বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সরকার শীতঘুমে,
হচ্ছে দক্ষ কর্মী ছাঁটাই
সমৃদ্ধ দত্ত

বিশ্বের বৃহত্তম ই-মার্কেটিং সংস্থা আমাজন প্রায় ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। টুইটার কোম্পানির মালিকানা বদল হওয়ার পর নতুন মালিক বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি এলন মাস্ক প্রথম যে কাজটি করেছেন, সেটি হল ছাঁটাই। সর্বাগ্রে কোম্পানির সিইিও ভারতীয় পরাগ আগরওয়াল ও তাঁর টিমকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপর দেখা যাচ্ছে নতুন মালিক কোম্পানিকে আরও লাভজনক করার জন্য কর্মী ছাঁটাই করার বড়সড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেন বড়সড়? কারণ নতুন মালিকের নতুন সিদ্ধান্ত, টুইটারের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেক করে দেওয়া হবে। ঠিক ৫০ শতাংশ ছাঁটাই হবে। ফেসবুক এবং হোয়াটস অ্যাপ যে কোম্পানি পরিচালনা করে, সেই মেটা গত সপ্তাহেই জানিয়েছে, তাদের টার্গেট ১১ হাজার কর্মী ছাঁটাই। মোট কর্মী সংখ্যার ১৩ শতাংশ ছাঁটাই হয়ে যাবে। 
এইসব সংস্থায় প্রধানত কারা কাজ করেন? উচ্চ বেতন তথা বিপুল সামাজিক স্ট্যাটাসের এই চাকরিগুলি প্রধানত কোন র‌্যাঙ্কের নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রফেশনালদের জন্য? এগুলি সবই যেহেতু প্রধানত তথ্য প্রযুক্তির দ্বারা পরিচালিত, তাই এখানে কাজ করেন ডেটা সায়েন্টিস্ট, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা অ্যানালিস্ট, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স অপারেটর, রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়াররা। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি ডিপ্লোমা নেওয়া হাই প্রোফাইল ছাত্রছাত্রীরা এই সেক্টরে চাকরি পায়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বের প্রথম সারির যে কোম্পানিগুলি রয়েছে তাদের অর্থাৎ টুইটার, মেটা, আমাজন, কয়েনবেস, মাইক্রোসফ্ট এবং স্ন্যাপের পক্ষ থেকে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। আরও হবে আগামী এক বছর ধরে। 
গোটা বিশ্বে এই কয়েক সপ্তাহে সামগ্রিকভাবে শুধুমাত্র টেক কোম্পানিগুলি থেকে ১ লক্ষ ২৫ হাজারের বেশি ছাঁটাই হয়েছে। মেটা (ফেসবুক সংস্থা) শুধু এই বছরেই ১৫ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করে ফেলেছে। অক্টোবর মাসে সম্মিলিতভাবে এসব সংস্থার ১১ হাজার পদ চিরতরে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভারতের বহু টেক সংস্থা গত আটমাস ধরেই এই পন্থায় পা মিলিয়েছে। ২০২০ এবং ২০২১ সালে যে পরিমাণ হায়ারিং অর্থাৎ নতুন নিয়োগ হয়েছিল, ২০২২ সালে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রবণতা বন্ধ করে উল্টো পথ নেওয়া হচ্ছে লাগাতার। অর্থাৎ ফায়ারিং। ছাঁটাই। 
এই প্রবণতা থেকে যে চরম আশঙ্কার বার্তা পাওয়া যাচ্ছে সেটা হল, এই প্রথম দেখা যাচ্ছে, হাই প্রোফাইল চাকরিতে বিপুল ছাঁটাই হচ্ছে। অর্থাৎ চাকরির জগতে যে সফটওয়্যার ও ইনফরমেশন টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি একচ্ছত্র দাপট দেখিয়ে আসছে বিগত ২০ বছর ধরে, হঠাৎ সেই সেক্টরের উচ্চ বেতন, উচ্চ স্ট্যাটাস, হাই প্রোফাইল চাকরির আর নিশ্চয়তা থাকছে না। সবথেকে কম চাকরি তথা কর্মসংস্থান হওয়ার কথা কাদের? যাদের বলা হয় আনস্কিলড লেবার। অর্থাৎ যাদের কোনও বিশেষ বিষয়ে বিশেষ নৈপুণ্যের অধীত জ্ঞান নেই। তারা শুধুই ম্যানুয়াল লেবার দিতে পারবে। সোজা কথায় শারীরিক শ্রমের কাজের বাজার অনেক বেশি এবং এই বাজারটিই কিন্তু অসংগঠিত। ভারতের মতো দেশে এই অসংগঠিত সেক্টর সবথেকে বেশি অর্থনীতিতে জোগান দেয় আর্থিক লেনদেন। ভারতের দুর্ভাগ্য হল স্কিল থাকলেও তাদের যথাযোগ্য কাজ ও মর্যাদা কম। পাড়ার প্লাম্বার কিংবা ইলেকট্রিশিয়ানরা স্কিলড লেবার। অথচ তাঁদের সেই স্কিলের রাষ্ট্র কোনও সুযোগ দেয় না। 
এই শ্রমিকদের কোনও নিরাপত্তা নেই। নেই কোনও জব স্ট্যাটাস।  দীর্ঘকাল ধরে ভারত ও বিশ্বের সর্বত্র ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর ছিল বৃহত্তম চাকরিদাতা। কিন্তু বিগত বছরগুলিতে দেখা গেল, বৃহৎ ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি আর তৈরি হচ্ছে না সেভাবে। সবথেকে বড় ধাক্কা লাগলো ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কোর সেক্টরে। অর্থাৎ সিভিল, মেকানিক্যাল এবং ইলেকট্রিক্যাল। বছরের পর বছর ধরে এই কোর সেক্টরের কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ কম। মেধাবী  অথবা মাঝারি মানের ছাত্রছাত্রী, দুপক্ষই সর্বাগ্রে পছন্দ করছে তথ্য প্রযুক্তিকে। যে কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রবণতা হল, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো কোর্সগুলির আসন আগে পূর্ণ হয়। 
অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অফ টেকনিক্যাল এডুকেশনের রিপোর্ট দেখা যাচ্ছে, ২০২১-২২ আর্থিক বছরে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের মোট আসন ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১২ সালে যা ছিল ২৬ লক্ষ। ২০২২ সালে সেটি ২৩ লক্ষ। ২০১৪ সালে সবথেকে বেশি ছিল। ৩১ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং সিট। কেন এই ক্রমহ্রাসমান অবস্থা? কোর সেক্টরের লক্ষ লক্ষ আসন ফাঁকা পড়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে। এর কারণ কম বেতনের চাকরি। কম চাকরির সুযোগ। নির্মাণ ও ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের মন্দা।  তাই সবথেকে মূল্যবান কোর্স হয়ে উঠেছে তথ্য প্রযুক্তি। 
কিন্তু এবার বিস্ময়কর হল, স্কিলড কর্মীদের অবাধে ছাঁটাই করা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ভারতেও। সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হয়েছে ভারতের তথ্য প্রযুক্তি সেক্টরের নিয়োগ প্রবণতায় ধীরগতি। লকডাউনে সবথেকে বেশি দাপট দেখিয়েছে তথ্য প্রযুক্তি এবং সার্ভিস সেক্টর। অনলাইন সার্ভিস এমন শিখর স্পর্শ করেছিল যে, হু হু করে চাকরি বেড়েছে এইসব তথ্য প্রযুক্তি সংস্থায়। যে হারে নিয়োগ হচ্ছিল, সেই গতি তো নেইই, বরং ছাঁটাই শুরু হয়েছে। 
এইসব উচ্চশিক্ষার পর চাকরি পাওয়ার জন্য আরও কী করতে হয়? ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের পর আবার ম্যানেজমেন্ট কোর্স করতে হয়। অর্থাৎ দ্বিগুণ স্কিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই কর্মীদের ছাঁটাই করা চলছে। এই দক্ষ কর্মীরা ছাঁটাই হলে আবার চাকরি পেয়ে যাবেন! তাহলে আর চিন্তা কীসের? চিন্তা হল, একদিকে যেমন ছাঁটাই শুরু হয়েছে, তেমনই শুরু হয়েছে প্যাকেজ র‌্যাশনালাইজেশন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এখন তাবৎ অডিট এবং কনসালট্যান্ট সংস্থাগুলি কোম্পানিদের পরামর্শ দিচ্ছে যে, তোমরা অনেক বেশি স্যালারি দিচ্ছো। এত স্যালারি দেওয়ার মতো বাজারই নয়। বরং এখন স্কিলড ওয়ার্কারদের চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই বেশি। অতএব বেতন কমাও। সেই পরামর্শ মেনে নিয়ে শুরু হয়েছে পে কাট। একটি পদের জন্য আগে যে বেতন পাওয়া যেত, এখন আগামী দিনে সেই বেতন কাঠামো অনেক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এটাই নতুন প্রবণতা। অর্থাৎ কর্মী ছাঁটাই এবং বেতন ছাঁটা‌ই। এই দুইয়ের পরিণাম কী? এডুকেশন লোন মেটাতে না পারা। তার ফলশ্রুতি টের পাওয়া যাচ্ছে। 
ভারতের ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক গত আগস্ট মাসে স্থির করেছে উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে। কারণ প্রবলভাবে বেড়ে চলেছে লোন ডিফল্টারের সংখ্যা। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে, তারপর আর সেই টাকা পরিশোধ করতে পারছে না অথবা করছে না। এরকম সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাই এই বছরে ১৪ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এডুকেশন লোন দেওয়ার টার্গেট। অর্থাৎ সবথেকে বড় বিপদ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের। যারা লোন নিয়ে বিদেশে বা স্বদেশে পড়াশোনা করতে চাইছে। 
এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার কী করছে? এখনও স্বপ্ন বিক্রির সেই ট্রেন্ডই চলছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। যা কিছু ভালো সব ভবিষ্যতে অপেক্ষা করে আছে। ২০২৫ সালে ভারত হবে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি। ২০৪৭ সালে হবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি। ২০৩০ সালে বেকারত্ব থাকবে না। সব ঘরে জল আসবে। সবার ঘর হবে। ইত্যাদি। শুধুই অবাস্তব ক্যাম্পেন এখনও অব্যাহত। বাস্তব অবস্থা নিয়ে ভারত সরকার কোনও চিন্তাভাবনা করছে এরকম সামান্য কোনও নমুনা দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির সঙ্গে ভারতের পার্থক্য কী? ওইসব দেশ বিপন্নতার কথা স্বীকার করে বারংবার বলছে যে, আমাদের এখন থেকে সতর্ক হতে হবে। সামনে আরও খারাপ সময় আসছে। সকলে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। আর ভারত সরকার ক্রমাগত বলে চলে, শুরু হয়েছে অমৃতকাল! সোনার ভারত তৈরি হল বলে! যে রাষ্ট্র দেশবাসীকে ঠকায়, সেই দেশের মানুষ সত্যিই ভাগ্যহীন! 

18th     November,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ