বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

নিঃস্ব বামেরা বিজেপিকে
শক্তি জোগাচ্ছে
তন্ময় মল্লিক

উস্কানি এভারেস্ট ছুঁলেও বিজেপি তা থেকে ফায়দা তুলতে পারল না। মহকুমা পরিষদের নির্বাচন বুঝিয়ে দিল, বাংলা ভাগের ফাঁদে পা দেয়নি শিলিগুড়ি। তাই কর্পোরেশনের পর মহকুমা পরিষদের নির্বাচনেও ভরসা থাকল সেই শাসক দলেই। বামেরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েও বিজেপিকে লড়াইয়ে ফেরাতে পারল না। উল্টে নিজেরাই নিঃস্ব হয়ে গেল। তাই একদা উত্তরবঙ্গের অলিখিত মুখ্যমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের শিলিগুড়িতে সিপিএম পঞ্চম। নির্দলেরও পরে। আর বিজেপি? বামেদের সৌজন্যে দ্বিতীয় হলেও তৃণমূলের গায়ে আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পারল না।
তিন দফায় বিপুল শক্তি নিয়ে তৃণমূল রাজ্যের ক্ষমতা দখল করলেও মুখ ফিরিয়েছিল উত্তরবঙ্গ। দু’একটি জায়গায় জয়ী হলেও সামগ্রিকভাবে মাটি তৈরি করতে পারেনি তৃণমূল। গত লোকসভা নির্বাচনে তো উত্তরবঙ্গে রীতিমতো গেরুয়া ঝড় বয়ে গিয়েছিল। একটি আসনেও তৃণমূল দাঁত ফোটাতে পারেনি। বিধানসভা ভোটেও সেই প্রভাব প্রায় অটুট ছিল। কিন্তু একুশের নির্বাচনে হাওয়ায় ওড়ানো বিজেপির ফানুস চুপসে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিটি নির্বাচনে বিপর্যস্ত হচ্ছে গেরুয়া শিবির।
শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ আকারে ছোট হলেও এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। একুশের ভোটে দক্ষিণবঙ্গে বিজেপি নাস্তানাবুদ হলেও দার্জিলিং জেলা সহ উত্তরবঙ্গের একের পর এক আসনে জয় হাসিল করেছিল বিজেপি। পেট্রল, ডিজেল, গ্যাসের অগ্নিমূল্যের দিকে থেকে নজর ঘোরাতে বিজেপি নেতারা তুলেছিলেন রাজ্যভাগের দাবি। তাকে সমর্থন করেছিল রাজ্য ও দিল্লি বিজেপির একাংশ। বাংলাকে অস্থির করার জন্য উস্কানির খামতি ছিল না। তবে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘জীবন দেব, কিন্তু বাংলা ভাগ করতে দেব না।’ এমনই এক প্রেক্ষাপটে মহকুমা পরিষদের নির্বাচনের দিকে নজর ছিল গোটা রাজ্যের। 
সবুজ ঝড়ের দাপটে এরাজ্যে লাল পার্টি অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগলেও বহু বছর শিলিগুড়িতে তারা মাথা উঁচু করেই ছিল। সৌজন্যে অশোক ভট্টাচার্য। তাঁরই নেতৃত্বে কর্পোরেশনের পাশাপাশি শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের ক্ষমতাও দখল করেছিল সিপিএম। 
২০১৫ সালে চারটি পঞ্চায়েত সমিতিতেই তারা জিতেছিল। ২২টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ১৯টিতেই বোর্ড গড়েছিল বামেরা। ফলে ‘অশোক মিথে’ আচ্ছন্ন হয়েছিল শিলিগুড়ি। ২০১৯ সালে উত্তরবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের আগের শিলিগুড়িতে গিয়ে অনেক তৃণমূল নেতাকে বলতে শুনেছি, ‘আমাদের দলে একজন অশোক ভট্টাচার্য দরকার। দিদির কাজ তুলে ধরতে পারছি না। সেটা পারলেই সিপিএম বিজেপি উড়ে যাবে।’ অস্বীকার করার উপায় নেই এবারের মহকুমা পরিষদের নির্বাচনে সেই ‘অশোক মিথ’ ভেঙে চুরমার।
নির্বাচনে বিপর্যয় সত্ত্বেও সিপিএম শাসক দলের ‘সন্ত্রাস’কে কাঠগড়ায় তুলতে পারেনি। কারণ সিপিএমের দলীয় মুখপত্র ‘গণশক্তি’ পত্রিকার প্রথম পাতায় লিখেছে, ‘চাপা সন্ত্রাস, হুমকির পরিবেশ ছিল। ভোটের দিন কয়েকটা জায়গায় হামলার ঘটনাও ঘটে। যদিও বড় ধরনের কোনও অশান্তি ছাড়াই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’
শাসক দলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফায়দা লোটে বিরোধীরা। এটাই রাজনীতির প্রথা। কিন্তু এবারের পঞ্চায়েত ভোটে সেই সুযোগটাও বিরোধীরা নিতে পারেনি। চটহাট পঞ্চায়েতে প্রার্থী করা নিয়ে শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল। ফলে তৃণমূলের অনেকেই নির্দল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাতে শাসক দলের ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। তা সত্ত্বেও ১৮টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ৯টি ও নির্দল ৮টি পেয়েছে। একটি মাত্র আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। 
এর অর্থ, নেতাদের মধ্যে প্রবল খেয়োখেয়ি থাকলেও মানুষ শাসক দলের বাইরে যেতে চাইছেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্পেই তাঁদের ভরসা। হাজারো প্ররোচনা, উস্কানি সত্ত্বেও মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে না। তাই প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূল বিপুল জয় পাচ্ছে।
মানুষের পাশে থাকলে যে ভোট পাওয়া যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আপার বাগডোগরা পঞ্চায়েত। কংগ্রেস নেতা অমিতাভ সরকার বছরভর কর্মীদের পাশে থাকেন। তার ফলও পেয়েছেন। ১১টি আসন পেয়ে তৃণমূল ক্ষমতা দখল করলেও সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস।
শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ যে এলাকা নিয়ে গঠিত সেখানকার দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রই বিজেপি জিতেছিল। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গেরুয়া শিবিরের ভোট ব্যাঙ্কে ব্যাপক ধ্বস স্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে ৩২০টি পঞ্চায়েতের আসনে জয়ী হয়েছে, সেখানে বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৮৬টি। বিজেপি নেতারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন, মুখে তাঁরা যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন, পায়ের তলার মাটি দ্রুত সরে যাচ্ছে। পাহাড়ে অবস্থা 
আরও খারাপ। সেই কারণে বিজেপি পাহাড়ে ভোটে লড়ার সাহস পায়নি।
পাহাড়ে ‘ভোট বয়কটে’র রাজনীতি বহু পুরনো। রাজ্য সরকারকে সুবাস ঘিসিং অস্বীকার করতেন। সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি বহুবার নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ভোট বয়কটের ডাকে থমকে যেত গোটা পাহাড়। নির্বাচন কর্মীরা কড়া পুলিসি প্রহরায় বুথে যেতেন, আবার শূন্যবাক্স নিয়ে ফিরে আসতেন। এবার বিজেপি এবং তাদের লিখিত ও অলিখিত জোট সঙ্গীরা নির্বাচন বয়কট করেছিলেন। কিন্তু পাহাড় থমকায়নি। উল্টে মানুষ ভোট দিয়েছেন উৎসবের মেজাজে। বোঝা গেল, এই মুহূর্তে পাহাড়ে বিজেপি এবং বিমল গুরুংয়ের গুরুত্ব কতটা!
জিটিএ নির্বাচনে কোন দল কতগুলি আসন পেল সেটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা হল পাহাড়ের মানুষ রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। 
বাম জমানায় আটের দশকে পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর থেকেই নির্বাচন কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছিল। সুবাস ঘিসিং এবং পরবর্তীকালে বিমল গুরুং যে দলকে সমর্থন করতেন নির্বাচনে জিতত তারাই। ফলে নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়লেই এমপি হওয়ার আশায় তাবড় তাবড় নেতা ‘ভিক্ষাপাত্র’ নিয়ে পাহাড়ের নেতাদের দরজায় কড়া নাড়তেন।
ঘিসিংয়ের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের পর থেকেই পাহাড় চলে গিয়েছিল সিপিএমের ‘খরচের খাতায়’। নেতারা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন। সুকনার জঙ্গল পেরতেন না। এমনকী কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টচার্য পাহাড় এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন মহিলা হয়েও যাবতীয় হুমকি, চোখরাঙানি উপেক্ষা করে পাহাড় দাপিয়েছেন। সুবাস ঘিসিংকে পাহাড়ছাড়া করে যে বিমল গুরুং এক সময় ‘হিরো’র মর্যাদা পেয়েছিলেন তাঁকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয়ে মাসের পর মাস আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল। একপ্রকার নাকখত দিয়ে পাহাড়ে ফিরেছেন। ‘বাংলার বাঘিনী’ বিশেষণটা তাঁকেই মানায়।
বামফ্রন্টের রাজত্বেও সুবাস ঘিসিংয়ের ভয়ে সিপিএম পাহাড়ে প্রার্থী দেওয়ার সাহস পেত না। বুদ্ধদেববাবুর পুলিস নেতাদের সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে তাঁরা প্রার্থী দাঁড় করানোর সাহস পেয়েছেন। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাহাড় হাসছে’ স্লোগানকে সিপিএম যতই কটাক্ষ করুক না কেন, এই একটি কারণে তৃণমূল সুপ্রিমোর কাছে তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
এবার শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের নির্বাচনে  বিরোধীরা তৃণমূলের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি। ২২টি পঞ্চায়েতের ৪৬২টি আসনের মধ্যে সিপিএম পেয়েছে মাত্র ১৫টি। বিজেপি জয়ী হয়েছে ৮৬টি আসনে। লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে সিপিএম নিজেদের নিঃস্ব করে দিয়ে বিজেপিকে শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছে। এখনও সেই রাস্তাতেই। মহকুমা পরিষদের ভোট অন্তত সেকথাই বলে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা নানাভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখেছেন, উত্তরসূরি রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রে মা অক্টোপাসের আত্মত্যাগ নজিরবিহীন। ডিম পাড়ার পর মা অক্টোপাস তা রক্ষার জন্য খাওয়াদাওয়াও ছেড়ে দেয়। ফলে দিন দিন রুগ্ন হতে থাকে। তারপর একসময় মারা যায়। সিপিএমের হাল দেখে অনেকে বলছেন, রামের জন্য বামেদের এই ‘আত্মত্যাগ’ মা অক্টোপাসের আত্মবলিদানকেও হার মানাবে।

2nd     July,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ