বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

এত চাকরি কোথায় ছিল?
সমৃদ্ধ দত্ত

চাকরি আছে আধা সামরিক বাহিনীতে। চাকরি আছে পেট্রলিয়াম দপ্তরে। চাকরি দেখা যাচ্ছে শিপিং মিনিস্ট্রিতে। চাকরি পাওয়া যাবে এয়ারপোর্টে। চাকরি হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে। অবয়বহীন কিন্তু অন্তহীন চাকরি দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ব্যাঙ্কে। চাকরি আছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায়। চাকরি অপেক্ষা করছে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। ১৫ লক্ষ চাকরি শুধু পড়ে আছে দেশজুড়ে প্রচুর কেন্দ্রীয় স্কুলে। এইসব চাকরি অগ্নিবীররা পাবে। শুধু একবার মিলিটারিতে চার বছরের চুক্তির সেনাজীবন সমাপ্ত করতে হবে। তারপর কত শত চাকরি। কম পরিশ্রমের চাকরি চাই? বিজেপি পার্টি অফিসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি হবে। দেশবিদেশ দেখার ইচ্ছা আছে? এই তো মার্চেন্ট নেভিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। কর্পোরেটের অফিসে বসতে ভালো লাগবে? একঝাঁক কর্পোরেট কর্তা বলেছেন তাঁরা হাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে বসে আছেন। ২০২২ সালের জুন মাসে চাকরির যেন অকাল চৈত্রসেল হচ্ছে। রাষ্ট্র বলছে এসো চাকরি নাও। হঠাৎ চাকরির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারে মন্ত্রীরা প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন চাকরি দেওয়ার। একজন মন্ত্রী সোমবার বলছেন কত চাকরি তিনি দেবেন। আর একজন তাঁকে ছাপিয়ে মঙ্গলবার বলছেন তাঁর প্রতিশ্রুতি বেশি জোরদার। স্বপ্নের পোলাওতে ঘি কম দিতে নেই। তাই ভারত সরকারের যে যেমন পারছেন চাকরির ঘোষণা করছেন। অগ্নিপথ প্রকল্প ঘোষণা করে বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পের মাধ্যমে চার বছরের চুক্তিতে সেনা নিয়োগ করা হবে। ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা করে বেতন। কিন্তু সব টাকা পাওয়া যাবে না হাতে। কিয়দংশ সরিয়ে রাখবে সরকার। তার সঙ্গে আরও সমপরিমাণ টাকা সরকার দেবে। আর চার বছর পর সাড়ে ১১ লক্ষ টাকা হাতে দেওয়া হবে। এই ঘোষণায় দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, আন্দোলন চলছে, সেটা এখন সর্বজনবিদিত। কর্মপ্রত্যাশী যুবদের প্রশ্ন, আমরা এতদিন ধরে আশা করেছি এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে চলেছি যে, একদিন আবার স্থায়ী চাকরির নিয়োগ শুরু হবে সেনাবাহিনীতে। সেই চাকরি পাবো। অনেকেই মেডিক্যাল এবং ইন্টারভিউ পর্বও সমাপ্ত করে বসে আছেন। কারণ, বিগত দু’বছর রিক্রুটমেন্ট বন্ধ। এখন পুরনো প্রথার নিয়োগ নিয়ে সরকার কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। হঠাৎ ৪৬ হাজার নতুন সেনা নিয়োগের প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে। যুবসমাজের প্রশ্ন, পুরনো পরীক্ষা, মেডিক্যাল, ইন্টারভিউ, পে স্কেল, রেশন ইত্যাদি চিরাচরিত নিয়োগ ব্যবস্থার কী হবে? সেটাও চলবে? নাকি বন্ধ হয়ে যাবে? এসব নিয়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় আন্দোলন। সেই আন্দোলন ভুল? নাকি ঠিক? আমরা জানি না। আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষ মতামত দিতে ভালোবাসেন। যাঁরা সারের দাম কত অথবা কত রকমের সার হয়, সেটাই জানেন না, তাঁরাই এক বছর ধরে সবথেকে বেশি সমর্থন করেছিলেন তিন কৃষি আইনকে। কারণ তাঁদের দল ওটার সমর্থক। যাঁরা কখনও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্ক, জুয়েলারি শিল্প, ঠিকা শ্রমিকের কাজের মতো হাজারো জীবিকা কীভাবে দৈনিক পেমেন্টে চলে এবং ভারতের অর্থনীতিকে এরাই সজীব রেখেছে, এই সহজ সত্য জানেন না, তাঁরাই উচ্চকণ্ঠে নোটবাতিলকে সমর্থন করেছিলেন। কারণ ওটা চালু করেছিলেন তাঁদের নেতা। এবারও যাঁদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা সেনাবাহিনীতে জওয়ান হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে না অথবা সেনাবাহিনীর চাকরি সম্পর্কে ধারণা নেই যাঁদের, তাঁদের অনেকেই অগ্নিপথ প্রকল্পকে সমর্থন করছেন। তাঁরা নিজেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না। প্রিয় দলের যে কোনও সিদ্ধান্তকে অন্ধের মতো প্রচার করাই তাঁদের যেন দায়িত্ব! তাঁদের জন্য একটাই পরামর্শ, সাবধান। আপনারা প্রাণপণে কৃষি 
আইনকে সমর্থন করার পর হঠাৎ একদিন দেখেছিলেন খোদ ভারত সরকারই সেই আইন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সবথেকে বেশি বিব্রত হতে হয়েছে আপনাদেরই। এবার তাই বুঝেশুনে সমর্থন 
করুন। আবার যদি অগ্নিপথ প্রকল্প প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তাহলে আবার আপনারাই অস্বস্তিতে পড়বেন। তাই যাঁরা সরাসরি এই প্রকল্পের ভালোমন্দের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরাই সিদ্ধান্ত নিন। আমাদের মতামতের জন্য তাঁরা বসে নেই। 
আমাদের প্রশ্নটা বরং অন্য। সেটা হল, একটা রাষ্ট্র ঠিক কতটা তার দেশবাসীকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে?  এবং নির্বোধ হিসেবে বিশ্বাস করে? মাপকাঠিটা ঠিক কী? কারণ কয়েকদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ ঘোষণা করলেন, আগামী দেড় বছরে ১০ লক্ষ চাকরি দেওয়া হবে। আট বছর সরকারে থাকার পর। ২০১৪ সালে বলা হয়েছিল, বছরে ২ কোটি করে চাকরি হবে। ১৫ লক্ষ টাকা প্রত্যেকের ব্যাঙ্কে ঢুকে যাবে। আট বছর পর আমরা জানি সেই ঘোষণাগুলির পরিণতি। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমাদের যে আবার এরকম প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়, আমরা মোটেই বিরক্ত হব না, এটা রাষ্ট্র ধরেই নিয়েছে। অর্থাৎ আমরা আবার বিশ্বাস করব, আবার জয়ধ্বনি দেব, আবার আশায় আশায় ভোট দেব এটা রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে।  গত আট বছর ধরে এই চাকরিগুলো কোথায় ছিল? কেন ৪৫ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ হল? অগ্নিপথ প্রকল্প ঘোষণা করার আগে তো বলা হল না যে, একবার চার বছর সমাপ্ত হয়ে গেলে তারপর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অগাধ চাকরি পাওয়া যাবে! যেই আন্দোলন শুরু হল, তখনই যেন চাকরির প্রতিশ্রুতির লকগেট খুলে দেওয়া হল। কেন? যদি সত্যিই কেন্দ্রীয় সরকারের এতগুলো দপ্তরে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ চাকরি থাকেই, তাহলে এত বছর ধরে কেন কোনও নিয়োগ হল না? কেন প্রায় ৯ লক্ষ শূন্যপদ কেন্দ্রীয় সরকারে রয়েছে? রেল থেকে সামরিক বাহিনী—অসংখ্য চাকরিতে নিয়োগ হয় না বছরের পর বছর। হঠাৎ ঠিক দেড় বছরের মধ্যেই ১০ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি কেন? দেড় বছর পর কোন বছর আসছে? ২০২৪। সেই বছরে কী হবে? লোকসভা ভোট! তাহলে ওটাই লক্ষ্য নয় কি? দেশবাসীর প্রধান পরিচয় কী রাষ্ট্রের কাছে? নিছক একজন ভোটার? 
হঠাৎ করে এই যে অগ্নিপথ আন্দোলনের দৌলতে তাবৎ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা চাকরির তালিকা ঘোষণা করছেন, সেগুলি কোন দপ্তরে, কোন পদে এবং কত পে স্কেলে আছে? স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না কেন? আর শুধুই অগ্নিপথ প্রকল্পে যোগ দিলেই এই হাজার হাজার চাকরি পাওয়া যাবে এটা আবার কেমন পক্ষপাত? দেশের বাকি কর্মপ্রত্যাশী যুবসমাজ কী দোষ করল? সরকারি চাকরি পেতে হলে বাধ্যতামূলক চার বছরের জন্য মিলিটারিতে যোগ দিতে হবে, এরকম কোনও শর্ত নেই ভারতে। তাই চাকরির সুযোগ থাকলে, সকল যোগ্য কর্মপ্রত্যাশী যুবসমাজের জন্যই থাকা উচিত। সত্যিই এই তাবৎ ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে আমাদের থেকে বেশি, সুখী আর কেউ হবে না। আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু বিগত বছরগুলির রেকর্ড থেকে দেখেছি, বিশ্বাস করে ঠকতে হয়েছে। তাই আশা নিরাশার দোলাচল আপনাদের কথায়। 
নোটবাতিলের সময় আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাঙ্ক আর এটিএমের লাইনে দাঁড়িয়েছি। করোনার সময় আমাদের স্বজন অক্সিজেন না পেয়ে মারা গিয়েছেন। মূল্যবৃদ্ধির জেরে আমরা সংসারের খরচে রাশ টানছি। কাশ্মীরে ৩৭০নং ধারার জয়গান গেয়েছি। রামমন্দিরকে প্রণাম করছি। একটাই বিনীত অনুরোধ, আর গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়।  এবার স্বস্তি দিন! অগ্নিবীর অথবা সাধারণ যুবকযুবতী, সকলের মুখেই সত্যিকারের হাসি ফোটান। জীবনযাপনে সামান্য নিশ্চিন্তি উপহার দিন। আমরা শুধুই ভোটার নই। রক্তমাংসের মানুষও!

24th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ