বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

মায়ের যত্ন নিন

কমলিনী চক্রবর্তী: ‘পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রমজীবী মানুষ হলেন ‘মা’। কর্মবিরতি নেই, মজুরি নেই, দাবি নেই, শর্ত নেই, স্বার্থ নেই, তিনি শুধু নিঃস্বার্থ শ্রম দিতেই জানেন!’ 
১ মে, শ্রমিক দিবসে মায়ের শ্রম নিয়ে এমন আরও দু’একটা মেসেজ ঢুকেছিল বটে হোয়াটসঅ্যাপে। ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো তাই! আগামিকাল মাদার’স ডে। এই তথাকথিত ইঙ্গো সংস্কৃতিটা বহু যুগ আগে থেকেই বাঙালি বাড়ির ঘরে ঘরে দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার তাই বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষেই মাদার’স ডে পালনে মেতে ওঠেন। 
তখন আমি সদ্য বিবাহিত। মাতৃত্বের স্বাদ তখনও শরীর ও মন জুড়ে হিল্লোল তোলেনি। এমন সময় এক বন্ধুর সন্তান হওয়ার খবর পেয়ে মা ও শিশুকে দেখতে গিয়েছিলাম হাসপাতালে। বন্ধুকে প্রশ্ন করলাম, কেমন লাগছে? ও উত্তর দিয়েছিল, খুব সম্পূর্ণ লাগছে নিজেকে। পরবর্তীতে নিজের শিশুকন্যাটিকে কোলে নিয়ে যখন সেই একই সম্পূর্ণতা অনুভব করি রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তখন বারবার সেই বন্ধুটির কথা মনে পড়ছিল। 
সম্প্রতি এক প্রতিবেশীর জন্মদিনে গিয়ে দেখি তাঁর মনখারাপ। জন্মদিনে মনখারাপ কেন? একমাত্র কন্যাটি দিল্লিতে কলেজে। মেয়েকে ছাড়া এটাই তাঁর প্রথম জন্মদিন। মন যে খারাপ হবে তা তো বলাই বাহুল্য। অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া পেয়ে বসল আমাকে। আনন্দের রং ম্লান হল। সত্যিই তো সন্তানের অনুপস্থিতিতে সবই যে বড্ড ম্যাড়মেড়ে, প্রাণহীন। প্রায় দুই দশক আগের একটা বৈশাখী সন্ধ্যার কথা মনে পড়ল। সেদিন ছিল মায়ের জন্মদিন। আমি তখন কলকাতার বাইরে। সকাল থেকে সাতকাজে মায়ের সঙ্গে কথা হয়নি। একটা কেঠো মেসেজে প্রণামটুকু জানিয়েছিলাম শুধু। সন্ধেবেলা সব কাজ সেরে মায়ের জন্মদিনের কথা আবারও মনে পড়তেই জাঁক করে ফোন করলাম বাড়ির ল্যান্ড লাইনে। ‘হ্যাপি বার্থ ডে মা! আমার প্রণাম নিও...।’ সেদিন আমার গলার স্বরের প্রচণ্ড উত্তেজনায় মায়ের অস্ফুট অবসাদ মাখা, ‘তুই আমার ভালোবাসা নিস...!’ –এ চাপা পড়ে গিয়েছিল। আমার প্রতিবেশীর জন্মদিন ও মনখারাপ দেখে অতগুলো বছর পিছিয়ে গিয়েছিলাম স্মৃতির সরণি বেয়ে। একইসঙ্গে আবার আগামীর আশঙ্কায় মনটা কেমন হু হু  করে উঠল। নিজের ছোটখাট মনখারাপগুলো চেপে রেখে হাসিমুখে থাকাই বুঝি সর্বকালের মায়েদের ভবিতব্য। 
এমন টুকরো টুকরো কত কথায় যে উপচে যাচ্ছে মন। কিছু আগের ঘটনা, কিছু বা পরবর্তীর ভাবনা। আর মাদার’স ডে সেইসব স্মৃতি ঘিরে মুহূর্ত তৈরির দিন। মাতৃত্ব উদ্‌যাপনের দিন। সারাটা বছর যিনি হাসিমুখে, অকাতরে স্নেহ আর ভালোবাসায় মুড়ে রাখেন আমাদের, তাঁকে সেলিব্রেট করার জন্য একটা মাত্র দিন অবশ্যই বড্ড ফিকে। তবু এই একদিন দিয়েই না হয় শুরু করা যাক মাতৃত্বের উদ্‌যাপন। তেমনই কিছু পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞরা।
‘মাদার’স কেয়ার’ সংস্থার থেরাপিস্ট ডঃ অপর্ণা সিংঘানিয়া জানালেন, নিজের জীবন দিয়ে মায়ের যত্ন নিতে। বিষয়টা আর একটু বিশ্লেষণ করে দিলেন তিনি। বললেন, ‘আমরা যে ধরনের সামান্য কাজে আনন্দ পাই, সেগুলোতেই ওই একটা দিন মাকেও সামিল করে নিন। যেমন ধরুন আপনি হয়তো গান শুনতে ভালোবাসেন। মাদার’স ডে-তে মায়ের মনের মতো একটা গান শোনার কিছু উপহার দিন তাঁকে। হয়তো ওয়ার্ড গেমস বা অন্য কোনও বোর্ড গেম খেলা আপনার নেশা। মাকেও সেই খেলা শিখিয়ে নিয়ে তাঁকে খেলার সঙ্গী করে নিন। মনে রাখবেন কোনও বাহ্যিক উপহারে যে মা খুশি হবেন, তা কিন্তু নয়। বরং আপনার জীবনের অংশ হয়ে ওঠাই তাঁর কাছে অনেক বেশি আনন্দের।’ নিজের জীবনের একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেন অপর্ণা। তিনি তখন তারুণ্যে পা দিয়েছেন। একটু একটু করে মায়ের মুঠোখানা আলগা হতে শুরু করেছে। বন্ধুবান্ধব ঘিরে জীবনটা বেশ খানিকটা ভিন্ন পথে যাত্রাও করেছে অনায়াসে। নতুন ভালোলাগা তৈরি হয়েছে, গড়ে উঠেছে নিজস্ব পছন্দ। এমনকী শখ আহ্লাদ সবকিছুতেই একটা নিজস্বতার তকমা লেগেছে। মায়ের শেখানো জিনিসগুলো ক্রমশ পুরনো হতে শুরু করল। আর সেইসঙ্গেই জং ধরল মায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বেও। মায়ের হাত ধরে বাগান করা, ঘরসাজানো তখন সবই বড্ড বোরিং। ক্রমশ বয়স বাড়ল, সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ল বিবেচনা বোধ। তাঁর মনে হল নিজের শেখা নতুন পছন্দ অপছন্দগুলো মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিলে কেমন হয়? মা যে কোনও কিছুই সহজে গ্রহণ করতে পারতেন। মেয়ের হাত ধরে তিনিও হয়ে উঠলেন আধুনিক। সাজগোজ থেকে ইন্ডোর গেমস সবই রপ্ত হয়ে উঠল তাঁর। এখন মা বৃদ্ধা, মেয়ে শেষ যৌবনে দাঁড়িয়ে। একে অপরের ভালোলাগা আর পছন্দগুলো নিয়েই দিন কাটান দু’জনে। কোনও ভালো সিনেমা দেখলে বা নতুন কোনও বই পড়লে মাকে বলেন সে কথা। এমনকী, গুরুমারা বিদ্যায় এখন মেয়েকেই নাকি সুডোকু খেলায় বলে বলে হারিয়ে দেন মা! 
সন্তানের ছত্রচ্ছায়ায় মায়ের আধুনিক হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে একটা গল্প বললেন ‘কেয়ার স্পট জিরান্টোলজিকাল ক্লিনিক’-এর থেরাপিস্ট রঞ্জনা সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, মোবাইল ফোন যখন প্রথম এল, তখন সকলেই বোতাম টেপা ফোনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। স্মার্টফোনের রমরমা যতদিনে বেড়ে উঠল ততদিনে তাঁর এক ক্লায়েন্ট প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গিয়েছেন। নিজে থেকে নতুন কিছু শেখা আর তাঁর হয়ে ওঠে না। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার রাজত্বে অংশীদার হতে না পেরে বেশ একটু মনখারাপই লাগে তাঁর। বিভিন্ন আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না। আধুনিক প্রজন্মে ব্যবহৃত অর্ধেক শব্দ তাঁর ল্যাটিন মনে হয়। ক্রমশ নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি পারিবারিক আড্ডা, জমায়েত ইত্যাদি থেকে। একটা অচেনা অবসাদ গ্রাস করছিল তাঁকে। এমন অবস্থায় ওই ভদ্রমহিলার উদ্বিগ্ন কন্যাকে রঞ্জনা পরামর্শ দেন মাকে আধুনিক করে তোলার জন্য। বলেন, ধৈর্য রেখে তাঁকে স্মার্ট ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। প্রৌঢ়া এখন রীতিমতো টেক-স্যাভি। অবসাদ ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। 
মাদার’স ডে-র বিশেষ যত্নের তালিকায় এবার উপস্থিত তুলনামূলক কমবয়সি মায়েরা। তাঁরা তো ঘরে বাইরে চূড়ান্ত ব্যস্ত। তাই তাঁদের জন্য চাই অন্যরকম যত্ন। যেমন, তরুণী কন্যা তিন্নি তার সদ্য পঞ্চাশ পেরনো মায়ের জন্য প্রতিবছর মাদার’স ডে-তে নানারকম চমকের আয়োজন করে। আগামিকাল সে মাকে নিয়ে বাড়ির কাছাকাছি একটা কাফেতে সান্ধ্যভোজে যাবে। আগে থেকে অর্ডার দিয়ে মায়ের জন্য একটা কাস্টমাইজড ট্রুফল কেক আর কাস্টমাইজড কফির আয়োজন করে রেখেছে। পরিবেশন করার সময় কফি ফোটোজেনিক-এর উপর ভেসে থাকবে তার মায়ের উজ্জ্বল হাসিমুখখানি। আর ট্রুফল কেকের ওপর বাংলায় আইসিং করে লেখা থাকবে— ‘ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে’।  আঠারো বছরের মধুরা এবার মাদার’স ডে-তে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মায়ের জন্য নানারকম খাবারের আয়োজন করেছে। রোম্যান্স নভেল পড়ে এক্কেবারে ‘ইংলিশ কালচার’ রপ্ত করে ফেলেছে মধুরা। তাই মায়ের যত্ন শুরু হবে ‘ব্রেকফাস্ট ইন বেড’ দিয়ে। তাতে কফি, চিজ টোস্ট, স্ক্র্যাম্বলড এগ আর বার-বি-কিউ সসেজ থাকবে। এরপর বেলা ১১টা নাগাদ থাকবে একটা বিশেষ পানীয়। গরমে পুদিনা, আদা কুচি আর লেবুর রস দিয়ে তৈরি এই পানীয় খুবই রিফ্রেশিং বলে জানাল মধুরা। এরপর লাঞ্চ মেনুতে পোলাও আর মাংস। এবং ডিনারে মিন্স মিট শেফার্ড’স পাই আর চিজ কেক। সময় পেলে বৈকালিক কিছু একটা বানিয়ে ফেলতেও পারে সে। মধুরার কথায়, ‘আমার মা নানারকম বিদেশি রান্নার বই পড়েন, শো দেখেন, কিন্তু নিজে খুব একটা রান্না করতে পারেন না। তাই মায়ের ওইসব বই থেকে রেসিপি ট্রাই করে মাকেই চমকে দেব বলে ঠিক করেছি।’ মধুরার বন্ধু ঋষি আবার মাদার’স ডে-তে মায়ের সঙ্গে নতুন মুহূর্ত তৈরি করতে ভালোবাসে। আর প্রতি বছরই মুহূর্তগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয়। কোনও বছর বাইরে খেতে যায় মাকে নিয়ে, কোনও বছর সারাটা দিন শুধু‌ই মায়ের পছন্দের বই পড়ে শোনায় মাকে, কোনও বছর আবার গিটার বাজিয়ে গান শুনিয়ে কেটে যায় তার মাদার’স ডে। এবছর কী হবে সেটা আগে থেকে বলা মুশকিল। কিন্তু নতুন কিছু একটা হবেই, বলল ঋষি। ঋষির মা ভালো গান করেন। তাঁর গাওয়া কিছু গান রেকর্ড করেছিল একবার। সঙ্গে সেই গানগুলো গিটারেও তুলেছে।  সব মিলিয়ে একটা পেনড্রাইভ বানিয়েছে ঋষি। মাদার’স ডে-র উপহার।          
ঘটনাগুলো হয়তো ছোট, উপহারগুলোও সাধারণ। কিন্তু সেগুলো দিয়েই তৈরি হয় অমূল্য কিছু মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তগুলোর সাহায্যেই আমাদের জীবনের খুঁটিনাটিতে, প্রতি পদে মাকে জড়িয়ে রাখুন। ঠিক যেমন মা আপনাকে রেখেছেন শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত।

7th     May,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ