বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

আইনি স্বীকৃতি  সত্যিই দেওয়া 
হল কি?

যৌন পেশায় আইনি স্বীকৃতি সত্যিই মিলেছে? এ ব্যাপারে গত কয়েকদিনে সংবাদপত্র শিরোনামে নানা হইচই। যৌনকর্মীদের জন্য এটা সুখবর নিশ্চয়ই। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। আলোচনায় অন্বেষা দত্ত। 

গত ১৯ মে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা ঘিরে তোলপাড় হল সংবাদমাধ্যম। চারদিকে উৎসবের আবহ। কেন? বলা হল, যৌনকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যৌনকর্মীদের কাছেও এ সংবাদ বয়ে আনল আশার আলো।
সুপ্রিম কোর্টের হিসেব বলে, ভারতে এখন অন্তত ন’লক্ষ যৌনকর্মী রয়েছেন। অথচ ‘সভ্য সুশীল’ সমাজের চোখ সেই কর্মীদের অস্তিত্ব খুঁজে পায় কি? ২০২২ সালে পৌঁছে দেশের শীর্ষ আদালত যখন যৌনকর্মীদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার কথা বলল, তখন নড়ে বসল ‘সভ্য’ সমাজ। কেন? তার আগে থেকে তো আমরা জানি, একজন অপরাধী যত বড় অপরাধ করুক, সে খুনি হলেও মানবাধিকার থেকে তাকে বঞ্চনা করা যায় না। যৌনকর্মীরা কি কোনও অপরাধী? না, আইনের চোখে তাঁরা অপরাধী (criminal) নন, তাঁরা নির্যাতিতা (victim)। তাহলে এই পেশার কর্মী যাঁরা, তাঁরা সম্মানের অধিকারী, সুস্থভাবে বাঁচার অধিকারী— এ কথাগুলো ‘সভ্য’ সমাজকে আদালতের বলার প্রয়োজন হয় কেন? বিষয়টা এতটাই গুরুত্বহীন?   
এমন নানা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল আইনের এক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, আদৌ কি যৌন পেশাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট? কথায় কথায় যা জানা গেল, তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট। যৌনকর্মীকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকায় আইনি আশ্বাস অবশ্যই মিলেছে। কিন্তু তা আইনি স্বীকৃতি নয়। বস্তুত এ পেশা ভারতে বেআইনি, এমনটা কোনওদিনই বলা হয়নি আইনে। এ পেশায় যুক্ত থাকলেই তিনি অপরাধী নন। আবার বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এ পেশা ঘিরে আইনের এমন কিছু ধারা-উপধারা রয়েছে, যাতে এ পেশায় আইনি তকমা খুঁজতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়। কেন, সে কথায় পরে আসছি। যাই হোক আইনি আশ্বাস আবার কিছুটা ভরসা দিল, সন্দেহ নেই।
তবে এই আশ্বাস হঠাৎ করে একদিন এল, তা-ও নয়। এর একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০০৭ সালে সোনাগাছিতে এক যৌনকর্মী খুন হন। সেই ঘটনায় নিম্ন আদালতে বুদ্ধদেব কর্মকার নামে এক অভিযুক্তের সাজা হয়েছিল। হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। অভিযুক্ত সুপ্রিম কোর্ট অবধি দৌড়লেও শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়ই বহাল রেখেছিল। সময় গড়িয়েছে। এই ঘটনার সূত্রে ২০১০ সালেই ওই আপিল মামলাকে জনস্বার্থ মামলায় রূপান্তরিত করে সুপ্রিম কোর্ট। তার কয়েক বছর পরে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাতে ছিলেন দু’জন অভিজ্ঞ আইনজীবী। বাইরে থেকে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁদের রিপোর্ট তৈরিতে তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করেছিল। কমিটি সব দিক খতিয়ে দেখে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের কাছে কয়েকটি রিপোর্ট পেশ করে। তার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট কিছু নির্দেশিকা তৈরি করে। অতীতে তার কিছু কিছু জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। ১৯মে আরও কিছু নির্দেশিকা এল। সুপ্রিম কোর্ট জানাল, যতদিন না আইন প্রণয়ন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই সব নির্দেশিকাই আইনের মতো কাজ করবে। তাই এই রায়ে নতুন আইন তৈরি হয়েছে এমন নয়। 
কমিটির সুপারিশ, স্বেচ্ছায় যাঁরা যৌনপেশায় আসছেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাঁরা এ পেশায় রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একটা পার্থক্য করা প্রয়োজন। যদিও তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কের স্বেচ্ছায় যৌন পেশা বেছে নেওয়ার বিষয়টি কিন্তু পরস্পরবিরোধী। অনেক মর্মান্তিক পরিস্থিতি একজনকে বাধ্য করে এ পথে যেতে। কাউকে তাড়া করে দারিদ্র্য, কারও মাথার উপরে ছাদটাই নেই, কারও দু’বেলা খাবার জোটে না, দোরে দোরে ঘুরেও কাজ না পাওয়া। তারপর হয়তো কারও প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে বাড়ি থেকে পাড়ি অনেকটা দূর। একদিন তিনি দেখেন নিজের দেশটাও চলে গিয়েছে পায়ের তলা থেকে। হাত বদল হতে হতে পাচার হওয়া মেয়েটির গায়ে ‘যৌনকর্মী’র তকমা লেগে যায় কখন, তিনি নিজেও জানতে পারেন না। তাঁর ইচ্ছের খোঁজ রাখে কে? তাঁর সম্মানের জন্য ভাবতে হয় আইন-আদালতকে। কারণ ‘সভ্য’ সমাজ তাঁর অস্তিত্ব টের পায় না। তাঁরা শুধু আছেন আড়ালে, পেট চালানোর জন্য অসম্মানের বোঝা কাঁধে নিয়ে।   
শীর্ষ আদালতকে আলাদা করে প্রশাসন-পুলিশকে বলতে হচ্ছে যৌনকর্মীদের সম্মানের সঙ্গে দেখবেন— এ যেন এ অভাগা দেশেই সম্ভব। সব পেশার মানুষই সম্মান পাবেন, এটাই প্রত্যাশিত। না, বাস্তবে যৌনকর্মীদের সঙ্গে তা হয় না। তাই শীর্ষ আদালতকে পুলিশের উদ্দেশে বলতে হয়, জুলুম করে যৌনকর্মীদের কাছ থেকে টাকা চাওয়া, যৌন হয়রানি, গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে। যৌনকর্মীদের শিশুদের মায়ের কাছে রাখতে হবে। কিন্তু সুস্থ পরিবেশ না পেলে তার সামগ্রিক বিকাশ কীভাবে হবে, তা কেউ জানে না। এমন শিশুকে মূলস্রোতের স্কুল ঠাঁই দেয় না, তার জন্য তোলা থাকে আর এক লড়াই। 
আমাদের দেশে আইন চোখে আঙুল দিয়ে কিছু দেখানোর পরেও আমরা দেওয়ালে পিঠ না ঠেকলে কিছু করতে চাই কোথায়? তাই আইন-আদালত যত বেশিবার সক্রিয় হয়, ততই মঙ্গল। অন্তত যৌনকর্মীদের কারণে অকারণে কোণঠাসা করার অভ্যাসটা হয়তো বা একটু হলেও ধাক্কা খায়।
 এবার আসা যাক বেআইনি না হয়েও কেমন করে একটি পেশা কার্যক্ষেত্রে ‘বেআইনি’, সে প্রসঙ্গে। ভারতীয় পিনাল কোড ও ১৯৫৬ সালের ইমমরাল ট্রাফিক (প্রিভেনশন) আইন অনুযায়ী, যৌনপেশার আওতায় থাকা বেশ কিছু কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেমন যৌনকর্মীর জন্য দালালি, যৌনপেশা চালানোর জন্য বাড়িঘর ভাড়া দেওয়া এবং শিশুদের যৌন পেশায় নিয়োগ করা ইত্যাদি এর মধ্যে পড়ে। যৌনকর্মী কি এই বাস্তব বাদ দিয়ে বাঁচেন? সংবাদমাধ্যমের হিসেবে সারা দেশে এখন অন্তত ৩০ লক্ষ যৌনকর্মী রয়েছেন (যদিও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, সারা দেশে ৯ লক্ষ যৌনকর্মী রয়েছেন)। এই সংখ্যার দ্বন্দ্ব এই কারণেই যে যৌনকর্মীদের ‘নাগরিকত্ব’-এর হিসেবটাও অনেক কিছুর মতোই ঝাপসা। একটা বড় অংশের হিসেবই নেই। কেন? পাচার হওয়া মহিলাদের একটি বড় অংশ আসেন প্রতিবেশী দেশ যেমন, নেপাল, বাংলাদেশ বা মায়ানমার থেকে। ভারত এক্ষেত্রে অন্যতম গ্রাহক এবং সরবরাহকারী। এদের ভোটার কার্ড বা রেশন কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়। যাতে তাঁদের কিছুটা সুরাহা হয়। কিন্তু এদেশের নাগরিকত্ব আইনে কীভাবে তাঁরা তা পাবেন? সব মিলিয়ে একটা চূড়ান্ত প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। পাচার হওয়া মানুষের হাতে জন্মশংসাপত্র থাকে কি? আইনের কর্তারা এব্যাপারে কী বলবেন? যৌনকর্মীদের নিয়ে তাই সরকারি গণনাতেও ত্রুটি থেকে যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উপরেই নির্ভর করতে হয়। আলাদা করে যৌনকর্মীদের জনগণনা হয় কি না জানা যায় না।
নাগরিকত্ব দিয়ে এর সমাধান ১৩৮ কোটির দেশে হয়তো অসম্ভব। শুধু জনসংখ্যা নয়, আর্থ-সামাজিক-ভৌগোলিক অবস্থানও দায়ী। কম জনসংখ্যার জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডসের মতো বেশ কিছু দেশে যৌনপেশা আইনে স্বীকৃত। যৌনকর্মীরা মৌলিক অধিকার পান সেখানে। আমাদের দেশে অন্তত সেটুকু হোক।
শীর্ষ আদালত যখন কিছু বলে, গোটা সমাজ তা নিয়ে ভাবে। আইন প্রণয়ন হতে যত সময়ই লাগুক, মনে করা যাক ততদিন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের এক একটা পদক্ষেপ সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক একটা নুড়ি পাথর। আইন দিয়ে সভ্যতার শুরু হয়নি, আইন দিয়ে সভ্যতার শেষও হয় না। কিন্তু সভ্যতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইন অনুঘটকের কাজ করে।

11th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ