বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

হিংসা ও ঘৃণাই মোদি সরকারের প্রকৃত মুখ
সন্দীপন বিশ্বাস

এ এক চতুর খেলা, সেই সঙ্গে ভয়ঙ্করও! আগুন নিয়ে এই খেলার পিছনে বিজেপির গভীর গোপন উদ্দেশ্যও রয়েছে। সেই উদ্দেশ্য হল, ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে দেশকে অশান্ত করে তোলা। এখন আর পাকিস্তানের সেই শক্তি নেই। তাই আর একটা পুলওয়ামা তৈরি হওয়া এখন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সার্জিকাল স্ট্রাইকের মধ্য দিয়ে দেশাত্মবোধের আগ মার্কা চমক। তাই ২০২৪-এ মরিয়া জয়ের লক্ষ্যে দেশের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। সেই কাজে নূপুর শর্মা, নবীনকুমার জিন্দালরা এক একটি বোড়ে মাত্র। মাস্টাররা আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। বিজেপি জানত, তাঁদের এসব উস্কানিমূলক কথায় দেশে অশান্তি সৃষ্টি হতে বাধ্য। এই অশান্তির পথ ধরে কিছু নাশকতামূলক কাজ, কিছু মৃত্যুই এনে দিতে পারে দেশের মানুষের মনে দেশভক্তির অন্ধ আবেগ। এনে দিতে পারে হিন্দুত্বের প্রতি উগ্র ভক্তি। এই কৌশলেই ২০২৪-এর ভোট বৈতরণী অনায়াসে পার করা যাবে বলে বিশ্বাস বিজেপির। বিজেপি নূপুর শর্মাদের কুকর্মের জন্য লোকদেখানো শাস্তি দিলেও মোদিজি কিন্তু নীরব। তাঁর এই মৌনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। আসলে কোনওদিনই মোদির মধ্যে সেই দায়বদ্ধতা দেখা যায়নি। সে অর্থনীতির ভেঙে পড়া হোক, শিল্পের গোল্লায় যাওয়া হোক কিংবা করোনাকালে হোক, তিনি কস্তুরী মৃগের মতোই আপন গন্ধে মেতে আছেন। তাঁর একমাত্র দায়বদ্ধতা দেখা গিয়েছে দেশের সম্পদ বিক্রিতেই। সে যাই হোক, বিশ্বজোড়া প্রতিবাদ উঠলেও নূপুর শর্মা ইস্যুতে বিজেপি কিন্তু তার লক্ষ্যে দু’দিক দিয়ে সফল। প্রথমত, দেশের ভিতর মুষ্টিমেয় একটা অংশ সেই উত্তেজনার পাতা ফাঁদে কিছুটা হলেও পা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভিতরেই নূপুরের সমর্থনে আওয়াজ উঠেছে। নূপুরকে শাস্তি দেওয়ায় গেরুয়া বাহিনীর নীচের তলায় ক্ষোভ জমেছে। মোদিভক্তরা মনে করেন, নূপুরকে শাস্তি দিয়ে নেতারা ভুল বার্তা দিচ্ছেন। দল কিন্তু চায়, সমর্থকদের এই হিন্দু আবেগ আরও দৃঢ় হোক। 
তাঁদের সংখ্যা আরও বাড়ুক। ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই আবেগকে বিজেপি যে কোনও মূল্যে বাঁচিয়ে রাখবেই। সে হিংসা, ঘৃণা ছড়িয়েই হোক কিংবা হিজাব, জ্ঞানবাপী, ইদগা করে হোক অথবা বিতর্কিত বা ভুল ইতিহাসের  ছবি ‘কাশ্মীরি ফাইলস’ আর ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’ করেই হোক। এ সব কিছুই একই ছকের নানা মুখ। 
শুধু নূপুর বা নবীন নন, বিজেপির অন্তত ৩৮ জন নেতা গত ৮ বছরে ক্রমাগত ধর্মবিদ্বেষ এবং হিংসার বার্তা ছড়িয়ে গিয়েছেন। বিজেপির নিজস্ব সমীক্ষাতেই দেখা গিয়েছে, এই ৮ বছরে অন্তত ৫২০০ বার অকারণে অন্য সম্প্রদায়কে খোঁচা মেরে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং উগরে দেওয়া হয়েছে ২৭০০টি হেট স্পিচ। নূপুররা শাস্তি পেলেও অতীতে প্রজ্ঞা ঠাকুর সহ আরও কয়েকজন বিজেপি নেতা যে ঘৃণা ও হিংসা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বর্ষণ করে অশান্তি পাকিয়েছিলেন, বিজেপি তার বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ নেয়নি। এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে তারা অন্য নেতাদের হেট স্পিচ ছড়ানোয় উৎসাহ দিয়েছে। আসলে ধর্মের বর্বর লোভ বারবার নগ্ন করেছে নেতাদের নির্লজ্জ অমানুষতা।
সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, নূপুর, নবীনরা বিজেপিরই তৈরি করা। এঁদের শোকেসে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। তাঁদের দিয়ে ঘৃণাটুকু ছড়িয়ে বিশ্বজোড়া ধিক্কারের পর তড়িঘড়ি ভালোমানুষির মুখোশ পরে আবার তাঁদের গোডাউনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতীতে বিজেপির ক্ষেত্রে এমন কেস আমরা অনেক দেখেছি। কিছুদিনের মধ্যে আবার শোকেসে এনে রাখা হবে অন্য ‘নূপুর’দের। তবে এই ঘটনায় দেশ এবং দেশনায়কের যে মুখ পুড়েছে, সেটা মোটেই অস্বীকার করা যাবে না। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায় না। পদ্মপার্টি ভালো করেই জানে, আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ব্যর্থতার ইস্যুকে চাপা দেওয়ার একমাত্র দাওয়াই হিংসা ও ঘৃণা। কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ, লক্ষ্য তার ধর্মদ্বেষে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
এই যে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে খেপিয়ে বাজিলাভের চেষ্টা, এই খেলা কিন্তু মারাত্মক। তাদের ধর্মীয় আবেগের আড়ালে এই আন্দোলনের রাশ চলে যেতে পারে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের হাতে। সেই পাল্টা ঘৃণা ও আবেগ প্রত্যাঘাত হয়ে নেমে আসতে পারে। সেই পথ ধরে দেশে যদি কিছু নাশকতামূলক ঘটনা ঘটেই যায়, তার সুবিধা কিন্তু বিজেপি পেয়ে যাবে। সুতরাং লক্ষ্য, হিংসার শক্তিকে রাম মন্দিরের থেকেও উচ্চ চূড়াসম্পন্ন করে তোলা। 
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, সম্রাট অশোক তাঁর রাজনৈতিক  হিংসার অভিমুখটিকে প্রকৃত ধর্মের পথে প্রসারিত করেছিলেন। আর বর্তমান সরকার ভ্রান্ত ধর্মের পথটিকে হিংসার অভিমুখে প্রসারিত করেছে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ‘অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশ্যতি। / ততঃ সপত্নাঞ্জয়তি সমুলস্তু বিনশ্যতি॥’ অর্থাৎ অধর্ম দুরাত্মা প্রথমে হাত ভরে পায়। সে প্রচুর ধন সম্পদ খ্যাতি লাভ করে। ক্রমে সব শত্রুকে জয় করে নিজেকে মহাবলশালী রূপে কল্পনা করে অহমিকায় ডুবে যায়। তখন সে নিজেকে আরও অনেক বড় মনে করে। মনে করে, সে সব কিছুর নিয়ন্তা। একদিন চরম শিখর থেকে তার পতন হয়। সমূলে সে ধ্বংস হয়। পুরাণের এই বাণীকে ইতিহাস বারবার সত্যে পরিণত করেছে। 
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জাভাযাত্রীর পত্র’তে বলেছেন, ‘দীনতা থেকে লোভের জন্ম।’ আজ এত হিংসার উদ্গীরণ দেখে মনে হচ্ছে, অজস্র দীনতা তাদের মূঢ়ত্বের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। ক্ষমতার লোভের সামনে দাঁড়িয়ে যেন হিতাহিত জ্ঞান অবলুপ্ত হয়েছে। 
বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিয়েছিলেন দেশের একশো জন প্রাক্তন বুরোক্র্যাট। সেই চিঠিতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, দয়া করে এই হিংসার রাজনীতি, ঘৃণার রাজনীতি বন্ধ করুন। কে কে ছিলেন আবেদনকারীদের মধ্যে? ছিলেন দেশের প্রাক্তন নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, প্রাক্তন বিদেশ সচিব সুজাতা সিং, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি টি কে এ নায়ার, দিল্লির প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জং প্রমুখ। তাঁরা নরম সুরে অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘দেশের এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি অভূতপূর্ব। তা যে শুধু দেশের সংবিধানের পক্ষে অনৈতিক ও ভয়ঙ্কর তা নয়, তা দেশের সামাজিক কাঠামো, পারস্পরিক বিশ্বাসের বাতাবরণ, সভ্যতার পরম্পরা এবং শ্রদ্ধার বোধকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। এই সময় বধির থাকা অন্যায়। মোদিজি, এই সময় আপনার নীরবতা সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দেবে।’ বলাই বাহল্য, দেশের হেলাচেলা রাজনীতিকদের থেকে এঁরা যেমন শিক্ষিত, তেমনই অভিজ্ঞ। প্রশাসনিক স্তরে তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সাম্প্রতিক ভারতের যে ছবি তাঁদের চোখে ফুটে উঠেছে, তা যথেষ্টই আতঙ্কের।  
এই যদি সরকারের সক্রিয় চেতনা হয়, তাহলে সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাসের গড়ে তোলা ছবিটা একটা মিথ্যা, স্রেফ ভক্কিবাজি। দেশের স্বাধীনতাকে ঘিরে যে অমৃত মহোৎসবের আয়োজন, তার সারবত্তা কিছুই থাকে না। অমৃতের কলসে শুধু বিষই ভরা থাকে। 
আজকের ভারতের দুর্দশার পিছনে রয়েছে এই হেট পলিটিক্স। শাসক দল যে আন্তরিকতার সঙ্গে হিংসা ও ঘৃণাকে ছড়াচ্ছে, সেই আন্তরিকতার সঙ্গে দেশশাসনের দিকে মনোযোগ দিলে দেশের এই হাল হতো না। অবশ্য শাসকেরও দরকার দেশের অর্থনীতি, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সুরক্ষা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জ্ঞানগম্যি। গত আট বছরে তার প্রমাণ মেলেনি। আমরা দেখেছি শুধু শাসক নেতাদের মনের অন্ধকার দিকগুলি। সেই অন্ধকার মানসিকতা মানুষকে লড়িয়ে দিচ্ছে। এক সম্প্রদায়ের কেউ পয়গম্বর সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করছেন, অন্য সম্প্রদায়ের কেউ কৃষ্ণ, শিব নিয়ে কুৎসিত বাক্য বলছেন। তারপরই বিদ্বেষ নেমে আসছে হিংসার আকারে। একসময় আন্দোলন, মারামারি, হানাহানির শেষে আহত, সংক্ষুব্ধ মানুষ যে যাঁর ঘরে ফিরে যাবেন। দেখবেন মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানদের মুখ। দেখবেন নিজের ঘরেও ঘন অন্ধকার। খাদ্য নেই, টাকা নেই, চাকরি নেই, ব্যবসা নেই, শিল্প নেই। ব্যর্থতম শাসকের চরমতম ব্যর্থতায় গড়ে ওটা এক শ্বাসরুদ্ধ ভারতের বাসিন্দা আমরা সবাই। সেখানে হিন্দু-মুসলমান সকলেরই সমান দুর্দশা। এই শ্বাসরোধ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সত্যিই একটা আন্দোলনের দরকার, পথে নেমে আসা দরকার। ভালো করে বাঁচার জন্য, সুস্থ জীবনের জন্য সেই আন্দোলনে একসঙ্গে পা মেলাতে হবে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান সকলকেই। ইতিহাস বলে, সকলে এক হলেই ভেঙে পড়ে দুষ্টু রাজার সিংহাসন।  

15th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ