বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দেশকে গনগনে আগুনের পথেই ঠেলে দিতে অগ্নিপথ
হুমায়ুন কবীর

ভারতের স্বাধীনতার দিনেই ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি’-র আনুগত্য পাল্টে যায়। তবে, আমাদের সেনার পথ চলা শুরু ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকর হওয়ার দিন থেকে। ১৮৯৫ সালের ১ এপ্রিল এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা হয়, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি নামে। সাড়ে পাঁচশোর বেশি প্রিন্সলে স্টেট বা দেশীয় রাজ্য স্বাধীন ভারতের অঙ্গীভূত হয় এবং তাদের নিজস্ব সেনারাও যুক্ত হন ভারতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে। স্বভাবতই স্বাধীন ভারতের সেনার লক্ষ্য, নৈতিকতা এবং উদ্দেশ্য পাল্টে যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই তিন সেনাবাহিনীর (আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স) সুপ্রিম কমান্ডার। তবে, তিন বিভাগের পেশাগত কমান্ডার যথাক্রমে চিফ অব আর্মি স্টাফ, চিফ অব নাভাল স্টাফ এবং চিফ অব এয়ার স্টাফ। মুলত এঁরা ফোর-স্টার জেনারেল, কিন্তু দু’বার ফাইভ-স্টার ফিল্ডমার্শালও এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন।  
প্রায় সাড়ে ১২ লাখ ভারতীয় সেনার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল—জাতীয় নিরাপত্তা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ। তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়ও সেনাকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হয়। ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনা পাকিস্তান এবং চীনের বিরুদ্ধে একাধিক লড়াইয়ের গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। আরও একটি গৌরবের কথা এই যে, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অরাজনৈতিক চরিত্রই অপরিবর্তিত রেখেছে তারা। হালফিল একটি রাজনৈতিক দল সেনাদের অর্জিত গৌরবের এবং সাফল্যের অংশীদার হতে চাইলে সেনা সেই স্রোতে গা ভাসায়নি, বরং নীরব থেকে ওই দলটির উৎসাহে জল ঢেলে দিয়েছে।
সাধারণভাবে, ভারতীয় নাগরিক (নেপালি ও গোর্খাসহ) ন্যূনতম সাড়ে ১৭ বছর থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত, ন্যূনতম ৪৫ শতাংশ নম্বর-সহ মাধ্যমিক কিংবা সমতুল পরীক্ষায় পাশ, এলাকা ও জাতিভিত্তিক নির্দিষ্ট শারীরিক মাপ এবং সক্ষমতা থাকলে ভারতীয় সেনায় যোগ দিতে পারেন। সাধারণ সৈনিক (জেনারেল ডিউটি) সর্বোচ্চ ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত কিংবা মোট ১৯ বছর চাকরি করতে পারেন, নায়েক কিংবা হাবিলদারদের অবশ্য বয়সের ঊর্ধসীমা ৪৯ বছর কিংবা যথাক্রমে ২৪ বা ২৬ বছর চাকরির মেয়াদ। কমিশন্ড অফিসারদের অবসরের বয়স ৬২ বছর।     
১৪ জুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বিয়ষক কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে অগ্নিপথ প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৬ হাজার অগ্নিবীর নিয়োগ পাবেন চার বছরের জন্য। সেনাবাহিনীতে ৪০ হাজার এবং বায়ুসেনা ও নৌবাহিনীতে তিন হাজার করে আরও মোট ছ’হাজার। এই প্রকল্প ন্যূনতম যোগ্যতা—অষ্টম শ্রেণি থেকে বিভিন্ন কাজের প্রয়োজন অনুসারে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ, বয়স সাড়ে ১৭ থেকে ২১, তবে কেবলমাত্র এবছরের জন্য ২৩ বছর। দেখা হবে শারীরিক মাপজোক এবং ফিটনেস। বেতন হার মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা। অগ্নিবীররা সেনার মতো চিকিৎসা কিংবা সিএসডি ক্যান্টিনের সুবিধা পাবেন না। চারবছর পরে তাঁদের ‘সেবা নিধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে করমুক্ত এককালীন ১১ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা দেওয়া হবে, যার অর্ধেক মূলত বেতন থেকেই কেটে নেওয়া। সেনার সঙ্গে এবং সেনার মতোই পাকিস্তান-চীন সীমান্তে যুদ্ধে ও সেনার অন্যান্য কাজে তাঁদের লাগানো হবে। তবে অবসর নিয়ে ‘এক্স-সার্ভিসম্যান’ স্বীকৃতি তাঁরা পাবেন না। পেনশন কিংবা গ্রাচুইটিরও বালাই নেই। যোগ্যতার নিরিখে ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে অবশ্য সরাসরি সেনাবাহিনীতে নেওয়া হবে। বাকিরা ‘আজাদ পঞ্ছি’—ফের চাকরির জন্য হন্যে হবেন অথবা ‘সেবা নিধি’ ভাঙিয়ে ব্যবসা করবেন!
অগ্নিবীররা ট্রেনিং পাবেন মাত্র ছ’মাসের। ছুটিছাটা বাদ দিয়ে তাঁদের অ্যাক্টিভ সার্ভিস পিরিয়ড দু’বছর আটমাস। এই ঘোষণার পর বক্সার, বেগুসরাই, মুজফফরনগর, হরিয়ানা, পাঞ্জাব থেকে শুরু করে সেকেন্দ্রাবাদ হয়ে দেশজুড়ে অনেক রাজ্যে ধুন্ধুমার কাণ্ড। সিএএ, এনআরসি, কৃষি আইন বিরোধী সমস্ত আন্দোলনকে ছাপিয়ে গিয়েছে অগ্নিপথের প্রতিবাদ। এই আন্দোলন কিছুটা যে হবে তা জানা ছিলই, তবে ব্যাপ্তিটা অজানা ছিল সরকারের। ‘আগ্নিবীর’ নামক ‘অ্যাডহক’ সেনা, নিয়োগের বিষয়টি আলোচনার মধ্যে ছিল বছর দুই। কিন্তু তৎকালীন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াতের আপত্তি ছিল। তিনি উল্টে সেনার অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। এই প্রকল্প ঘোষণার সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরং এটাই জানিয়েছেন, সেনার বয়স ভবিষ্যতে আরও কমবে। তাঁর দাবি, এতে তারুণ্যের সঞ্চার হবে বাহিনীতে।
মোদি সরকারের এটাই কি আসল উদ্দেশ্য? নিশ্চিতভাবে নয়। বিদ্বজ্জনেরা জানেন, এক ঢিলে অনেক পাখি মারতেই পছন্দ করেন মোদি। বছরে দু’কোটি চাকরি-সহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু কী করলেন? উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার। মন্দির-মসজিদ বিতর্ক সৃষ্টি। গোমাতারক্ষার ধুয়ো তুলে গোমাংস ভক্ষণকারীদের গণধোলাই। সিএএ-এনআরসি চালু করার জন্য জবরদস্তি। দিকে দিকে বুলডোজার দাওয়াই। তোলা হল নামাজ আজান হিজাব বিতর্ক। মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির কষ্টকল্পনা ছড়িয়ে দিয়ে জনমানসে সঞ্চার করা হল শাসনভার তাদের হাতে চলে যাওয়ার কৃত্রিম ভয়। মোদি এভাবেই লোকসভার ভোটে বাজিমাত করেছেন দ্বিতীয়বার। মিথ তৈরি করেছেন ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। অদূরে ২০২৪। লোকসভা ভোট। মানুষের প্রত্যাশার বিপুল চাপ এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়াও প্রবল। বস্তাপচা বুলিতে কি আর চিঁড়ে ভেজে? অতএব বেনিয়া বুদ্ধি লাগাও, বিক্ষুব্ধ যুব শ্রেণির হাতে তুলে দাও ললিপপ!
বিমুদ্রাকরণ ভারতের শ্রমের বাজার ধ্বংস করে দিয়েছে। অন্যদিকে, আম্বানি ও আদানি-সহ কিছু ধনকুবেরের সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ অবিশ্বাস্য! নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া মানুষ জেনে গিয়েছে, মোদি শুধুই বেনিয়াদের বন্ধু। তাঁরা আসলে ভবিষ্যতে চীনকে মোকাবিলার চিন্তাতেই তারুণ্যের গুরুত্ব বাড়িয়েছেন সেনায়। কিন্তু এতে কোনও লাভ নেই। কারণ রেগুলার সেনা, অগ্নিবীরদের কখনওই নিজেদের সমকক্ষ ভাববেন না। অন্যদিকে, নামমাত্র প্রশিক্ষিত ‘অতিথি’ অগ্নিবীরেরাও কি নিবেদিত প্রাণ হওয়ার ঝুঁকি নেবেন? স্পষ্টতই মানসিক দিক থেকে দু’ভাগ হয়েই থাকবে বাহিনী।
প্রতিরক্ষা বরাদ্দের বড় অংশ গ্র্যাচুইটি-পেনশন দিতেই চলে যায়। তাই ওই ঝামেলার পাট চুকিয়ে দেওয়ার কায়দা। এই টাকায় বরং উন্নতমানের যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধাস্ত্র কেনা হবে। এই মুনাফার হিসেব কষেছে সরকার! অধিক প্রাপ্তি? ‘অস্ত্র হাতে যুবকরা হিন্দুত্বের ধ্বজা ঊর্ধ্বে তুলে ধরবেন’—সাভারকারের এই বাণীর সফল রূপকার হবেন অবসরপ্রাপ্ত এই সদ্যযুবরা। খাকি হাফপ্যান্ট পরে লাঠি আর কাঠের ডামি বন্দুক বইতে বইতে কাঁধে কড়া পড়ে যাওয়া ক্যাডাররা চাইছেন—‘ইসবার কুছ অলগ হো যায়’।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা থেকে বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা আশ্বস্ত করেছেন, এই অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীরদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু অষ্টমের গণ্ডি পেরনো যুবরা কত চাকরির যোগ্য? হিমশিম হবেন নিয়োগকর্তারা। অতএব, পুনর্নিয়োগের আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। কোনও এক বিজয়বর্গীয় বলেছেন, বিজেপির অফিসে অগ্নিবীরদের দারোয়ানের চাকরি দেওয়া হবে! ঠিক তাইই হতে চলেছে এঁদের পরিণতি! তাহলে গালভরা নামকরণ কেন? অনেকের আশঙ্কা, অস্ত্রশিক্ষাপ্রাপ্ত খালি পেটের এই জওয়ানদের কেউ কেউ যদি ক্রাইমের দিকে ঝুঁকে যান! প্রশ্ন, পূর্বেকার নিয়মে সেনা নিয়োগ কি এবার বন্ধ হবে? উত্তর নেই। ধরা যাক, অগ্নিবীরের ২৫ শতাংশ দিয়ে বাহিনীর শূন্যপদ পূরণ করাটাই হবে নিয়ম। মোদির বিরোধিতা করার পরিণাম সবাই জানে। তাই মোদির বিরুদ্ধাচরণ বাস্তবে অসম্ভব—অন্য মন্ত্রীদের পক্ষেও। কয়েকজন প্রাক্তন সেনাকর্তা আপত্তি তুলেছেন বটে, তবে তা ফুৎকারে উড়ে যাওয়ার মতোই।                              
রাজ্যেগুলির প্রাপ্য টাকা, কোভিডকালে চালু করা ডোল তুলে নিয়ে কিংবা ১০০ দিনের কাজে ব্যাপক কাটছাঁট করেও অর্থনীতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, কোভিড পরবর্তীকালে বাজার থেকে চাহিদা স্রেফ গায়েব হয়ে গিয়েছে! চাহিদা তৈরি না-হলে জোগানের প্রয়োজন নেই, তাই নেই চাকরিও! নয়া জুমলা নয়, প্রকৃত সমাধান চান দেশবাসী। নীরবতার মধ্যে একটা রোম্যান্টিসিজম থাকে। তারই নিষ্ঠুর প্রয়োগ এবং সঙ্গে বরফ শীতল ঔদাসীন্য। ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আরও একবার মধ্যযুগের মতো ‘দিওয়ারোঁ পিছে গুম কর দিয়ে যাওগে’ বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেই পারেন শাসক।     
• লেখক স্বেচ্ছাবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার। 
মতামত ব্যক্তিগত 

28th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ