের সঙ্গে কাজ করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। যত কাজ তত টাকা। সেইভাবেই আস্তে আস্তে কাজ শিখেছি। এখন তো এক্সপার্ট হয়ে গিয়েছি। ডাক্তার যেমন রোগী দেখেই অসুখ বলে দিতে পারে আমিও তেমন বাইক দেখেই গলদ ধরে ফেলতে পারি।’ 
বাইক সারানো পেশা হলে নেশা কী সোনালির? হেসে বললেন, গান শুনতে ভালো লাগে। লতা আর আশার গান তাঁর বিশেষ প্রিয়। এছাড়া রান্নাও করেন শখে। বেশ ভালো রাঁধেন তিনি। রোজকার রান্না তো আছে, ছেলেমেয়ের টিফিন তৈরি, স্বামীর খাবার, কর্মচারীদের খাবার ইত্যাদি বানান রোজ। এছাড়াও বিশেষ কিছু পদও রাঁধতে ভালোবাসেন। তবে বাঙালি রান্নাই করেন বেশি। এছাড়া আর একটা শখও রয়েছে। তবে তাকে স্বপ্নই বলা ভালো। ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রী নিয়ে মোটর মেকানিক ট্রেনিং স্কুল খোলার স্বপ্ন দেখেন সোনালি। বললেন, ‘ইচ্ছে আর অধ্যবসায়ের ভরসায় তো অনেকটা দূর এগিয়েছি। দেখা যাক স্বপ্নপূরণ হয় কি না।’ 
রঙিন শাড়ি, হাতে চুড়ি,
ট্রাক মেরামত

তবে কলকাতায় একমাত্র হলেও সোনালি কিন্তু ভারতের একমাত্র মোটর মেকানিক নন। তাঁর পূর্বসূরিও আমাদের দেশেই আছেন। দিল্লির সঞ্জয় গান্ধী ট্রান্সপোর্ট নগর ট্রাক সার্ভিস সেন্টারে গেলেই দেখা পাবেন শান্তি দেবীর। দেশের প্রথম ও একমাত্র ট্রাক মেকানিক তিনি। স্বামী রাম বাহাদুরের সঙ্গে মিলে ট্রাকের মেরামত করেন শান্তি। বললেন, ‘কে কী বলল, কতটা অবাক হল, তাতে আমার বয়েই গেছে। আমি নিজের কাজ করি। মন দিয়ে কাজ করি। তাই আমি সফল মেকানিক। তাই বলে বাড়ির কাজে অবহেলা করেছি ভাববেন না। সেখানেও আমি যথেষ্ট দড়। রান্না করে ঘর গুছিয়ে, সেলাই করে সংসার ও সন্তান মানুষ করেছি। পেশায় আমি ট্রাক মেকানিক। একটা করলে অন্যটা সম্ভব নয়, এমন কথা মানি না।’ 
সঞ্জয় নগর ট্রাকের আড্ডা। মোটামুটি ৭০ হাজার ট্রাকের আনাগোনা সেখানে। সেই জায়গায় যখন শান্তি আর রাম বাহাদুর প্রথম এসেছিলেন তখন তাঁরা কেউ-ই ট্রাক সারানোর কাজ জানতেন না। বরং ট্রাকের আড্ডাখানার এক কোণে নিজেদের একটা ছোট্ট চায়ের দোকান খুলে বসেছিলেন। ট্রাকচালকদের কৃপায় রমরম করে চলতে শুরু করল তাঁদের ব্যবসা। সারাদিন চা বানানোর ফাঁকে ফাঁকে ট্রাক সারানোর কাজটা যে কখন রপ্ত হয়ে গেল রাম বাহাদুরের তা তিনি নিজেও জানেন না। অচিরেই দেখলেন হর্নের তার জোড়া, টায়ার পাল্টানো ইত্যাদি দিব্যি করতে পারছেন। আগ্রহ নিয়ে বাকি কিছু কঠিন কাজও শিখতে শুরু করলেন। বেশ পোক্ত হাতে ট্রাক সারানোর কাজ শেখার পর স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করলেন ট্রাক সারানোর দোকান খোলার জন্য। স্বামীর সঙ্গে সহমত হলেন শান্তিও। এবং চায়ের দোকানের পাশেই চালু হল ট্রাক সারাই কারখানা। প্রথম দিকে ট্রাকচালকরা তাঁর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতেন। একজন মহিলা একা হাতে চায়ের কেটলি নামিয়ে চাও ছাঁকেন আবার স্বামীর পাশাপাশি ট্রাকের ভারী টায়ারও গড়িয়ে গড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যান— চিত্রটা বিশেষ পরিচিত ছিল না তাদের কাছে। এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, বললেন শান্তি। শিক্ষার হাতেখড়ি কি স্বামীর কাছে? শান্তি বললেন, ‘আমার স্বামী যেমন অন্যান্য মেকানিকের কাজ দেখে দেখে ট্রাক সারানোর কাজ শিখেছেন আমি আবার শিখেছি তাঁকে দেখে। আলাদা করে কেউ হাতে ধরে কিছু শেখাননি। বরং হাতে হাতে কাজ করতে করতেই কাজটা শিখে গেছি।’ প্রথম দিকে শুধুই ট্রাকের টায়ার বদলানো জানতেন। তারপর পাংচার সারাতে শিখলেন, তারপর ট্রাকের বডির কাজ এবং সব শেষে ইঞ্জিনের কাজ। এখন দক্ষ ট্রাক মেকানিক হয়ে উঠেছেন শান্তি। তবে বয়স বেড়েছে। তাই ভারী টায়ার গড়ানোর কাজ আর নিজে হাতে করেন না। 
শান্তি বললেন, ‘তিন দশকেরও বেশি এই কাজ করছি, তবু এখনও একজন মহিলাকে ট্রাক সারাতে দেখে অনেকেই অবাক হয়। ভাবে ছেলেদের দুনিয়ায় আমি কী করছি। কিন্তু কাজ তো কাজই। তার মধ্যে পুরুষ নারী বিভেদ হয় না। যেটা করছি তাতে সম্পূর্ণ মন দিতে পারলে সব কাজই সকলের।’         
রঙিন শাড়ি, হাতভর্তি কাচের চুড়ি পরে ট্রাক সারান শান্তি। ট্রাকের আড্ডায় তিনি এখন সবার ‘মাস্টারজি’। স্বামীর তুলনায় তাঁর জনপ্রিয়তাও কিছুমাত্র কম নয়। মাস্টারজির হাতের চায়ের পাশাপাশি ট্রাকের উপর তাঁর ডাক্তারিরও কদর করে সঞ্জয় নগর ট্রাক আড্ডার ড্রাইভার থেকে খালাসি সবাই। পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করলে শান্তি বলেন, ‘ছেলেদের দুনিয়ায় পা রেখেছি বলে সাজগোজ ছেড়ে দিতে হবে? এ আবার কেমন দাবি! তাছাড়া আমি তো চা’ও বানাই, ট্রাক ড্রাইভারদের খাবারেরও জোগান দিই। এই কাজ করতে করতেই আটটা ছেলেমেয়ে মানুষ করেছি। সংসার সামলেছি আবার দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য স্বামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছি। পোশাক মানুষের পরিচয় নয়, বরং কাজই পরিচয়। অনটন এসেছে, দুঃসময় গেছে, কিন্তু হার মানিনি। মনের জোর আর ঘরের মানুষটার উৎসাহই আমার জীবনে চলার পাথেয়।’             

18th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ