বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

এই অপরাধের শেষ কোথায়?
শান্তনু দত্তগুপ্ত

আতিক-উর-রহমান কে? 
ঠিক দু’বছর আগের কথা। ১৯ বছরের দলিত কিশোরীকে গণধর্ষণ এবং খুনের অভিযোগ। ঘটনাস্থল, হাতরাস। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী মহল। হাতরাসের পথে চলেছিলেন তাঁরাও। সিদ্দিক কাপ্পান, মাসুদ আহমেদ, মহম্মদ আলম এবং আতিক-উর-রহমান। মথুরা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিস। অভিযোগ কী? হাতরাসে গণ্ডগোল বাঁধাতে যাচ্ছিলেন তাঁরা। লক্ষ্য, সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া। হলই বা সবটা সন্দেহ। তাতে তো আর দেশদ্রোহীর ট্যাগ লাগানোয় বাধা নেই! এই চারজনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ চার্জ দিল যোগীর পুলিস। ধারা চাপল দেশদ্রোহিতা, জাতিগত দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মে আঘাত হানার। পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তি আইনের তিনটি ধারা তো রয়েইছে। কিন্তু সত্যিকারের অপরাধ কী? স্বাধীন মত প্রকাশের ইচ্ছা! অন্যায় দেখলে গলা উঁচিয়ে বলে ফেলা... এটা ঠিক হচ্ছে না। কয়েকটি কাগজ উদ্ধার হয়েছিল তাঁদের কাছ থেকে। তাতে লেখা ছিল, জাস্টিস ফর হাতরাস। ব্যস! এতেই তাঁরা দেশদ্রোহী। 
হাতরাসের স্মৃতি ফিকে হতে শুরু করেছে। আমরা এখন আর খোঁজ রাখি না ওই কিশোরীর পরিবারের। কেমন আছেন তার বাবা, মা, ভাই...। আমরা কি খোঁজ রেখেছি কাপ্পানের? কিংবা আতিকের? মহম্মদ আলমের জামিন দিয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। গত ২৩ আগস্ট। এবার জামিন হয়েছে কাপ্পানের। আতিক-উর-রহমান কিন্তু এখনও জেলে। মাত্র ২৮ বছর বয়স। হৃদযন্ত্রের জটিল রোগে আক্রান্ত। হার্টের একটি ভালভ ঠিকমতো বন্ধ হয় না তাঁর। যথাযথ চিকিৎসা এবং ওষুধ না পড়লে মৃত্যু ঘনিয়ে আসাটা কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। তা সত্ত্বেও জামিন পাননি আতিক। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর চিকিৎসার সুযোগটুকু ছিনিয়ে আনতে পেরেছিলেন স্ত্রী সঞ্জিদা। জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, তারপর নিম্ন আদালতে... ‘দেশদ্রোহী’ স্বামীর জন্য ভাবনার সময় ছিল না তাদের। বারবার কাতর আর্জি জানিয়েছেন, আমার স্বামীর চিকিৎসা দিল্লির এইমস ছাড়া সম্ভব নয়। দয়া করে মঞ্জুর করুন। ডাক্তার বলেছিল, দু’লক্ষ টাকা লাগবে। অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি। শুধু অনুমতিটুকু দিন। আড়াই মাস ধরে জেল হাসপাতালে পড়ে থাকার পর এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে অর্ডার নিয়ে আসেন সঞ্জিদা। আইনজীবী কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, কী চায় প্রশাসন? আর একটা স্ট্যান স্বামী? মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি।
অপরাধী কাপ্পানও। 
কারণ তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ওই দলিত নির্যাতিতার পরিবার যেন বিচার পায়। সেটাও ছিল ভাবনায় সীমাবদ্ধ। বলে উঠতে পারেননি, পৌঁছতে পারেননি হাতরাসে। ঘটনাস্থলের ৪২ কিলোমিটার দূর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গী আরও তিনজনকে। দু’টো বছর অনেক সময়। কিন্তু এই ৭৫৮ দিন পরও কি কাপ্পান বা আতিকদের বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ করতে পেরেছে পুলিস? উত্তর হল, না পারেনি। অর্থাৎ, এই দু’টো বছর তাঁরা শুধুমাত্র সন্দেহের বশে জেলের ঘানি টেনেছেন। তাও সেই সন্দেহ দেশদ্রোহিতার, দাঙ্গা বাঁধানোর। মনে পড়ে সেই ঘটনা? ঠাকুর সম্প্রদায়ের চার ব্যক্তি গলায় ওড়নার ফাঁস পেঁচিয়ে টেনে হিঁচড়ে খেতের মাঝে নিয়ে গিয়েছিল তাকে। তারপর গণধর্ষণ। মেরুদণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় চিড় ধরেছিল ওই কিশোরীর। তা সত্ত্বেও পুলিস বিশ্বাস করতে চায়নি। অভিযোগ নেয়নি যোগীরাজ্যের চাঁদ পা থানা। কিন্তু ঘটনার আগুন ছাইচাপা দেওয়া যায়নি। গোটা দেশের ধিক্কারে অভিযোগ নিতে বাধ্য হয়েছিল যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন। কিন্তু বাঁচানো যায়নি কিশোরীকে। ১৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর দিল্লির হাসপাতালে নিথর হয়েছিল তার শরীর। এরপরও থেমে যায়নি ঘটনাক্রম। রাতের অন্ধকারে পরিবারের সম্মতি ছাড়াই পুলিস দাঁড়িয়ে থেকে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছিল সেই নির্যাতিতার। কেন? কারণ সে যে দলিত! উত্তরপ্রদেশের সমাজ ব্যবস্থায় তার মতো একটা প্রাণের থেকে উচ্চবর্ণের চার বজ্জাতের সম্মান 
অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। এই অন্যায় কি ধর্ষণের থেকে কম গুরুতর? 
অপরাধ কী ছিল তিস্তা শীতলবাদের?
গুজরাত পুলিস বলে, ২০০২ সালের গোধরা পরবর্তী সংঘর্ষের তদন্তকে ভুল পথে চালিত করেছেন তিনি। নির্দোষ লোকজনকে ষড়যন্ত্র করে জেলে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেটা আবিষ্কার হতে এত বছর কেন লাগল? আর খুব কাকতালীয় হলেও সত্যি, গুজরাত দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদিকে সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দেওয়ার পরদিনই গ্রেপ্তার তিস্তা! সবরমতী এক্সপ্রেসের সেই হত্যাকাণ্ড এবং তারপর জাতিগত সংঘর্ষ... দেশভাগের দাঙ্গার পর ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষত গুজরাত। ঘরে ঘরে গিয়েছিলেন তিস্তা... তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর তুলে ধরেছিলেন একের পর এক সংঘর্ষ বিধ্বস্ত মানুষের কাহিনি। কিন্তু নাঃ, তার একটিতেও সরকারের জয়গান ছিল না। তাই বিশ বছর পরে হলেও জেলের মুখ দেখতে হল তাঁকে। সাতদিন পুলিস হেফাজত, আর তারপর ৬৩ দিনের জেল। বিচারাধীন বন্দি। কিন্তু এই ৭০ দিনে তাঁকে জেরা করা হল কতবার? মাত্র একবার। মারাত্মক অভিযোগ তো তাঁর বিরুদ্ধে! বড়সড় তদন্ত বলেই না শেষ রাতে, বিনা ওয়ারেন্টে, ঘরে ঢুকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল! প্রথমেই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ফোন। কথা বলতে দেওয়া হয়নি আইনজীবীর সঙ্গেও। তারপর ধাক্কা মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। ভোর ৬টার সময় তিস্তা শীতলবাদকে এনে তোলা হয়েছিল আমেদাবাদ ক্রাইম ব্রাঞ্চের দপ্তরে। এতকিছুর পরও কেন এমন এক অপরাধীকে দফায় দফায় জেরা করার কথা মনে হল না গুজরাত পুলিসের? বরং তাঁর জায়গা হল ৬ নম্বর বারাকে। সঙ্গী, একজন অন্তঃসত্ত্বা সহ ২৪ জন মহিলা এবং ৭ জন শিশু। প্রত্যেকেই বিচারাধীন। কিন্তু তিস্তার অপরাধ যে সবচেয়ে গুরুতর... রাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা।
কাপ্পানের মুক্তির সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘প্রত্যেক মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। নিগ্রহ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলে সে যদি ন্যায়বিচার চায়, তাতে দোষ নেই। তাহলে আইনের চোখে মত প্রকাশ অপরাধ হয় কীভাবে?’ সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের এই সারমর্মটা বোঝে। কিন্তু রাষ্ট্র যে বোঝে না! এদেশে এখন মত প্রকাশ করাটাই অপরাধ। সরকারের সমালোচনা করা আরও গুরুতর। তাই নির্ভয়ার জন্য যখন ইন্ডিয়া গেটের সামনে মোমবাতি মিছিল বের হয়, তা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। কিন্তু হাতরাসের জন্য যখন কাপ্পান বা আতিকরা ন্যায়বিচার চান, সেটা দেশদ্রোহ। 
আতিকের জন্য আবেদন জানাতে গিয়ে আইনজীবী বলেছিলেন, ‘সব রিপোর্ট পাওয়ার পরও যদি তাঁকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া না হয়, তা হবে মানব সমাজের ইতিহাসে কঠিনতম শাস্তি—বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড’। এলাহাবাদ হাইকোর্ট জেল কর্তৃপক্ষকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিল। বলেছিল, যেভাবে হোক এই দু’দিনের মধ্যে আতিককে এইমসে ভর্তি করতে হবে। পরদিন সকাল ৭টায় ফোন পেয়েছিলেন আইনজীবী—‘জেল থেকে আতিক-উর-রহমানকে এইমসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চিকিৎসার জন্য’। কিন্তু জামিন? এখনও না। 
এ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। গান্ধীজির তিন বাঁদরের ভূমিকা ছিল তিন রকম। আমাদের অধিকাংশ কিন্তু ওই তিনটিরই কম্বো। সরকারের বিরুদ্ধে দেখা, শোনা এবং বলা—তিনটিই আমাদের কাছে পাপ। রাষ্ট্রের সমালোচনা করা মানে তার বিরোধিতা নয়, বরং ভুল ধরিয়ে দেওয়া। গণতন্ত্রের সেটাই রীতি। ভুল জানলে তা শোধরানো যায়। কিন্তু সমালোচকের প্রতিবাদী কণ্ঠ চেপে ধরলে? হত্যাকাণ্ড। গণতন্ত্রের। 
তাহলে অপরাধী কে? শাসক, নাকি শোষিত? নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া সব কণ্ঠেই জমাট বাঁধছে এই প্রশ্ন। উত্তর মোদি সরকারের কাছে আছে তো? 

13th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ