বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

মনমতো সাজ

বাংলার মাটির ঐতিহ্য শাড়িতে নিয়ে আসেন একজন। আর অন্যজন সবার মাপমতো এবং মনকাড়া পোশাকে সাজিয়ে তোলেন সম্ভার। দুই ডিজাইনারের কথা লিখেছেন অন্বেষা দত্ত।
আজ দুই শ্রীপর্ণার কথা আপনাদের বলব— শ্রীপর্ণা কর এবং শ্রীপর্ণা বসু। প্রথমজন শাড়ি নিয়ে কাজ করছেন আর দ্বিতীয়জন ব্লাউজ থেকে ড্রেস, বানাচ্ছেন সবই।
জামদানি আর কাঁথাকাজকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন ‘ইরা দ্য লেবেল’-এর শ্রীপর্ণা কর। তাঁর মতে, এই দুই কাজ বাংলার বড় সম্পদ। তবে যুগ যুগ ধরে একই ধরনের মোটিফে বা নকশায় যে জামদানি দেখা যায়, তাতে বদল আনা দরকার বলে তাঁর মনে হয়েছে। এ ধরনের শাড়ি শুধুই পুজো বা উৎসবের জন্য নয়। এই শাড়ি নিজ আভিজাত্যে পৌঁছে যেতে পারে সবরকম জায়গায়। আর তাই শ্রীপর্ণা পুরনো সেই নৈপুণ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে চান আধুনিক ঘরানার।
ইরার অর্থ পৃথিবী। যা মাটির খুব কাছাকাছি, তাঁকে খোঁজার মন্ত্রেই পা বাড়িয়েছে শ্রীপর্ণার লেবেল। মাটির কাছে থাকা পোশাক নিয়ে তাই তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। তিন বছর আগে ইরা-র যাত্রা শুরু। সেই সময়েই ডিজাইনারের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে মুম্বই থেকে নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন তিনি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি-র স্নাতক শ্রীপর্ণা ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন বছর সাত হল। যে ধরনের সৃষ্টিকর্মে নিজে বিশ্বাস করেন, সেই ধরনের কাজ নিজে হাতে না করতে পারলে হবে না, বুঝেছিলেন তিনি। তাই দেশীয় জিনিস দিয়েই কাজ শুরু। হাতে বোনা খাদি শাড়ির থেকে আর কীই বা হতে পারে তার জন্য উপযুক্ত? একই সঙ্গে তা অভিজাত, আধুনিক এবং পরেও আরাম। 
এই শাড়িতে জামদানি ও কাঁথাকাজের সূক্ষ্ম ছোঁয়া তাকে করে তোলে আরও সুন্দর এবং অভিনব। ইরা-র প্রতিটি শাড়ি এবং তাতে যে নকশা রয়েছে, তা হাতে বোনা। ডিজাইনগুলো শ্রীপর্ণা নিজে তৈরি করেন। এর পাশাপাশি এক একটি শাড়ির রং-সুতোর কম্বিনেশন, ফ্যাব্রিক— ইত্যাদি সব বেছে নিয়ে গোটা প্ল্যানিং করেন তিনিই। বিয়ের পর মুম্বই চলে যেতে হয় তাঁকে। তাই সেখান থেকে ডিজাইন তৈরি করে পাঠিয়ে বাকি কাজটা সুসম্পন্ন করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। বড় চ্যালেঞ্জ, তবে তাঁতিদের সহায়তার ইরার কাজ এগচ্ছে ভালোই। শাড়ির ওপরে কোথায় কী বসবে, সবই পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবিতে বলে দেন তিনি। আর এ শহর থেকে বাকিটা সামলে দেন আর একজন। 
তবুও মুম্বই থেকে বাংলার পছন্দের শাড়ি তৈরিতে অসুবিধে হয় না? শ্রীপর্ণা জানালেন, প্রথম দিকে কলকাতা আসতেন। লেদার হ্যান্ডব্যাগ ডিজাইনার হিসেবে কাজ করা শুরু তাঁর। কিন্তু মুম্বইয়ে তখন এধরনের ইন্ডাস্ট্রি ছিল না। তাই শ্রীপর্ণা বললেন, ‘শুরুটা কীভাবে করব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল মনের মধ্যে। মুম্বইয়ে তখন লেদার ইন্ডাস্ট্রি বলতে কিছু নেই।’ এরপরই শাড়ির ডিজাইনে মন বসালেন তিনি। এ শহরে ফিরে একেবারে সরাসরি তাঁতিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কীভাবে এঁকে পাঠালে তাঁরা বুঝতে পারবেন, কোন সুতোয়, কোন ফ্যাব্রিকে কাজ হবে— এসব কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরে তিনি কী স্টাইলে কাজ করতে চাইছেন, তা বুঝে যেতেন উইভাররাও। তাই এখন অন্য শহরে বসেও কাজ করতে কোনও অসুবিধা হয় না বলে জানালেন শ্রীপর্ণা। ইরা-র কাঁথাকাজ যে শাড়িতে হয়, সে শাড়ি আলাদা করে তাঁতির কাছে বোনানো হয়। হাতে বোনা সরু পাড়ের সুতির শাড়িতে গ্রামের একদল দক্ষ মহিলা কাঁথাকাজ ফুটিয়ে তোলেন শ্রীপর্ণার ডিজাইন থেকে। তার আগে শাড়িতে ওই ডিজাইনের ড্রয়িংটা করে দেন আর একজন। কোথায় কতটা গ্যাপ থাকবে, সমানতালে কীভাবে এগিয়ে চলবে সুতোর চলন, সেসবের খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেন তিনি। 
জামদানি কাজও হয় খাদি শাড়িতে। একইভাবে শ্রীপর্ণার দেওয়া নকশা তোলেন শিল্পীরা। তবে এক্ষেত্রে শাড়ি যেখানে বোনা হয়, সেখানেই কাজটা তুলে নেওয়া হয়। জরি দিয়ে জামদানি কাজে অভিনবত্ব এনেছেন তিনি। ওপরে ছবিতে যে কালো খাদি সিল্ক দেখছেন, তাতে রয়েছে জরি দিয়ে জামদানিতে পদ্ম মোটিফ। জামদানির চেনা মোটিফেও কিছুটা বদল ঘটিয়েছেন তিনি। এনেছেন মাছ মোটিফ। আবার অন্য একটি শাড়িতে অফ হোয়াইটে লাল সুতোয় কাঁকড়া বুটি এসেছে চেনা মোটিফের অনুপ্রেরণায়। শ্রীপর্ণার কথায়, ‘কিছু চেনা মোটিফ যেমন আছে, তেমনই কিছুটা বদলও ঘটানো হচ্ছে। এখনকার প্রজন্ম যাতে জামদানির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং আগেকার প্রজন্মও যাতে জামদানির রূপবদলে ভিন্ন স্বাদ পান, চেষ্টা করেছি সেটারই।’ তিনি জানালেন, বাংলাদেশি জামদানির কাজে সাধারণত ট্র্যাডিশনাল কাজ থাকে। তবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক তাঁতি কিছুটা অন্য ধরনের কাজ করতে চান, ট্র্যাডিশনের পাশাপাশি যে কোনও মোটিফে তাঁরা জামদানিতে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। এতে শ্রীপর্ণারও সুবিধে হয়েছিল। 
কটনের সঙ্গে এবার পুজোর আগে সিল্কেও কাঁথাকাজ আনতে চান তিনি। তাঁর নকশা বিষ্ণুপুরী সিল্কে কাঁথায় ফোটানোর পরিকল্পনা করছেন।
.............................
এবার আসি শ্রীপর্ণা বসুর কথায়। তাঁর ব্র্যান্ডের নাম ‘সই’। বছর চারেক হল তৈরি করেছেন এটি। সই অর্থাৎ বন্ধু। শ্রীপর্ণার বিশেষত্ব, তিনি সব সাইজের ব্লাউজ অনায়াসে বানিয়ে দিতে পারেন এবং তার ফিট হয় দুর্দান্ত। শ্রীপর্ণার কথায়, ‘একটু ভারী চেহারার অনেকেই মনমতো ডিজাইনার ব্লাউজ না পেয়ে আফসোস করেন। আমি তাঁদের কথাও ভেবেছি। ব্লাউজের নজরকাড়া কাটের পাশাপাশি তাঁদের জন্য তৈরি করে দিই নানারকম ড্রেসও।’ কখনও মেশিন এমব্রয়ডারি, কখনও হ্যান্ড এমব্রয়ডারি এবং কখনও হ্যান্ড ব্লকপ্রিন্টে সাজিয়ে তোলেন ব্লাউজ বা ড্রেস। তার জন্য কাপড় সংগ্রহ করেন রাজস্থান থেকে। প্রথমে পিঠের দিকের কাজ দিয়ে শুরু করেছিলেন। তারপর সেই ট্রেন্ড সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় তিনি নজর দেন ফিটিং এবং সব বয়সের মহিলাদের ব্লাউজের দিকে, যাতে সবাই সাধ্যের মধ্যে দামে স্টাইলিশ ব্লাউজ পরতে পারেন। 
সইয়ের সংগ্রহে আছে নানাধরনের ব্লাউজ। যার পিছনদিকের নকশায় পাবেন প্রজাপতি, আয়ুষ প্রতীক, রাজস্থানী নথ, ফুল, লতাপাতা, পার্সিয়ান কার্পেটের মোটিফ— এমন সবকিছুই। আয়ুষ ব্লাউজটির কথা বলছিলেন শ্রীপর্ণা। তিনি জানালেন, দশ হাজার বছরের পুরনো আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রতীক বেছে নিয়ে সেটিকে নিজের মতো সাজিয়েছেন। এই প্রতীকের সঙ্গে সংস্কৃত মন্ত্র থাকে। তিনি সেই মন্ত্রের জায়গায় এনেছেন একটি লাল ফুল। মহামারীর এই কঠিন সময়ে সেরে ওঠার বার্তা দিতে আয়ুর্বেদের মোটিফকে ব্যবহার করেছে সই। র সিল্কের  মতো লুকে কালো রঙের চেন্নাই সিল্কে এমব্রয়ডারি করে কাজটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘র সিল্কের মতো অত দামি নয় বলে চেন্নাই সিল্কে করেছি কাজটা, এতে ব্লাউজ অ্যাফর্ডেবল হয়, সবাই কিনতেও পারেন,’ বলেন শ্রীপর্ণা। 
আর একটি ব্লাউজের পিছনে আছে বৈকুণ্ঠমের পেন্টিং। সিল্কের উপর আগে বধূর মুখটি হ্যান্ড পেইন্ট করে নেন তাঁরা। তারপর বধূর  মুখে-কানের সব অলঙ্কার হাতে বোনা জারদৌসি কাজে সাজানো হয়েছে। সব মিলিয়ে তাতে একটা ব্যতিক্রমী লুক এসেছে। 
সিল্কের পাশাপাশি চান্দেরি ও কটনেও প্রচুর কাজ করেন তিনি। অর্গ্যানিক কটনের ব্লাউজের হাতায় দিয়েছেন জামদানির কাজ। এটা এবারের গ্রীষ্মেই তৈরি করেছেন। আবার এমব্রয়ডারির কাজে ব্যবহার করেছেন উলের সুতোও। একটি স্লিভলেস ব্লাউজে ভরা ফুলের কাজে সই ব্যবহার করেছে উল। 
ব্লাউজের মতো শ্রীপর্ণা হাত দিয়েছেন স্মার্ট লুকিং ড্রেস তৈরির কাজেও। ড্রেসের ক্ষেত্রেও সব চেহারার মহিলা যাতে পরতে পারেন, সেদিকে খেয়াল রেখেছেন তিনি। কখনও পোলকা ডট, কখনও ফিশ মোটিফ থাকে তাঁর ড্রেসে। সঙ্গে মেটিরিয়ালে ব্যবহার করেছেন ফুলিয়ার কাপড়ও। কেউ যদি অতিরিক্ত রোগা চেহারার হন, তাঁর জন্য কোমরের কাছে দু’দিকে দড়ি থাকে, যাতে ওয়েস্টলাইন ঠিকমতো রাখতে পারেন। ড্রেসের দামও তিনি রেখেছেন এমন, যাতে পকেটে খুব বেশি চাপ না পড়ে। 


যোগাযোগ: শ্রীপর্ণা কর, ৯৮৩০৪৩৩৮২৬ এবং শ্রীপর্ণা বসু, ৯৪৩২৮৯০৭৯০।
(ছবি ডিজাইনারদের সৌজন্যে)
গ্রাফিক্স: সোমনাথ পাল

3rd     July,   2021
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021