বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিজেপির গিমিক পলিটিক্স
বনাম ‘লালগুণ্ডা’
তন্ময় মল্লিক

‘আমি ভয় করব না ভয় করব না। দু’বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এই কলিই হোক বঙ্গ বিজেপির থিম সং। তাতে হতাশাগ্রস্ত বিজেপি নেতৃত্ব হয়তো পঞ্চায়েত ভোটে লড়াইয়ের কিছুটা শক্তি পাবে। কারণ গেরুয়া শিবিরের কথাতেই স্পষ্ট, তারা হতাশায় ভুগছে। তা না হলে পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি জানাত না। কিন্তু 
কেন এই হতাশা? এবার আর সিপিএম তাদের 
‘ভোট শিফ্টিং’ করাবে না। ‘শূন্য’ বামেদের কাছে পঞ্চায়েত ভোটই শক্তি প্রমাণের সুবর্ণ সুযোগ। তাই তারা ভোট শিফ্ট করিয়ে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারতে চাইবে না। সেটা টের পাচ্ছে বিজেপিও। তাই কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি জানিয়ে পরাজয়ের অজুহাত তৈরি করে রাখতে চাইছে।
গিমিক পলিটিক্সে অভ্যস্ত বিজেপি ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি করে। বিভিন্ন সময় এক একটি ইস্যুকে ভাসিয়ে দিয়ে মানুষকে মাতিয়ে দেয়। কখনও ৩৭০ ধারা, কখনও এনআরসি, কখনও সিএএ, কখনও আবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। তা থেকেই তোলে রাজনৈতিক ফায়দা। তবে, সেটা অনেকে ধরে ফেলায় ক্ষমতা দখলের জন্য এখন ঘোড়া কেনাবেচার নীতিকে আঁকড়ে ধরেছে। আর সেই কাজে বিজেপির প্রধান হাতিয়ার কেন্দ্রীয় এজেন্সি। তবে, বেশি দুধের আশায় ক্রমাগত ইঞ্জেকশনের ‘সাইড এফেক্ট’ও মারাত্মক। সাময়িক লাভ পেতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে ফেলছে বিজেপি। তাতে দুর্বল হচ্ছে সংগঠন, বাড়ছে এজেন্সি নির্ভরতা। পঞ্চায়েত ভোট কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে করানোর দাবি বঙ্গ বিজেপির সেই দেউলিয়াপনাকেই করেছে প্রকট।
কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে ভোট করালে বিজেপির নেতাদের আস্ফালন বাড়ে, কিন্তু তাতে ভোট বাড়ে না। ভোটারদের গুলি করে মারলেও ভোটে জেতা যায় না। আর সেটা যায় না বলেই দেশে প্রথম হ্যাটট্রিক করা মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ বঙ্গে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেও বাংলার মানুষের রায় বদলে দিতে পারেননি। এমনকী নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, সিবিআই, ইডি পাশে থাকা সত্ত্বেও নয়। 
জনসমর্থন থাকলে যে বিরোধীরাও ভোটে বাজিমাত করে, তা পুরনির্বাচনে প্রমাণ করেছে তাহেরপুর। তাহেরপুরেও রাজ্য পুলিসের পাহারাতেই ভোট হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস দাঁত ফোটাতে পারেনি। কারণ সেখানে বামেদের সংগঠন ও জনসমর্থন ছিল অটুট। নেপাল মাহাতর সৌজন্যে ঝালদা পুরসভায় তৃণমূলের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর নিয়েছে কংগ্রেস। বিধানসভা ভোটে দু’টি দলই শূন্য। কিন্তু রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি একটি পুরসভাতেও সেই ফাইট দিতে পারেনি। 
মানুষের চাওয়ার উপরেই নির্ভর করে ভোটে হারজিত। তার প্রমাণ সদ্য হওয়া নন্দীগ্রামের ভেকুটিয়া সমবায় সমিতির নির্বাচন। ১২টি আসনের মধ্যে ১১টিতেই জয়ী হয়েছে বিজেপি। সমবায় নির্বাচনের দিন বুথের পাহারায় কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়, ছিল রাজ্য পুলিস। বিজেপির ভাষায় তৃণমূলের ‘দলদাস পুলিস’। তা সত্ত্বেও বিজেপি জিতল। কী করে? সমবায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তৃণমূল অপেক্ষা বিজেপি প্রার্থীদের যোগ্য মনে করেছেন। সুতরাং কেন্দ্রীয় বাহিনী বা পুলিস নয়, নির্বাচনে জয়লাভের আসল চাবিকাঠি জনসমর্থন। বঙ্গে বিজেপির সেটার বড়ই অভাব। দিন যত যাচ্ছে তাদের জনসমর্থন ততই কমছে। পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে পঞ্চায়েত ভোট করানোর দাবি।
বিজেপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। তাই বাংলায় পড়ে পাওয়া ষোলো আনা সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে বিজেপির। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা সিপিএম মাত্র ১১ বছরেই শূন্য। কেন এমন পাহাড়প্রমাণ ধস? কারণ বিপদের সময় কর্মীদের পাশে ছিল না নেতৃত্ব। ২০০৯ সালেই বেজে গিয়েছিল বামেদের বিদায়ঘণ্টা। তা সত্ত্বেও ২০১১ সালে বামেরা পেয়েছিল প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট। ক্ষমতাচ্যুত সিপিএম নেতারা ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই। কৃতকর্মের খেসারতের অঙ্ক কষে আতঙ্কিত নেতারা বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছা গৃহবন্দি জীবন। অসহায় কর্মীরা নেতৃত্বকে পাশে পাননি। সেই সুযোগেই বিজেপি আজ প্রধান বিরোধী। 
একুশের নির্বাচনে বিজেপি নেতাদের গরম গরম ভাষণে দলের অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বাংলা তাঁদের হাতের মুঠোয়। দিল্লির দম খেয়ে ছুটিয়েছিলেন হুমকির ফোয়ারা। নির্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়ায় তাঁদের অবস্থাই হয়েছিল সবচেয়ে বেশি করুণ। কিন্তু রাজ্য নেতৃত্বকে পাশে পাননি। তাই আক্রান্তরা কেউ ছেড়েছিলেন ঘর, কেউ বাধ্য হয়েছিলেন আত্মসমর্পণে। ফলে বামেদের ছেড়ে আসা কর্মী-সমর্থকরা বিজেপিকে ভরসা করে আঙুল কামড়েছেন। বিপদের সময় কর্মীদের পাশে না থাকলে কী হয়, সেটা সিপিএমকে দেখে গেরুয়া শিবিরের শেখা উচিত ছিল। সেই শিক্ষা বিজেপি নিলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি করতে হতো না। 
৩৪ বছর একটানা রাজ্যপাট চালানোয় বহু সিপিএম নেতার ক্ষমতায় থাকাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এখন তাঁদের দমবন্ধ অবস্থা। জীবিত অবস্থায় ফের ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য শুরু হয়েছে ছটফটানি। তাই ভাঙচুর করে, পুলিস পিটিয়ে বিজেপিতে যাওয়া কর্মীদের ফেরাতে চাইছেন। বর্ধমানের ভাঙচুর তারই বহিঃপ্রকাশ। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন খোদ রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। কিন্তু তাতে যে হার্মাদদের অত্যাচারের স্মৃতি মানুষের মনে নতুন করে ফিরে এল, সেটা নেতৃত্ব উপলব্ধি করতে পারল না। 
সিপিএম নেতারা বুঝতে পারছেন না, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’ স্লোগান এখন ব্যাক ডেটেড। মহামারীর সঙ্কটও বাংলার মানুষকে শেষ করে দিতে পারেনি। কারণ পাশে আছে বিনা পয়সার রেশন, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, বার্ধক্য ভাতা, শিল্পীভাতা। আর আছে স্বাস্থ্যসাথী।
একই ইস্যুতে সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠন কলকাতায় মিছিল করল। সভার ভিড় হয়েছিল ভালোই। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়রা চাইলেই সেদিন কলকাতায় বিজেপির চেয়ে বেশি অশান্তি করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। কারণ মিছিলে ভিড় হলে নজরকাড়ার জন্য ভাঙচুরের দরকার হয় না। সেলিম সাহেবরা যা পারেননি, সেটা করে দেখালেন তাঁরই দলের ছাত্র-যুবরা।
বামেদের যুবনেতারা কেন্দ্রীয় বাহিনীতে নয়, ভরসা রেখেছেন বুথ ভিত্তিক সংগঠনে। তাঁরা বয়সে নবীন। হয়তো সেই কারণে শূন্য থেকেই লড়াইটা শুরু করতে চাইছেন। অবশ্য সেটা তাঁদের মুখের কথা কি না, তা বলবে সময়। তবে চেষ্টা করছেন। আর তাতেই চটেছে বঙ্গ বিজেপি। সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘বামেদের হাতে অনেক লালগুণ্ডা এখনও আছে। ওদের দিয়েই হয়তো বুথ রক্ষার কথা ভাবছে। আমাদের তো ওসব নেই। তাই কেন্দ্রীয় বাহিনীর কথা বলছি।’
২০১৯ সাল থেকে এপর্যন্ত বাংলায় হওয়া নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণ হয়েছে, বিরোধী ভোট ভাগাভাগি হচ্ছে মূলত বিজেপি ও সিপিএমের মধ্যে। এক দলের ভোট বাড়লে অন্য দলের কমে। কিন্তু তৃণমূলের ভোট মোটামুটি অটুট। এই পরিস্থিতিতে সিপিএম বুথ ভিত্তিক সংগঠনে নজর দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বিজেপির। সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই সুকান্তবাবু বলেছেন, ‘বামেদের হাতে অনেক লালগুণ্ডা এখনও আছে’। এতদিন কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের মুখে এসব কথা শোনা যায়নি। উল্টে তৃণমূলকে হেয় করার জন্য বামেদের দেওয়া হতো দরাজ সার্টিফিকেট। 
শত্রুর শত্রু, আমার বন্ধু। এই নীতিতেই বিজেপি ও সিপিএমের মধ্যে গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক বোঝাপড়া। এক সুরে বাঁধা ছিল মমতা বিরোধী লড়াই। বিজেপিকে দিয়েই সিপিএম তাদের ‘পথের কাঁটা’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাতে চেয়েছিল। তাই শুরু হয়েছিল গোপন ক্যাম্পেন, ‘একুশে রাম ছাব্বিশে বাম’। তার পরিণতি? বিজেপি ৭৭, সিপিএম জিরো। 
ক্ষমতায় ফেরার নেশায় বুঁদ ‘বৃদ্ধ সিপিএম’ বিজেপির ঘাড়ে বন্দুক রেখে ফায়ার করতে গিয়ে হাতিয়ারটাই তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। বিজেপির ঘরে গচ্ছিত সেই ‘ধন’ ফেরানোই ‘তরুণ সিপিএম’ এর চ্যালেঞ্জ। এবারের পঞ্চায়েত ভোটে হবে তার লড়াই। সেই জন্যই শঙ্কিত বঙ্গ বিজেপির চোখে ‘ভালো সিপিএম’ এখন ‘লালগুণ্ডা’।

24th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ