বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

রাজপাটহারা ৪৫ বছরের পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস
হারাধন চৌধুরী

কাকতালীয়। তবু দুটি ২১ তারিখ বাংলার রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ—২১ জুন আর ২১ জুলাই।
২১ জুলাই আসার আগেই মানুষ জেনে যায়, সেদিন বিরাট রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। তৃণমূল কংগ্রেস দিনটিকে পালন করে ‘শহিদ দিবস’ নামে। কিন্তু ২১ জুনের তাৎপর্য সাধারণ মানুষ ভুলে গিয়েছে। কিছু পুরনো বামপন্থী মানুষ হয়তো মনে রেখেছেন, প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু শপথ নিয়েছিলেন ২১ জুন, ১৯৭৭। শুধু একটি সরকার তৈরি নয়, সাত সাতটি বামফ্রন্ট সরকারের বীজ রোপণ হয়েছিল ওই মাহেন্দ্রক্ষণে। বিপরীতক্রমে খেদের দিন কংগ্রেসিদের কাছে। সেদিন পতন হয়েছিল বিতর্কিত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মন্ত্রিসভার। সেই বিচারে কংগ্রেসের রাজপাট হারানোর ৪৫ বছর পূর্ণ হল অতি সম্প্রতি।
কংগ্রেস বরাবরই বামপন্থীদের ঘোষিত শ্রেণিশত্রু। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে কংগ্রেসকে উৎখাত বামেদের জন্য স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণ। নরেন্দ্র মোদি গেরুয়া শিবিরকে কংগ্রেসমুক্ত ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তেমনি প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসুরা বামপন্থী বাঙালিকে স্বপ্ন দেখাতেন কংগ্রেসমুক্ত বাংলা গড়ার। বামপন্থীরা ভাবতেন এই স্বপ্ন জ্যোতিবাবুর হাতেই বাস্তবরূপ পাবে। কিন্তু মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতার রেকর্ড সৃষ্টির পথে অন্তরায় হয়ে ওঠেন এক বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস নেতা। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে বাংলা কংগ্রেস নামে নতুন দল তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম অকংগ্রেসি (যুক্তফ্রন্ট) সরকার উপহার দেন অজয় মুখোপাধ্যায়। অর্থাৎ বাংলায় প্রথম অকংগ্রেসি সরকার তৈরির (১৯৬৭ সালের ১ মার্চ) কৃতিত্ব জ্যোতি বসুর নামের পাশে লেখা হল না, ইতিহাস জায়গা করে দিল অজয় মুখোপাধ্যায়কে। অজয়বাবুকে সামনে রেখে তিনবার সরকার (দুটি যুক্তফ্রন্ট-সহ) তৈরি হয়। সবক’টিই অত্যন্ত স্বল্পায়ু। দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন হয় ১৯৭০-এ। যে মার্কসবাদী ও কমিউনিস্টদের ভরসায় অজয়বাবু গাছে চড়েছিলেন, বস্তুত তাঁরাই সুযোগ বুঝে কেড়ে নিয়েছিলেন মই। ১৬ মার্চ, ১৯৭০ মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় পদত্যাগ করেন। তবে, রাজ্যপাল তাঁকেই সাময়িকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে বলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৭ মার্চ হরতাল ডাকে সিপিএম। হাড় হিম করা সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড ঘটে সেদিনই। রাজ্যে ওই একদিনে খুন হল ২৪ জন! ১৮ মার্চ সিপিএম-বর্জিত নব-কংগ্রেস-সমর্থিত সরকার তৈরির চেষ্টা হয়। সেটা ছিল দিল্লি, রাজভবন ও সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মস্ত গোপন খেলা। তবে সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক বেঁকে বসায় খেলাটি ভেস্তে যায়। আবার জ্যোতিবাবুদের ছয় পার্টির জোটের তরফে বিকল্প সরকার তৈরির কৌশলও ব্যর্থ হয় চূড়ান্তভাবে। শেষমেশ ১৯ মার্চ, ১৯৭০ জারি হল রাষ্ট্রপতির শাসন। 
বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪৮ থেকে টানা সাড়ে ১৪ বছর রাজপাট সামলেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই কংগ্রেসের ছন্নছাড়া দশা শুরু হয়। ক্ষমতা ছাড়া নিতান্তই অসহায় বোধ করতে থাকা দলটির কাছে রাষ্ট্রপতির শাসন হঠাৎই আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালে ফের ক্ষমতা ফিরে পায় কংগ্রেস, রাইটার্সের দখল যায় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের হাতে। আধা-ফ্যাসিস্ত শক্তি কর্তৃক নজিরবিহীন কারচুপির অভিযোগ তোলেন জ্যোতি বসুসহ সমস্ত বিরোধী নেতারা। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২-এর নির্বাচন পর্যন্ত বাংলার বুকে ১৬৫৩টি রাজনৈতিক হত্যা সংঘটনের অভিযোগ ওঠে। সিদ্ধার্থ জমানাও খুন জখম অস্থিরতার চরম নজির স্থাপন করে। ১৯৭৫-এ ইন্দিরা শাহি জারি করে জরুরি অবস্থা। তাতে অস্থিরতা আরও ভয়াবহ আকার নেয়। জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে সহস্রাধিক বামপন্থী মানুষকে হত্যা করা হয়। এছাড়া ১৯৭০-৭৭ পর্বে কংগ্রেসের গোষ্ঠী কোন্দলে প্রাণ যায় ১৩০ জন কংগ্রেসির। সিদ্ধার্থ জমানায় শ’খানেক পুলিসও খুন হয়। রাজ্যজুড়ে কায়েম হয় বেনজির মস্তানরাজ। সব মিলিয়ে কংগ্রেস শাসন নিজেকে জনগণের সাক্ষাৎ আপদ প্রমাণ করে ছেড়েছিল। 
জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর ১৯৭৭ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার জোগাড় হয়। রাজ্য বিধানসভার ভোটেও বামেদের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট অভাবনীয় সাফল্য পায়। সরকার গড়েই জ্যোতি বসুরা গণভিত্তি মজবুত করার উপর জোর দেন। ১৯৭৮-এ হল ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ভোট। প্রত্যাশা মতোই এল বিপুল জয়। ১৯৮০-তে কেন্দ্রে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা সরকারের পতনের পর ক্ষমতা ফিরে পান শ্রীমতী গান্ধী। কিন্তু সেই ভোটেও বাংলায় প্রায় ঠাঁই-হারা হয়ে যায় কংগ্রেস। তার রেশ টাটকা থাকতে থাকতেই ১৯৮১-তে ভোট নেওয়া হল ৮১টি পুরসভায়। সবক’কটিই বামেরা পেল। ওই জোয়ারে বামেদের ফের জয় জয়কার হল ১৯৮২-র বিধানসভা ভোটে। জ্যোতিবাবুরা বুঝিয়ে দিলেন, ১৯৫২ থেকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ঐক্য গড়ার যে চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন, তাতে শুধু সফল নন ভীষণ পোক্তও। 
পার্টি কতটা ভোটকুশলী তার প্রমাণ রাখলেন তাঁরা টানা ৩৪ বছর। কিন্তু তার ভিতরে ঘটে গিয়েছে মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তু বাঙালিদের সঙ্গে নারকীয় কাণ্ড, বিজন সেতুতে নিরস্ত্র সন্ন্যাসীদের হত্যাসহ অগণিত অমানবিক ঘটনা। উল্লেখযোগ্য, ১৯৮৪-তে রাজ্য বাজেট পেশ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে বিধানসভা কক্ষে লাঠিধারী গুন্ডাদল ঢুকিয়ে কংগ্রেস বিধায়কদের বেধড়ক পেটানো হয়। গবেষণা সংস্থায় ঢুকে বিজ্ঞানীদের পিটিয়ে বিখ্যাত হন এক এমপি। প্রশাসন আর পার্টি দু-দশ বছরের ভিতরেই একাকার হয়ে গিয়েছিল। পার্টির ‘শিক্ষাবিদ’ ছাড়া কারও ঠাঁই ছিল না কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাথায়। তাঁরাই ডাক পেতেন পার্টি ও গণসংগঠনের মঞ্চ আলোকিত করার জন্য। ছোটদের মনও বিষিয়ে দিতে ১৯৭৯ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় রচনা লিখতে দেওয়া হয়: গত বছরের ভয়াবহ বন্যা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যের অপ্রতুলতা!
সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ হতেই, ভোটে কারচুপি-সন্ত্রাসের লাইন নেয় সিপিএম। ত্রাতা হয়ে ওঠে কানকাটা, গালফাটা হার্মাদ বাহিনী। ১৯৯৩ সাল। রাজ্য যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে মহাকরণ অভিযানের ডাক দেন। প্রতিবাদী জনতার জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল মহানগর। সেই নিরস্ত্র নরনারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জ্যোতি বসুর সশস্ত্র পুলিস বাহিনী। রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিল গুলিবিদ্ধ ১৩টি তাজা প্রাণ। দিনটিকে সেদিনের যুবনেত্রী ‘শহিদ দিবস’ নাম দেন এবং তারপর থেকে প্রতিবছর রাজ্যজুড়ে শহিদতর্পণ চলছে তাঁর নেতৃত্বে। কেন্দ্রে তখন নরসিমহা রাওয়ের শাসন। তিনিই কংগ্রেস সুপ্রিমো। রাজ্য কংগ্রেসে চলছে ‘সিপিএমের বি টিম’-এর দাপট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশা করেছিলেন বাংলার মানুষের স্বার্থে হাইকমান্ড সক্রিয় হবে। কিন্তু দিল্লি সামান্যতম আগ্রহ দেখায়নি। লোকে বলত, সবটাই বসুর হাতযশ! ফলে নতুন দল গড়তে বাধ্য হন মমতা। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ভূমিষ্ঠ হল তৃণমূল কংগ্রেস। কোনও সন্দেহ নেই, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই সংঘটিত পুলিসি বর্বরতাই তৃণমূল গঠনের উদ্যোগটিকে ত্বরান্বিত করেছিল। 
মমতার তৃণমূলই ২০১১ সালে জগদ্দল সিপিএম শাহির পতন ঘটায়। সঙ্গে ছিল কংগ্রেসসহ আরও কয়েকটি দল। কুণ্ঠাহীন সমর্থন ছিল আপামর জনগণের। কিন্তু মা-মাটি-মানুষের সরকার তৈরির পরই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় কংগ্রেস। মহাকরণ ও মমতার জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায় তারা। ২০১৬ সালে তাদের কাছে টেনে নেয় সিপিএম। একাধিক বাম শরিকের আপত্তিতে, ২০১৮ পঞ্চায়েত ভোটে বাম-কংগ্রেস অফিসিয়াল জোট না-হলেও আঞ্চলিক স্তরে কিছু সমঝোতা হয়েছিল। এই এক্সপেরিমেন্টে বাম, কংগ্রেসের কেউই লাভবান হয়নি। দু’পক্ষের সমর্থকদের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব যাঁরা জানেন, তাঁরা বোঝেন—এটা হওয়ার কথা ছিলও না। ফলে, ২০১৯ লোকসভার ভোটে কংগ্রেস একাই চলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দুটি আসনে জেতে। ফের পড়ে সিপিএমের চক্করে। কংগ্রেস, ২০২১ বিধানসভার ভোটে বামেদের জোটসঙ্গী হয় আর একদফা। ক্রমে পরিষ্কার হচ্ছে—জ্যোতি বসুর জমানা থেকে কংগ্রেসকে শেষ করে দেওয়ার যে গোপন খেলা শুরু হয়েছিল, সেটা নিষ্ঠাভরেই চালিয়ে যাচ্ছে সিপিএম। তেলে-জলে মেশানোর জবরদস্তিতেই পতন (পড়ুন, পচন) নিশ্চিত হল, ২০২১-এ কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বিধানসভা থেকে। দেশের প্রতিটি গ্রামে যে-দলের কিছু-না-কিছু কর্মী-সমর্থক এখনও বর্তমান, তার এই করুণ পরিণতি! পুরভোটের পর লেখা হল আর একদফা নিখোঁজ সংবাদ। আগের দুই কংগ্রেসের (বাংলা কংগ্রেস, নব কংগ্রেস) সাইনবোর্ডটুকুও আর নেই। দল দুটি আজ ইতিহাসের সামগ্রীমাত্র। ২০২৪ লোকসভার ভোট অদূরে। ওই ভোটের রেজাল্ট বলবে, বাংলার বুকে জাতীয় কংগ্রেস তাদের থেকে কতটা বড় শক্তি। এখন মনে হয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল না ভাঙলে ‘কংগ্রেস’ শব্দটাই হয়তো মুছে যেত বাংলার রাজনীতি থেকে। 

6th     July,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ