বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রত্যাশীরা
পি চিদম্বরম

ভারতে ২৮টি রাজ্য। পুদুচেরি এবং দিল্লি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও তাদের বিধানসভা রয়েছে। দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর ছিল একটি রাজ্য। প্রতিটি রাজ্যের মাথায় একজন রাজ্যপাল থাকেন।
রাজ্য বিধানসভাগুলির জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নানা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা নির্বাচিত হন। বৃহত্তম দলের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি মুখ্যমন্ত্রী (সিএম) পদে শপথ নেন। মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্যের জনগণের নির্বাচিত নেতা। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে মন্ত্রীদের নিয়োগ করা হয়। এটাই হল ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টারি সিস্টেম। ভারত বহুবছর যাবৎ এই ব্যবস্থা অনুসরণ করেছে। সিস্টেমটি ভালোভাবেই কাজ করেছে এবং দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে কিছু ছোটখাট ত্রুটিবিচ্যুতি।
এক সরকার
কিন্তু কিছু লোকের আবার ওয়েস্টমিনস্টার সিস্টেম পছন্দ নয়। একইভাবে, তারা রাজ্যটাজ্য পছন্দ করে না; তাদের পছন্দ নয় নির্বাচিত বিধানসভা; এবং তারা মুখ্যমন্ত্রীদেরও পছন্দ করেন না। সংক্ষেপে এটাই বলতে হয় যে, তারা রাজ্য সরকারগুলির থেকে পরিত্রাণ চায়। ১৪২ কোটি ৬০ লক্ষ জনসংখ্যার চীনের যদি একটি সরকার থাকতে পারে, তবে ১৪১ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যার ভারতেরও তা থাকবে না কেন? ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের বিরুদ্ধে সমর্থক বাড়ছে। এইরকম কিছু সমর্থককে রাজ্যগুলিতে রাজ্যপাল নিযুক্ত করা হয়েছে।
রাজ্যপাল হলেন রাজ্যের একজন টিটুলার হেড বা আলঙ্কারিক প্রধান, ঠিক যেমন ব্রিটিশ রাজা। এখানে একটি রাজ্য সরকার পরিচালিত হয় এই রাজ্যপালের নামে। রাজ্যপালের ক্ষমতা সংবিধান নির্ধারণ এবং সীমাবদ্ধ করে রেখেছে (অনুচ্ছেদ ১৬৩):
‘রাজ্যপালের কার্যাবলির অনুশীলনে সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিপরিষদ থাকবে, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে সংবিধান কর্তৃক কিংবা সংবিধানের অধীনে যতদূর তাঁর কার্যাবলি তিনি অনুশীলন করবেন অথবা তাঁর আপন বিচক্ষণতায় যেকোনও একটি অনুসরণ করবেন।’
ভাষা সহজ ও সরল। আমরা যে ওয়েস্টমিনস্টার মডেল গ্রহণ করেছি তার পটভূমিতে বিবেচনা 
করলে অনুচ্ছেদ ১৬৩-র অর্থ নিঃসন্দেহে সেটাই স্বীকার করে। ইংল্যান্ডের রাজার মতো, রাজ্যপালের প্রকৃত ক্ষমতা নেই। যেখানে সংবিধান তাঁকে করতে বলেছে, শুধুমাত্র সেখানেই তিনি তাঁর বিবেচনার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন। তবুও, কিছুতেই মানতে না-চাওয়ার মতো কিছু ব্যক্তি (ডাউটিং থমাস) রয়েছেন। বিচারপতি কৃষ্ণ আয়ার তাঁর সমশের সিং বনাম পাঞ্জাব রাজ্য মামলার রায়ে তাঁদের শুধরে দিয়েছেন:
‘আমরা আমাদের সংবিধানের এই শাখার আইন থেকে ঘোষণা করি যে, রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপাল ... তাঁদের আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন শুধুমাত্র তাঁদের মন্ত্রীদের পরামর্শ অনুযায়ী এবং কয়েকটি সুপরিচিত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে তাঁরা সেটি সংরক্ষিত রাখবেন।’
সীমা অতিক্রম
তবুও আমাদের কিছু রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব ফলাবার খোয়াব দেখেন। তাঁরাই মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার প্রত্যাশী।
 একটি বিল আইনে পরিণত হওয়ার জন্য রাজ্যপালের সম্মতি প্রয়োজন। অনুচ্ছেদ ২০০-তে এই বিধান রয়েছে যে রাজ্যপাল সম্মতি দিতে পারেন অথবা তাঁর সম্মতি স্থগিত রাখতে পারেন কিংবা বিষয়টি রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্যও সংরক্ষিত রাখতে পারেন। যদি কোনও বিলের সম্মতি আটকে রাখা হয়, তাহলে পুনর্বিবেচনার জন্য বিলটি বিধানসভায় ফেরত পাঠাতে হবে। এরপরও যদি বিলটি সংশোধনসহ অথবা কোনওরকম সংশোধন ছাড়াই ফের পাশ করা হয়, তখন রাজ্যপাল ওই বিলে তাঁর সম্মতি দিতে বাধ্য। সেখানে কিছু রাজ্যপাল বিল নিয়ে পরিষ্কার ‘টালবাহানা’ করেন। উপরে উপরে দেখানো হয় যে রাজ্যপাল বিলটি ‘বিবেচনা’ করছেন। একজন রাজ্যপাল একটি বিল কতবার পড়বেন এবং বিবেচনা করবেন? যদি তিনি বিলগুলি বুঝতে অক্ষম হন, তাহলে অক্ষমতার উল্লেখসহ তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
 রাজ্যপালরা রাজ্য সরকারের বিরোধিতা করেন। একটি রাজ্য সরকার নতুন শিক্ষানীতি এবং তথাকথিত ত্রিভাষা সূত্রের বিরোধী। সেখানকার রাজ্যপাল সেই রাজ্য সরকারের বিরোধিতা করেছেন এবং নয়া শিক্ষানীতি ও ত্রিভাষা সূত্র সম্পর্কে স্তুতি করেছেন। রাজ্যপাল অন্যান্য ইস্যুতেও রাজ্য সরকারের বিরোধিতা করেছেন। সেখানকার রাজ্য সরকারের সমর্থক সাংসদরা রাজ্যপালকে প্রত্যাহার করার দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে একটি স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি জমা দেন।
 রাজ্যপালরা অপ্রাসঙ্গিক এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করেন। একজন রাজ্যপাল বললেন যে ছত্রপতি শিবাজি ছিলেন ‘পুরনো দিনের আইকন’। এতে ক্ষিপ্ত গোটা রাজ্যের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দলও, এমনিতে তারা রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিল, তবু এই ইস্যুতে তাঁকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি জানাল।
 রাজ্যপালরা অস্বস্তিকর মন্তব্য করেন। মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে এক রাজ্যপাল বলেছিলেন যে ‘যদি মুখ্যমন্ত্রী জানতে না পারেন যে তাঁর অফিসের কেউ একজন আত্মীয়কে নিয়োগ করার জন্য উপাচার্যকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তাতে বোঝা যায় তিনি কতটা অযোগ্য! আর যদি তিনি সেটার সম্পর্কে জানতেন তবে তিনিও সমান দোষী।’ এর আগে, একই রাজ্যপাল বলেছিলেন যে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর অতীত রাজনৈতিক রেকর্ড সম্পর্কে অবগত এবং একটি অনুষ্ঠানে, দলের তরুণ নেতাকে (বর্তমানে যিনি মুখ্যমন্ত্রী) কাপড়চোপড় পর্যন্ত বদলাতে হয়েছিল (যাতে বোঝায় যে কাপড়চোপড় ভিজিয়ে ফেলার মতোই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি)।
 মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধী দলের নেতাদের ‘স্বাগত’ জানাবার জন্য রাজ্যপালদের পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অভিভাবক’ বা ‘গার্ডিয়ান’। একইসঙ্গে, রাজ্যপালদের দেখানো হয়েছে সাংবিধানিক রীতিনীতি পালনের দরজা। 
অদম্য ইচ্ছা
কেন রাজ্যপালরা মুখ্যমন্ত্রীর পদ প্রত্যাশীদের মতো আচরণ করেন? বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ডঃ সি রঙ্গরাজন, যিনি একটি রাজ্যের রাজ্যপালও ছিলেন, সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বই ‘ফর্কস ইন দ্য রোড’-এ তিনি বলেছেন যে:
‘যাঁরা বিশুদ্ধভাবে রাজনৈতিক নিয়োগ পেয়েছেন, অন্য দলের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে তাঁদের সমস্যা হয়। ছিদ্রান্বেষণের একটা প্রবণতা রয়েছে ... স্পষ্টতই, একটি রাজ্যে এমন দুটি ক্ষমতার কেন্দ্রের কথা সংবিধানে কল্পনা করা হয়নি। অধিকন্তু, রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই তাঁদের অতীত অবস্থান মনে রেখে কাজ রাখেন। তাঁরা প্রত্যক্ষ শাসক ছিলেন এবং ছিলেন ক্ষমতার ব্যবহারে অভ্যস্ত। সেই কাজ করার ‘অদম্য ইচ্ছা’ কখনও কখনও স্পষ্ট হয়। এই কারণে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ শিখতে হবে।’
সম্ভবত না, কারণ ওয়েস্টমিনস্টার-বিরোধী মতের লোকেরা রাজ্যপাল পদে মুখ্যমন্ত্রীর পদ প্রত্যাশীদের পছন্দ করেন।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

28th     November,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ