বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বাংলার বিরোধীদের
ব্যর্থতা ঘরে ও বা‌ইরে
সমৃদ্ধ দত্ত

কলকাতার রাস্তায় আর ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং বুলগানিনের আগমনে জনসমুদ্র তৈরি হয়েছিল। তাঁদের সংবর্ধনা জানাতে ১৯৫৫ সালের সেই নভেম্বরে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশে একইসঙ্গে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা অজয় ঘোষ। ছয়ের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের আঁচ আছড়ে পড়েছিল কলকাতার রাস্তায়। স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী দশকগুলিতে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অঙ্গ ছিল বিশ্বসাহিত্যের চর্চা। ছিল বিশ্ব চলচ্চিত্র নিয়ে চূড়ান্ত আগ্রহ ও তর্কবিতর্ক। জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে ছিল বাঙালির প্রখর উপস্থিতি। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে বিধানচন্দ্র রায়। জ্যোতি বসু থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি অথবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
 জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে বাঙালি নেতানেত্রীর উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল এক সাফল্য। এই যে বলা হচ্ছে উজ্জ্বল উপস্থিতি, এটার অর্থ এই নয় যে, শুধু তাঁরা মন্ত্রী হয়েছেন কিংবা কোনও দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ। উজ্জ্বল উপস্থিতির তাৎপর্য হল, তাঁরা প্রত্যেকেই জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পেরেছেন। অর্থাৎ তাঁদের কোনও সিদ্ধান্ত জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। তাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকেছে জাতীয় দলগুলি। তাঁদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে বিশেষ সমীহ জানিয়ে। বিধানচন্দ্র রায় নিজের দলের সুপ্রিম লিডার জওহরলাল নেহরুকে স্বাধীনতার পর কড়া চিঠি লিখে বলেছিলেন যে, গত দু’বছরে যে অর্থ সাহায্য উদ্বাস্তু খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে বাংলাকে, আর যে পরিমাণ উদ্বাস্তু এসেছে, সেই হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে মাথাপিছু সাহায্য দেওয়া হয়েছে ২০ টাকা করে! এটা কি প্রাপ্য বাঙালির! এই কড়া চিঠির প্রেক্ষিতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল পাল্টা চিঠি লিখে বিধানচন্দ্র রায়কে কিছুটা হলেও ক্রুদ্ধ ভাষায় বলেছিলেন, দলের এবং দেশের প্রধান নেতাকে এই ভাষায় লেখা উচিত হয়নি আপনার। বিধানচন্দ্র রায় বলেছিলেন, আপনারা আঘাত পেলে আমি দুঃখিত। তবে আমার রাজ্যের স্বার্থে আমাকে মুখ খুলতেই হবে। 
অজয় মুখোপাধ্যায়, প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিরা ক্ষুব্ধ হয়ে কংগ্রেসের মতো এক বিরাট প্রভাবশালী দল ছেড়ে নিজেদের নতুন দল নির্মাণ করেছিলেন। তাঁরা সফল হননি। সেটা ভিন্ন ব্যাখ্যা। আবার কংগ্রেসে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। আবার আর একটি সাহসের নজির হল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সকলেই চেয়েছিলেন জ্যোতি বসুকে। তাঁর দল আটকে দিল। তিনি কিন্তু দলের অনুগত রইলেন। বিদ্রোহ করলেন না। অর্থাৎ শৃঙ্খলারক্ষায় নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা পর্যন্ত রেয়াত করলেন না। যা বেনজির।
একইভাবে সাহসে সকলকে ছাপিয়ে গিয়ে বাংলার সবথেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শুধু কংগ্রেস ত্যাগ করেননি, কংগ্রেসকে সংগঠনগতভাবে দুর্বল করে দিয়েছেন। তাঁর রাজনীতির গতিপথ সঠিক অথবা বেঠিক, সেটা নিয়ে গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবেই। তাঁর প্রশংসা কিংবা সমালোচনা, উভয় অধিকারই আছে সমর্থক ও বিরোধীদের। কিন্তু ১৯৮৪ সাল থেকে লোকসভায় জিতে চলা, একের পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হওয়া, দুবার রেলমন্ত্রী হওয়া, তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এবং একটি আঞ্চলিক দলের নেত্রী হিসেবে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অবতীর্ণ হওয়া, যে কোনও রাজনৈতিক কেরিয়ারে এক ঈর্ষণীয় রোলমডেল। 
প্রশ্ন হল, সেই বাংলা এখন কার্যত কূপমণ্ডুক হয়ে গেল কেন? বিশ্ব রাজনীতির কোনও ঘটনায় বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে আর কোনও ঢেউ ওঠে না। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে যত চর্চা অথবা বই প্রকাশিত হয়েছে কিংবা লিটল ম্যাগাজিন উত্তাল হয়েছে অতীতে সেই অনুপাতে এখন কী হয়? বিশ্ব চলচ্চিত্র, নাটক অথবা সংস্কৃতি। কিছুই আর বাঙালি চেতনার সঙ্গে তীব্রভাবে সম্পৃক্ত হতে পারছে না। এখন বরং অনেক বেশি দিনভর আলোচনা আর চর্চা চলে স্থানীয় রাজনীতি আর সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে। বাইরে তাকানোর জানালা ও দরজা প্রায় বন্ধই। কিছু উৎসাহী মানুষ আজও হয়তো চর্চা করে নিরালায়। কিন্তু সেই স্রোত নগণ্য। 
এই তালিকায় সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি বাংলার রাজনীতির। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর বিগত ৩৮ বছরে আর একজনও এমন নেতানেত্রী উঠে এলেন না যিনি দলের চরম সফল ও জনপ্রিয় নেতা তো বটেই, জাতীয় স্তরেও যাঁকে নিয়ে আলোচনা হয় কিংবা তাঁকে তাঁর নিজের দল খুব গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে একবার লক্ষ করলে আরও স্পষ্ট অনুধাবন করা যাবে বিষয়টি। আট বছর হয়ে গেল কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে বাংলা থেকে বিজেপির  ১৮ জন এমপি জয়ী হয়েছেন। একজনকেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রীর মতো যোগ্য মনে করা হয়নি। কোনও পূর্ণমন্ত্রী ২০১৪ সালেও ছিলেন না। ২০২২ সালেও নেই। এটা বাংলার কাছেই যথেষ্ট অসম্মানের বার্তা। 
বাংলার বিরোধী নেতানেত্রীরা মুখ্যমন্ত্রী কিংবা শাসক দলের তুমুল সমালোচনা করেন। যা অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রবণতা। বিরোধী দলের কর্তব্যই তাই। কিন্তু তাঁদের নিজেদের ভাবমূর্তি ও শক্তির দিকেও এবার নজর দেওয়ার সময় হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেন এখনও পর্যন্ত গোটা বাংলায় সবথেকে গ্রহণযোগ্য বিরোধী নেতা হিসেবে উঠে আসতে পারলেন না? কেন বিপুল জনপ্রিয় হতে পারলেন না? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু ১৯৯২ সালেও তাঁর সভায় যে জনসমাবেশ হতো সেটা ছিল অকল্পনীয়। এই যে ক্রাউডপুলার ইমেজ, এটা কেন আয়ত্ত করতে পারছেন না কোনও বিরোধী দলের নেতানেত্রীরা? তাঁদের সামনে ইস্যুর অভাব নেই। অবিরত সরকার বিরোধী বিষয় নিয়ে তাঁরা সামনে আসছেন। মিডিয়ায় আসছেন। ফেসবুকে আসছেন। তবু জনতার মধ্যে আলোড়ন তুলতে পারছেন না কেন? 
কেন একটি ভোট থেকে আর একটি ভোটের মধ্যবর্তী সময়সীমায় তাঁরা এমনভাবে আগ্রাসী হয়ে ওঠেন যেন আগামী কাল নির্বাচন হলে তাঁরা বিপুলভাবে জয়ী হয়ে সরকার গড়বেন! কিন্তু আদতে আবার যখন ভোট আসে, তখন দেখা যায় ওই আগ্রাসন সফলভাবে আকর্ষণ করতে পারছে না ভোটব্যাঙ্ককে। এর কারণ কী? গণতন্ত্রে যত বেশি শক্তিশালী বিরোধী হবে, ততই তো সরকারও সজাগ থাকবে, অনেক বেশি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন হবে। 
কিন্তু বাংলার বিরোধীরা যতটা সময় ব্যয় করেন সরকারের সমালোচনায়, তার সিকিভাগ সময়ও খরচ করেন না নিজেদের আরও বেশি কীভাবে ভোটারদের কাছে আস্থাভাজন ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়, সেটা নিয়ে কোনও দলগত অথবা ব্যক্তিগত অনুশীলনে। কোনও বিরোধী নেতা বাংলা থেকে এমন পর্যায়ে উঠতে পারছেন না যিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কুশলী চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন। তাঁদের নিজেদের দলও সেভাবে প্রমোট করে না। কারণ, বিজেপি অথবা কংগ্রেসের হাইকমান্ড দিল্লিতে। সেই হাইকমান্ডের থেকে এই দলের রাজ্য নেতানেত্রীরা সেরকম গুরুত্ব পান না। যা প্রতিনিয়ত স্পষ্ট। অধীর চৌধুরীকে লোকসভায় দলনেতা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছে কংগ্রেস। অথচ তাঁকে সেভাবে কাজেই লাগানো হয় না লোকসভার বাইরে। আবার সিপিএম গত ৪৪ বছর ধরে কোনওদিন বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণই হয়নি। আগাগোড়া তারা সরকারেই থেকে এসেছে। তাই ফর্মুলাই জানে না যে, বিরোধী রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত। ১১ বছর কেটে গেল বিরোধী হিসেবে। এখনও সঠিক দিশা নিজেরাই ঠিক খুঁজে পাচ্ছে না তারা। 
বিরোধীরা সরকার বিরোধী ইস্যু নিজেরা তৈরি করার মুন্সিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ। তারা শুধু অপেক্ষা করে সরকার অথবা শাসক দল কখন কী ভুল করবে, সেটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু কোনও ইস্যুকেই দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের রূপ দিতে পারছে না। তাই দলের ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মাহীনতায় বিরোধী দলের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। এই দুর্বলতাগুলিকে ভুলে গিয়ে, তারা সাময়িক হাততালি পেতে সবথেকে বড় একটি ভুলও দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আন্ডারএস্টিমেট করা!  

2nd     December,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ