বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

বাহার-এ-বেগমপুর

বেগমপুরের শাড়ি। তাই নাম বেগমপুরি। কিন্তু আপনি আসল বেগমপুরি চেনেন কি? লিখেছেন অন্বেষা দত্ত

হুগলির চণ্ডীতলার ছোট গ্রাম বেগমপুর। এ গ্রামে বেশিরভাগ মানুষেরই পেশা ছিল তাঁত বোনা। তবে গত দশকে গ্রামে চার হাজার তাঁতি থাকলেও সংখ্যাটা নেমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র দু’হাজারে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে কিছু বছর আগে বেগমপুরি শাড়ির কদর কিছুটা কমে গিয়েছিল। তাঁতিদের একটা অংশ ঝুঁকছিলেন অন্য পেশার দিকে। তবে ছবিটা পাল্টেছে। বেগমপুরের সুতির শাড়ি আবার মনে ধরেছে শাড়িবিলাসীদের। কারণ এ শাড়িতে এসেছে উজ্জ্বল রং, নতুন কম্বিনেশন। লাল, পার্পল, কমলা, কালো, সবুজ— এমন নানা উজ্জ্বল রঙে কাজ হচ্ছে বেগমপুরিতে। কাপড়ের টেক্সচার একটু মোটা ধরনের হলেও এ শাড়ির বিশেষত্ব এর কাজে। শাড়ির জমি বরাবর লম্বা স্ট্রাইপসে সুতোর কাজ আর পাড়ে সাধারণ বর্ডার। অল্প কাজে অভিজাত শাড়ি খোঁজেন যাঁরা, তাঁরা এককথায় পছন্দ করবেন এই শাড়ি। 
বেগমপুরের পাশের গ্রাম শিয়াখালা। সে গ্রামের মেয়ে সোহিনী সেন মুখোপাধ্যায়। প্রতিবেশী গ্রামে থাকায় বেগমপুরের শাড়ির ঐতিহ্য বুঝতে দেরি হয়নি তাঁর। ঠাম্মা আর পিসির কাছে হাতের কাজ শেখা। তাঁরা দারুণ সেলাই করতেন। সেই দেখে প্রথমে হ্যান্ডমেড জুয়েলারি, পরে পিসির পরামর্শে অনলাইনে বুটিক শুরু করেন তিনি। জুয়েলারির পেজ থেকেই শাড়ি বিক্রি করতেন। ক্রমে ক্রমে শাড়ি হয়ে ওঠে মুখ্য। আগ্রহ জাগে অতি চেনা বেগমপুরি শাড়ি নিয়ে। বুটিক তৈরিতে বুদ্ধি দিয়েছিলেন অমৃতা সেনগুপ্ত, তাঁর বুটিকের হয়ে মডেলিংও করেন যিনি। সোহিনীর দশটা-পাঁচটার কাজ কোনওদিনই পছন্দ ছিল না। ইচ্ছে ছিল নিজের মতো কিছু করার। তাই মাত্র ২৬ বছর বয়সে নিজের বুটিক করে এগনোর সাহস পেয়েছেন। 
গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বেগমপুরি শাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে তাতে কতরকম ‘ভেজাল’ ছুঁয়ে যায়, শাড়ির অরিজিন্যালিটি কতটা টিকে থাকে, এমন নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। সোহিনী বললেন, ‘ধনেখালি আর বেগমপুরি দুটো আলাদা মেটিরিয়াল। তবে অনেকেই সেটা গুলিয়ে ফেলেন। সকলেই তো শাড়ির সমঝদার নন। তাঁরা কাজের সাদৃশ্য দেখে হয়তো বা মনে করেন বেগমপুরিই কিনছি। ধনেখালির তুলনায় বেগমপুরির দামও বেশি। তাই সস্তার ধনেখালিকে বেগমপুরি বলে চালিয়ে অনেকে লাভের রাস্তা দেখছেন। আমি খাস গ্রামের মেয়ে বলে অনেকটাই বুঝি।’ ধনেখালির চওড়া খেজুরছড়ি পাড় বা জমিন পাড় (কেউ কেউ মাছের কাঁটাও বলে) যেভাবে ফাঁক দিয়ে দিয়ে হয়, তা কখনও বেগমপুরিতে থাকবে না। বেগমপুরির চওড়া পাড়ে সলিড কালার থাকে। আবার এই শাড়িতে ইঞ্চি পাড়ও থাকে। এই ইঞ্চি পাড়েই একমাত্র খেজুরছড়ি থাকতে পারে বেগমপুরিতে। এই শাড়ির সলিড কালারে চওড়া প্লেন পাড়ের মধ্যে খেজুরছ঩ড়ি থাকে না।  এছাড়া ধনেখালির মতো ফাঁক দিয়ে দিয়ে পাড়ে নকশা থাকবে না কখনও। হাফ মাঠাপাড় বা ফুল মাঠাপাড়ে (স্থানীয় ভাষায় এভাবেই বলা হয়) সাধারণ বর্ডার থাকবে বেগমপুরির পাড়ে। গঙ্গা যমুনা পাড়ও আজকাল বেগমপুরিতে আসছে। বেগমপুরি-ধনেখালি দুই শাড়ির সুতোও একেবারে আলাদা। ধনেখালির চওড়া খেজুরছড়ি পাড়ে আড়াআড়ি কাজকে বেগমপুরি বলে ভুল করেন অনেকে। ধনেখালির ক্ষেত্রে সুতো একটু ছেড়ে ছেড়ে থাকে। বেগমপুরির জমিতে সুতোর কাজটা সবসময়ই লম্বালম্বি হবে, আড়াআড়ি কখনও নয়। 
ঐতিহ্য থেকে কিছুটা সরে বেগমপুরি কটনে বর্ডার পাড় রেখে সুতোর কাজ না করে হ্যান্ড ফেব্রিকের কাজও করিয়েছেন সোহিনী। তাঁর বুটিক ‘আদিত্রী’-তে এধরনের শাড়ি রয়েছে। সোহিনীর আক্ষেপ, ‘বেগমপুর শিয়াখালার মানুষজন এত কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই জানেন না, এই শাড়ির দুনিয়া জুড়ে কত কদর। তাই তাঁদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করে লাভের অঙ্ক গুনছেন শহুরে বিক্রেতারা। পিওর কটন হ্যান্ডলুম মার্ক দেখে শাড়ি কেনা সেক্ষেত্রে সব ক্রেতার জন্য উপযোগী। ফেসবুক লাইভে ধনেখালি শাড়িকে বেগমপুরি বলে চালিয়ে বিক্রি করছেন, এমনটা আকছার হচ্ছে। বেগমপুরির টেক্সচারও ধনেখালির তুলনায় একেবারেই আলাদা।’ আর একটি জিনিস মাথায় রাখতে বলছেন তিনি, ‘খুব লিমিটেড কিছু পিস ছাড়া বেগমপুরি শাড়িতে ব্লাউজপিস থাকে না। ৭০০-৮০০ টাকায় ব্লাউজপিস সহ বেগমপুরি বিকোচ্ছে হরদম, নিশ্চিন্ত থাকুন সেটা কখনওই অরিজিন্যাল শাড়ি নয়।’ 
তিনি বললেন, ‘সাদা লাল যে বেগমপুরিটি ছবিতে দেখছেন, সেটি ফুল মাঠাপাড় বা চিরুপাড় শাড়ি। এটা অনেকেই জানেন না। বেগমপুরি শাড়ির পাড় থাকবে ভরাট, হাত দিলেই বোঝা যাবে। এতে কোনও সুতো ওঠা কিছু মনেই হবে না।’ এছাড়াও নকশা বর্ডার, গঙ্গা যমুনা বর্ডার, টেম্পল বর্ডার, জাকাটে নকশা ইত্যাদি থাকে পাড়ে। সম্প্রতি লেখিকা আশাপূর্ণা দেবীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ উপন্যাসের থিমে বেগমপুরি শাড়িতে হ্যান্ড ফেব্রিক করেছেন তিনি। ‘আদিত্রী’-তে ধনেখালি এবং বেগমপুরি দু’রকম শাড়িই রয়েছে। কিন্তু সোহিনী বলছেন, ‘ধনেখালিকে বেগমপুরি হিসেবে চালানোর চেষ্টাটা বন্ধ করতে চাই। আমার কাছে ধনেখালির রেঞ্জ ৫০০-১১০০টাকা। আর বেগমপুরির রেঞ্জ ৮০০-৩৫০০ টাকা পর্যন্ত। অনেকেই বুঝতে চান না কেন বেগমপুরির দাম বেশি, ধনেখালিকে বেগমপুরি বলে চালানোর জন্যই এই সমস্যাটা আরও হয়েছে।’ 
তাঁর মতে, ‘অনলাইন বুটিক করার যেমন সুবিধা আছে, তেমন অসুবিধাও। অনলাইন বলে অনেক ক্রেতা বুঝতে পারেন না। বেগমপুরি বলে যা খুশি চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি বলতে গেলে বেগমপুরেরই মেয়ে। তাই খারাপ লাগাটা আরও বেশি। সুতোর মান সবচেয়ে বড় ব্যাপার। তার জন্যই দু’টি আলাদা।’ স্ক্রিন প্রিন্ট থেকেও আজকাল কাজ হচ্ছে। হাতে বোনা শিল্পের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক তুলনীয় নয়। তাই সোহিনী চান তাঁর কারিগরদের মাধ্যমে যে শাড়ি তৈরি করছেন, তাতে তাঁদের হাতের স্পর্শ থাকুক। 
কীভাবে যত্ন করবেন এই শাড়ির? প্রথম দিকে বেশ কয়েকবার ড্রাই ক্লিন করানো বুদ্ধিমানের কাজ। বাড়িতে হাতে কাচার সময় ঠান্ডা জলে প্রথমে শাড়ি ভিজিয়ে রাখুন। তবে বেশিক্ষণ নয়। গাঢ় রঙের শাড়ির সঙ্গে হালকা রঙের শাড়ি ভেজাবেন না। শাড়ি কাচতে হবে মাইল্ড ডিটারজেন্ট দিয়ে। ধোয়ার পরে শাড়ি নিংড়াবেন না। জল ঝরিয়ে ছায়ায় মেলে দিন। এ শাড়ি সুতির, তাই ধোয়ার পর একটু ছোট হয়ে যেতে পারে। ঘন ঘন মাড় না দেওয়াই ভালো। শুকিয়ে গেলে হালকা ইস্ত্রি ব্যবহার করুন। আসল বেগমপুরির জন্য এইটুকু যত্নই যথেষ্ট। 
সব শাড়ি: আদিত্রী, যোগাযোগ: ৮৩৭২৯৮০২৮৪  ছবি: সুমন দাস

2nd     April,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ