বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বুলডোজার রাজনীতিই
চিনিয়ে দেয় স্বৈরতন্ত্রকে
সন্দীপন বিশ্বাস

জরুরি অবস্থার সময় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের কথা আমরা কেউ ভুলিনি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব ইন্দিরা গান্ধীকে আজও জরুরি অবস্থার কাঁটা বিদ্ধ করে। এই একটি ব্যাপারে তিনি ভারতের নিন্দিত চরিত্র হয়ে রয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন চালু হওয়া সেই কালো দিনের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ২১ মাসের। সেই জরুরি অবস্থার কথা মানুষ আজও ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারণ করেন। কয়েকদিন আগেই গেল ২৫ জুন। এই কালো দিনটি বিজেপির কাছে একটা অস্ত্র। তারা বারবার সেটা নিয়ে খেলা করে বুঝিয়ে দেয়, এই দিনে দেশের গণতন্ত্রকে নিকেশ করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এই দিন এলেই মোদি থেকে একেবারে চুনোপুঁটি নেতারা ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসকে তেড়ে গাল পাড়েন।  
সেটা হয়তো ভুল নয়, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক সময় চালুনিও ছুঁচের বিচার করে ফেলছে। সেই সময়কার অভিজ্ঞতা বলে, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকে চেনা যায়। কেননা সেটা ছিল একটা ঘোষিত ব্যবস্থা। কিন্তু মোদিজির শাসনের কৌশলকে চেনা যায় না। কেননা বর্তমানে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন এক শ্বাসরুদ্ধ পরিণতির দিকে। সুতরাং আজ মোদি যে পথে হাঁটছেন, সেখানে তাঁর এসব কথা বলা সাজে না। মোদি-শাসনের গেরুয়া ফাঁসে এখানে প্রতি মুহূর্তে লাঞ্ছিত, দলিত, নিপীড়িত হচ্ছে মানবাত্মা তথা দেশের গণতন্ত্র। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গণতন্ত্রের মহান সৌধকে, ব্যক্তির মৌলিক অধিকারকে। তাই ইন্দিরা গান্ধীকে চেনা যায়, কিন্তু মোদিজিকে সহজে চেনা যায় না। ফ্যাসিজিমের লক্ষণই এটা। কিছুদিন ফ্যাসিস্তদের বন্ধুর মতো মনে হয়। প্রথমে কাঁধে হাত রাখে। তারপর কণ্ঠরোধ করে। সার্বিক বিচারে এবং প্রকৃত অর্থেই তিনি ক্রমে ক্রমে এক বিশাল মাপের ডিক্টেটর হয়ে উঠছেন। আগামী দিনে তাঁর স্বৈরতন্ত্রের স্বরূপ হয়তো বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তির উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে চলে যাবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এমন অনেক মানুষ দেখি, যাঁদের কাছে একনায়কতন্ত্র একটা নেশা। সেই নেশায় ডুবে তাঁরা মানুষকে মানুষ মনে করেননি। 
মোদির মধ্যেও সমতুল লক্ষণগুলি দেখা যায়। যেমন তিনি শুধু বলতে ভালোবাসেন, কারও কথা শুনতে রাজি নন। কোনও প্রশ্নের জবাব তিনি দেন না। তিনি চান প্রশ্নাতীত আনুগত্য। তিনি চান ভক্তমণ্ডলী। তিনি চান জাতীয়তাবাদ এবং নরেন্দ্র মোদি শব্দ দু’টি সমার্থক হয়ে উঠুক। বারবার দেখা গিয়েছে লোকসভাকে এড়িয়ে তিনি বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গণতন্ত্রের কাছে দায়বদ্ধতা দেখানোর ক্ষেত্রে তিনি ততটা নিষ্ঠাবান নন। নোট বাতিলের মতো অতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, অথচ কারও সঙ্গে আলোচনাও করলেন না! নিজের ভুল সিদ্ধান্ত এইভাবে দেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়াই হল স্বৈরতন্ত্রের প্রধান লক্ষণ। আমাদের দেশে কত সমস্যা—আর্থিক সমস্যা, স্বাস্থ্যের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, শিল্পের সমস্যা, রাস্তার সমস্যা, বেকারত্বের সমস্যা, পানীয় জলের সমস্যা। কিন্তু ওসবকে তিনি সমস্যা বলেই মনে করেন না। আসলে এদেশে বহু সমস্যার সৃষ্টিই হয়েছে তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। তাঁর কাছে দেশশাসনের অর্থ হল বড় বড় মূর্তি নির্মাণ, মন্দির নির্মাণ, হিন্দুত্বের শক্তি দিয়ে সংখ্যালঘুদের দাবিয়ে রাখা, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি, মানুষের যুক্তি এবং বোধকে পুরাণের শিক্ষার ছাঁচে ফেলে তাঁকে মানসিকভাবে ক্রীতদাসে পরিণত করা। 
স্বৈরতন্ত্রের আরও একটি লক্ষণ, বিরোধীদের নিকেশ করা। আমরাও দেখি, বিজেপি কীভাবে এখানে নানা কৌশলে বিরোধীদের কুচলে দিচ্ছে। ক্ষমতা এবং অর্থবল দিয়ে বিরোধী শক্তিকে একেবারে ছন্নছাড়া করে দেওয়ার অবিরাম চেষ্টা চলছেই। আসলে গণতন্ত্রের কাঠামো ভেঙে শাসক যখন নিজের মতো করে গণতন্ত্রের একটা সংজ্ঞা তৈরি করে, তখন সেটাকেই বলে স্বৈরতন্ত্র।  
আমাদের মতো দেশে যেখানে রাজনীতিতে ক্রিমিনাল কেস খাওয়া নেতা, আর মন্ত্রীদেরই আধিক্য, সেখানকার রাজনীতিতে অন্তত নীতি বলে কিছু থাকে না। তাই অনায়াসেই লোভ দেখিয়ে ভেঙে ফেলা যায় নির্বাচিত একটি সরকারকে। বিরোধী রাজনীতিকদের লোভের বশবর্তী করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায়। গণতন্ত্রে এই প্রহসন মোদি জমানায় বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিকতম নিদর্শন মহারাষ্ট্র। পরবর্তী লক্ষ্য নাকি তাদের বাংলা! তবে এর চেয়ে বড় কমেডি বোধহয় আর কিছু হয় না। 
আর একটা প্রহসনের কথা বলতেই হয়। কালো টাকা ধরার লক্ষ্যে মোদি রাতারাতি নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ভারতীয়দের জমা টাকা টেনে বের করে এনে দেশের মানুষের অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে দেওয়ার নামে মস্করাও করেছিলেন তিনি। সেই ব্যাপারটা এখন কোন পর্যায়ে গড়িয়েছে একটু দেখা যাক। সুইস ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক একটা রিপোর্ট বলছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাঙ্কে ভারতীয়দের জমানো টাকার পরিমাণ সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ২০২০ সালে সুইস ব্যাঙ্কে ভারতীয়দের টাকার পরিমাণ ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যেই সেখানে জমানো ভারতীয়দের টাকার পরিমাণ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার অনেকটাই অবশ্যই সাদা টাকা নয়। তাহলে এই করোনাকালে সুযোগ নিয়ে কারা এই বিশাল পরিমাণ কালো টাকা সংগ্রহ করল, তা দেশবাসীর জানা দরকার। কাদের মদতেই বা হল এমন অবৈধ সম্পদ, তাও মানুষ জানতে চান। 
একদিন মোদি বলেছিলেন, সুইস ব্যাঙ্কের সব কালো টাকা নিয়ে এসে গরিবের অ্যাকাউন্টে ঢোকাবেন। এখন দেখা যাচ্ছে, মোদি সরকারের অপদার্থতায়  গরিব ও মধ্যবিত্তের ঘর শূন্য হয়ে অতুল বৈভবে ভরে উঠছে বড় বড় শিল্পপতিদের অ্যাকাউন্ট। করোনাকালে মানুষ যখন দিশাহারা, পথের মধ্যে প্রাণ যাচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকদের, তারই আড়ালে চলছিল দেশের ধনী শিল্পপতি, উদ্যোগপতিদের স্বার্থরক্ষার অমানবিক খেলা। সেই সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি খুইয়ে বেকার হয়েছিলেন, তাঁদের মাসিক আয় কমে গিয়েছিল। এর উপর হু হু করে মূ্ল্যবৃদ্ধি আর পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোর বেহিসেবি খেলায় ধনীরা আরও ধনী হয়েছেন। গরিব আরও গরিব হয়েছেন। সুইস ব্যাঙ্কের এই রিপোর্ট মোদি শাসনের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।  
তাই এখন মোদিজির সামনে প্রশ্নপত্র। জবাব দিতে হবে তাঁকেই। কেননা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখন তো তিনিই দায়বদ্ধ। তিনি অনায়াসেই বলতে পারেন, তাঁর আমলে কাদের টাকা সুইস ব্যাঙ্কে ঢুকেছে। তাহলে কি দেখা যাচ্ছে? নোট বাতিলে ধরা পড়ল না একটাও কালো টাকা। উল্টে তারপরেই সুইস ব্যাঙ্কে বেড়ে গেল কালো টাকার পরিমাণ। নোট বাতিলের ‘সুফল’ কারা ভোগ করলেন, এটা তো একেবারে জলের মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল। তাই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত সুইস ব্যাঙ্কের তথ্যপ্রকাশ করে প্রকৃত রাজধর্ম পালন করা।
রাজধর্মের কথা বললেই আবার একরাশ হতাশা জেগে ওঠে। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই শাসক মানেন না তাঁর সীমাবদ্ধতার কথা। শাসক একজন জনপ্রতিনিধি। আইন তৈরি করার ক্ষমতা গণতন্ত্র তাঁকে দিয়েছে। কিন্তু বিচারের ভার তাঁর হাতে নেই। একমাত্র স্বৈরতন্ত্রেই আইন প্রস্তুতকারী ও বিচারক একই ব্যক্তি হন। তাই মানুষ প্রতিবাদ করলেই কোনও সরকার সেই প্রতিবাদীকে শাস্তি দিতে পারে না। সেই অধিকার গণতন্ত্র তাকে দেয়নি। প্রশাসনকে অভিযোগ নিয়ে আদালতের দরজায় দাঁড়াতেই হয়। এটা মধ্যযুগ নয় যে, রাজার নির্দেশে বিদ্রোহী প্রজাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে কিংবা গিলোটিনে গলা কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু সরকার-বিরোধীদের এদেশে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নানা অজুহাতে বিজেপি সরকার বিরোধীদের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দিচ্ছে। একদিকে বুলডোজার, অন্যদিকে ঠোক দো—এই দুই অস্ত্র দিয়ে বিরোধীদের দমন করার অগণতান্ত্রিক চেষ্টা চলছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে বিরোধী স্বর যত বাড়ে, বুলডোজারের আস্ফালনও ততই বাড়ে। মোদিও তার প্রশংসা করেন। বুলডোজারের এই অহমিকা আর রোষই বলে দেয়, স্বৈরতন্ত্রী শাসকের আকার, মন, মানসিকতা আসলে একটা বুলডোজার। তিনি মনে করেন, তাঁর বিপরীত দিকে যাঁরা আছেন, সবাইকে গুঁড়িয়ে দেব। তবেই আমার শান্তি।  শাসকের যখন গণতন্ত্রের উপর আস্থা থাকে না, আইনের উপর আস্থা থাকে না, বিচারকের উপর আস্থা থাকে না, তখন তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ালেই নিজ হাতে শাস্তির দণ্ড তুলে নেন। পাশাপাশি, গণতন্ত্রেও রয়েছে বুলডোজারের পাল্টা মন্ত্র। সেটা আমরা সত্যজিৎ রায়ের থেকে জেনেও গিয়েছে। ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’ এটাই ইতিহাসের শেষ সত্য।  

29th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ