বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মানুষ কিনতে না পেরেই ‘রায়’ কেনার মরিয়া চেষ্টা
তন্ময় মল্লিক

‘পারিব না—এ কথাটি বলিও না আর,...একবার না-পারিলে দেখ শতবার।’ কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষ। বিজেপির দিল্লির নেতৃত্ব কি কবির এই কথাতেই অনুপ্রাণিত? সেই কারণেই কি প্রথম দু’বারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় মুখে কালি লাগলেও হাল ছাড়েনি! এবার মহারাষ্ট্র দখলের তৃতীয় দফার প্রয়াস। বিজেপি আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছে। টার্গেট শিবসেনার সেকেন্ড ইন কমান্ড, একনাথ সিন্ধে। তাঁর বিদ্রোহে উদ্ধব থ্যাকারের সরকার আপাতত ভেন্টিলেশনে। জোর কদমে শুরু হয়েছে ‘রাজনীতির ঘোড়া’ কেনাবেচা। এর সবটাই আন্ডার দ্য টেবিল। এই জাতীয় ‘অপারেশনে’ রক্ত ঝরে না। তবে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হন সেই সব মানুষ যাঁরা প্রিয় দলকে জেতানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নেন আর নেতাদের ভাবেন ‘ভগবান’। 
প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে একটা কথাই বলে, ‘আমাদের কাজ করার সুযোগ দিন।’ দেয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপি ‘আচ্ছে দিনের’ স্লোগান তুলে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মানুষ সেকথা বিশ্বাস করে নরেন্দ্র মোদির দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। 
ক্ষমতায় বসেই মোদিজি বুঝেছিলেন, অধিকাংশ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই তাঁর পক্ষে রাখা অসম্ভব। কিন্তু মানুষের সামনে ‘গাজর’টা ঝুলিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে মানুষ তাঁর পিছনে দৌড়বে না। তাই স্বপ্নের সওদাগর ঝুলি থেকে বের করেছিলেন নতুন ফাঁদ, ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’। দেশবাসীকে বুঝিয়েছিলেন, রাজ্যগুলির উন্নতি করতে গেলে দরকার কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার। এখন দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’। 
দেশের মানুষ বিজেপিকে কাজ করার প্রচুর সুযোগ দিয়েছে। বিজেপি টানা আট বছর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন। ফলে তাদের কাজের মূল্যায়ন হবেই। সময় এসেছে আমজনতার হিসেব চাওয়ার। হিসেব করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, কাজের নামে অকাজই বেশি করেছে বিজেপি।
সুইস ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ‘কালা ধন’ দেশে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। টাকা ফিরিয়ে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা। মনে আছে সেই সব কথা? বিজেপির সেই প্রতিশ্রুতিতে কেঁপে গিয়েছিল আসমুদ্র হিমাচল। কারণ এমন কথা তাঁর আগে কেউ বলার সাহস দেখাননি। কিন্তু বিগত আট বছরে কত টাকা ফিরেছে? এক টাকাও নয়। উল্টে তাঁর আমলে একের পর এক ঠগ শিল্পপতি ব্যাঙ্ক ফাঁকা করে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছে। মোদিজির সরকার টাকা ও প্রতারক কাউকেই ফেরাতে পারেনি। তাই বিজেপি নেতারা এখন আর ‘কালা ধন’ এর কথা মুখে আনেন না। 
নোট বাতিলের সন্ধ্যাটা মনে আছে? মোদিজি বলেছিলেন, দুর্নীতি দমন ও দেশের মধ্যে থাকা কালো টাকার মোকাবিলা করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। আপনারা ক’টা দিন কষ্ট করুন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের আর লাইনে দাঁড়াতে হবে না। কিন্তু তাঁর আশ্বাস আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে কোনও মিল নেই। উল্টে ‘কালো টাকা’ ঘুরপথে ‘সাদা’ হয়ে গেল।
দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ চেয়েছিল বিজেপি। মানুষ সেই সুযোগ দিয়েছেনও। দু’-দু’বার। কিন্তু সুযোগ পেয়ে কী করেছে? এনআরসি চালু করতে গিয়েছে। তাতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল অশান্তি আর অস্থিরতা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। কথায় আছে, ভাঙবে তবু মচকাবে না। বিজেপিরও সেই দশা। এনআরসি করতে পারল না। তাই মানুষকে ধাপ্পা দিতে পাশ করাল সিএএ আইন। তবে, সেটাও আপাতত ‘ঠান্ডাঘরে’।
মানুষের জন্য কাজ করার আরও একটি নিদর্শন, নয়া কৃষি আইন। কৃষক বিরোধী সেই আইনের বিরুদ্ধে উত্তাল হল দেশ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কৃষকরা রাস্তায় রাত কাটালেন। নানাভাবে সেই আন্দোলন ভাঙার চেষ্টাও হল। বছরভর চেষ্টার পর তা ব্যর্থ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে কৃষি আইন প্রত্যাহার করলেন। 
মানুষের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ পেয়ে বিজেপি লাগু করে দিল জিএসটি। মানুষকে বোঝাল জিনিসপত্রের দাম কমবে। কর ফাঁকি দেওয়া বন্ধ হবে। কিন্তু হল ঠিক তার উল্টো। মুদ্রাস্ফীতির পারদ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিল। বাড়ল মানুষের দুর্ভোগ। তবে, আমজনতা নাজেহাল হলেও সরকারের কোষাগার হচ্ছে পুষ্ট। 
মানুষের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ পেয়ে জ্বালানির দাম এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যা ভাঙার সাহস কেউ দেখাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর বিরোধীদের অপদার্থতার সুযোগ নিয়ে পেট্রল, ডিজেলের উপর দিনের পর দিন সেস বাড়িয়েছে। তার ফলে বিশ্বের বাজারে পেট্রপণ্যের দামের রেকর্ড পতনের সময়েও দেশবাসীকে পেট্রল, ডিজেল কিনতে হয়েছে চড়াদামে। আর রান্নার গ্যাসের দাম বাড়তে বাড়তে এখন হাজার পার। মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। তবুও বিজেপির হেলদোল নেই।
দেশের মানুষ কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী চার ঘণ্টার নোটিসে দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে করোনা তাড়ানোর নিদান দিতে পারেন। তারপর মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেলে রাজ্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতেও পারেন। 
দেশের মানুষ কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন বলেই নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিদেশ ভ্রমণে রেকর্ড গড়তে পেরেছেন। তার জন্য কোটি কোটি টাকা জলের মতো খরচ হলেও প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
বিজেপি সরকারের নেওয়া অধিকাংশ পদক্ষেপই দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বছরে ২কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসে এখন বলছে, দশ লাখ। তাও সেটা দেড় বছরে। দেশ রক্ষার মহান দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। চাকরি মাত্র চার বছরের। এভাবেও যে ভাবা যায়, সেটা নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় না বসলে কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারতেন না। অনেকে বলছেন, ‘ঠিকা সেনা’ নিয়োগের পথ বাতলে নরেন্দ্র মোদি বিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছেন। ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প ভালো না মন্দ, সেটা সময় বলবে। তবে, এই প্রকল্পকে ঘিরে দেশজুড়ে যুবসমাজের ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে। এর প্রভাব ভোটে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বিজেপি সরকারের এমন বেশকিছু পদক্ষেপ সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারছেন না। তাই রাজ্যে রাজ্যে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। এই অবস্থায় শুধু ধর্মকে হাতিয়ার করে ক্ষমতা দখল যে অসম্ভব, সেটা দিল্লির নেতারাও বুঝতে পারছেন। তাই অবিজেপি সমস্ত রাজ্যে ক্ষমতার নাগাল পেতে চাইছে ঘুরপথে। তারজন্য বিরোধী শিবিরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষুব্ধ নেতাদের দিকে শ্যেন দৃষ্টি থাকে বিজেপি নেতৃত্বের। কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বাংলাতেও সেই চেষ্টা বিজেপি করেছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য তা পারেনি। মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই গেমপ্ল্যানেরই অঙ্গ।
নির্বাচনী লড়াইয়ে রক্ত ঝরলে শাসক দলের বিরুদ্ধে ওঠে গণতন্ত্রকে হত্যার অভিযোগ। সেই আঙুল তোলার মধ্যে কোনও ভুল নেই। মত প্রকাশের অধিকারে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি, আইনের চোখে অপরাধ। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেই অপরাধী। কিন্তু যাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আলু, পেঁয়াজের মতো কেনাবেচা করেন তাঁরা? তাঁরা কি আরও বড় অপরাধী নন? ক্ষমতা আর অর্থের জোরে রাজনীতির ময়দানে ‘চাণক্য’ সাজলেও আসলে তাঁরা ‘গণতন্ত্রের ঘাতক’। মানুষকে কিনতে না পেরে কিনে নেন ‘মানুষের রায়’।
রাজনীতিতে ‘ঘোড়া’ কেনাবেচা নতুন কিছু নয়। কংগ্রেস আমলেও ছিল। প্রায় সব দলই কম-বেশি এটা করে থাকে। কিন্তু বিজেপি একে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। আর সেই কাজে সিবিআই, ইডির মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে নির্লজ্জভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এটা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। প্রয়োজনে দলবদল আইন আরও কঠোর করতে হবে। তা না হলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষের মানুষের রায়দানও হয়ে যাবে মূল্যহীন।

25th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ