বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি, সর্বোচ্চ
বেকারত্ব, ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ
সমৃদ্ধ দত্ত

দৈনিক বাজারের জায়গাটা সমাজকে পর্যবেক্ষণের সম্ভবত সবথেকে সেরা গবেষণাগার। সেখানে তীক্ষ্ণভাবে পারিপার্শ্বিক লক্ষ করলে সমাজের সহানুভূতি, ধৈর্য, অসহিষ্ণুতা, অহং, শ্রেণি বিভাজন, সঙ্কুচিত মানুষ, উদার মানুষ, দাম্ভিক, শব্দ ব্যবহারের কুশলতা অথবা নির্বুদ্ধিতা ইত্যাদি ব্যক্তিগত আচরণের প্রকাশকে দেখা যায়। বাজারের চরিত্রটি খুবই রহস্যময়। একশ্রেণির মানুষ থাকেন, যাঁরা সর্বদাই পিন্টু অথবা আসলামের থেকে মাছ কেনেন। তাঁরা বলেন, ও আমাকে খারাপ মাছ হলে দেয় না। বলে দেয়,  কাকু, আজ মাছটা ভালো নেই। তাই ওটা দিচ্ছি না। এরকম সময় কাকুদের কাছে রহস্যজনক প্রশ্ন হল, তাহলে ওই খারাপ মাছ পিন্টু বা আসলাম কাকে দেবে? সে কি ফেলে দেবে? নাকি আনকোরা কোনও খুচরো ক্রেতাকে গছিয়ে দেবে? বাঁধা খরিদ্দারকে দিল না, অচেনা এবং অনিয়মিত ক্রেতাকে দিয়ে দেয়? কিন্তু সেটা তারা কেন করবে? সেটা করলেও তো তার ইমেজের ক্ষতি হবে। সেই ক্রেতা বদনাম করতে পারে। আর কোনওদিন আসবে না। পরিচিতদেরও বলে দেয়। তাই রহস্যটা আর জানা হয় না যে, সেই খারাপ মাছ কোথায় গেল? বাঙালির অন্যতম সেরা দুটি আলোচনা শুরু হয় মার্চ এপ্রিল থেকে। শেষ হয় সেপ্টেম্বর মাসে। আম এবং ইলিশ নিয়ে। দুটোই বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রেও চেনা বিক্রেতার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল আমরা। পিন্টু অথবা আসলামের কাছে খয়রা মাছও আছে, ইলিশও আছে। আমরা দুজন পাশাপাশি যখন দাঁড়িয়ে একজন ইলিশ কিনি আর অন্যজন খয়রা মাছ কিনি, তখন কি সামান্য হলেও একটা বৈষম্যের আভাস ঘুরে বেড়ায় ক্রেতা বিক্রেতাদের মনে? আমরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালে দেখতে পেতাম যে, খুব দামি ইলিশ যেখানে বিক্রি হয়, সেখানে আজ পর্যন্ত কিছু মানুষ কোনওদিন যাননি। তাঁদের প্রিয় শব্দ হল, সস্তা। যে কোনও পণ্য সস্তা হলে তাঁদের স্বস্তি হয়। কিন্তু যাঁরা গত বছরও ইলিশ কিনেছেন, তাঁরাও এবার হিসেব করে গোটা মরশুমে হয়তো তিনবার মাত্র কিনেছেন। যতই দিন যাচ্ছে, ততই দামি ইলিশ, পোস্ত। উচ্চমূল্যের ফল খাওয়ার স্বপ্ন থেকে বহু মানুষ সরে যাচ্ছেন অন্যদের অজান্তে। বাজারে গেলে লক্ষ করা যায়, ক্রেতাদের মনোভাবের বদল ঘটছে। বাজার ও মুদিখানায় বিগত কিছু বছর ধরে ক্রমেই আইটেমের তালিকা কমছে। হঠাৎ করেই কিছু কিছু চেনা ক্রেতার কাগজের লিস্টে ভোজ্য তেলের পরিমাণ সামান্য কমে যায়। বিক্রেতা লক্ষ করেন। কিছু বলেন না। আগে নিয়ম করে পোস্ত নেওয়া হতো। এখন কয়েকমাস ধরে আর নেওয়া হচ্ছে না। যে মানুষটি আগে বেশ দাপটের সঙ্গেই হাসিমুখে গল্প করতে করতে বাজার করতেন, তিনি আজকাল যেন দ্রুত বাজার সেরে চলে যেতে পারলে স্বস্তি পান। কারণ, তাঁর কেনাকাটা এবং সম্মানে আঁচ ফেলছে বাজারের দাম। 
বিভিন্ন অফিসপাড়া তো বটেই, শহর, গঞ্জ, মহকুমার ব্যস্ত এলাকায় সবথেকে দ্রুত হারে যা বেড়ে চলে, তা হল স্ট্রিটফুডের দোকান। মাঝেমধ্যেই একটি করে নতুন স্ট্রিটফুড স্টল। দোকান অথবা স্টল শব্দটি শুনতে ভালো। আসলে একটা ছোট্ট ঠেলা অথবা টেবিল। সঙ্গে একটা পেল্লায় ছাতা। এসব জায়গায় ভিড় উপচে পড়ে। কারণ কী? কারণ, সস্তায় অন্তত দুপুরের জন্য পেট ভরে যাওয়ার মতো কিছু না কিছু খাবার পাওয়া যাবে। যাঁরা বিক্রেতা তাঁরা অন্য কাজ না পেয়ে এই পথ নিয়েছেন। আর যাঁরা ক্রেতা তাঁরা পকেটের কথা ভেবেই চেষ্টা করেন যতটা সম্ভব কম পয়সায় দিনের খাবার আর যাতায়াত খরচটা বেঁধে রাখতে। কারণ, সামান্য বেতনে তাঁদের কাজ করতে হয়। 
ভারতের সবথেকে বড় বিপদ হল এই দুটি। এরকম বিপজ্জনক কম্বিনেশন বহু বছর পর আমাদের গ্রাস করেছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি, আবার সর্বোচ্চ বেকারত্ব, এটা যে কোনও দেশের অর্থনীতি শুধু নয়, সমাজের পক্ষেও ভয়ঙ্কর এক প্রবণতা। ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সময়সীমায় কেন্দ্রীয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা অথবা এজেন্সিতে চাকরি পাওয়ার জন্য মোট সাড়ে ২২ কোটি যুবক-যুবতী আবেদন করেছিল। চাকরি হয়েছে মাত্র ৭ লক্ষ ২২ হাজারের। অনুপাতটা ভয়াবহ! ২২ কোটির বেশি আবেদন করে চাকরি হয়েছে ৭ লক্ষ! এই বছর রেলের গ্রুপ ডি লেভেল ওয়ান পদের চাকরিতে ১ লক্ষ ২৪ হাজার শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। আবেদন জমা পড়েছে দেড় কোটির বেশি। আজ থেকে নয়। এই নিয়োগ থমকে আছে ২০১৯ সাল থেকে। এর মধ্যে কোটি কোটি ছেলেমেয়ের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে চাকরির পরীক্ষায় বসার। 
সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) প্রতি মাসে রিপোর্ট প্রকাশ করে বেকারত্বের। আগস্ট মাসে ভারতে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে প্রায় ৯ শতাংশে। যা বিগত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০ এবং ২০২১ সাল করোনাকাল ছিল। অর্থনীতি, আর্থিক লেনদেন, কাজের সুযোগ অনেকটাই ছিল থমকে। অথচ ২০২২ সালের আগস্ট মাস তো সেরকম নয়। তা সত্ত্বেও ২০২২ সালের আগস্ট মাসের দুটি রিপোর্ট দেশের পক্ষে মারাত্মক বার্তা বহনকারী। বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। আবার মূল্যবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ। 
কেন আরও বেশি ভয়ঙ্কর এই কম্বিনেশন? কারণ, বেকারত্ব যেখানে সর্বোচ্চ এবং মূল্যবৃদ্ধির হারও চরম পর্যায়ে, সেখানে একের পর এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে আরও এক মারাত্মক চিন্তাজনক ঘটনা। সেটি হল, যাঁরা কর্মরত, অর্থাৎ একটি কোনও পেশায় যুক্ত, এরকম একটি বিরাট অংশের বার্ষিক আয় কমেই চলেছে। পিপলস রিসার্চ অন ইন্ডিয়াজ কনজিউমার ইকনমি যে সমীক্ষা করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৫ সাল থেকে দেশের সবথেকে গরিব শ্রেণির মধ্যেও যাঁরা দরিদ্রতম, সেই ২০ শতাংশের আয় ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। দ্রুতগতিতে। কিন্তু সেই প্রবণতা এখন থমকে গিয়েছে। বরং উদ্বেগজনকভাবে ২০২১ সাল থেকে এই অংশের বার্ষিক গড় আয় ৫৩ শতাশে কমে গিয়েছে। পক্ষান্তরে সবথেকে ধনী ২০ শতাংশের বার্ষিক আয় ঠিক ওই সময়সীমায় ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। গরিব, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত—এই তিন ক্যাটাগরির মধ্যে প্রথম দুই ক্যাটাগরির আয় কমেছে ৫৩ ও ৩৩ শতাংশ। মধ্যবিত্তের আয় কমেছে ৮ শতাংশ। সোজা কথায় গরিব আরও গরিব হচ্ছে। ধনী আরও ধনী হচ্ছে। মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। সরকার ২০২২ সালকে প্রচার করছে অমৃতকাল আখ্যা দিয়ে। এই যদি অমৃত হয়, গরল কাল কাকে বলে? কারণ, সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি, সর্বোচ্চ বেকারত্ব এবং জীবিকা থাকা সত্ত্বেও আয় কমতে থাকা, এই তিন প্রবণতা আমাদের আড়ালে এক সম্পূর্ণ বৈষম্যের আগ্নেয়গিরির জন্ম দিচ্ছে। প্রবল এক রাগ জমে উঠছে সমাজে। যার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাবে আমরা জানি না। অস্থিরতা, আইন না মানা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্রোধ, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, এরকম মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায় সামান্য কোনও ইস্যুতে কোথাও গোলমাল হলে। রাস্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামবদলের ছেলেমানুষি অনেক হয়েছে। ধর্ম নিয়ে প্ররোচনার রাজনীতিও অনেক হল। এবার রাজ্যগুলিকে ডেকে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত মূল্যবৃদ্ধি আর বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের রাস্তা খোঁজা। তবে প্রশ্ন হল, তারা কি সমাধান চায়? 
অর্থমন্ত্রকের ইকনমিক সার্ভে অনুযায়ী, ভারতে একটি কৃষক পরিবারের মাসিক গড় আয় ১০ হাজার ২১৩ টাকা। আশাকর্মীদের মাসিক গড় আয় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা (ইনসেনটিভ নিয়ে)। কয়েকবছর আগে আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি একটি সমীক্ষা করেছিল। স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া। সেখানে চিত্রটি ছিল বিপজ্জনক। ভারতে ৫০ হাজার টাকার বেশি আয় করে এরকম কর্মীদের শতকরা হার ১.৬ শতাংশ। নিয়মিত জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, এরকম কর্মীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের গড় আয় ১০ হাজার টাকা! গড়ে চারজনের পরিবারের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক, বিনোদন ১০ হাজার টাকায়? কীভাবে সম্ভব? অমৃতকালে ভারতের রহস্যকাহিনি এটাই! 

16th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ