বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

মনের মতো মালবেরি

গরমে ফুরফুরে সিল্ক হোক আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট। সেই তালিকার প্রথম সারিতে থাকবে মালবেরি। লিখছেন স্বরলিপি ভট্টাচার্য।

মেহগনি কাঠের আলমারি। পাল্লা খুললেই রংমহল। থাকে থাকে সাজানো শাড়ি। কোনওটা মায়ের, কোনওটা ঠাকুরমার, কোনওটা বা নিজের। ইচ্ছে মতো বেছে নিয়ে পরার সুখই আলাদা। সূর্যদেব যতই চোখ রাঙাচ্ছে, শাড়ির মিছিলে সামনের শাড়িতে চলে আসছে সুতি, লিনেনের মতো ফ্যাব্রিক। খুব প্রয়োজন না হলে তসর, সিল্ক আপাতত শীতঘুমে। কিন্তু এই আবহাওয়াতেও সিল্ক বেছে নিতে পারেন। যদি তা হয় মালবেরি। নামের মধ্যেই যেন প্রচ্ছন্ন বনেদিয়ানা।  

জন্মকথা
ইতিহাসে যাকে আমরা সিন্ধু সভ্যতা বলে জানি, সেই সময় নাকি মালবেরি সিল্কের জন্ম। বন্য রেশম থেকে সিল্ক তৈরি তখন জনপ্রিয় সংস্কৃতি ছিল। গৃহপালিত সিল্ক মথ বম্বেক্স মোরি থেকে মালবেরি সিল্কের জন্ম। যা বম্বিসিডে মথ পরিবারের সদস্য। বন্য সিল্ক মথ ম্যানডেরিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলতে পারেন। সাদা মালবেরি পাতা এই সিল্ক মথ লার্ভার মূল খাদ্য। 

আরামই মুখ্য 
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি, কলকাতার লেকচারার তথা ফ্যাশন ডিজাইনার শৌভিক বসু গত ২২ বছরের বেশি সময় ধরে পড়াচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘ভারতে বিভিন্ন রকম সিল্ক পাওয়া যায়। দক্ষিণ ভারতে নির্দিষ্ট একটা ধরন। পশ্চিমবঙ্গে আবার তসর অন্য ধরনের হয়। রিজিওনাল সিল্ক প্রতিটি জায়গায় কিছু না কিছু থাকে। কিন্তু সব সিল্ক সব আবহাওয়ায় পরা যায় না। ব্যাঙ্গালোর সিল্ক বা কাঞ্জিভরম গরমে এসি ছাড়া কোনও জায়গায় পরার কথা ভাবা যায় না। সেখানে মালবেরি সিল্ক দারুণ আরামদায়ক, কারণ প্রাকৃতিক উপায়ে এই ফ্যাব্রিক বের করা হয়। মালবেরি গাছের পাতা খেয়েই সিল্ক ওয়ার্মগুলো বেঁচে থাকে। পুরোটাই পরিবেশবান্ধব। ডিসইনফেকটেড, নন অ্যালার্জিক। সব ইতিবাচক দিকই এর মধ্যে আছে। খুব হালকা এই সিল্ক। ভীষণ আরামের জিনিস। পরলে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকবে।’ তিনি আরও জানান, এই সিল্ক মূলত তৈরি হয় চীনে। ‘নাথু লা পেরিয়ে চীনের দিকে একটা রাস্তা আছে, যেটা সিল্ক রুট হিসেবে পরিচিত, আগে খুব দুর্গম ছিল। ওটাই আগে চীন এবং ভারতের মধ্যে মালবেরি সিল্ক আসা ও ব্যবসার একমাত্র রাস্তা ছিল। খুব দামি সিল্ক। কিন্তু অসম্ভব আরামদায়ক,’ বললেন তিনি। 

চরিত্র বদল
প্রথম দিকে উপহার হিসেবে সিল্ক বিনিময় হতো রাজ পরিবারে। ধনী বৃত্তে তা সীমাবদ্ধ ছিল। আবহমানকাল ধরে চলে আসছে এই সিল্কের প্রোডাকশন। এত পথ অতিক্রম করতে গিয়ে তার চরিত্র বদলেছে বইকি! ধীরে ধীরে তা মধ্যবিত্তেরও নাগালে এসেছে। তথ্য বলছে, চীনের পর ভারত সিল্ক তৈরিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে স্বীকৃত। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কর্নাটক, জম্মু এবং কাশ্মীরে মালবেরি সিল্ক তৈরি হয় বলে জানা যাচ্ছে। এথনিক বুটিকের কর্ণধার গার্গী সোনকার জানালেন, বাংলায় তৈরি মালবেরি সিল্ক তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘মালবেরি সিল্ক অনেক ধরনের হয়। বাংলায় যেটা তৈরি হয়, সেটা মালদহ আর মুর্শিদাবাদের সুতোর টানা-বানা (লম্বা এবং চওড়া বুনট) থাকে। খুব সফট। একটা ক্রেপ ফিনিশ থাকে। সারা বছর পরা যায়। গরমে আরামদায়ক। মালবেরি খাঁটি হলে হাতের মুঠোয় চলে আসবে। আগে আমরা শুনতাম আংটির মধ্যে দিয়ে শাড়ি গলে যায়। এটা তা না হলেও হাতের মুঠোয় চলে আসবে।’ 
আবার শৌভিকের মতে, ‘এই সিল্ক ওয়ার্মটাই এখানে হারভেস্ট হয় না। মালবেরি ওয়ার্ম আমাদের আবহাওয়ায় বাঁচবেই না। নন হাইজেনিক স্পেসে থাকতেই পারবে না। মালবেরির সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ কোয়ালিটি হয় না। একটা কাপড় যখন বোনা হয়, তখন একটা টানা থাকে, লম্বা একটানা সুতো যায়। আর চওড়া দিয়ে আর একটা সুতো ঢোকে। এভাবে একটার পর একটা ঘর হিসেবে শাড়ি বোনা হয়। এবার টানাতে হয়তো কটন সুতো নেওয়া হল। আর চওড়া জায়গায় মালবেরি সিল্ক। এভাবে যদি বোনা হয়, তাহলে তা অরিজিনাল হল না।’

আসল নাকি নকল? 
শৌভিক জানালেন, তিনি আসল মালবেরি সিল্ক শেষবার দেখেছিলেন মুম্বইয়ের ‘কালা ঘোড়া’ প্রদর্শনীতে। তাঁর মায়ের প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগের মালবেরি সিল্কের উপর ব্লক প্রিন্টের শাড়ি রয়েছে। যার রং, কোয়ালিটি এখনও এক রকম রয়েছে। ‘কোভিডের পর সিল্ক রুট শাটডাউন। আমদানি রপ্তানি একেবারেই বন্ধ। ফায়ার ফ্লাইস, স্টাইল ফাইল, ফার্স এই ধরনের প্রথম সারির প্রদর্শনীগুলোতে বা কিছু কিছু টেক্সটাইল ওরিয়েন্টেড জায়গাতে খুব কম হলেও এই সিল্ক থাকতে পারে। এই প্রদর্শনীগুলোতে কিছু কিছু বুননশিল্পী আসেন, যাঁরা মালবেরি সিল্ক বোনেন’, বললেন তিনি।  আর গার্গী বললেন, ‘সব জিনিসেই এত মিক্সড কোয়ালিটি এসে গিয়েছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল নাকি নকল তা বোঝা কঠিন। কারণ একটা শাড়ি থেকে ২০০ গ্রাম সুতো বের করেও যদি মিক্সড সুতো বসিয়ে দেন তাঁতিরা, আমরাও অনেক সময় বুঝতে পারি না। আমরাই বোকা বনে যাচ্ছি কোনও কোনও সময়। আজকাল সিল্ক মার্ক দিলেই যে সব সিল্ক আসল, সেটাও নয়। প্রতিদিন সিল্কের সুতো পাল্টে যাচ্ছে। ফলে একটা বিশ্বস্ত জায়গা থেকে শাড়ি কিনলে ভরসা করা যায়।’ 

কাজের রকমারি
কী ধরনের কাজ হয় মালবেরি সিল্কে? এক্ষেত্রে প্রায় সকলেই এক সুরে কথা বললেন। বছর তিনেক আগে এই ফ্যাব্রিক নিয়ে কাজ করেছেন ডিজাইনার অভিষেক নাইয়া। তিনি বললেন, ‘আমি উইভিংকে গুরুত্ব দিতাম। জামদানি উইভ টেকনিকটা ব্যবহার করে জামদানি মোটিফও ব্যবহার করেছি। এয়ার ফ্রেন্ডলি বলে ফুরফুরে ফিল থাকে। শুধু শাড়ি কেন, মালবেরি সিল্কের তৈরি কাফতান বা অন্যান্য ড্রেস পরুন।’ শৌভিকের মতে, ‘এমব্রয়ডারি ধরে রাখার মতো শক্তি এই শাড়ির নেই। তাই প্রিন্টই বেশি হয়।’ গার্গীরও একই মত। তিনি বলেন, ‘মালবেরিতে হ্যান্ড এমব্রয়ডারি আমরা করি না। কারণ সিল্কটা খুব হালকা তো, একটু ভারী সিল্ক না হলে এমব্রয়ডারি ধরে রাখতে পারবে না। বাটিক, হ্যান্ড পেন্ট, টাই অ্যান্ড ডাই, শিবোরি করি।’ 

যত্নের খুঁটিনাটি
শখের শাড়ি। দামিও বটে। তার তো সঠিক যত্নের প্রয়োজন। টোটকা দিলেন শৌভিক। ‘মায়ের কাছে শেখা, একটা সুতির পুঁটলিতে শুকনো লঙ্কা, কালোজিরে দিয়ে শাড়ির একটা ভাঁজ তুলে রেখে দিন। পাঁচ, ছ’বছর পর যখন আলমারি থেকে বের করলাম শাড়িটা, ওই জিনিসটা একইরকম রয়েছে। আর একটু এদিক ওদিক করে নরম রোদে দিন। যাতে কোনও ভাবেই পোকা না লাগে। যে কোনও সিল্ক ড্রাই ক্লিন করবেন। উইভাররা বলতেন, খুব প্রয়োজন না হলে চার, পাঁচবার পরার আগে ওয়াশের দরকার নেই। পরার পরে হাওয়ায় এবং নরম রোদে রেখে আলমারিতে তুলে রাখুন। শাড়ি উল্টো ভাঁজ করে রাখুন। ভিতরের দিকটা বাইরে থাকবে।’ অভিষেকের মতে, ‘যে কোনও সিল্ক যত্ন না করলে কিছুদিন পরে ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ড্রাই ওয়াশ করবেন। সরাসরি রোদে মেলবেন না। হার্ড ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোবেন না।’
মা, দিদিমার সংগ্রহের খাঁটি মালবেরি আপনাকে গর্বিত করবে। নিজেও সংগ্রহ করতে পারেন, এই সিল্ক। যেন ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া একমুঠো টাটকা বাতাস।  

30th     April,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ