বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিজেপির হুঙ্কার ও বাংলার রাজনীতি
হিমাংশু সিংহ

বারবার বাংলা ও বাংলার মানুষকে হুমকি দেওয়া কেন? এর কারণ একটাই, আসন্ন পঞ্চায়েত ভোটে এরাজ্যে ফলাফল কী হবে বেশ বুঝতে পারছে বিরোধীরা। এজেন্সি লাগিয়ে, তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তার করেও রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধার দূরঅস্ত। উল্টে বঙ্গ বিজেপিই ক্রমে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে জেলায় জেলায়। দক্ষিণবঙ্গে তো বটেই, বারবার রাজ্যভাগের কথা বলে উত্তরবঙ্গের মানুষের মনেও সীমাহীন বিরক্তির উদ্রেক করেছে গেরুয়া শক্তি। দিনের পর দিন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে মতুয়ারা ক্ষিপ্ত। রাজবংশীরা ক্ষুব্ধ। দলিত ও আদিবাসী সমাজ অসন্তুষ্ট। পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে এরাজ্যে দলের প্রভাব যে উত্তরোত্তর কমবে, সেব্যাপারে নিশ্চিত মুরলীধর লেন থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতারা। তৃণমূল ভেঙে রাজ্য জয়ের খোয়াব দেখাও শেষ। বরং যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁরা সবাই আবার জোড়াফুলের তলায় আশ্রয়প্রার্থী। তাই লম্বা চওড়া ভাষণ দিলেও দেওয়াল লিখন জলের মতো পরিষ্কার। এত কিছু করেও জননেত্রীর ভাবমূর্তিতে একটা আঁচড় পর্যন্ত দিতে ব্যর্থ এরাজ্যের রাম-বাম শিবির। আস্ফালনই সার। অমিত শাহ, নাড্ডা সাহেবদের আসা যাওয়া প্রায় নেই বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, শূন্যগর্ভ হুমকিতে বেঁচে আছেন তাঁরা। প্রায়শই বলছেন, ডিসেম্বরে দেখে নেব! পায়ের তলার মাটি আলগা হলে হতাশায় মানুষ ভুল বকে। বঙ্গ বিজেপিরও আজ সেই হতশ্রী দশা।
দেড় বছর আগের বিধানসভা ভোটে দলবদলুদের গ্যাস বেলুনের মতো ফুলিয়ে আর দেদার কালো টাকা ছড়িয়েও যে শেষরক্ষা হয়নি, তা সবার জানা। বুক ফুলিয়ে অমিত শাহের ২০০ আসন জেতার হুঙ্কার শেষ পর্যন্ত অধরাই রয়ে গিয়েছে বিধানসভা নির্বাচনে। বঙ্গ বিজেপির হাল সেই থেকে ক্রমেই শোচনীয়। ভাড়া করা নেতা আর বেইমানদের রথের সারথি করে কোনওকালেই যুদ্ধজয় সম্ভব নয়। সেই স্বপ্ন ধাক্কা খেতেই তৃণমূল ভাঙিয়ে সংগঠন তৈরির ছকও চুরমার। যোগদান মেলা করে যে আর বিশেষ সুবিধা হবে না, তা দিল্লি থেকে কাঁথি বিজেপির ছোট-বড়-মাঝারি নেতারা ভালো করে জানেন। উল্টে যাঁরা দল ছেড়েছিলেন, তাঁরা সবাই তৃণমূলে ফেরত চলে গিয়েছেন। বাকিরাও সাইডলাইনের ধারে অপেক্ষায়। একটা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে—ইস্যু যাই 
থাক, বাংলার শাসন ক্ষমতা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে সরানোর হিম্মত রাম-বাম কোনও দলেই এখনও নেই। কাঁথির ব্যর্থ যুবরাজ হতাশায় ভুগে নন্দীগ্রামকে অশান্ত করার চেষ্টা 
চালিয়ে যাচ্ছেন। আগুন লাগাচ্ছেন, অশান্তিতে ইন্ধন দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে তৃণমূলের সভামঞ্চে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আমরা এসবের সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে যেটা 
জানি তা হচ্ছে, ঘোলা জলেও আর মাছ ধরার 
শক্তি নেই বিজেপির ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ নেতাদের। তাই মরিয়া হয়ে রাজ্যে সরাসরি আগুন লাগাতে চাইছেন তাঁরা। শুধু এজেন্সি দিয়ে হচ্ছে না দেখে ভিন রাজ্য থেকে লোক ঢোকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
এত বড় ষড়যন্ত্র স্বাধীন ভারতে বাংলা ও বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে হয়নি। বারবার বলা হচ্ছে, ডিসেম্বরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরঙ্কুশ সরকারকে নাকি তাঁরা ফেলে দেবেন। কেন্দ্রের শাসক দলের প্রতিনিধিরা এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবিধানবিরোধী মন্তব্য করতে পারেন? একথার বাস্তব ভিত্তি কোথায়? ডিসেম্বরে বাংলায় কোনও নির্বাচন নেই। না লোকসভা, না বিধানসভা! গতকাল পাহাড়ে ঘেরা হিমাচলে ভোট হয়েছে। গুজরাতে হবে ডিসেম্বরের শুরুতে। তাহলে বাংলার মানুষ ও সরকারকে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া কেন? ওই দুই ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য মিলিয়ে ভোটের আগে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার মদ, মাদক ও নগদ কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে। ক’টা জায়গায় নোট গোনার মেশিন নিয়ে সিবিআই, ইডি হত্যে দিয়েছে? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তবে কি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছেড়ে একেবারে অসাংবিধানিক কায়দায় বাংলার শাসন ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র আঁটছেন দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গের নেতারা? কারণ তাঁরা বেশ বুঝতে পারছেন, চব্বিশের লোকসভা ভোটে দক্ষিণবঙ্গে পদ্ম ফোটানো ক্রমেই অসম্ভব হবে। গতবারের ফলটুকু ধরে রাখাই স্বপ্ন হয়ে থেকে যাবে।
দলগতভাবে রাজনৈতিক যুদ্ধে তৃণমূলের সঙ্গে এঁটে ওঠা সম্ভব নয় বুঝে গত জুন মাস থেকেই আয়কর ইডি ও সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে পুরোদমে রাজ্যে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। একের পর এক তৃণমূল নেতাকে হিসেব কষে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে জেলার জেলায় সংগঠনকে দুর্বল করতে। আইন আইনের পথে চলুক। তা নিয়ে আমাদের কিচ্ছু বলার নেই। দুর্নীতি করে থাকলে 
শাস্তি হোক। কিন্তু যখন দেখি অন্যান্য রাজ্যে ইডি সিবিআই সম্পূর্ণ ঠুঁটো, আর এরাজ্যে অতি সক্রিয়তার নামে তৃণমূলকে চেপে ধরার চেষ্টা চলছে, তখন প্রতিবাদ করতেই হয়। দেখেশুনে মনে হয়, গত 
ছ’মাস ধরে ইডি, সিবিআইয়ের কাজই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিক দিক থেকে টালমাটাল করে দেওয়া। কিন্তু বিচার শুরু না করে শুধু নেতাদের গ্রেপ্তার করে আর ভূরি ভূরি অভিযোগ এনে কোনও গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়া যায় না। ইন্দিরা গান্ধী অন্তত কয়েক ডজন রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে বদনাম কুড়িয়েছিলেন। তাঁর জরুরি অবস্থার সমালোচনা করে এখনও নিজেদের আসন সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন মোদি, অমিত শাহরা। তাহলে সেই একই দোষে বিজেপি আজ দুষ্ট হবে না কেন? নরেন্দ্র মোদির দলের বিরুদ্ধে এই প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে।
পঞ্চায়েত ভোটের আর বেশি দেরি নেই। সেখানেই ‘দুধ কা দুধ, পানি কা পানি’ হয়ে যাবে এই বাংলায়। বোঝা যাবে কার কত দম! এই মুহূর্তে বঙ্গ বিজেপির হাল ২১-এর নির্বাচনের আগের থেকেও খারাপ। চাপিয়ে দেওয়া রাজ্য সভাপতিকে কেউ মানেন না। তিনি গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল হয়েই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। দিলীপ ঘোষের অবস্থাও তথৈবচ। আর ঢাক-ঢোল পেটানো বিরোধী দলনেতার গা থেকে এখনও তৃণমূলের গন্ধ যায়নি। তাঁর ও তাঁর পরিবারের মধুমাস যে কেটেছে তৃণমূলে থেকেই, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিজেপির আদি নেতাদের মধ্যেই তাঁকে নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় আছে। এর বাইরে যাঁরা আছেন তাঁরা কেউ পাতে দেওয়ার মতো নন। একজন বলছেন, আসুন সব বিরোধী দল মিলে এক হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করব। কেউ পাত্তাও দিচ্ছেন না। বাম, কংগ্রেস ও অন্য ছোট দলগুলি কেউ বিজেপির ওই সাম্প্রদায়িক ফাঁদে পা দিতে প্রস্তুত নন। কারণ তারা জানে, তৃণমূল আছে বলেই তাদের পার্টি অফিসগুলো এই দুর্দিনেও সুরক্ষিত আছে। খোলা যাচ্ছে। গেরুয়া দল এলে পার্টি অফিসগুলি দখল হয়ে যাবে। আলিমুদ্দিনের ইটখোলার সেই দৃশ্য মানুষ চাক্ষুষ করবে টিভির পর্দায়। তাই বামেরা শূন্য হলেও বিজেপির লেজুড় হতে চাইবে না কখনও। কারণ তাতে জাতও যাবে, পেটও ভরবে না।
এ কথা ঠিক, গত কয়েক মাসে বাম নেতারা একটু গা ঝাড়া দিয়েছেন। বিশেষ করে যুব ফ্রন্ট সক্রিয় হচ্ছে। এটা ইতিবাচক ইঙ্গিত। সর্বত্র না-হলেও কয়েকটি বাছাই করা জেলা শহরে বামেদের পক্ষে সমর্থনও সামান্য বাড়ছে। একটা জিনিস স্পষ্ট, তৃণমূলের গেরুয়ামুখী ভাঙন যেমন আর সম্ভব নয়, তেমনি সিপিএম থেকে বিজেপির দিকে ভোট চলে যাওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তিও এবার বন্ধ। এবার তৃণমূল বিরোধী ভোট বাম ও  বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হবে। ফলে পঞ্চায়েত ভোট থেকেই দেখা যাবে, এ রাজ্যে ভোটের নিচুতলার সমীকরণ কেমন বদলে যাচ্ছে। যতদিন দিল্লির তখতে নরেন্দ্র মোদি আছেন, ততদিন রাজ্যের সংখ্যালঘুরা মমতার হাত ছাড়বেন না। এটা ধ্রুব সত্য। সিপিএমের ছোট-বড় নেতারা যতই আস্ফালন করুন, আর দ্বিগুণ উৎসাহে যুব নেতা ও নেত্রীদের পথে নামান, এই কথাটা তাঁরাও বিলক্ষণ জানেন। তাই তাঁরা তেমন কোনও উৎসাহ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, হিন্দু ভোটের যে মেরুকরণ ২১-এর নির্বাচনে বিজেপি করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল, তাও আর বিশেষ হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না। 
দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূল সামান্য কিছু সমর্থন হারালেও তা মূলত শহর ও লাগোয়া এলাকার প্রতিষ্ঠিত বাঙালির মধ্যে সীমাবদ্ধ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথী, কন্যাশ্রীর কদর এখনও গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ স্থান 
দখল করে আছে। গ্রামের মানুষ এটাও জানে, একমাত্র মমতাই শত বাধা উপেক্ষা করেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ ৬৯টি প্রকল্প চালিয়ে যাবেন। এই একের পর এক জনমোহিনী প্রকল্পগুলি এবারও বাংলায় গেরুয়া আগ্রাসন রুখে দেবে অবলীলায়। আর বামেদের লড়াই শূন্যের ‘অগৌরব’ ঘোচানোর, আপাতত তার বেশি কিছু নয়। ফলে লাভের লাভ কিছুই হবে না। রাজ্য রাজনীতির ভোট সমীকরণ আমূল বদলে যাওয়ার কোনও ইঙ্গিত এখনও নেই। শুধু দ্বিতীয় স্থানে বাম না বিজেপি, শুধু এটুকুই নিষ্পত্তির অপেক্ষা।

13th     November,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ