বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বুলডোজার যখন বিপজ্জনক অস্ত্র!
মৃণালকান্তি দাস

জোসেফ সিরিল ব্যামফোর্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজ করতেন ইংল্যান্ডের ইলেকট্রিক এবং বিমান উৎপাদন মন্ত্রকের সঙ্গে। বিশ্বযুদ্ধের পর এই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর হাত ধরেই বদলে গিয়েছিল কৃষি দুনিয়া। যুদ্ধের প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধার করেছিল আস্ত একটা দেশ—ব্রিটেনকে। কৃষিতে বিপ্লব এসেছিল গোটা ইউরোপজুড়েই। কৃষি থেকে শিল্প বিপ্লব—ইউরোপে হাইড্রোলিক লোডারের ক্যারিশ্মা দেখিয়েছিলেন এই ব্যবসায়ী। যাঁর নামের আদ্যক্ষর নিয়েই তৈরি হয়েছিল ‘জেসিবি’ নামে একটি কোম্পানি। মোদি জমানায় সেই জেসিবির বুলডোজারই গোটা ভারতের কাছে ‘নয়া জুজু’। বুলডোজার হয়ে উঠেছে শাসকের পৌরুষ প্রদর্শনের প্রতীক!
বুলডোজার বিতর্কের শুরু উত্তরপ্রদেশে। ২০১৭ সালে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর যোগী আদিত্যনাথ অপরাধজগতের সাঙাতদের শায়েস্তা করতে আইনের চেয়ে তিনি বেশি জোর দেন ‘এনকাউন্টার’-এর উপর। তাঁর নির্দেশে জেলায় জেলায় দাগি অপরাধীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। অমান্যকারীদের অনেকের মৃত্যু হয় এনকাউন্টারে। ফেরারিদের চাপ দিতে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয় ঘরবাড়ি। এতে আপাতদৃষ্টে গোটা রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটলেও যোগীর এই ‘অসাংবিধানিক দমননীতি’ সংগত কারণেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। বিতর্কের কারণ, সরকার চিহ্নিত ৯০ শতাংশ ‘অপরাধী’ মুসলিম। প্রবলভাবে উঠে আসে মানবাধিকারের প্রশ্ন। আইনের শাসনের প্রশ্ন। ব্যক্তি বাহুবলীর জায়গা দখল করে রাষ্ট্র। একসময় মনে হয়, ‘ডিসটোপিয়া’ শব্দটি যেন ভারতে তার অভিঘাত হারিয়েছে—এই দেশ তার প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত যাপন করছে সেই ভয়াবহতায়।
উত্তরপ্রদেশের দেখাদেখি বিজেপি শাসিত হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশও ‘বুলডোজার’ আইন চালু করে। সম্প্রতি রামনবমী ও হনুমানজয়ন্তী উপলক্ষে বিজেপিশাসিত কর্ণাটক, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতে যে সংঘর্ষ ঘটে, তার মোকাবিলায় দেদার বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় প্রধানত গরিব মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকান। কর্ণাটকের উদুপি শহরে হিজাব প্রতিবাদে যোগ দেওয়া মুসলিম পরিবারের রেস্টুরেন্ট গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। জাহাঙ্গীরপুরীতে বুলডোজার–কাণ্ডের পাশাপাশি বিজেপির স্থানীয় নেতারা বাংলাদেশকেও টেনে আনেন। বলেন, ‘বাংলাদেশি ঘুসপেটিদের (অনুপ্রবেশকারী) এইভাবেই ঢিট করা হবে।’ পান থেকে চুন খসলেই হিন্দি সিনেমা শোলে-র ভিলেন ডাকু গব্বর সিংয়ের ঢঙে শাসক দলের নেতাদের হুমকি শোনা যাচ্ছে, ‘চুপ থাকো। নইলে বুলডোজার যাবে!’ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বুলডোজার আর নিছক একটি যন্ত্র মাত্র নয়। সংখ্যালঘু উৎপীড়নে সরকারি ব্যবস্থাপনার রূপক হিসেবে তা আত্মপ্রকাশ করেছে। বিজেপি নেতাদের বয়ানে যে লড়াই ‘৮০ বনাম ২০ শতাংশের’। সেই লড়াইয়ের হাতিয়ার ‘বুলডোজার’! ভারত নামে দেশটি কখনও এমন অসহিষ্ণু ছিল না।
উত্তরপ্রদেশে শেষ নির্বাচনে বিজেপির পক্ষ থেকেই সুকৌশলে যোগী আদিত্যনাথের নতুন ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়েছিল—‘বুলডোজার বাবা’। ‘বুলডোজার’-এর সেই সুফলও পেয়েছে বিজেপি। দলের সমর্থকরা বুলডোজারে চেপে সদর্পে বিজয়োৎসব পালন করেছে। বুলডোজার চালানোর জন্য নিশানা ঠিক হতেই সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশন বা মিউনিসিপ্যালিটির কাজ হল ‘ব্যাকডেটে’ একটি নোটিস লটকে দেওয়া। মধ্যপ্রদেশের খারগোন থেকে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ, থুড়ি প্রয়াগরাজ, সর্বত্রই একই পদ্ধতির ব্যবহার দেখা গিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বাড়ির জন্য পুরকর জমা পড়লেও, হঠাৎ করে অবৈধ নির্মাণ আবিষ্কার হয়, যার জন্য একের পর এক বাড়ি গুঁড়িয়ে যায়। প্রশ্ন করার সাহস কারও নেই, দু’দিনের নোটিসে রাতারাতি বাড়ি ভেঙে দেওয়ার অধিকার কোন আইনের বলে? হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রতিভূ হয়ে এই যন্ত্র যেন মুসলিমদের প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এই ভূমি তাদের নয়, এখানে তাদের বসবাস, জীবন-জীবিকা নির্বাহ— সবই চলছে সংখ্যাগুরুর অনুগ্রহে। মোদির ভারতে এ অবশ্য খুব বিস্ময়কর কোনও খবর নয়। এই ভারতে বুলডোজার যেমন একদিকে সংখ্যালঘু মানুষদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা সঞ্চার করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে এর মাধ্যমে দোর্দণ্ডপ্রতাপ পৌরুষদৃপ্ত শাসকের একটি ছবিও জনমানসে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন এক শাসক, যিনি অনায়াসে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যাঁর শাসন সব রকম 
চ্যালেঞ্জকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, বুলডোজারের মতোই। এ যেন সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে সমস্ত নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা, সাম্য, সৌভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ন্যায়ের প্রতিশ্রুতিকে পদদলিত করে রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন রথ। নিশ্চিত এই রথ ছুটবে আগামী লোকসভা ভোট পর্যন্ত!
আসলে সবটাই পরিকল্পিত। কেন এই পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়ল? কারণ, এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবল সঙ্কটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তো বটেই, গ্যাস বা জ্বালানির দাম যে জায়গায় গিয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের নাজেহাল দশা। দেশজুড়েই। কোথাও কেউই স্বস্তিতে নেই। এ রকম একটা সময়েই তো সকলের মুখ ঘোরাতে হয়। পরিকল্পনা করেই বিজেপি দেশবাসীর মুখ ঘোরাতে চেয়েছে। অনেকটা সফল তো বলতেই হবে। পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাদের বেলাগাম করে তুলেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হেট স্পিচ আজ তাই বিস্ময় উদ্রেককারী হয় না। প্রকাশ্যে মুসলিম ‘গণহত্যার’ ডাক দিতে গেরুয়াধারীদের গলা কাঁপে না। গোরু নিয়ে যেকোনও ছুতোনাতায় মুসলিম–দলিত হত্যা অনুমোদন পাচ্ছে রাষ্ট্র ও শাসক দলের! রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতীয় নিরাপত্তা আইনে যত গ্রেপ্তারি, তার সিংহভাগ মুসলিম এবং শাসক চিহ্নিত ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’–এর শরিক। বিনা বিচারে গরাদবন্দি অগুনতি মানুষ। আদালতের বিচার পেতে কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর। নতুন ভারতের ‘নিও নর্মাল’ এটাই। সেই ‘নিও নর্মাল’-এর বার্তা একটাই। এ দেশে থাকতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে। ভক্তিতে সমীহ আদায় নয়, ভয়কে ভক্তি করা শিখতে হবে। মেনে নিতে হবে এই সত্য, দেশটা চলবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায়। একনায়কতন্ত্র এভাবেই নিজের অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে। কখনও ব্যক্তির হিংস্রতা, আবার কখনও রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা—‘অপর’-কে দমন করার দ্বিমুখী অস্ত্র ব্যবহারে হিন্দুত্ববাদী শক্তির সামনে সংবিধানের আদর্শ কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
তাই দেশের জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মুসলিম হলেও আজও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের হার ৫ শতাংশের কম। আধা সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন সাড়ে ৪ শতাংশ। ভারতের আমলাতন্ত্র, বিদেশ মন্ত্রক এবং পুলিস সার্ভিসে মুসলিমদের সংখ্যা ৩.২ শতাংশ। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বড়জোর ১ শতাংশ। আনুপাতিক হারের বিবেচনায় যেখানে লোকসভায় ৭৪ জন মুসলিম সদস্যের থাকা উচিত, সেখানে রয়েছেন মাত্র ২৭ জন। দেশের কোনও রাজ্যে আজ মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী নেই। ১৫ রাজ্যে একজনও মুসলিম মন্ত্রী নেই! ১০ রাজ্যে রয়েছেন মাত্র একজন করে। অধিকাংশের দায়িত্বে সংখ্যালঘু মন্ত্রক! উগ্র হিন্দুত্ববাদের আঁতুড়ঘর গুজরাতে মুসলিম জনসংখ্যা ৯ শতাংশ হলেও ১৯৯৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিধানসভা বা লোকসভায় বিজেপি একজন মুসলিমকেও প্রার্থী করেনি! ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটেও বিজেপি কোনও মুসলিমকে টিকিট দেয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর মুখে নিরন্তর শোনা যায় ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’–এর কথা! ‘নীলকণ্ঠ’ প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা গেয়ে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা যেমন বলেছেন, ‘বিরোধীরা ভোটব্যাঙ্কের লক্ষ্যে নিম্নমানের রাজনীতি করছে... দেশের আত্মায় আঘাত হানছে... দেশের মানুষ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করছে। মোদি সরকারের সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস ও সবকা প্রয়াসের নীতি অপরিবর্তিতই থাকবে। ওই নীতি মেনেই দেশ এগিয়ে চলেছে। চলবেও।’ আজ এমন অসত্যকে প্রতিষ্ঠা করতেই— ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে দেওয়া হয় ছোট-বড় অজস্র মিথ্যার বিষ। যার প্রতিটিরই টার্গেট ভারতের বহুত্বকে আক্রমণ করা, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতার মাত্রা বৃদ্ধি। ‘সত্য’পথে তো আর ক্ষমতারথ ছোটানো যায় না। এত দিনে বহু নির্বাচনে এ কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে, নিরন্তর মিথ্যা কথা বলে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন সম্ভব। ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে অহেতুক ভীতির আবহ সৃষ্টি করে বিদ্বেষের রাজনীতিকে পুষ্ট রাখাই যথেষ্ট। যোগী আদিত্যনাথরা তো সেই পথেরই পথিক!
ক্ষমতাসীন গেরুয়া শিবির তো কবেই ভুলে গিয়েছে, নির্বাচনী গণতন্ত্রে মানুষের কথা মাথায় রাখার বাধ্যবাধকতা শাসকের থাকেই। শাসন ক্ষমতায় থাকতে হলে সমালোচনাকে মর্যাদা দিতে হয়। পর্বতপ্রমাণ অহমিকার চূড়া থেকে নামতে হয়। ‘যা করছি সেটাই ঠিক’—এই অবস্থান থেকে সরে এসে অপরের কথা শুনতে হয়। বিরোধী যুক্তি অনুধাবন করতে হয়। সেটাই গণতন্ত্রের দাবি। কিন্তু এ দাবি মানবে কে?

7th     July,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ