বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

পুষ্টির প্রতিশ্রুতি
বনাম বাস্তবের অপুষ্টি
সমৃদ্ধ দত্ত

মে মাসে ইউনিসেফ একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছিল। সেখানে একটা টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে। সিভিয়ার ওয়েস্টিং। যাকে সরল সংজ্ঞায় বলা হয়ে থাকে সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন। অর্থাৎ পুষ্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভাব। এই পুষ্টির সর্বোচ্চ অভাবে ভোগা পাঁচ বছর বয়সের কম যত শিশু বিশ্বে আছে, সেই রাষ্ট্রগুলির তালিকায় শীর্ষে ভারত। ইউনিসেফ এই ধরনের সমীক্ষাকে পরিভাষায় বলে থাকে ‘চাইল্ড অ্যালার্ট’। ২০২২ সালের মে মাসের এই ‘চাইল্ড অ্যালার্টে’ ইউনিসেফ বলেছে, ভারতে এরকম সিভিয়ার ওয়েস্টিং-এর আওতায় থাকা পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যা ৫৭ লক্ষ ৭২ হাজার ৪৭২। ইউনিসেফের কথায়, বিশ্বে প্রতি পাঁচটি শিশু মৃত্যুর মধ্যে গড়ে একটি হয় অপুষ্টির কারণে। ‘সিভিয়ার ওয়েস্টিং’ কথাটির অর্থ হল, বয়স অনুপাতে কম ওজন এবং কম উচ্চতা। এবং অপুষ্টিজনিত অসুখ তৈরি হওয়া। ভারতের প্রথম ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ভারতের অর্ধেকের বেশি চার বছরের কম বয়সি শিশুই কম ওজনের এবং অপুষ্টিতে ভুগছে। 
ঠিক ৩০ বছর পর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমীক্ষা বলছে বিশ্বে সব রাষ্ট্রের তুলনায় ভারতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ বহু সরকারি প্রকল্প এসেছে। কার্যকর করা হচ্ছে। কিন্তু চিত্র বিশেষ বদলাচ্ছে না। কারণ কী? একমাত্র কারণ, নানাবিধ হাততালি বান্ধব, চটকদার এবং প্রচারসর্বস্ব প্রকল্পগুলির তুলনায় এই বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। যাকে বলা হয় ‘মিশন মোড’, সেভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং মিড ডে মিলের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়! আশাকর্মীদের বেতন বাড়ে না। বেছে বেছে আম জনতার খাবারের দাম বেড়ে যায় অজানা রহস্যে। 
স্বাভাবিকভাবে এই পরিসংখ্যানের একটি উত্তর হল, ভারতের জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাই ভারতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যাও বেশি। খুব সঙ্গত যুক্তি। কিন্তু ঠিক এই যুক্তির পাশেই এসে বসে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স। অর্থাৎ বিশ্ব ক্ষুধা সূচক। এই সমীক্ষা দেখায়, কোন দেশে ক্ষুধায় দিনযাপন করা মানুষের সংখ্যা কত। ২০২১ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে ১১৬ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান একেবারে নিম্নসারিতে। ১০১তম স্থান ভারতের। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে দিনযাপন করা মানুষের শতাংশের বিচারে ভারতের স্থান চরম উদ্বেগজনক। যদিও ভারত সরকার স্পষ্ট বলেছে, এই পরিসংখ্যান তারা স্বীকার করে না। কারণ গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স যে তথ্য পরিসংখ্যানকে ভিত্তি করে তাদের তালিকা তৈরি করে, সেটিই নাকি ভুলে ভরা। সর্বশেষ তথ্য ও নথি ব্যবহার করা হয় না। সুতরাং আপডেটেড নয়। 
হঠৎ ভারতের শিশুদের পুষ্টি নিয়ে এখন এই আলোচনার কারণ কী? এসব তথ্য তো সর্বজনবিদিত! কারণ হল, এই যে সেপ্টেম্বর মাস চলছে, এটা পুষ্টি উন্নয়ন মাস হিসেবে পালিত হচ্ছে ভারতে। রেডিওতে ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা করেছেন। এতদিন ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বরকে পুষ্টি উন্নয়ন সপ্তাহ হিসেবে পালন করা হয়েছে। এবার আর নিছক এক সপ্তাহ নয়। গোটা মাসই পুষ্টির মাস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে যে, পুষ্টি উন্নয়ন মাসে ভারতের পুষ্টির অবস্থাটি ঠিক কী। সাধারণ মানুষের পুষ্টি বাড়ানোই এই ঘোষণার লক্ষ্য। ঠিক এই সময়ই একটা আশ্চর্য প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। এই বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। সেটি হল, ভারতে যত মূল্যবৃদ্ধি হয়ে চলেছে, তার সিংহভাগ কারণ খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। আর তার থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হল, সবথেকে বেশি হারে প্রায় রকেটের গতিতে বেড়েছে প্রোটিন ইনফ্লেশন। অর্থাৎ যে খাদ্যগুলিতে প্রোটিন থাকে। যেমন? ডিম, ডাল, দুধ, মাছ, মাংস। এবং সব্জিও। যে কোনও মাসের খুচরো এবং পাইকারি মূল্য সূচক পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে, প্রত্যেক মাসেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সর্বদা এই খাদ্যপণ্যগুলির। কোন কোন পণ্যের দাম আগের থেকে কমে যায়? ভোগ্যপণ্য। মোবাইল, এসি, ৫০ ইঞ্চি টিভি ইত্যাদি। 
প্রোটিনই রক্ষা করবে অপুষ্টি থেকে। অথচ ভারতের সহজলভ্য প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের দামই সবথেকে বেশি বাড়ছে। আবার সরকার ঘোষণা করছে পুষ্টি বাড়াতে হবে। শিশুদের জন্য সরকারের পুষ্টি প্রদানের প্রকল্প একটি নয়। একাধিক। মিড ডে মিল থেকে ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। এখন অবশ্য মিড ডে মিল নাম নেই। কারণ এই সরকারের সবথেকে প্রিয় হবি হল, পুরনো সরকারগুলির দেওয়া সব নাম বদলে দেওয়া। মিড ডে মিলের নাম হয়েছে প্রধানমন্ত্রী পোষণ প্রকল্প। মিড ডে মিলে একজন ছাত্রছাত্রীর জন্য প্রতিদিনের খাবারের বরাদ্দ কত?  প্রাথমিক স্তরের ছাত্রদের জন্য ৪ টাকা ৯৭ পয়সা। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ২০২০ সালে এই বরাদ্দ শেষবার বাড়ানো হয়েছিল। কত টাকা ছিল তার আগে? প্রাথমিক স্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল পড়ুয়াপিছু ৪ টাকা ৪৮ পয়সা। আর ষষ্ঠ থেকে অষ্টম স্তরের জন্য ছিল ৬ টাকা ৭১ পয়সা। অর্থাৎ ২০২০ সালে প্রাথমিকের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল ৪৯ পয়সা! তারপর থেকে আর বাড়েনি। ২০১১ সালে এই বরাদ্দ কত ছিল? ২ টাকা ৮৯ পয়সা। ১১ বছর কেটে গিয়েছে। অর্থাৎ ১১ বছরে বরাদ্দ বেড়েছে ২ টাকা ৮ পয়সা! প্রশ্ন হল, পুষ্টি নামক শব্দটি প্রতিদিন ৪ টাকা ৯৭ পয়সা বরাদ্দের পাশে মানানসই কি না? 
সরকার বলেছে সেপ্টেম্বর মাস হোক পুষ্টির মাস। সেপ্টেম্বর মাসের প্রাক্কালে দুবার দুধের দাম বেড়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সবথেকে বেশি বেড়েছে ডালের দাম। যা গরিবের খাবার হিসেবে চিহ্নিত। বেড়েছে ডিমের দাম। ভোজ্য তেলের দাম রেকর্ড স্পর্শ করেছে আগস্টে। অনেকটা বেড়ে গিয়ে একটু কমে যাওয়াকে আজকাল মূল্যবৃদ্ধির নিয়ন্ত্রণ বলা হয়। অর্থাৎ পুষ্টির সবথেকে প্রধান উপকরণ ঠিক যে খাদ্যগুলি, সেই প্রোটিন আইটেমের দাম বেড়েছে বেছে বেছে! 
সরকারের মতে, সেপ্টেম্বর মাস পুষ্টি বাড়ানোর মাস। ঠিক সেপ্টেম্বর মাস শুরু হওয়ার আগে আগস্টের শেষ সপ্তাহে কোন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে? সরকারের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০২১ সালের সমীক্ষা। সেখানে আত্মহত্যার যে পরিসংখ্যান সেখানে এক আশ্চর্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ২০২১ সালে গোটা দেশে সরকারি হিসেবে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী প্রত্যেক চারজন আত্মহত্যাকারীর মধ্যে একজন দৈনিক মজুর! শুধু এক বছরে ৪২ হাজারের বেশি দৈনিক রোজগারে সংসার চালায় এরকম মানুষের আত্মহত্যা ঘটেছে। এই বিশেষ প্রবণতাটি আগে ছিল না। দৈনিক মজুর কেন এত আত্মহত্যা করছে? অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে প্রধান কারণ অবশ্যই প্রয়োজনীয় আয়ের সংস্থান করতে না পারা। বিগত আট বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে, দৈনিক মজুরের আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৪ সালে মোট আত্মহত্যার ১২ শতাংশ ছিল দৈনিক মজুর। ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। এর মধ্যেও সিংহভাগ খেতমজুর। 
বহু বছর ধরে কৃষকদের আত্মহত্যার হার ছিল সর্বোচ্চ।  ঋণ পরিশোধ করতে না পারা, চাষের খরচ না ওঠা ইত্যাদি কারণে বিগত বছরগুলিতে কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়ে খেতমজুর হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ছিল অত্যন্ত বেশি। হঠাৎ লক্ষণীয়ভাবে এবার দেখা যাচ্ছে, খেতমজুররাই আত্মহত্যা করছেন অনেক বেশি হারে। কৃষি ছেড়ে অনেকে হয়েছিলেন খেতমজুর। কিন্তু খেতমজুরি ছেড়ে কোথায় যাবেন? তাই শর্টকার্ট! আত্মহত্যা। তাঁরা জেনে গেলেন না যে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস পুষ্টির মাস!

9th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ