বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

লক্ষ্য যখন আজ্ঞা পালন
তন্ময় মল্লিক

তদন্তের উদ্দেশ্য কী? সত্যান্বেষণ। কিন্তু যখন তা না হয়ে প্রভুর আজ্ঞা পালন পায় প্রাধান্য, তখনই তদন্তে জন্মায় অবিশ্বাস। সিবিআই ও ইডির সাম্প্রতিক তদন্তেও ঘটছে সেটাই। ‘কর্তা’র ইচ্ছায় কর্ম করতে গিয়ে অভিযুক্ত হচ্ছে বারবার। কয়লা ও গোরু পাচারের তদন্তে নেমে ঘুরপাক খাচ্ছে গাঙ্গেয় বঙ্গেই, গোমুখে যাওয়ার তাগিদ তাদের নেই। তদন্ত একমুখী ও একবগ্গা হলে জনমনে জন্ম নেয় প্রতিহিংসার তত্ত্ব। সেই কারণে বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠে একুশের ভোটে নাকখত খাওয়ার বদলা নেওয়ার অভিযোগ।
নিয়োগ দুর্নীতি এবং গোরু পাচার নিয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তে তোলপাড় হচ্ছে রাজ্য রাজনীতি। নিয়োগে দুর্নীতি আর অভিযোগ নয়, এখন তা প্রমাণিত। আদালত দেখিয়ে দিয়েছে, যোগ্যদের রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে মেধাতালিকার সামনে জায়গা নিয়েছে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠরা। তার বেশিরভাগটাই হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিশেষ বান্ধবী’র ফ্ল্যাট থেকে 
উদ্ধার হওয়া কোটি কেটি টাকা আর সোনার 
গয়নাই তার প্রমাণ।
গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি চাকরির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে ওয়েটিং লিস্টে থাকা সকলের চাকরির দাবি হচ্ছে জোরদার। অভিযোগ, টাকার দাপটের কাছে তাঁদের ঠেলে দেওয়া 
হয়েছে পিছনে। তাই বুকে এঁটেছেন পোস্টার, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গলদের কথা মানতে বাধ্য হয়েছে রাজ্যের শিক্ষাদপ্তর। তাই বঞ্চিত ও যোগ্য আন্দোলনকারীদের চাকরি দিতে উদ্যোগী হয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী। বলাই বাহুল্য, ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা। তবে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারলে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ দূর হবে। তাতে হয়তো ক্ষতটা শুকবে, কিন্তু দাগটা থেকেই যাবে।
অপরাধের তদন্তের সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের রোগ নিরাময়ের কিছুটা মিল আছে। চিকিৎসকরা লক্ষণ দেখে চিকিৎসা করেন। কিন্তু নজর থাকে রোগের উৎস খোঁজায়। তার জন্য নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করান। রোগের কারণ জানা গেলেই রোগীকে সুস্থ করা যায় দ্রুত। একইভাবে কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে দক্ষ অফিসাররা শিকড় খোঁজার চেষ্টা করেন। তারজন্য সম্ভাবনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেন। কিন্তু গোরু ও কয়লা পাচার কাণ্ডের তদন্তে সিবিআই সেই নিয়ম মানছে না। তার মানে তদন্তকারী সিবিআই অফিসারদের দক্ষতা কম, এমনটা নয়। বরং তাঁরা চাইলে মানুষের পেট থেকে অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত বের করে আনতে পারেন। কিন্তু ‘কর্তা’র ইচ্ছায় কর্ম হওয়ায় তাঁরা সমালোচনার মুখে পড়ছেন।
পাল পাল গোরু যে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যায়, তা সকলের জানা। বছরের পর বছর নয়, যুগ যুগ ধরে পাচারের ঘটনা ঘটছে। অনুপ্রবেশ এবং গোরু পাচার দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির অন্যতম প্রধান সমস্যা। সীমান্তের বহু মানুষের পেট চলে চোরাচালানের টাকায়। বিএসএফ ঠেকানোর চেষ্টা করলেই হয় সংঘাত। তারজন্য বিএসএফের সঙ্গে সীমান্ত এলাকার মানুষের সম্পর্ক সাপে নেউলে।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষের এই ক্ষোভটাকে খুব সুন্দরভাবে ভোটের কাজে লাগাতেন কমল গুহ। তাই দিনহাটা হয়ে উঠেছিল তাঁর দুর্গ। কমলবাবু ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে নতুন দল তৈরির পর সীমান্ত এলাকায় সংগঠন গড়ায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে দু’দিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে ঘোরার সুযোগ হয়েছিল। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। গাড়ি থেকে নেমেই গ্রামের সভায় কমলবাবু বিএসএফের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাচ্ছিলেন আর বয়ে যাচ্ছিল হাততালির ঝড়। আক্রমণের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল উল্লাস। 
কয়েকটি সভা ঘোরার পর বিএসএফকে এভাবে আক্রমণের কারণ জানতে চেয়েছিলাম। কমলবাবু হাসতে হাসতে বলেছিলেন, বিএসএফের উপর এলাকার লোকজনের কেমন রাগ বুঝতে পারলেন! আসলে এই সব এলাকার অধিকাংশ মানুষ গোরু, সিরাপ, সাইকেল, নুন পাচার করে। বিএসএফের সঙ্গে লড়াই এদের প্রতিনিয়ত। তাই বিএসএফের বিরুদ্ধে কিছু বললেই এরা খুশিতে হাততালি দেয়।
এই স্মৃতিচারণার উদ্দেশ্য গোরু পাচারে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা, পুলিস বা বিএসএফ কর্তাদের অপরাধ লঘু করে দেখানো নয়। বরং হাজার হাজার কোটি টাকার এই দুর্নীতিতে যারা যুক্ত তাদের কঠিনতম শাস্তিই কাম্য। যে কোনও মূল্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ক্রাইম বন্ধ করা দরকার। তারজন্য লাগে সদিচ্ছা। শুধু বিরোধীদের টার্গেট করলে হবে না। অপরাধী ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। কিন্তু সিবিআই ও ইডি কি সেই দৃঢ়তা দেখাতে পারবে?
কেন উঠছে এই প্রশ্ন? তার উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০১৮ সালের একটি ঘটনায়। কেরলে বাড়ি যাওয়ার পথে সিবিআইয়ের হাতে ধরা পড়েছিলেন বিএসএফের কমান্ডান্ট ডি ম্যাথু। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিল নগদ ৪৭ লক্ষ টাকা। নিন্দুকজনে বলে, সিবিআইয়ের জেরায় তিনি এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের নাম বলেছিলেন। সেই সূত্রেই সিবিআই অফিসাররা মন্ত্রীর পুত্রের সঙ্গে কথা বলতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি মেলেনি। কারণটা জলের মতোই পরিষ্কার।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশার হাজার হাজার গোরু বাংলাদেশে পাচার 
হয়। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা গোরু সিন্ডিকেটের 
হাত ঘুরে যায় বাংলাদেশে। তারজন্য সীমান্ত পার করতে হয়। তারও নানান কায়দা আছে। কখনও হাঁটিয়ে, কখনও কলাগাছের ভেলায় জুড়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনও কপিকল বানিয়ে কাঁটাতারের বেড়া টপকে বাংলাদেশে ফেলে দেওয়া হয়। এটা এক আধ দিনের কারবার নয়। বছরের পর বছর চলছে। তার জন্য পুলিস, রাজনৈতিক নেতা, বিএসএফ সবাইকে নিয়ে গড়ে উঠেছে একটা পাকাপোক্ত সিন্ডিকেট। সায়েন্টিফিক রিগিংয়ের মতোই পাচারচক্রও বামজমানায় ছিল সায়েন্টিফিক। পরে তা হয়ে যায় খুল্লমখুল্লা।
অনেকে বলছেন, এরাজ্যে পুলিসের চোলাই বিরোধী অভিযানের সঙ্গে সিবিআইয়ের গোরু পাচার তদন্তের বেশ মিল রয়েছে। এখানে চোলাই তৈরির কারখানায় না গিয়ে পুলিস চোলাইয়ের ঠেকে হানা দেয়। তাতে চোলাইখোর ধরা পড়ে, কিন্তু চোলাইয়ের কারবার চলতেই থাকে। কেন্দ্রীয় এজেন্সিও সেই একই স্টাইলে তদন্ত করছে।
কয়লা পাচারের বিষয়টা আরও মারাত্মক। খনির পাহারার দায়িত্ব সিআইএসএফের। উৎসস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই আটকে দেওয়া যায় বেআইনি কয়লা পাচার। সিআইএসএফ দায়িত্ব পালন করেনি। অথচ কয়লা পাচার কাণ্ডে ইসিএল কর্তারা গ্রেপ্তার হলেও সিআইএসএফ আশ্চর্যজনকভাবে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। কারণটা কী?
বামফ্রন্টের আমলে অবিভক্ত বর্ধমান জেলার তৎকালীন ডিএম সুব্রত গুপ্ত বেআইনি কয়লা বন্ধ করার জন্য একটা নতুন কৌশল নিয়েছিলেন। তিনি জেসিবি ভাড়া করে বেআইনি খনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আঘাত হেনেছিলেন একেবারে উৎসমুখে। কয়লা মাফিয়াদের প্রচুর মেশিন চাপা পড়ে গিয়েছিল। ফলে বহুদিন বন্ধ ছিল কয়লা পাচার।
সাপ্লাই লাইন কাটলেই বন্ধ হবে গোরু ও কয়লা পাচার। কিন্তু কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি সেটা করছে না। উল্টে গোমুখের সন্ধান না করে ঘুরপাক খাচ্ছে গাঙ্গেয় বঙ্গে। কারণ সমস্যার সমাধান নয়, ইস্যুটাকে জিইয়ে রেখে বিরোধীদের টাইট দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। কারণ মিশন-২০২৪ গেরুয়া শিবিরের কাছে দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির খুব পছন্দের স্লোগান। বাংলাতেও দিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি। তবে ডবল ইঞ্জিন সরকার 
হলে সাধারণ মানুষের কী হাল হয়, তা হাড়ে হাড়ে 
টের পাচ্ছেন গুজরাতের বিলকিস বানো। তিনি গর্ভবতী অবস্থায় শুধু ধর্ষিতাই হননি, চোখের 
সামনে আছড়ে মারা হয়েছিল তাঁর তিন বছরের মেয়েকেও। জহ্লাদদের হাতে খুন হয়েছিলেন পরিবারের সাতজন। সেই ঘটনায় আদালত ১১জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। গুজরাত সরকার তাদের সবাইকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে দিল। শুধুই কি মুক্তি? না, তার সঙ্গে ধর্ষক, খুনিদের গলায় উঠেছে ফুলের মালাও। যাকে বলে, একেবারে বীরের সংবর্ধনা। এই না হলে আচ্ছে দিন!

20th     August,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ