বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিজেপি, আধুনিক ভারতের গ্রামোফোন কোম্পানি
পি চিদম্বরম

লিভারপুলের স্থানীয় বাসিন্দা ফ্রান্সিস ব্যারাউড একজন চিত্রশিল্পী। মার্ক নামে তাঁর এক ভাই ছিলেন। মার্ক মারা গেলেন। ফ্রান্সিস উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন একটি সিলিন্ডার ফোনোগ্রাফ প্লেয়ার, মার্কের কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং এবং একটি ফক্স টেরিয়ার কুকুর, যার নাম ছিল নিপার। ফ্রান্সিস যখন রেকর্ডগুলি বাজাতেন তখন কুকুরটি ফোনোগ্রাফের দিকে ছুটে যেত। মার্কের কণ্ঠস্বর কোথা থেকে আসছে তা বুঝে উঠতে নিপার বিভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে বসত এবং মনোযোগ সহকারে শুনত। ফ্রান্সিস দৃশ্যটি এঁকে নাম দিয়েছিলেন ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’। ১৮৯৯ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি ১০০ পাউন্ড দিয়ে পেইন্টিংটি কিনেছিল। লোগোটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে আটবছর বাদে কোম্পানিই তার নাম পরিবর্তন করে রাখল ‘এইচএমভি’। ২০১৪ সালে লন্ডনে তার নিজস্ব নীল ফলকে অমর হয়ে গিয়েছে নিপার।

মামুলি নয়
গত সপ্তাহে বিজেপির দুই মুখপাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবর  (দল থেকে নূপুর শর্মাকে সাসপেন্ড এবং নবীনকুমারকে বহিষ্কার) 
পড়ে আমার নিপারের গল্পটি মনে পড়ে গেল। কোনওরকম অসম্মানের উ঩দ্দেশ্য ছাড়াই, এরপর থেকে আমি এই মানিকজোড়কে ‘নূপুর ও নবীন’ হিসেবে উল্লেখ করব। ৫ জুন নূপুর একটি চিঠি পান, যার শুরুতে লেখা ছিল, ‘আপনি বিভিন্ন বিষয়ে দলের অবস্থানের বিপরীত মতামত প্রকাশ করেছেন’। আমার অবাক লাগছে এই ভেবে যে, ভারতের মুসলিম ও খ্রিস্টান নাগরিকদের সম্পর্কে বিজেপির অবস্থানটা তাহলে কী?
নূপুর ও নবীন বিজেপির অনুগত পাইক এবং তাঁরা তাঁদের নেতাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আপনাদের অনেকের মতোই নূপুর ও নবীনও পর্যবেক্ষণ করেন, পড়েন এবং শোনেন। যেমন তাঁরা ২০১২ সালে গুজরাতের ভোট প্রচারে নরেন্দ্র মোদিকে বলতে শুনেছেন, ‘আমরা যদি গুজরাতের পাঁচ কোটি মানুষের আত্মসম্মান এবং মনোবল বাড়াই, তবে আলি, মালি এবং জামালিদের পরিকল্পনা আমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’ তাঁরা অবাক হয়ে ভাবতেন যে আলি, মালি এবং জামালি কারা? এই ‘আমরা’-ই বা কারা? এবং আলি, মালি ও জামালিরা ‘আমাদের’ ক্ষতি করার কোনও পরিকল্পনা করবে কেন?

স্মরণীয় কথা
২০১৭ সাল। উত্তরপ্রদেশ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে এক স্মরণীয় ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘সবকা সাথ, সবকা বিশ্বাস’ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সারসংক্ষেপ করেন, ‘যদি আপনি একটি গ্রামে একটি কবরস্থান তৈরি করেন, তবে একটি শ্মশানও তৈরি করা উচিত আপনার। কোনওরকম বৈষম্য হওয়া উচিত নয়।’ কথাগুলি নূপুর ও নবীনের মনে নিশ্চয় গভীর ছাপ ফেলেছে।
তাঁরা ২০১৯-এর ১১ এপ্রিল অমিত শাহের কিছু কথা শুনেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা সারা দেশেই এনআরসির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব। বৌদ্ধ, হিন্দু এবং শিখ ছাড়া প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে দেশ থেকে ভাগিয়ে দেব আমরা। ... অনুপ্রবেশকারীদের থেকে মুক্তিলাভ বিজেপির অঙ্গীকার ...। অবৈধ অভিবাসীরা উইপোকার মতো। গরিবের প্রাপ্য শস্য খেয়ে ফেলছে তারা, তারা আমাদের চাকরিও নিয়ে নিচ্ছে।’ নূপুর ও নবীনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে এই প্রত্যয় জন্মেছে যে, উচিত কথাগুলি যথাস্থানে একেবারে উপযুক্ত ব্যক্তির মুখ থেকেই বেরিয়েছে। 
২০১৯-এর ১৫ ডিসেম্বর, ঝাড়খণ্ডে একটি নির্বাচনী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন—‘সমস্যার সৃষ্টি করছে’ যেসব লোকজন, ‘পোশাক থেকেই তাদের শনাক্ত করা সম্ভব’।
নূপুর ও নবীন সম্ভবত সেই ভাষণ শুনেছেন এবং পোশাক দেখে মানুষ শনাক্ত করার সঙ্কল্প তাঁরা করে থাকতে পারেন।
উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোট প্রচারের সময় মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বার বার বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক এগিয়ে গিয়েছে। লড়াইটা এখন ৮০ বনাম ২০-র।’ কথাগুলি নূপুর ও নবীন নিশ্চয় শুনেছেন এবং তাঁদের চেতনায় জ্বলে উঠেছে এটাই যে, ‘২০ শতাংশ’ হল শত্রু।
কারও সন্দেহ নেই যে, মুসলিমদের সম্পর্কে বিজেপির অবস্থানটি এম এস গোলওয়ালকর (আরএসএস-এ ‘গুরুজি’) থেকে পাওয়া। মুসলিমরা ভারতে বা ভারতের সংসদ ও আইনসভায় কাঙ্ক্ষিত নন। সংসদের উভয় কক্ষে ৩৭৫ জন বিজেপি সাংসদের মধ্যে এ-মাসের শেষ নাগাদ একজনও মুসলিম এমপি থাকবেন না। ৪০৩ সদস্যের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি 
একজনও মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। ১৮২ সদস্যের গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপির প্রার্থী দাঁড় করানোর চিত্রটি একই ছিল। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন এমন ১১টি রাজ্যে—মুসলিম মন্ত্রী মোটে একজন। ২০১২ সালের জুনে এস ওয়াই কুরেশি অবসর নেওয়ার পর থেকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে (ইসিআই) কোনও মুসলিম নির্বাচন কমিশনার নেই। তালিকাটি দীর্ঘ।
আমার দৃষ্টিতে, নূপুর শর্মা ও নবীনকুমার বিশ্বস্ততার সঙ্গেই বিভিন্ন বিষয়ে বিজেপির অবস্থানের প্রতিফলন ঘটিয়ে চলেছেন। তাঁরা মাস্টার বা মনিবের কথা কানে নিয়ে নিজেদের মতো করে কথা বলেছেন। বিজেপি হল আধুনিক ভারতের গ্রামোফোন কোম্পানি।

বধির কান কাজ করবে না
বিজেপি দল ও সরকারের সংখ্যালঘু বিরোধী নীতি এবং বিদ্বেষের পরিণাম সম্পর্কে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা বার বার সতর্ক করেছিল। তারা সরকারকে হুঁশিয়ার করেছিল—অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াড, লাভ জিহাদ প্রচার, সিএএ, এনআরসি, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, রাজ্য বিধানসভায় ধর্মান্তর প্রতিরোধ বিল নিয়ে। হিজাব, হালাল, আজান, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মতো কিছু ‘নন-ইস্যু’ এবং অন্যকিছু ইস্যু খুঁচিয়ে তোলার ভিতরে রয়েছে পরিষ্কার ইসলাম-বিদ্বেষের প্রকাশ। সরকার বধির হয়ে গিয়েছে। 
যখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং অন্যান্য ১৫টি দেশ বিজেপির মুখপাত্রদের বক্তব্যের নিন্দা করেছে, তখন সরকার আত্মরক্ষার উপায় হাতড়াচ্ছে। বিদেশমন্ত্রীর ওজনদার কামান সরিয়ে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে বিদেশ সচিবের নিপুণ ‘ড্রাফ্টসম্যানশিপ’।
পরিতাপের সত্য এই যে, প্রধানমন্ত্রী একটি নিন্দাসূচক শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি মনে করেন, কোনওরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এই অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি সামলে উঠবেন। যথারীতি ফিরে আসবে জীবনের ছন্দ। তবে সত্য এই যে, রাজনৈতিক জীবন ভারতের ২০.২০ কোটি মুসলিম জনগণকে বাদ দিয়ে ছন্দে এগবে না। এবার বিরোধীরা নয়, মোদিজিকে আগাম সতর্ক করল দুনিয়া।
লেখক ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

13th     June,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ