বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

শাড়িবৈচিত্র্যে ওড়িশা

গরমে পরার মতো আরামদায়ক সুতির শাড়ির নানা রকম চারূপমার পাতায় প্রকাশিত হয়েছে আগেও। এবার সেই সিরিজে নতুন সংযোজন প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার সুতির শাড়ি। লিখেছেন অন্বেষা দত্ত।  

সে ১১০০-১২০০ শতকের কথা। গীতগোবিন্দের কবি জয়দেব তাঁর সৃষ্টি উৎসর্গ করেছিলেন জগন্নাথদেবকে। শুধু পুঁথির পাতায় নয়, কেঁদুলি গ্রামের তাঁতিদের হাতে কাপড়েও বোনা হয়েছিল গীতগোবিন্দম। সেই কাপড় দেখে পুরীর তৎকালীন রাজা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি পাট্টায় (সিল্ক) বোনা গীতগোবিন্দ চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। 
‘ওড়িশার শাড়ি নিয়ে কথা বলতে গেলে এই গপ্পটা অবশ্যই জানা উচিত সকলের,’ বলছিলেন টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ জয়িতা সেনগুপ্ত। জানা-অজানায় চার-পাঁচরকম শাড়ির কথা উঠে এল তাঁর সঙ্গে আলোচনায়। 

কোটপাড
ততটা না-শোনা শাড়ির তালিকায় পড়বে ওড়িশার আদিবাসী ঐতিহ্যের অঙ্গ এই সুতির শাড়িটি। কোরাপুট জেলার গ্রাম কোটপাড, গ্রামের নামেই শাড়ি। ভেজিটেবল ডাই করা এই ফ্যাব্রিক কোটপাডের মিরগান সম্প্রদায়ের আদিবাসী তাঁতিরা হাতে বোনেন। এই প্রাকৃতিক ডাই আবার তৈরি হয় ওই অঞ্চলের মাদার গাছ থেকে। এখান থেকে রঙের মধ্যে মূলত বের করা হয় কালো আর মেরুন। গাঢ় মেরুন থেকে ঘন খয়েরি— ডাইয়ে কেমন রং আসবে তা নির্ভর করে গাছের ছাল ও মূলের বয়সের উপর,   কতটা ডাই এবং কতটা আয়রন সালফেট ব্যবহার হচ্ছে তার উপর। এই সব রং এরপর অফহোয়াইট সুতির সুতোর সঙ্গে মিশে তৈরি হয় ম্যাজিক। 
ওড়িশার এই শাড়িই প্রথম জিআই (জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন অব ইন্ডিয়া) ট্যাগ পায় ২০০৫ সালে। এ শাড়ির মাহাত্ম্য এর অর্গানিক ডাইয়ে। মোটিফগুলো তৈরি হয় স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির মধ্যে থেকেই। যার মধ্যে আছে শাঁখ, নৌকা, কুঠার, কাঁকড়া, ধনুক, মন্দির, মাছ আর পাখা। সুতির সুতো, তসর সিল্ক আর মাদার গাছের মূল হল এই টেক্সটাইলের মুখ্য উপাদান। বিভিন্ন রঙের সুতো ডাই করতে সময় লেগে যায় ১৫-৩০ দিন। শুধু শাড়ি নয়, কোটপাডের শালও বেশ নজরকাড়া। শাড়ি গরমে আর শাল শীতে, এমনই সুন্দর ফ্যাব্রিক কোটপাড। প্রাকৃতিক ডাই থেকে তৈরি বলে ত্বকের জন্যও ক্ষতিকারক নয়। বলা যায় সীমাবদ্ধতা শুধু রঙের বৈচিত্র্যে। তা না হলে এমন পরিবেশবান্ধব চোখজুড়ানো কাজে ভরা শাড়ির তুলনা হয় না।      

ডোংরিয়া
ওড়িশার আর এক উপজাতিভুক্ত সম্প্রদায় ডোংরিয়া কোন্ধ। রায়গড় এবং কালাহান্ডি জেলা অধ্যুষিত নিয়মগিরি পাহাড়ে তাঁদের বাস। এ শাড়ির নামে ডোংরিয়া থাকলেও মজার কথা হল ডোংরিয়া কোন্ধরা এ শাড়ি বোনেন না। এ শাড়ির আঁচলে যে নকশা পাওয়া যায়, তা আদতে ছিল কটন শালের নকশা। যে শালে কোন্ধরা নিজে হাতে সুন্দর এমব্রয়ডারি কাজ করে থাকেন। এই এমব্রয়ডারি ক্রমশ এত জনপ্রিয়তা পায় যে ওড়িশার অন্য অংশের তাঁতিরা এই নকশায় শাড়ি বুনতে শুরু করেন। ডোংরিয়া কোন্ধরা তাঁদের ঈশ্বর, পাহাড় এবং ঝরনার প্রতি অসম্ভব শ্রদ্ধাশীল। শাড়ির আঁচলে যে যে রং বেছে নেওয়া হয়, তা তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শাড়িতে থাকা ত্রিভুজ পাহাড়ের দ্যোতক, যা কোন্ধদের অন্যতম জীবনরেখা।  

হাবাসপুরী
এ শাড়িও কালাহান্ডি ও তার আশপাশের  অঞ্চলে বোনা হয়। কালাহান্ডিরই একটি গ্রাম হাবাসপুর। এখন অবশ্য চিচেইগুড়া গ্রামেও বোনা হচ্ছে এসব শাড়ি। এগুলো প্রথম দিকে মোটা সুতির শাড়ির মতো ছিল, আদিবাসীরাই বুনতেন। ক্রমে ক্রমে সময়ের ব্যবধানে  ফাইন কটন এবং সিল্কে বোনা হচ্ছে হাবাসপুরী। এ শাড়ির মোটিফে ফুল, মাছ আর কচ্ছপ সহ নানা পশুর সমাহার। আর সেগুলো ঘেরা থাকে দাঁতি দিয়ে। শাড়ির বর্ডারেও এই সব মোটিফ থাকে কখনও কখনও। এছাড়া বর্ডারে থাকে মন্দিরের নকশা। ওড়িশার সব শাড়িতেই মন্দির ঘুরেফিরে আসে, কারণ জগন্নাথদেবকে উৎসর্গ করে পুরো ভাবনাটাই আবর্তিত হয়, জানালেন জয়িতা। এ শাড়িতেও স্থানীয় প্রাকৃতিক সামগ্রী ব্যবহার করা হয় সুতো রং করার জন্য। অনেক সময় ডাই ছাড়া কটন সুতো এমনি ফেলে রাখা হয়। তাতে একটা ধূসর মতো শেড আসে। এমনিতে মোটামুটি চেনা চার-পাঁচটি রং ব্যবহার করা হয় হাবাসপুরীতে। মিউটেড বা মরা-মরা ভাব থাকে রঙে, সেটাই এ শাড়ির আভিজাত্য। বেজ, কালো, ধূসর এবং লালে এ শাড়ি বেশি দেখা যায়। তবে উজ্জ্বল রঙেও আজকাল হাবাসপুরী দেখা যাচ্ছে। এ শাড়ির আবার চারটি ধরন— কিং হাবাসপুরী, কুইন হাবাসপুরী, প্রিন্স হাবাসপুরী এবং মিনিস্টার হাবাসপুরী। কেন এমন নাম? জয়িতা বললেন, শাড়িতে কতটা পরিমাণ নকশা রয়েছে এবং তার মান কেমন, তার উপর নির্ভর করে এই শ্রেণিভেদ তৈরি হয়েছে। 

গঞ্জাম বোমকাই
গঞ্জাম জেলার পত্রপুরের চিলকিটির কাছে ছোট্ট গ্রাম বোমকাই। সেখান থেকে তৈরি হয় গঞ্জাম বোমকাই। কবিরাজ নায়েক ছিলেন এ শাড়ির একমাত্র উইভার। তাঁর স্ত্রী সবিতাও কাজে সঙ্গ দিতেন সমানতালে। একটি শাড়ি বুনতে লেগে যায় ২০ দিনেরও বেশি। এ শাড়িতে কাজের জন্য বেশ কয়েকবার জাতীয় পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন কবিরাজ নায়েক। তাঁর অবর্তমানে সেই কাজ নিরলস করে চলেছেন সবিতা। সঙ্গে রয়েছে গঞ্জাম জেলারই পদ্মনাভপুর ক্লাস্টার। অরিজিনাল বোমকাই বলতে একসময় এই বোমকাইকেই বোঝাত। পরবর্তীকালে পশ্চিম ওড়িশায় অন্য স্টাইলে বোমকাই বোনার চল শুরু হয়। এই চারটি শাড়ি ওড়িশার অন্যতম বিশেষত্ব। 
এছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই পরিচিত এবং জনপ্রিয় শাড়ির মধ্যে রয়েছে বিচিত্রপুরী, সাধারণ বোমকাই, সিঙ্গল কটকি বা ডবল কটকি এবং সম্বলপুরী শাড়ি। বিচিত্রপুরীও ওড়িশার হ্যান্ডলুম শাড়ি। বারগড়ের তাঁতিদের হাতে তৈরি বিচিত্রপুরী শাড়ির বডিতে থাকে ইক্কত পাশাপল্লি মোটিফ। সঙ্গে বর্ডারে থাকে মাছ, রুদ্রাক্ষের মোটিফ। এ শাড়িকে বন্ধকালা (কেউ কেউ বলেন বান্ধা) শাড়িও বলা হয়।
সম্বলপুরী শাড়িতে থাকে শাঁখ, চক্র, ফুল ইত্যাদি মোটিফ। রঙে ওড়িশার আঞ্চলিক লাল কালো সাদার প্রাধান্য থাকে। প্রভু জগন্নাথের মুখের রঙের সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানেও টাই-ডাইয়ের মধ্যে তাঁতির সুচারু হাতের কাজ দেখতে পাওয়া যায়। এতে সুতো প্রথমে টাই-ডাই করে তারপরে ফ্যাব্রিক তৈরি করা হয়, গোটা কাজে লেগে যায় কয়েক সপ্তাহ। বলা হয়, ওড়িশার বাইরে এ শাড়ির জনপ্রিয়তা বেড়েছিল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে। উনি পরতেন এ শাড়ি। ৮০-৯০-এর দশকে সারা দেশে তাই বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এ শাড়ি।
হাবাসপুরী শাড়ির ছবি সৌজন্য: তারিণী অফিশিয়াল। 

28th     May,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ