বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

স্নানবিলাসে রূপটান

স্নান মানেই শুধু সাবান শ্যাম্পু নয়। আধুনিক নানাবিধ স্নান সামগ্রী রয়েছে। সেসবের ব্যবহারে ভীষণ গরমেও ফুরফুরে থাকা যায়। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বিউটি থেরাপিস্ট শেহনাজ হুসেন-এর সঙ্গে কথা বললেন কমলিনী চক্রবর্তী।  

লস অ্যাঞ্জেলেসের পাঁচতারা হোটেলের প্রাসাদোপম সুইট। বাথরুম-বিলাস অন্তহীন সেখানে। কাচের দেওয়ালের ওধারে সুবিশাল বাথটাব। সাদা পোর্সেলিন এতটাই ঝকঝকে যে মুখও দেখা যায় তাতে। কিন্তু তা ফেনায় ঢাকা। আর গলা পর্যন্ত সেই ফেনিল আস্তরণে নিজেকে মুড়ে রেখেছেন হলিউড তারকা জুলিয়া রবার্টস। গান শুনছেন, সুর ভাঁজছেন আপন মনে। তিনি তখন স্নানে মগ্ন। ‘প্রিটি উইম্যান’ ছবির স্নান দৃশ্যটি মনে পড়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই এতক্ষণে। বিদেশি বাহুল্য শুধু নয়, স্নান মাহাত্ম্যের নানা উদাহরণ দেশেও পাবেন।  
দেশজ সেই স্নান-কাহিনির সূত্রপাতটা একটু রাজকীয়ভাবেই করা যাক। বেশ কয়েক যুগ আগের এক ভারতীয় চিত্র কল্পনা করে নিন। ঋতুবিশেষে রানিদের অন্দরমহলের অলস দিনগুলো অনেকক্ষেত্রেই শুরু হতো স্নানের অবসরে। চারদিকে দুর্গের সুউচ্চ প্রাচীর। আর তার মাঝখানে খোলামেলা স্নানাগার। একান্ত অবসরে রাজা-রানির প্রেমলীলার ক্ষেত্র, না হলে রানিদের রোজকার বিনোদন কেন্দ্র। একটু আরাম আর সামান্য আহ্লাদ যেখানে তাঁদের নিত্যসঙ্গী। দাসীদের নিয়ে প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন। খোলা আকাশের নীচে রঙিন দুপুর যাপনের অখণ্ড অবসর। যেখানে সখী দাসীদের হাসি-কলরবের মাঝে রাজরানির নিশ্চিন্ত স্নান। আশপাশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রসাধনী সাজানো। হলুদ, চন্দন, কুমকুম, গোলাপের পাপড়ি, ঘৃতকুমারী তৈল, সুগন্ধি আতর জল, মখমলের লুফা, রেশমি গা-মোছা আরও অনেক কিছু। সেইসব উপাদানের এক একটির এক একরকম গুণ। কোনওটা কোমল ত্বকে জেল্লা আনে, কোনওটায় বা গায়ের রং পরিষ্কার হয়। আবার কোনও এক সামগ্রী হয়তো শুধুই সুগন্ধ বিস্তারের কাজে লাগে। 
রাজকীয় পরিবেশ ছাড়ুন। দৃশ্যপট চটপট বদলে ফেলে চোখ রাখুন আধুনিক নারীর ব্যস্ত জীবনের অন্দরমহলে। যুগ বদল আর সামাজিক পরিবর্তনের পরেও কিন্তু মহিলাদের স্নানবিলাসে এতটুকুও ফাঁক পড়েনি। তবে পাশ্চাত্য প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো প্রাকৃতিক উপাদানগুলো খানিকটা কৃত্রিম হয়েছে। কিন্তু তাতে স্নানের মহিমা একটুও কমেনি। প্রখর গ্রীষ্মের দহন দিনে একটু আরাম খুঁজতে এখনও আমাদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আর প্রাণের সেই আরামই আনে শরীরের সতেজতা। 
স্নান সামগ্রীর বদল হয়েছে বিস্তর। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গেই এসেছে ইঙ্গো নামকরণ। বাবল বাথ, বাথ সল্ট, বাথ ফোম, বডি লুফা, বডি সিরাম, স্ক্রাবিং সোপ— সবই নব কলেবরে এখনকার টিপটপ স্নানকক্ষে উপস্থিত। এইসবের ব্যবহার ও উপকার কিন্তু ভিন্ন। ঋতু অনুযায়ী একএকটা একএক সময় ব্যবহার্য। 
রোজ চাই বাথ অয়েল
সুগন্ধি বাথ অয়েল কয়েক ফোঁটা জলে ফেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। তেলে জলে মিশ না খেলেও জলের সঙ্গে সুগন্ধি এই তেলের নির্যাস মিলেমিশে একাকার হবে। তারপর সেই জলে স্নান করলে দেখবেন একটা স্পা-এর ফিল পাচ্ছেন। সুগন্ধের আবার নানারকম। লেমন, রোজমেরি, সেডারউড, ল্যাভেন্ডার, তুলসী আরও হরেক এসেন্স। শুধু‌ই ঩যে স্নানের আরাম তা নয়, আরও বিভিন্ন উপকারিতাও রয়েছে। ত্বকের উজ্জ্বলতা  বাড়বে। সুগন্ধি তেল মিশ্রিত জল গায়ে ঢালার পর একটু মাসাজ করে নিন। ত্বকের ভিতর থেকে তা পরিষ্কার করবে। এছাড়া নিয়মিত মাসাজের ফলে রক্ত চলাচল উন্নত হবে। এতে গাঁটে গাঁটে ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যন্ত্রণা কমে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে আবার ত্বকের কোনও ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন থাকলে তাও এই অয়েল মাসাজে কমতে পারে। এক একটি সুগন্ধের এক একরকম কাজ। প্রখর গ্রীষ্মের দহন দিনের জন্য যেমন সাইট্রাস সুগন্ধ উপযুক্ত। এতে একটা বাড়তি সতেজতা আসে। রোজমেরির গুণের অন্ত নেই। সতেজ সুগন্ধের পাশাপাশি তা আবার ত্বক ময়েশ্চারাইজও করে। আবার ল্যাভেন্ডার অয়েল আমাদের স্নায়ু শান্ত করে। তুলসীর নির্যাসে ত্বক নরম হয়। 
বিউটি থেরাপিস্ট শেহনাজ হুসেন বলেন, ‘স্নানের জলকে একটু সুগন্ধি করে নিতে পারলে স্নান আরও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। যাঁদের খুব তৈলাক্ত ত্বক তাঁরা অনেক সময় তেল ব্যবহার করতে চান না। সেক্ষেত্রে স্নানের জলে কয়েক ফোঁটা কোলন ফেলে দিন। একইরকম আরাম পাবেন। গ্রীষ্মের জন্য চন্দনের সুগন্ধযুক্ত কোলন বিশেষ উপকারী। কোলনের নিজস্ব কিছু কুল্যান্ট রয়েছে। গরমে তাই কোলন খুবই উপকারী।’ 
বাথ সল্ট 
এবার একটু বাথ সল্টের কথা বলি। শেহনাজ বললেন, ‘বাথরুমে যদি বাথটাব থাকে তাহলে তো কথাই নেই। বাথটাবের টলটলে ঠান্ডা জলে একমুঠো বাথ সল্ট ফেলে স্নানের মজাই আলাদা। এটা যেন পরিপূর্ণ একটা ‘বেদিং এক্সপিরিয়েন্স’।  কিন্তু সকলের হয়তো সেই বিলাসিতার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে স্নানের বালতি দিয়েই কাজ চালাতে হবে। জলটা একটু আগে থাকতে ভরে রাখুন বালতিতে। তারপর ছোট চামচের এক চামচ বাথ সল্ট তাতে ফেলে দিন। একটুক্ষণ রেখে জিনিসটাকে থিতিয়ে যেতে দিন। তারপর স্নান করুন। এতে মাসকুলার টেনশন কমে। এই সামগ্রী মাসল রিল্যাক্সেশনে সাহায্য করে। এছাড়া সারাদিনের তেল ঘামে শরীরে যে টক্সিক পদার্থ জমা হয় তাও একেবারে নির্মূল করে ধুয়ে সাফ করে দেয় জলে মেশানো বাথ সল্ট। স্নান হয়ে ওঠে আরও আরামদায়ক।’ বাথ সল্টের ব্যবহারে স্নানের পর নিজেকে আরও তরতাজা লাগে। একেবারে রিফ্রেশিং অভিজ্ঞতা, জানালেন শেহনাজ।
বাথ সিরামে ত্বক তাজা
স্নানের তৃতীয় সামগ্রীটি হল সিরাম। মুখে এবং চুলে তো সিরাম ব্যবহার করেন নিশ্চয়ই। কিন্তু ত্বকে করে দেখেছেন কি? এই গ্রীষ্মে স্নানের আরাম একেবারে একশো ভাগ উপভোগ করতে তা সিরাম দিয়ে শেষ করুন। বাথ সিরাম ব্যবহারের আবার একটু ভিন্ন পদ্ধতি আছে। রাতে বা সন্ধের দিকে স্নান করলে এই সামগ্রী বিশেষ উপভোগ্য হয়ে উঠবে। প্রথমে যেমন ঠান্ডা জলে স্নান করছেন তেমনই করুন। সাবান ব্যবহার করবেন না। বরং কোলন ফেলে স্নান করে নিন। স্নানের একেবারে শেষ পর্যায়ে উষ্ণ গরম জলে গা ধুয়ে ফেলুন। তারপর মোলায়েম তোয়ালে দিয়ে গা হালকা মুছুন। রগড়ে বা ঘষে মুছবেন না। বরং প্যাট ড্রাই করে নিন। এরপর গা মোটামুটি ভিজে থাকতে থাকতেই হাতের তালুতে পরিমাণমতো সিরাম নিয়ে তা গায়ে হাতে পায়ে মুখে মেখে নিন। তারপর গা একটু শুকিয়ে গেলে পোশাক পরে নিন। স্নানের পর আমাদের শরীরে রোমকূপগুলো খুলে যায়। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। ফলে রোমকূপগুলোর মুখ বন্ধ রাখা জরুরি। সিরাম সেই কাজটাই করে। নিয়মমাফিক সিরামের ব্যবহারে ত্বক নরম থাকে। 
আরামদায়ক বাবল বাথ
ক্লান্ত দিনের শেষে আরাম পেতে বাবল বাথ অনবদ্য। বাজার চলতি অনেক ধরনের বাবল বাথ লিকুইড পাওয়া যায়। জলে মিশিয়ে নিলেই ব্যস, ফেনায় ফেনায় ভরে যাবে বাথটাব। কিন্তু তেমনটা যদি না চান বা আপনার ত্বক যদি খুব সেনসিটিভ হয় তাহলে বাড়িতেও ঘরোয়া নিয়মে বাবল বাথ বানিয়ে নিতে পারেন। ত্বকের কোনও ক্ষতি হবে না। তার জন্য চাই সাবান, জল ও গ্লিসারিন বা নারকেল তেল।  কাপ লিকুইড সাবান  কাপ উষ্ণ জলে গুলে নিন। তারপর তার সঙ্গে  কাপ গ্লিসারিন বা নারকেল তেল মেশান। এই মিশ্রণ বাথটাবের জলে মিশিয়ে নিলেই দেখবেন ফেনায় ফেনা হয়ে যাচ্ছে। তারপর স্নান সারুন সময় নিয়ে। নারকেল তেল বা গ্লিসারিন ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করবে। আর সাবান জলে ত্বক পরিষ্কার হবে। আরামও পাবেন আবার অজানা কেমিক্যালের ফলে ত্বকের কোনও ক্ষতির আশঙ্কাও থাকবে না। লিকুইড সোপের বদলে শাওয়ার জেলও ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন জেল যেন স্ক্রাবযুক্ত না হয়। বাবল বাথ ত্বকের পক্ষে আরও উপকারী করে তোলার জন্য সেই জলে এসেনশিয়াল অয়েল বা বাথ অয়েল মেশাতে পারেন। খুবই রিফ্রেশিং লাগবে স্নান শেষের পর। 
শুষ্ক ত্বকের পক্ষে উপকারী স্নান
শুষ্ক ত্বক হলে স্নানের সময় সাবান এড়িয়ে চলুন। বরং এসেনশিয়াল অয়েল দিয়ে একটু গা ঘষে নিন। তাছাড়া স্নানের আগেও যদি মিনিট পাঁচেক এসেনশিয়াল অয়েল দিয়ে একটু মাসাজ করে নেন তাহলে স্নানের পর ত্বক আরও মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। তেল ছাড়া এক্ষেত্রে বাথ জেলও ব্যবহার করতে পারেন। তাতে ত্বক নরম থাকবে। গরমকালের পক্ষে ফুলের সুগন্ধযুক্ত বাথ জেল ভালো। এতে শরীর ও মন দুই-ই তরতাজা থাকে। আর আছে প্রি-বাথ ক্রিম। যে কোনও সুগন্ধের এই ক্রিম কিনতে পারেন। ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ রাখতে এই ধরনের ক্রিমের জুড়ি মেলা ভার। স্নানের আধ ঘণ্টা আগে এই ক্রিম দিয়ে হালকা হাতে সারা শরীরে মাসাজ করে নেবেন। তারপর এসেনশিয়াল অয়েল সহযোগে স্নান করুন। শরীরের সঙ্গে মনটাও ভালো হয়ে যাবে বলে জানালেন শেহনাজ হুসেন। তবে তাঁর মতে ক্রিম, জেল বা অয়েল যা-ই মাখুন না কেন ত্বকের পক্ষে আদর্শ হল অলিভ অয়েল। এই তেলে ত্বকের পিএইচ ব্যালান্স একেবারে ঠিক থাকে। তাই সারা বছর অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন অন্তত অলিভ অয়েল মাসাজ একেবারে মাস্ট।
তৈলাক্ত ত্বকের জন্য
এমন ত্বকে ক্রিম বা তেল খুব একটা ব্যবহার করা যায় না। সেক্ষেত্রে সুগন্ধি কোনও স্ক্রাব ব্যবহার করতেই পারেন। অথবা বাড়িতেও বানাতে পারেন স্কিন সুদিং স্ক্রাব। হলুদ তৈলাক্ত ত্বকের পক্ষে খুবই উপকারী। চালের গুঁড়ো, জল ঝরানো টক দই আর হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে একটা স্ক্রাব বানিয়ে নিন। সুগন্ধের জন্য তাতে সামান্য চন্দনবাটাও মেশাতে পারেন। ঘাড়, পা,    গোড়ালি, হাঁটুর পিছন দিক, কনুই ইত্যাদি অংশে এই স্ক্রাব ব্যবহার করুন। সপ্তাহে দু’দিন এই স্ক্রাব ব্যবহার করে স্নান করুন। এছাড়াও সাবানের সঙ্গে একটু শক্ত বডি লুফা বা গা ঘষা ব্যবহার করতে পারেন। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য লিকুইড সোপ বা শাওয়ার জেল বেশি উপযুক্ত। পিউমিস স্টোন বা পিঙ্ক পিউমিস দিয়ে কনুই আর গোড়ালি ঘষে নিন। তারপর তাতে বাথ জেল লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে একটু মাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। আরাম পাবেন। 
এছাড়া সাধারণ সাবান বা বাথ লোশন তো আছেই। ত্বকে সহ্য হলে অবশ্যই সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। 
তবে স্ক্রাবারযুক্ত সাবান কোনও ত্বকের পক্ষেই খুব একটা ভালো নয়। যদি তা একান্তই ব্যবহার করতে হয় তাহলে সপ্তাহের দু’দিনের বেশি কখনওই করবেন না। আর শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে কিন্তু যে কোনও স্ক্রাবারই নৈব নৈব চ। 

21st     May,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ