বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

প্যাকেজিংয়ের ঘোড়ায়
বিভাজনের সওয়ারি
শান্তনু দত্তগুপ্ত

ধানমন্ত্রী চিঠি লিখতে পারেন। চিঠির প্রাপক মিতালি রাজ। প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ জানান ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদানের জন্য। প্রশংসায় ভরিয়ে দেন মিতালির নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাকে। বলেন, তুমি নিছক একজন খেলোয়াড় নও, তুমি ট্রেন্ড সেটার। শুধু কি একজন প্রধানমন্ত্রী? ওই চিঠি যেন লেখা আপাদমস্তক কোনও এক ভারতীয়ের... যিনি গর্বিত মিতালির পারফরম্যান্সে। আপামর দেশবাসীর না বলতে পারা কথাগুলোই তিনি যেন তুলে ধরছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়কের সামনে।
প্রধানমন্ত্রী ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল কুড়োতে পারেন। 
নয়াদিল্লির আইটিপিও সুড়ঙ্গটি উদ্বোধনের সময় যতটুকু মানুষের নজর টেনেছিল, তার সবটাই ছাপিয়ে গিয়েছেন মোদিজি। কারণ ওখানে গিয়ে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন... রাস্তার ধারে পড়ে আছে বোতল, প্লাস্টিক। নিজের হাতে সেইসব কুড়িয়ে এনেছিলেন তিনি। স্বচ্ছ ভারতে বিশ্বাসী মোদিজি। ঠিক যেমনটা ভেবেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ঘাটতির মধ্যে গান্ধীজি প্যাকেজিংটা করতে পারেননি। কিন্তু তাঁরই ভাবনাকে দারুণ প্যাকেজিং করে বিজেপি সরকার বাজারে এনেছে। প্রচারের ভরকেন্দ্রে একজনই—নরেন্দ্র মোদি। ফর্মুলা হিট। চারদিকে মারমার কাটকাট। প্রধানমন্ত্রী নিজে বোতল কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলছেন, আর আপনারা পারবেন না! স্কুলে প্রচার, কলেজে প্রচার, অফিসে, বাস স্টপেও।
প্রধানমন্ত্রী মৌনও থাকতে পারেন।
এইটে হজম হতে একটু অসুবিধা হলেও সর্বৈব সত্য। কিন্তু ইস্যুবিশেষে। এমনিতে থালা বাজানো থেকে সরকার ভাঙানো... সর্বত্র তাঁর অবাধ ব্যুৎপত্তি। মাঝে মাঝে কিছু বিষয় তিনি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যান। যেমন নূপুর শর্মার ‘ছোট্ট ঘটনা’। ছোট বলায় রেগে যাবেন না যেন! আপনি হয়তো ভাবছেন, একটা মন্তব্যে দিকে দিকে আগুন জ্বলে গেল, খুন হল, বিভাজন চরমে পৌঁছল... তারপরও ছোট্ট বলে কীভাবে? বলতেই হবে। কেন জানেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো মনে করছেন না। কী এমন হয়েছে? কয়েকটা শহরে প্রতিবাদ! বিক্ষোভ! অল্পসল্প আগুন! ১৪০ কোটির গণতন্ত্রে এটুকু হতেই পারে। আইনরক্ষকরা এতটুকু সামাল দিতে বেশ সক্ষম। আর যে দেশে ৭০ ভাগ মানুষ দু’বেলা পেটপুরে খেতে পায় না, তারা কতদিন আর প্রতিবাদের ঝান্ডা নিয়ে লাফাবে? পাঁচদিন! দশদিন! একমাস! তারপরই সব শেষ। দেখুন তো, এখন সব কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। উদয়পুর বা অমরাবতীর খুন নিয়ে একটু উথালপাথাল চলছে বটে, তবে তা থেমে যাবে। মানুষ আবার ডুবে যাবে জীবন সংগ্রামে। লড়াই চলবে নিরন্তর। বেঁচে থাকার লড়াই। টিকে থাকার লড়াই। রাজনীতির প্রতিটা ধুলোকণা এই বাস্তবটা জানে। তাই কী দরকার কথা বাড়িয়ে? 
মোদিজি না বলতে পারেন, নূপুরদেবীর কিন্তু কথা বলার ছিল। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল তাঁকে... ক্ষমা চাইতে হবে দেশবাসীর সামনে। গণমাধ্যমে। মানুষের মনে যে ঘৃণা, যে বিদ্বেষ তিনি ভরে দিয়েছেন, তা হয়তো কর্পূরের মতো উবে যাবে না। কিন্তু প্রলেপ পড়বে ঘায়ে। শান্ত হবে পৃথিবী। টিভিওয়ালারা ভাবলেন, এবার তৈরি থাকতে হবে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে মানে নূপুর শর্মা বলবেন। মারাত্মক টিআরপি হবে। ক্যামেরা, বুম সব রেডি। কিন্তু নূপুরদেবী আর রেডি হয়ে উঠতে পারেন না। এখনও পর্যন্ত তিনি ক্ষমা চাননি দেশের কাছে। তাঁর অবিবেচক মন্তব্যের জন্য এতদিন পরও সমাজের পরতে পরতে ঘোরাফেরা করছে চাপা টেনশন। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে সন্দেহের চোখে। সদ্য যৌবনে পা দেওয়া ডাকাবুকো ছেলেটা কলেজের জন্য বেরলে মা দুরুদুরু বুকে সাবধান করছে... বাবা, বুঝেশুনে কথা বলিস। 
এটাই কি চেয়েছি আমরা? এই সমাজ? ভণ্ড গেরুয়াধারীদের একাংশ সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ নামক শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য দেদার হাঁকডাক চালাচ্ছে। সেই চেঁচামেচি বাড়ছে। প্রতিদিন। সেই আগুনে গাওয়া ঘি ঢালছেন নূপুর শর্মারা। এ আর এমন কী অপরাধ? দোষী তো অল্ট নিউজের মহম্মদ জুবেইর। চার বছর আগে একটি টুইট করেছিলেন। তার জন্যই আপাতত তিনি শ্রীঘরে। আর একটি অপরাধ হয়েছে তাঁর—নূপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য তিনি টুইটারে শেয়ার করেছিলেন। এতবড় আস্পর্ধা! টেনে আনো ২০১৮ সালের টুইট। করো এফআইআর। আর এফআইআর হলে গ্রেপ্তার তো করতেই হবে! ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছেন তিনি। কিন্তু নূপুর শর্মার বিরুদ্ধে কি ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ নেই? যতদূর জানা যাচ্ছে, চারটি রাজ্যে ন’টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। হিংসায় উস্কানি সহ বহু ধারা রয়েছে। তারপরও তিনি গ্রেপ্তার হননি, অথচ তাঁর বক্তব্য প্রচার করার দায়ে চেপেছে জুবেইরের কাঁধে। সংবিধান বলে, রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপাল ছাড়া এদেশের আইনে কেউ ইমিউনিটি পেতে পারেন না। অর্থাৎ, এই দু’টি পদ ছাড়া দেশের যে কোনও নাগরিকের জন্য আইন সমান। অপরাধ করলে গ্রেপ্তার হতে হবে। তাহলে নূপুরদেবী কি রাজ্যপাল? নাকি বিজেপির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী? তাঁর ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশ—সব জলে গেল বলে মনে হচ্ছে। অভিযুক্তের হেলদোল নেই, সরকারেরও না! ওই যে বললাম, ইস্যুভিত্তিক। সবাই বোধহয় প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায় রয়েছেন। কবে তিনি কিছু বলবেন এই ইস্যুতে, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি স্টার্ট দেবে। তার আগে? পিঠ পুড়ছে, ফিরে শো গোছের ব্যাপার আর কী। বিজেপির তাঁবেদাররা অবশ্য তাদের কাজকম্ম চালিয়ে যাচ্ছে যথারীতি। সুপ্রিম কোর্ট ‘নূপুর-আদেশ’ দেওয়া মাত্র গেরুয়া শিবিরের পেটোয়া একটি সংবাদমাধ্যম লিখেছিল, ‘ইসলামের নামে কয়েকজন ধর্মান্ধ খুন করছে, আর তার দায় একজন মহিলাদের উপর চাপিয়ে যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট... এসব বন্ধ হওয়া দরকার।’ অথচ, সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু তার পর্যবেক্ষণে একবারের জন্যও হিংসা, খুন বা ইসলামের নামে ধর্মান্ধতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেনি। তাহলে এভাবে আদালত অবমাননার সাহস গেরুয়া বশংবদ মিডিয়াকুল পায় কীভাবে? এদের বিরুদ্ধে কেন এফআইআর হয় না? সংবাদমাধ্যমটির নাম অল্ট নিউজ হলেও কি একইরকম উদাসীনতা দেখা যেত? নাকি এখনও চলছে অপেক্ষা... মোদিজির মৌনতা ভঙ্গের। তিনি বললেই হবে গ্রেপ্তার। পুলিস ব্যবস্থা নেবে। আইন আবার সবার জন্য সমান হবে।
হয়তো এত ছোটখাট ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় বিজেপির দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের নেই। মহারাষ্ট্র নিয়ে বহুদিন ছুটোছুটি করতে হয়েছে। অবশেষে মিশন সফল। এবার লক্ষ্য তেলেঙ্গানা। ভোট সামনেই। ভাঙাগড়ার খেলায় বেশি মন দিতে হয় শাসনকালের মাঝামাঝি। তেলেঙ্গানার জন্য অতটা দরকার না হলেও কিছুটা তো দরকার বটেই। বাকিটা বাংলার জন্য তোলা রয়েছে। অমিত শাহ সে কথা ঘোষণাও করেছেন—খুব শিগগিরই নাকি বাংলায় বিজেপি সরকার গড়বে। কীভাবে? রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে তারপর ভোটে যাবে? শাহ মশাইয়ের বোঝা দরকার, ৩৫৬ অস্ত্রে শান দিলে আখেরে লাভ হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তখন ২৫০ আসন নিয়েও যদি তৃণমূল সরকার গড়ে, অবাক হবেন না। আর রইল একনাথ সিন্ধে থিওরি। আপনারা বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, বাংলায় সে চেষ্টা আপনারা আগেই করে রেখেছেন। লাভের লাভ কিছু হয়নি। শান্তিকুঞ্জের শান্তিলাল বিজেপির জন্য এতটুকু শান্তি আমদানি করতে পারেননি। এখন তো আরও হবে না। ঘোড়া কেনাবেচার চেষ্টা যতই চালান না কেন, অদূর ভবিষ্যতেও বাংলার তৃণমূল বিধায়করা ওই ফাঁদে পা দেবেন না। 
দিন পাঁচেক আগের কথা। মিশন মহারাষ্ট্র যখন উত্তেজনার শেষ সীমানায়। জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলন করছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। বলছিলেন, ‘বেটিং, গ্যাম্বলিং, ক্যাসিনো, হর্স ট্রেডিং... উমম...  হর্স রেসিং।’ বড়ই শোচনীয় দশা বিজেপির। পরিস্থিতি এমনই যে সর্বত্র হর্স ট্রেডিংই মাথায় ঘুরছে নেতানেত্রীদের। সুপ্রশাসনের দিকে নজর দেওয়ার সময় থাকবেই বা কীভাবে? আসলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর থেকে আপনারা আট বছরে কিছুই শেখেননি। একবারও এ ধরনের কথা তাঁর মুখে শুনেছেন? সম্মান করেন প্রত্যেককে। মনে নেই, বাংলায় বিধানসভা ভোটের আগে এসে কী সুন্দর তিনি ‘দিদি ও দিদি’ ডেকেছিলেন! কংগ্রেসে খানিক অ্যালার্জি তাঁর আছে বটে, তা বলে সীমা তিনি কি কখনও অতিক্রম করেন? কখনও কি রাহুল গান্ধীকে আজ পর্যন্ত পাপ্পু বলে ডেকেছেন? কখনও ইন্দিরা গান্ধীর নামে কুকথা বলেছেন? এই সব শিখতে হবে। সংস্কারের ঘোড়ায় চেপে প্রবল গতিতে ছুটে চলেছেন মোদিজি। তাই তো দখল হচ্ছে একের পর এক রাজ্য। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই! থোড়াই কেয়ার। নানা ছক বেরিয়ে আসছে আস্তিন থেকে। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে একের পর এক রাজ্য সরকার। এত ব্যস্ততার মধ্যে নূপুর শর্মার মতো ছোট্ট ইস্যুতে কি সত্যিই কথা বলা যায়? বরং হাতড়ে বেড়ানো কিছু প্লাস্টিকের বোতল... কলম ধরা একটা চিঠির জন্য। এ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! ততক্ষণে বাড়ুক ধর্মান্ধতা, হিংসায় উস্কানি, খুন, বিভাজন... দরজায় যে কড়া নাড়ছে চব্বিশের ভোট।

5th     July,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ