বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

এজেন্সির ঘেরাটোপ
শান্তনু দত্তগুপ্ত

ছবিটা খুব পরিচিত। জার্মানির ব্রেসলাও... রাজপথের দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত ‘সোলজার’। প্রত্যেকের ডান হাত সামনের দিকে উঠে আছে হিটলারি কায়দায় কুর্নিশ জানাতে। আর রাজপথের ঠিক মাঝখানে ঘোড়ায় চেপে গোটা ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করছেন এক ব্যক্তি—আর্নস্ট রোম, নাৎসি ‘এসএ’ বা ঘাতক বিভাগের প্রধান। সময়টা ১৯৩৩। কে ছিলেন এই আর্নস্ট রোম? দক্ষ সেনানায়ক, আঘাত হানা এবং দল পরিচালনার নিরিখে জার্মানির প্রথম পাঁচজনের একজন এবং বিশ্বাসভাজন। মাঝে ঠিক বছরখানেকের ফারাক। অস্বস্তি হতে শুরু করল অ্যাডলফ হিটলারের। ক্ষমতাটা যেন নিরঙ্কুশ হচ্ছে না। তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার লোক এখনও আছে জার্মানিতে। এমন একদিন আসতে পারে, সে হয়তো চ্যান্সেলর হিটলারকেই গদি থেকে ছুড়ে ফেলে দেবে। কারণ সে এমন একটা বাহিনীর সর্বময় কর্তা, যার থেকে ভয়ঙ্কর এবং বাধ্য গোটা দুনিয়ায় খুব কম আছে। আর রোম এই এসএ ইউনিটে সোলজারের সংখ্যা বাড়িয়েই যাচ্ছে। প্রবাদটা চিরকালীন—শত্রুর শেষ রাখতে নেই। কিন্তু হিটলার ভাবলেন, চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে এমন কিছুর শেষ রাখতে নেই। ৩০ জুন, ১৯৩৪। তাঁর এলিট এসএস বাহিনীর কাছে নির্দেশ গেল—গণহত্যার। প্রথম টার্গেট, আর্নস্ট রোম। অন্তত ৫০০ জনকে সেই রাতে গুলি করে মেরেছিল এসএস ইউনিট। সেই রাত ইতিহাসে পরিচিত ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস’ হিসেবে। 
ক্ষমতার পথ মসৃণ করতে হবে। যুগে যুগে শাসকের এটাই ধ্যানজ্ঞান। অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন একনায়ক। ডিক্টেটর। তাঁর পক্ষে ‘হলোকাস্ট’ বা দমনের রাজনীতি খুব অস্বাভাবিক নয়। মানব সমাজের সবচেয়ে মুশকিলের বিষয় হল, ক্ষমতার দম্ভ বিষয়টা শুধু একনায়কতন্ত্রে থমকে নেই। তা গণতন্ত্রেও জাল বিস্তার করে। হিটলারের একজন হারমান গোয়েরিং ছিলেন। হিটলারের জন্য একটি বাহিনী তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি—গেস্টাপো। সোজা কথায় তাদের কাজ ছিল, উপরওয়ালা যা বলবে, যুক্তিতর্কের তোয়াক্কা না করে সেটাই পালন করা। ইহুদিদের বংশ লোপাট করা বা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প চালানো, গেস্টাপোর আতঙ্ক গ্রাস করেছিল পৃথিবীকে। নাৎসি বাহিনী কোনও দেশের দখল নিলে সেনার সঙ্গে সেখানে আগে ঢুকত গেস্টাপো। কারণ সেখানকার নাগরিক, প্রশাসন বা সমাজ, সবটাই নিয়ন্ত্রণ করত তারা। মাখনের উপর ছুরি চালানোর মতো নিখুঁতভাবে। এখন আর গেস্টাপো নেই। সব দেশেরই কোনও না কোনও গোয়েন্দা বা গুপ্তচর সংস্থা রয়েছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমাজের উপর তাদের প্রভাব তেমন একটা দেখা যায় না। দেশের নাগরিকদের ‘সাইজ’ করতে, বিরোধী রাজনীতির কোমর ভাঙার জন্য প্রয়োজন হয় অন্য মানদণ্ডের পুলিসিং। কেমন হয় তারা? হাতেগরম উদাহরণ ভারতেই আছে। এজেন্সি। নাম যা খুশি হতে পারে... সিবিআই বা ইডি। বিজেপি যখন বিরোধী আসনে ছিল, তখন একই অভিযোগ তারা করেছে। বলে এসেছে, বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে কংগ্রেস সরকার সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছে। সময় বদলেছে। বিরোধীরা এখন শাসকের আসনে। কিন্তু এজেন্সি অপব্যবহারের অভিযোগ? বেড়েছে গুণোত্তর প্রগতিতে। 
গত বুধবার সুপ্রিম কোর্ট একটি রায় দিয়েছে। মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের আওতায় ইডি এখন থেকে ভারতীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তারও করতে পারবে। অর্থাৎ, টাকা-পয়সা বা সম্পত্তি নিয়ে অনিয়ম খুঁজে পেলে শুধু হানা দিয়েই ইডির কাজ শেষ হবে না। যেমন খুশি ধরপাকড়ও করতে পারবে তারা। এতে সরকারের কী সুবিধা হয়েছে? রাজনীতির আঙিনায় দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করার পরও কালো টাকা নেই, এমন নেতানেত্রী সত্যিই খুঁজে পাওয়া ভার। নরেন্দ্র মোদি সরকার তাই সহজ রাস্তাটাই বেছে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অমিত শাহের হাতে। তাই যদি মোদি সরকার না বলে অমিত শাহকেই গোটা চিত্রনাট্যের পরিচালক হিসেবে ধরা যায়, খুব ভুল হবে কি? স্মৃতি হাতড়ালে দেখা যাবে, যে যে রাজনৈতিক নেতা অতীতে অমিত শাহ বা বিজেপির বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই গত কয়েক বছরে ইডির স্ক্যানারে ধরা পড়েছেন। তালিকাটা পি চিদম্বরমকে দিয়ে শুরু করা যেতেই পারে। ২০১০ সালে তিনিই ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সোহরাবুদ্দিন মামলায় সিবিআই তখন হাতকড়া পরিয়েছিল অমিত শাহকে। ঠিক তার বছর দশের পর পাশা বদলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পরই দেখা গিয়েছে, এজেন্সির নজরে এসেছেন চিদম্বরম। তারপর একে একে রবার্ট ওয়াধেরা, সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী। কেন? এঁরা প্রত্যেকেই বিজেপি তথা মোদি সরকারের সমালোচক বলে? 
শিবসেনা সুপ্রিমো যখন বিজেপিকে ল্যাং মেরে কংগ্রেস এবং এনসিপির সঙ্গে মহারাষ্ট্রে সরকার গঠন করলেন, ঠিক তখন থেকেই ভিতরে ভিতরে জ্বলছিল গেরুয়া শিবির। ২০২২ সালে এসে দেখা গেল, হাত গুটিয়ে তারা বসে থাকেনি। তারা জানত, আমাদের হাতে আছে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থাৎ এজেন্সি ব্যবহারের অসীম ক্ষমতা। শুরু হল ভাঙাগড়া। কিন্তু অপেক্ষা করতে হবে। যতদিন না সঠিক সংখ্যাটা হাতে আসে... তারপরই আঘাত। একদিন হঠাৎ উদ্ধব দেখলেন, তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে গিয়েছেন। এমএলএ সংখ্যা যা হাতে রয়েছে, তা দিয়ে বিধানসভার আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। আর তাই, একনাথ সিন্ধে আজ মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। মহারাষ্ট্রে ‘ইডি সরকার’। দেবেন্দ্র ফড়নবিশ যতই বলুন, ওটা আসলে একনাথ-দেবেন্দ্র সরকার... তা আম জনতার মন ভোলাতে পারছে না। রাজনীতি নিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সেই অর্থে মাথাব্যথা থাকে না। তারা শুধুই চায় স্থিতাবস্থা। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতাই তো আজ আর রাজনীতিতে নেই! মহামান্য ভারত সরকার এবং তার চালিকাশক্তি পদে পদে আজ বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিজেপি ছাড়া স্থিতাবস্থা সম্ভব নয়। বিরোধী হোক বা সাধারণ নাগরিক, রাস্তার দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে বলতে হবে, ‘হেইল বিজেপি।’ তা না হলে সরকার থাকবে না, সরকারের মুখপাত্রও নয়। মোদি সরকারের নামে লাগাতার আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছেন সঞ্জয় রাউত। তিনি মার্টিন লুথার কিংকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘রাজনীতির ব্যাখ্যায় যে দেশে ধর্মীয় ইস্যু আসে, সেই দেশ মহান। কিন্তু ভুল লোকজনের হাতে যদি শাসন ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে রাজনীতিই তৈরি করে ধর্মীয় ইস্যু।’ কৃষকের আত্মহত্যা হোক বা মূল্যবৃদ্ধি... নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বরাবর তাঁর তোপের নিশানায়। ফলাফল? সঞ্জয় রাউতও ইডির হেফাজতে। এখন সঞ্জয় রাউত যদি বলেন, এজেন্সিগুলিকে গেস্টাপোর মতো ব্যবহার করছে মোদি সরকার... খুব ভুল বলবেন কি? বিরোধীরা চেঁচামেচি করছে, ইডির সব পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এতেও কি খুব ভুল আছে? ছোট্ট একটা পরিসংখ্যান দেখা যাক। অর্থ তছরুপ আইন চালুর পর ইডি মামলা করেছে ৫ হাজার ৪২২টি। কিন্তু দোষী সাব্যস্ত কতজন? মাত্র ২৩।
ভাঙছে সরকার। একের পর এক। মহারাষ্ট্রের পর ঝাড়খণ্ড নিয়ে কলকাঠি নাড়া শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের বিধায়করা নিশানায়। কী চাই? মুখ ফুটে বলার অপেক্ষা। প্রস্তাব দেওয়াই রয়েছে। কোটি কোটি টাকার খেলা। সঙ্গে মন্ত্রিত্বের টোপ। আর সায় না দিলে? মশাই তৈরি থাকুন, ইডি যাচ্ছে। সাদা কালো যা কামিয়েছেন, আর ভোগ করতে হবে না। ক’দিন বরং জেলের ঘানি টেনে আসুন। ঝাড়খণ্ড মিটে গেলে আবার অন্য রাজ্য। এ এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। ক্ষমতা চাই। বিরোধীশূন্য মসৃণ রাস্তায় হেঁটে পৌঁছতে হবে অভীষ্ট লক্ষ্যে—একচ্ছত্র আধিপত্য। একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের ফারাক কতটা? একটা সুতোর উপর ঝুলছে সেই পার্থক্য—দুর্বলতা। শাসকের নজর রয়েছে ২৪ ঘণ্টা। খোঁজ চলছে অনিয়মের। অর্থ? বেআইনি কাজ কারবার? ফৌজদারি অপরাধ? এগুলোই যে দুর্বলতা! তাহলেই বেঁধে ফেলা যাবে বিরোধীদের। তারা হয় আত্মসমর্পণ করবে, না হলে জেলের দরজা খোলাই রয়েছে। বিজেপির চুনোপুঁটি নেতারাও রাজ্যে রাজ্যে হুমকি দেবেন, ‘বেশি গণ্ডগোল করলে বাড়িতে ইডি পাঠিয়ে দেব’।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ভোটদান। নাগরিক ওই একটা দিন তার ক্ষমতা দেখায়। তারা নির্বাচিত করে সরকার, যারা তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে দেশ বা রাজ্য শাসন করবে। সেই মতকে সমর্থন করাটাই সাংবিধানিক কর্তব্য। মহারাষ্ট্রের মানুষ তো উদ্ধব থ্যাকারেকে দেখে ভোট দিয়েছিলেন! একনাথ সিন্ধেকে দেখে তো নয়! ঝাড়খণ্ডেও মানুষের আস্থা ছিল হেমন্ত সোরেনের উপর। আম আদমির বোঝার সময় এসেছে, সবটাই ধোঁকা। ভোটদানই আর গণতন্ত্র নয়। এখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা একটাই—বিজেপি যা চায়। 
অর্থমনর্থম।

2nd     August,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ