বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিজেপিকে হটানো সম্ভব, বোঝাল বিহার-ঝাড়খণ্ড
সন্দীপন বিশ্বাস

‘মোদি ম্যাজিক’ বলে আসলে কিছু নেই। সেটা যাঁরা খাওয়াচ্ছেন, তাঁরা বিজেপির সুবিধাভোগী ক্লাসের কিছু অন্ধ মোদি ভক্ত। এতদিনে দেশের মানুষ বুঝে গিয়েছেন, মোদিজি যতটা বাক্যবাগীশ, ততটা কাজের মানুষ নন। কথায় আছে ‘ফলেন পরিচীয়তে’। মোদি নামক সুশ্রী ফলের কটু স্বাদ দেশের মানুষ প্রতি পদে আস্বাদন করছেন। কখনও কখনও তাঁর ভুলভাল সিদ্ধান্তের জেরে দেশের মানুষকে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। নোটবন্দির হঠকারিতায় কিংবা করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের বলি হয়েছেন দেশের শত শত মানুষ। কিন্তু কখনও তিনি দেশের মানুষের সামনে নতজানু হয়ে বলেননি, ‘আমার ভুল হয়েছিল। আমাকে ক্ষমা করুন।’ এই অহমিকা, ঔদ্ধত্য আর ব্যর্থতাই তাঁকে ক্রমে জনপ্রিয়তার শূন্যবিন্দুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 
মোদিজির জনপ্রিয়তা কেমনভাবে তলিয়ে যাচ্ছে, একটু দেখা যেতে পারে। এক সময় অনেক ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন ‘মন কি বাত’। ওটা আসলে নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাফাই গাওয়ার অনুষ্ঠান। মানে, দেশবাসী যাকে ভুল বলে মনে করছেন, সেটা যে ভুল নয়, তা ভুল যুক্তি দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা। কিন্তু এই সাফাই শোনার সময় নেই মানুষের। খাদ্যের সারিতে দিন কাটানো নিরন্ন ভারতবাসী তাই তাঁর মন কি বাতের আসর থেকে ক্রমেই উঠে চলে যাচ্ছেন। প্রথম যখন মন কি বাতের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, তখন শ্রোতা ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। বিজেপি শাসিত রাজ্যের রেল স্টেশনগুলিতে কুলি, মজুরদের জোর করে ধরে এনে মোদির নেপথ্য ভাষণ শোনানো হতো। ২০১৫ সালে শুরু সেই অনুষ্ঠানের শ্রোতার হার এক বছরে নেমে এল ২০ শতাংশে। এখন মাত্র ৮-১০ শতাংশ শ্রোতা। এখনও বিজেপি শাসিত রাজ্যের নেতারা বিভিন্ন এলাকার মানুষ, কুলি, দিনমজুরদের জোর করে বসিয়ে রেখে ওই সব ‘বাত’ শোনান। এই জোর-জুলুমটুকু বন্ধ হলে মোদির বক্তৃতা শোনার জন্য এক শতাংশ মানুষ এক মিনিটও অপেক্ষা করবেন না। কেননা দেশের মানুষের জীবনকে মোদিজি করে তুলেছেন দুর্বিষহ। আরও একটা হিসাব দেওয়া যায়, যেটা মোদির ওই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার একটা মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে। ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে মন কি বাতের আগে-পরে প্রচারিত বিজ্ঞাপন থেকে রেডিও তুলেছিল ১০.৬৪ কোটি টাকা। ২০২০-২১ সালে সেটা নামতে নামতে এসে দাঁড়িয়েছে ১.০২ কোটি টাকায়। মনে রাখা দরকার, এই বিজ্ঞাপনের অনেকটাই কিন্তু সরকারি বিজ্ঞাপন। তাহলে অর্থ কী দাঁড়াল? অর্থ দাঁড়াল এই যে, মোদিজির বক্তৃতায় ভরসা রাখতে পারছে না সরকারি মন্ত্রকগুলিই। তারা তাই বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
মোদিজির জনপ্রিয়তার এই শীঘ্রপতন বিজেপির শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। দলের নেতারা বুঝতে পারছেন, মোদিজির মুকুটে সাফল্যের অসত্য রঙিন পালক গুঁজলেও পীড়িত জনগণ আর ভুলবেন না। তাঁরা এখন আর মোদিজির বক্তৃতায় ভুলবেন না, ছাতি চাপড়ানোয় ভুলবেন না, কোনও প্রতিশ্রুতিতেই ভুলবেন না। ভুলবেন না গেরুয়া বাহিনীর সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানোর কৌশলে। কেনই-বা ভুলবেন? যে শাসক এক শতাংশ প্রতিশ্রুতিও রাখতে পারেন না, তিনি কখনও মানুষের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠতে পারেন না।
এই সময়কালে বিজেপি যে কতটা ভীত, তার একটা উদাহরণ সম্প্রতি আমরা দেখেছি। তেলেঙ্গানার প্রত্যন্ত একটা গ্রামের একটা ছোট্ট রেশন দোকান মোদিজির ছবি লটকায়নি বলে বিরাট গোঁসা হয়েছে দেশের অর্থমন্ত্রীর। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করে বলেছেন, মোদিজি বিনা পয়সায় সবাইকে রেশন দিচ্ছেন, কেন তাঁর ছবি টাঙানো থাকবে না? যেমন বুনো ওল তেমনই বাঘা তেঁতুল। অর্থমন্ত্রীকে সেখানকার জেলাশাসক কাগজ খুলে দেখিয়ে দিয়েছেন, বিনামূল্যের রেশনে মোদিজির বরাদ্দ যত টাকা, তার থেকে বেশি টাকা দেয় রাজ্য সরকার।     
এভাবেই সবক্ষেত্রে অসত্য তথ্য জাহির করে মোদিজির ইমেজকে ক্রমে ক্রমে আকাশচুম্বি করার খেলা এখন জাহির থাকবে। কেননা হাতে আর সময় বেশি নেই। মাত্র দেড় থেকে দু’বছর। এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে লোকসভা নির্বাচনের সলতে পাকানোর কাজ। গত আট বছরের খতিয়ানে দেখা যাচ্ছে দেশের মানুষের চালচুলো সব গিয়েছে, হাতে পড়ে রয়েছে শুধু একরাশ অসত্য প্রতিশ্রুতির আবর্জনা। তাই এখন একমাত্র ছক হিন্দুত্বের পাশাখেলা। একদিকে হিন্দুত্বের প্রলোভন এবং অন্যদিকে দেশের বঞ্চিত সমাজ, যেখানে রয়েছেন কৃষক, দিনমজুর, কারখানার শ্রমিক, বেকার যুবক, পুঁজি হারানো ব্যবসায়ী, সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যাঙ্কে রেখে কপাল চাপড়ানো প্রবীণ মানুষ এবং দরিদ্র সাধারণ মানুষ। এঁদের চোখের জলে ধুয়ে যাবে হিন্দুত্বের পাশাখেলা। মহাভারতে শকুনির মিথ্যার বেসাতিতে হেরে গিয়েছিলেন পাণ্ডবরা। কিন্তু এই জমানায় দেশশাসকের চাল বুঝে গিয়েছেন দেশের ভুক্তভোগী মানুষ। তাঁরাই মোদিজির পাশার দান উল্টে দেবেন। এখন থেকে মানুষ স্বপ্ন দেখছেন, বিজেপির নাগপাশমুক্ত এক স্বচ্ছ, হিংসামুক্ত ভারতের।  
একটা সাধারণ অঙ্কে আসা যাক। লোকসভায় বিজেপির মোট আসন সংখ্যা ৩০৩। বিজেপির ভরসা মাত্র দশটি হিন্দিভাষী রাজ্য। এই রাজ্যগুলিতে মোট আসন সংখ্যা ২২৫। তার মধ্যে গেরুয়া দখলে আছে ১৭৭টি আসন। এই পুঁজির উপরে ভর করেই তৃতীয়বার ফিরে আসার স্বপ্ন বুনন চলেছ বিজেপির। আসলে এই আসনে ধস নামলেই বিজেপিমুক্ত ভারতের স্বপ্ন সফল হতে বাধ্য। এর মধ্যে বিহার, ঝাড়খণ্ডে তার ধস নামতে শুরু করেছে। দক্ষিণেও ঠাঁই নেই বিজেপির। সর্বত্র সরকার ফেলার জন্য যেভাবে টাকা নিয়ে বিজেপি ছুটেছে, সেটা দেশের মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। টাকার জোরে গণতন্ত্র, সংবিধান, মানুষের মতামতকে ভুলুণ্ঠিত করে একের পর এক রাজ্য কিনে নিয়ে সরকার গড়েছে তারা। এটা একটা অগণতান্ত্রিক প্রয়াস। মানুষ নির্বাচনে যে দলকে প্রত্যাখান করেছে, সেই দলই সরকার গঠন করার জন্য উঠেপড়ে লাগছে, এটা মানুষ ভালো চোখে দেখছেন না। সেই প্রয়াস পরপর দু’বার ধাক্কা খেল। বিহার ও ঝাড়খণ্ডে বিধায়ক কেনার অশুভ খেলা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সুতরাং আগামী লোকসভা নির্বাচনে বহু রাজ্যে বিজেপির আসন কমছে। কংগ্রেস শূন্য দেশ গড়ার অস্ত্র ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। এই খেলায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক দলগুলি। তাদের ঐক্যের সামনে ভেঙে পড়বে বিজেপির স্বপ্নের ইমারত।
চাপটা অবশ্য বিজেপি টের পাচ্ছে বলেই বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধীদের উপর সিবিআই, ইডির পাল্টা চাপ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধীদের বাড়িতে চড়াও হয়ে চু-কিৎকিৎ খেলছে সিবিআই। ভোটবাক্সে সিঁদুরে মেঘ দেখেই মোদিজিরা পাল্টা চাপের লড়াই এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছেন। তাই দিয়ে কি সত্যিই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা যাবে? এই যে দেশটাকে একেবারে সবদিক থেকে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে, সেটাকে কি আবার তার পূর্ব অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে? না, তা যাবে না। কেননা বিজেপি শাসনের নমুনা পরীক্ষিত সত্য। সিবিআই ইডি দিয়ে সেই ব্যর্থতাকে ঢাকা যাবে না।   
দেশের মানুষের কাছে ভারতের এই মুহূর্তের চেহারাটা একেবারে স্পষ্ট।  মোদিজির ব্যর্থ শাসন দেশটাকে একটি রাজনৈতিক শৌচালয় বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার ৭৫ বছরের গৌরবকালে দেশের সমস্ত মহিমা তিনি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অসুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া এই সরকারের কোনও কাজ নেই। তাই সুশাসনের বদলে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ভারতের সবথেকে অযোগ্যতম এক শাসককে। তাঁর শাসনে দেশ যেন নানা রোগে আক্রান্ত। যেন আমাদের শরীরে গড়ে উঠেছে এক জঘন্য টিউমার। সেটাকে অবিলম্বে অপারেশন করে বাদ দেওয়া দরকার। ২০২৪ সালে সেই অপারেশন করতেই হবে। নাহলে এই শাসন ব্যবস্থা দেশটাকে পচিয়ে গলিয়ে আমাদের আরও বৃহত্তর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম না বুঝলে তার বিশাল মূল্য দিতে হবে। এর জন্য যেমন মোদিজি দায়ী থাকবেন, তেমনই দায়ী থাকবে আমাদের হীনমন্যতা, আমাদের ঘুমপ্রীতি, আমাদের নিজেদেরই নির্বুদ্ধিতাও।

7th     September,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ