বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মতাদর্শ শিকেয় তুলে রেখেছেন মোদি-শাহ
মৃণালকান্তি দাস

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন লালকৃষ্ণ আদবানি। আর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আমেদাবাদ পূর্ব লোকসভা আসনে সাত-সাতবার ভোটে জেতা সাংসদ, আদবানি ঘনিষ্ঠ হারিন পাঠক।
২০০০ সালের ৩ নভেম্বর, আমেদাবাদের এক আদালতে হারিন পাঠক এবং গুজরাতের তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অশোক ভাটের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়। অভিযোগ, গুজরাতে কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৫-র ২৪ এপ্রিল হেড কনস্টেবল লক্ষ্মণ দেশাইকে পিটিয়ে হত্যা করার জন্য মারমুখি জনতাকে উস্কে দিয়েছিলেন তাঁরাই। সেই সময়ে, পাঠক ছিলেন পৌরসভার কাউন্সিলার এবং ভাট রাজ্য বিধানসভার সদস্য। সেই কোটা বিরোধী আন্দোলনের জেরে পতন হয়েছিল মাধবসিংহ সোলাঙ্কি সরকারেরও। যদিও দুই নেতা দাবি তুলেছিলেন, তাঁরা ষড়যন্ত্রের শিকার।
৮ নভেম্বর হরিন পাঠক ও অশোক ভাট প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। গদি বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন ‘গুরু’ আদবানির কাছেও। কিন্তু কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অরুণ জেটলি ততক্ষণে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়িকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দাঙ্গার মামলায় অভিযোগ গঠনের পর হারিন পাঠক এবং অশোক ভাটকে পদত্যাগ করতেই হবে। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। ১৫ বছর পুরানো মামলার জেরে বাজপেয়ি মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ খোয়াতে হয়েছিল হারিন পাঠককে।
২০১০ সাল। মধ্যপ্রদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন বাজপেয়ির ভাগ্নে অনুপ মিশ্র। গোয়ালিয়রের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে নাম জড়িয়ে পড়ে অনুপ মিশ্রের ছেলের। অনুপ মিশ্রের ছেলে অশ্বিন মিশ্র, অনুপের ভাই অভয় মিশ্র এবং অজয় মিশ্র সহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিলেন মৃত যুবকের ভাই। শোরগোল পড়ে যায় মধ্যপ্রদেশের রাজনীতিতে। বিরোধীরা অনুপ মিশ্রের পদত্যাগের দাবি তোলে। তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের বিজেপির ইনচার্জ অনন্ত কুমার এবং মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান আদবানির মতামত চেয়েছিলেন। আদবানি বলেছিলেন, অনুপ মিশ্রকে পদত্যাগ করতে হবে। হাওলা কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আদবানি নিজেও ১৯৯৬ সালে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। উচ্চ আদালত তাঁকে মুক্তি দেওয়ার পর ১৯৯৮ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের মার্চে, নিউজ পোর্টাল তেহেলকা-র একটি স্টিং অপারেশন তোলপাড় করে দিয়েছিল দেশের রাজনীতি। তৎকালীন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণের বিরুদ্ধে এক জাল অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমতা পার্টির প্রাক্তন সভানেত্রী জয়া জেটলির বিরুদ্ধেও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের সরকারি বাসভবনে বসে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বঙ্গারু লক্ষ্মণকে দলের সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিতে নিজে উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাজপেয়ি। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল জর্জ ফার্নান্ডেজকেও।
এটাই ছিল বাজপেয়ি-আদবানির বিজেপি। তাঁরা সেই যুগ দেখেছিলেন, যখন শাস্ত্রীজি ট্রেন দুর্ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। নৈতিকতা ছিল জনজীবনের মূল্যবোধের অংশ। দুর্নীতি বা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত একের পর এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনেককে ভোটের লড়ার টিকিটও আর দেওয়া হয়নি। মিডিয়ার প্রশ্নকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তখন উস্কানিমূলক বক্তৃতায় অভিযুক্ত একাধিক বিজেপি মন্ত্রীকে পদত্যাগও করতে হয়েছে। ২০১৩ সালে, মধ্যপ্রদেশের আদিবাসী মন্ত্রী বিজয় শাহকে মহিলাদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের জমানায় যাবতীয় নজর সাংগঠনিক সম্প্রসারণের দিকে চলে গিয়েছে। সেখানে নৈতিকতার কোনও বালাই নেই। আজ ঘৃণার বক্তৃতা বা অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত মন্ত্রীরা বহাল তবিয়তে ক্ষমতা ভোগ করছেন।
বাজপেয়ি-আদবানি জুটির আদর্শ ছিল ‘পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স।’ যে কোনও মূল্যে ক্ষমতা অর্জন তাঁদের লক্ষ্য ছিল না। দলের সুস্পষ্ট মতাদর্শ ছিল। ‘আমাদের বিরোধী মানেই, তারা দেশবিরোধী— এমন আদর্শ বিজেপির ছিল না।’ ব্লগে লিখেছিলেন আদবানিজি। বিজেপি ক্যাডার ভিত্তিক পার্টি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আঁতুড়ঘরে যত্ন সহকারে বিজেপি নেতাদের গড়ে তোলা হতো। কিন্তু মোদি-শাহের এই নতুন যুগে দলের ধারাবাহিক সাংগঠনিক সম্প্রসারণের তাগিদই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। রাজনীতি স্বচ্ছ করার কোনও তাগিদ নেই। গেরুয়া শিবিরে অনেক নেতাই আজ প্রকাশ্যে বলেন, অন্য দলে কারও দমবন্ধ লাগলেই শ্বাস নিতে বিজেপিতে চলে আসুন। বিজেপি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে!
প্রধানমন্ত্রী মোদি কংগ্রেসি নেতাদের ‘নামদার’ বলে কটাক্ষ করেন। জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতারা মনে করতেন, কোনও নীতি ছাড়া ‘নামদার’-দের জড়ো করে তৈরি কংগ্রেস একদিন টুকরো হয়ে যাবে। এই নামদাররা স্রেফ ক্ষমতার লোভে কংগ্রেসে নাম লিখিয়েছেন। ক্ষমতা গেলে তাঁরাও পালাবেন। তাঁরা ভুল ভাবতেন না। কিন্তু কী আশ্চর্য! মোদি-শাহের জমানায় বিজেপি সেই নামদারদেরই দলে টানছে। শিকেয় তুলে রাখা হয়েছে মতাদর্শ! জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার হাত ধরে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেসের বিধায়করা যেদিন বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের হাতে বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি কুশাভাউ ঠাকরের জীবনী ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানও আত্মস্থ করতে হবে। নতুন দলের মতাদর্শ মগজে ঢোকাতে হবে। যাকে বলে ‘মগজ ধোলাই’। কিন্তু মগজ ধোলাই কতটা কাজে দিয়েছে, তার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মোদি-শাহের জমানায় বেড়াল সাদা না কালো তাতে কিছু যায় আসে না, ইঁদুর ধরতে পারলেই তাকে শাবাশি দাও। লাইনটা পরিষ্কার। সেখানে কে নামদার, কে বংশপরম্পরায় ক্ষমতায়, কার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ— তার চুলচেরা বিচার হয় না।
আজ একের পর এক সংখ্যালঘু বিদ্বেষী, উস্কানিমূলক ঘৃণাভাষণ, অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ডাকের মতো বক্তব্য রেখেও নিশ্চিন্তেই আছেন কেন্দ্রীয় নেতামন্ত্রীরা। ‘গোলি মারো শালোকো’, স্লোগান তুলে পদোন্নতি হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে বিদ্বজ্জনদের গুলি করে মারার নির্দেশ দিতেন বলে মন্তব্য করেছিলেন কর্ণাটকের বিজয়পুরার বিজেপি বিধায়ক বসনগৌড়া পাতিল ইয়াতনাল। অপভাষা ক্রমশই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিনোদনীমূল্য অর্জন করেছে। বাক্‌স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে যা চলছে, তার নাম রাজনীতি। বিজেপি বুঝে গিয়েছে, লখিমপুর থেকে হাতরাস, কোনও কিছুর প্রভাব পড়বে না ভোটে। তাই এখনও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহাল লখিমপুর খেরি কুখ্যাত অজয় মিশ্র। জাল ডিগ্রি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পদ খোয়াতে হয়নি মোদির মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনজনকে বেছে নিয়েছিলেন। অমিত শাহের ডেপুটি হিসেবে ওই তিন ‘দাবাং’ সাংসদ নিত্যানন্দ রাই, নিশীথ প্রামাণিক এবং অজয় মিশ্র। নিশীথ প্রামাণিক তাঁর হলফনামায় ১১টি মামলার উল্লেখ করেছিলেন। সেখানে খুন থেকে শুরু করে খুনের চেষ্টা, ডাকাতি, চুরির মাল কেনার মতো মারাত্মক সব অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। মামলার বহর দেখলে মনে হবে রীতিমতো ‘বাহুবলী’। শুধু দিনহাটা থানাতে তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে ৮টি মামলা। জেলার কোতোয়ালি থানায় রয়েছে একটি মামলা এবং পাশের জেলা আলিপুরদুয়ারেও রয়েছে দু’টি মামলা। খুন, ডাকাতি, অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা থাকলেও কোনও মামলাতেই তাঁর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়নি। কোনও মামলাতেই তিনি দোষীও সাব্যস্ত হননি। একসময় তাঁর বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তও শুরু হয়। বিজেপিতে যোগ দিতেই সবই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে। আরও এক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। তোলাবাজি, ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা প্রচার এবং মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত বেআইনি সমাবেশে যোগদানের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস-এর বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রের মোদি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৭৮ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৩৩ জন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
এটাই বাজপেয়ি-আদবানি জমানার সঙ্গে ফারাক। আসলে শক্তিশালী বিরোধী জোটের অভাবে মোদি-শাহ জুটি রাজনীতিতে নতুন খেলা খুঁজে পেয়েছেন। যে খেলায় ‘ফাউল’ বলার কোনও রেফারি থাকবে না!

26th     May,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ