বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিদ্বেষের এই পাশাখেলা...
সন্দীপন বিশ্বাস

মিথ্যা প্রচার কিংবা বিদ্বেষ যে কোনও সরকারের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে, মোদি অ্যান্ড কোম্পানিকে না দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না। সরকার এই দু’টো ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতিদিন ভারতের গণতন্ত্রকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। আর মিথ্যার বেসাতি করে আমাদের মোহাবিষ্ট করতে চাইছে। নতুন ভারত গড়ার ভুয়ো স্বপ্নের কথা বলে দেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে এই সরকার। আজকের ভারতকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে কোন পথের পথিক! তবে ওসবের পরোয়া করেন না তিনি। কেননা, তাঁর এখন পাখির চোখ ২০২৪ সালের ভোট। সেই দিকে তাকিয়ে বিদ্বেষের পাশাখেলা আরও বেশি করে খেলতে শুরু করেছেন। জানেন তিনি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষে দেশ যত বিপন্ন হবে, সম্প্রীতি যত ক্ষুণ্ণ হবে, হানাহানি যত বাড়বে, তাঁর জয়ের প্রত্যাশা ততই পূর্ণ হয়ে উঠবে। 
মোদি-শাহ জুটি ভালো করেই জানেন, তাঁদের ব্যর্থতার রিপোর্ট কার্ড দেখিয়ে ২০ শতাংশ ভোটও আসবে না। তাই এখন থেকেই চলছে জল ঘোলা করার খেলা। সেই জলে ক্ষমতার মাছ ধরার জন্য ছিপ ফেলবে বিজেপি। এখন থেকেই শুরু সেই খেলা। কীভাবে খেলাটা শুরু হল? বারাণসীতে জ্ঞানবাপী মসজিদ, দিল্লিতে কুতুব মিনার, আগ্রায় তাজমহল এবং মথুরায় ইদগা। এগুলির মাধ্যমে স্বচ্ছ জলকে সাম্প্রদায়িকতার কাঠি দিয়ে নেড়ে বাজিমাতের ছক। আদবানিরা প্রথম ক্ষমতা দখলের আগে অযোধ্যার বাবরি মসজিদকে ইস্যু করেছিলেন। মোদিজি ২০১৪ সালের ভোটে রামমন্দিরকে ইস্যু করেছিলেন। ২০১৯ সালের ভোটে তাঁর পালে হাওয়া দিয়েছিল পুলওয়ামা কাণ্ডকে ঘিরে প্রমোট করা দেশভক্তি। এখন রামমন্দির ইস্যু আর নেই। সেই মন্দির প্রস্তুতির পথে। পাকিস্তান এখন দুর্বল। তাকে নিয়ে খুব একটা ইস্যু করা সম্ভব নয়। অগত্যা ইস্যু খুঁজে বের করেছেন মোদিজিরা। এবার মোদিজিদের টার্গেট, দেশজুড়ে হিন্দুত্ব নিয়ে এমন শোর মাচাতে হবে, যাতে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মনের একটি বৃন্তে দু’টি কুসুমের ঐশ্বরিক ভাবনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পারস্পরিক হিংসায় মাতিয়ে দিতে হবে। ওই বিষ ভাবনাটুকুই মোদির ক্ষমতা জয়ের সোপান গড়ে তুলতে পারে, এমনই ছক কট্টর গেরুয়াপন্থীদের। সেই ছকে দেশের মানুষকে ভুলিয়ে দিতে হবে যে, পেট্রল-ডিজেলের দাম নাগালের বাইরে, টাকার দাম প্রতিদিনই পড়ে যাচ্ছে। জিনিসের দাম ঝড়ের 
গতিতে বেড়ে যাচ্ছে, চাকরি পাওয়ার আশা 
মরীচিকা। বাস্তব জীবনের এইসব কষ্ট ভোলাতে মানুষকে মাদক সেবন করানো দরকার। সেই মাদক হল জাতিগত হিংসা, সম্প্রদায়গত হিংসা এবং 
বিকৃত হিন্দুধর্মের প্রসার। মানুষের রক্তে সেই 
হিংসা ঢুকিয়ে দিয়ে সরকার পরস্পরকে যুযুধান করে মাঠে নামিয়ে দিতে চাইছে। ডিভাইড অ্যান্ড রুল। জ্ঞানবাপী, তাজমহল, কুতুব মিনার আর ইদগা নিয়ে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার বার্তা চলে গিয়েছে 
কট্টর নেতাদের কাছে। চলছে এখন তারই সলতে পাকানোর পর্ব। অযোধ্যার রাম জন্মভূমির পর এবার টার্গেট মথুরার কৃষ্ণ জন্মভূমি।
অথচ কী নির্মম প্রেক্ষাপট! দুই সম্প্রদায়ের মানুষই যখন সঙ্কটে দিশাহারা, তখন তাঁদের কানে বিষ ঢালা হচ্ছে। এর থেকে দেশের মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। এই সময়ে মিথ্যা উস্কানিতে আবেগপ্রবণ হয়ে পরস্পরের প্রতি লাঠালাঠি করলে আমাদের চলবে না। বরং সতর্ক হয়ে দেখতে হবে, হিংসার সমুদ্র মন্থন থেকে উত্থিত ক্ষমতার অমৃতটুকু মোহিনীর বেশে গেরুয়াপার্টি যেন চুরি করে নিয়ে না যায়। তাহলে আমাদের পাতে শুধু গরলটুকুই পড়ে থাকবে।   
অবশ্য আমরা তো এখনই প্রতিদিনই গরল পান করে চলেছি। মোদির একের পর এক ব্যর্থতার গরলে আমাদের জীবন বিষময় হয়ে উঠেছে। মোদির ব্যর্থতার হাজার খতিয়ান লেখা হচ্ছে প্রতিদিন। সমস্ত সমীক্ষা আর বিশ্লেষণে উলঙ্গ রাজার মিথ্যা গরিমার রাংতার মুকুট ভূলুণ্ঠিত। সংবাদপত্রে স্বাধীনতার সূচকে ভারতের স্থান বিশ্বে ১৫০ নম্বরে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশকে কোথায় নামিয়ে এনেছেন মোদিবাবুরা! এখানেই শেষ নয়, লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ভারত ১৪০ নম্বরে, বিশ্বের ক্ষুধার সূচকে ভারতের স্থান ১০১। বিশ্বে শান্তির সূচকে ভারতের স্থান অনেক পিছনে। যুব উন্নয়নে, মানবাধিকারে ভারত পিছনের সারির দেশগুলির সঙ্গে গোঁতাগুঁতি করছে। এরকম প্রচুর ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে সারা বিশ্বের কাছে মোদি-রাজ ভারতের মাথা হেঁট করে দিয়েছে। ভারতবাসী হিসেবে বিশ্বের কাছে আমাদের যে গৌরব ছিল, তা আজ আর নেই। দেশ যা ছিল আর দেশ যা হয়েছে, তার মধ্যে লেগে আছে রাজার বিভ্রান্তির অভিশাপ। অথচ এসব বিষয় মোদি-রাজের কাছে কোনও ইস্যুই নয়। দেশকে এই গাড্ডায় পড়ে যাওয়া থেকে তুলে ধরার চেষ্টাও দেখা যায় না। তার কারণ, এই ধরনের ভালো কাজ করার জ্ঞানটুকু বা অভ্যাস যে তাঁদের নেই, তা গত আট বছরের কেরামতি থেকেই বোঝা গিয়েছে। তাই যেটা তাঁরা পারেন, সেটাই করছেন। হিংসার বিস্তার করতেই ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। হিংসাই যেন আজ ভারতের মর্মবাণী। তাহলে কি বিশ্বে আমরা সব ব্যাপারেই পিছিয়ে আছি? না। সমীক্ষা বলছে, কিছু কিছু ব্যাপারে আমরা এগিয়েও আছি। যেমন বিশ্বে দাসত্বের সূচকে আমাদের স্থান চার নম্বরে, খুনোখুনির সূচকে আমাদের স্থান বিশ্বে দুই নম্বরে, ব্যক্তিগত সংগ্রহে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার সূচকে আমাদের দেশ দুই নম্বরে। এই সমীক্ষাই বলে দেয়, আমাদের দেশকে মোদি কোন পথে ঠেলে দিয়েছেন।  
মোদি কয়েকদিন আগেই সারা বিশ্বকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ভারতের হাতে রয়েছে অফুরন্ত খাদ্যভাণ্ডার। আমাদের দেশের চাষিরা সারা বিশ্বকে খাওয়াতে পারে। একথা বলে মোদি সারা বিশ্বের কাছে কৃষক দরদি সাজার ভান করলেও এদেশের সবাই জানেন, কীভাবে তিনি দেশের কৃষকদের দুর্বিপাকে ফেলতে চেয়েছিলেন। কৃষিবিল এনে তিনি ভারতীয় চাষিদের দাসে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ভারত ছিল একদা শস্য ও সম্পদে অন্যতম সেরা দেশ। কিন্তু তার হাল আজ সত্যিই খারাপ। লক্ষ্মী আজ অচলা। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতের খাদ্য নির্ভরতা শক্তিতে টান পড়েছে। বিদেশে গম রপ্তানি বন্ধ করতে হয়েছে ভারতকে। গম রপ্তানির মাধ্যমে আমাদের হাতে আসত প্রচুর বিদেশি মুদ্রা। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে ভারতের সামনে ছিল সারা বিশ্বে গম রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করার সুযোগ। তা নষ্ট হল। উপায় নেই বলেই সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেন না মোদিরা। 
আমরা জানি যে দেশের বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডার যত শক্তিশালী, সেই দেশের অর্থনৈতিক বনিয়াদ ততই মজবুত। আমাদের সেই মজুত বিদেশি অর্থ ভাণ্ডারে ধস নেমেছে। গম রপ্তানি করে সেই অর্থ ভাণ্ডারকে শক্তিশালী করা যেত। কিন্তু তা সম্ভব হল না, আমাদের খাদ্য ভাণ্ডার দুর্বল হয়ে পড়ায়। সরকার স্বীকার না করলেও তার কতকগুলি পদক্ষেপ সেই ইঙ্গিতই করছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের দেশের রেশন ব্যবস্থায় তার চাপ মালুম হবে। ইতিমধ্যেই তার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। মোদি সরকার রাজ্যগুলিকে বলে দিয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় গম দিতে পারবে না।
মোদির মতো অযোগ্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে পড়ে ভারতের সব সম্পদ একে একে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেউলিয়া হওয়ার সব লক্ষণ ফুটে উঠছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে পড়ে যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ছবিগুলি। প্রশ্ন জাগতেই পারে, তাহলে কি নতুন পথ দেখাচ্ছে শ্রীলঙ্কা? শেষ পর্যন্ত শাসকের ব্যর্থতার বিচার হবে প্রকাশ্য জনতার আদালতে? শ্রীলঙ্কার সদ্য ইতিহাস জনগণ অভ্যুত্থানের নিদর্শন হয়ে রইল। যদিও ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়কদের ধরে ধরে এই প্রহার, তাঁদের প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ মেনে নেওয়া যায় না, তা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। কিন্তু সর্বহারা জনতা আইন মানে না। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে এটা ঠিক, শ্রীলঙ্কার শাসকরাই দেশটাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। শ্রীরামচন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করব, মোদির ভারত যেন সেই পথে না যায়।

18th     May,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ