বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দাবিসর্বস্ব ‘চাঙ্গা অর্থনীতি’
শান্তনু দত্তগুপ্ত

আজকাল আমাদের মহামান্য ভারত সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে দেখে অসীম দাশগুপ্ত মহাশয়ের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। অসীমবাবুর বাজেট মোটামুটি ঘাটতি শূন্য হতো। অর্থাৎ, বছরের ব্যালান্স শিট কীভাবে যেন উনি বারবার মিলিয়ে দিতেন। অথচ, মাসের এক তারিখে তখন সরকারি কর্মীদের মাইনে হতো না, বেকারত্বে দেশের গড়কে পিছনে ফেলার ট্রেন্ড ছিল, নিত্য-নতুন শিল্প বাংলার দরজায় কড়া নাড়ত না। তারপরও অশোকবাবু ঘটা করে বিধানসভায় জানাতেন, ঘাটতি শূন্য বাজেট। বাম সরকারের বিদায়বেলায় দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাঁধে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি টাকার দেনা।
আকাশের গুমোট ভাব বাড়লে বিলক্ষণ বোঝা যায় বৃষ্টি হবে। তাতে আবহাওয়াবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কেউ যদি তারপরও দাবি করতে থাকে, ‘কোথায় গুমোট? এই তো সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, মনোরম ওয়েদার...।’ তাকে কী বিশেষণ দেওয়া চলে? নির্মলাদেবীও কতকটা তেমন প্রতিক্রিয়াই দিচ্ছেন। মূল্যবৃদ্ধির জ্বালায় সাধারণ মানুষ খাবি খাচ্ছে, পেট্রল-ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া, বেকারত্ব রেকর্ড গড়েছে... তারপরও আমাদের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলছেন, সব বিন্দাস! এমনকী ডলারের নিরিখেও নাকি টাকার দর বেশ স্থিতিশীল। আমরা সাধারণ মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। অর্থনীতির কীই বা বুঝি! কিন্তু পরিসংখ্যান দেখতে পাই। তার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। দেশবাসী কিন্তু দেখতে পাচ্ছে যে, ডলারের দাম ৮১ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। রোজ এক নতুন রেকর্ড। আর এর সোজা অর্থ, আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়া। 
ধরা যাক একটি উৎপাদন শিল্পের জন্য কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। অর্থাৎ ডলারের বিনিময়ে সেই জিনিসপত্র কিনতে হয় সংস্থাকে। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি যখন সেই মাল কিনত, এক ডলারের দাম ছিল ৬২ টাকা। অর্থাৎ, ১০ হাজার ডলারের কাঁচামাল কিনলে ভারতীয় মুদ্রা অনুসারে তাদের খরচ হতো ৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। আজকের দিনে সেই একই মাল কিনতে হলে সংস্থার খরচ হবে ৮ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। পাটিগণিতের হিসেবে শুল্ক বাদ দিয়েই দশ বছরে আমদানি খরচ বেড়ে গেল ৩০ শতাংশেরও বেশি। ভুললে চলবে না, সেই সঙ্গে অফিস-কারখানা চালানোর খরচ এবং কর্মীদের বেতনও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু দশ বছরে সেই পণ্যের দাম কতটা বেড়ে থাকতে পারে? খুব বেশি হলে ২৫ শতাংশ! সহজ সমীকরণে সংস্থাটি লোকসানে চলে গিয়েছে। তারা তো আর চ্যারিটি করছে না! অর্থাৎ, নিজের পকেট থেকে পয়সা দিয়ে তারা কারখানা চালাবে না, কর্মীদের মাইনেও দেবে না। ফলে তারা কী করবে? সরাসরি কমিয়ে দেবে কাঁচামালের আমদানি। তার জেরে কমবে উৎপাদন। তখন বহু কর্মীর হাতেই আর কাজ থাকবে না। সেক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত কর্মী সেই সংস্থা আর কিন্তু বেতন দিয়ে রাখবে না। চাকরি যাবে বহু মানুষের। এটা শুধু একটা সংস্থা নয়, এই প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করেছে দেশজুড়ে। ডলারের বিনিময়মূল্য ব্যাপারটা শুধু একটা নম্বর নয়, এর সঙ্গে সাধারণ অসংগঠিত শ্রমিকেরও স্বার্থ জড়িয়ে আছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। ডলারের বিনিময়মূল্য যত বাড়বে, ততই কমবে উৎপাদন। নতুন বিনিয়োগ হবে না। আর হাতে নগদের জোগান না থাকলে সাধারণ মানুষ কিনবে কী? সাদা চোখে এই সারসত্যটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্মলাদেবী বলছেন, আমাদের দেশের অর্থনীতিতে নাকি এর কোনও প্রভাবই পড়েনি। বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারও ভরপুর চাঙ্গা রয়েছে। এর কারণ কী? পরিস্থিতি থেকে নজর ঘোরানো? 
হয়তো সেটাই। কারণ ডলারের এমন দশা, অথচ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাতে হস্তক্ষেপ করছে না... এমন প্রবণতা অতীতে দেখা দেয়নি। ২০০৮ সালে চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও ভারতের অর্থনীতি এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েনি। তখন ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৪৩ টাকার আশপাশে। ডলারের দাম চড়তে থাকলেই সরকার কী করে? সোজা অঙ্কে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে শুরু হয় ডলার বিক্রি। ভারত ডলার বিক্রি করলে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার দাম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, কমবে ডলারের বিনিময়মূল্য। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারও চাঙ্গা হবে। অথচ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই পথে হাঁটছে না। তারা কিন্তু বারবার বলছে, মূল্যবৃদ্ধির হার নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রবণতা সামাল না দিতে পারলে আর্থিক বৃদ্ধি ধাক্কা খাবে। তাহলে সামলানোর উপায় কী? একটিই সমাধানসূত্র এখন পর্যন্ত আরবিআই দেখিয়েছে—রেপো রেট বৃদ্ধি। অর্থাৎ, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে সুদের ব্যাঙ্কগুলোকে ঋণ দেয়, তার হারটুকু বাড়িয়ে দেওয়া। এর ফলে সাধারণ মানুষের গাড়ি-বাড়ির ইএমআই বাড়ছে। কোভিডের পর সাধারণের সংসার খরচ বেড়েছে, বেতন কিন্তু বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দেওয়া মাইনে আর ফিরেও পাননি কর্মচারীরা। ইএমআই বেড়ে যাওয়া মানে সরাসরি সংসারে আঘাত। যাঁরা হয়তো এই পরিস্থিতিতেও ঋণ নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তাঁরা পিছিয়ে আসছেন। ফিক্সড ডিপোজিটের মতো সঞ্চয় প্রকল্পের সুদ সামান্য বাড়ছে ঠিকই, তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে এখনও এসে পৌঁছয়নি। এ না হয় গেল আম জনতার নানাবিধ চাপের ব্যাপারে। তাতেও দেশের অর্থনীতির কি কিছু সুরাহা হয়েছে? না হয়নি। কারণ, এতকিছুর পরও মূল্যবৃদ্ধির ঘোড়ায় লাগাম পরাতে পারেনি মহামান্য বিজেপি সরকার। উল্টে তারা এখন বলছে, মূল্যবৃদ্ধির দায় রাজ্য সরকারের। তাদের কিছু একটা করতে হবে। আর বাকিটা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক করবে। এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে, প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন মনমোহন সিং তো এমন দায়ঝাড়া কাজকর্ম করেননি! তাহলে বিজেপি শাসকের নয়া যুগে এটাও আচ্ছে দিনের অঙ্গ বলেই ধরে নিতে হবে? 
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বলেন, কংগ্রেস ৭০ বছর সরকারে থেকে কী করেছে? এ কথা ঠিক, কংগ্রেসের জমানায় জরুরি অবস্থা আছে, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি আছে, খানকতক যুদ্ধও আছে। কিন্তু তাও বলতে হয়, মোদিজি দেশ তো একদিনে তৈরি হয় না! আট বছরেও না। তাহলে সরকারে এসেই আপনি কংগ্রেসের সব সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে দিতেন। তা তো আপনি করেননি। বরং সেই সবেরই নাম বদলে আরও দ্বিগুণ উদ্যমে চালিয়ে গিয়েছেন। তা সে খাদ্য সুরক্ষা প্রকল্প হোক, ১০০ দিনের কাজ, কিংবা আবাস যোজনা... কংগ্রেসেকেই অনুসরণ করেছেন আপনি। যে ভিতের উপর দাঁড়িয়ে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন-ঘোষণা করেছেন, সেটাও তৈরি কংগ্রেসেরই এক অর্থমন্ত্রীর—মনমোহন সিং। আপনার তো সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য পাওয়া মাত্র দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর খোলনলচে বদলে দেওয়া  উচিত ছিল। সেটাও আপনি করেননি। হ্যাঁ, একটা বদল আপনি এনেছেন। কংগ্রেস জমানায় সংস্থা অধিগ্রহণ করত সরকার। এখন আপনি বিক্রি করছেন। তারপরও কিন্তু দেশের বেকারত্ব গত পাঁচ দশকের মধ্যে রেকর্ড। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কবে আপনার মুখে সাধারণ মানুষ কিছু শুনতে পেয়েছে? দিনক্ষণ মনে পড়ে না। আপনি তো লিডার! বিদেশের ভারতীয় দূতাবাসের কাছে বিস্ফোরণ হলে মাঝরাতে বিদেশ সচিবকে ফোন করেন। জিজ্ঞেস করেন তিনি জেগে আছেন কি না। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সময় রাতভর জেগে বসে থাকেন, খবর নেন খুঁটিনাটির। সন্ত্রাস, যুদ্ধ... এসব আপনার দু’চক্ষের বিষ। কিন্তু জীবনযুদ্ধে ধুঁকতে থাকা মানুষকে কেন কখনও জিজ্ঞেস করেন না যে, কত টাকা দিয়ে চাল কিনেছেন? ছ’মাস আগে কত দিয়ে কিনতেন? কেন প্রশ্ন করেন না সেই শ্রমিককে, মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যিনি কাজ হারিয়েছেন? কিংবা সেই সংস্থার মালিককে... ডলারের ঊর্ধ্বগতি যাঁকে পথে বসিয়েছে! বোধহয় সান্ত্বনা দেওয়ার মতো শব্দ নেই। আচ্ছা, একটা প্রশ্ন তো সাধারণ মানুষ আপনাকে করতেই পারে—আমাদের দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার কি সত্যিই এখনও শক্তিশালী আছে? থাকলে আপনার অর্থমন্ত্রক বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেন হাত গুটিয়ে বসে আছে? শ্রীলঙ্কা হয়ে ওঠার ভয়ে? 
বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে গেল, অথচ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াল না... এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হতে বেশি সময় লাগবে না। আমাদের সরকার তা বিলক্ষণ জানে। ইরানীয় বংশোদ্ভূত নুরিয়েল রুবিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, বিশ্বব্যাপী ‘কুৎসিত’ মন্দা আসতে চলেছে। তাঁর কথা ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ, ২০০৮ সালেও তিনি সতর্ক করেছিলেন বিশ্বকে। ফলে গিয়েছিল তাঁর আশঙ্কা। এবার তিনি যা বলছেন, তাতে বহু দেশেরই অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধসে পড়বে। তার মধ্যে ভারত নেই তো? সাবধান হওয়ার সময় এখনও আছে।

27th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ