বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

জ্যোতি নিভবে, ইতিহাসের
রং গেরুয়া হবে না
শান্তনু দত্তগুপ্ত

 

আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, নরেন্দ্র মোদি ঠিক কোন বিষয়ে প্রচারে জোর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন? না হয় খান তিনেক অপশনও দেওয়া হল—১) আচ্ছে দিনের স্বপ্ন, ২) প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি এবং ৩) কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষোদ্গার। ৭০ শতাংশ বা তার বেশি ভারতীয়ই বলবেন, কারণ অবশ্যই দু’নম্বর। অর্থাৎ, বিদেশ থেকে কালো টাকা আনব, আর প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ভরে দেব। দেশবাসী একসঙ্গে লাখপতি হয়ে যাবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাশয় কিন্তু শুনতে অন্য একটি কারণ পছন্দ করবেন। কোনটি জানেন? তিন নম্বর। বাজি ধরতে পারি। এই সাত বছরে যতটুকু বুঝেছি, কংগ্রেস নামক শতাব্দীপ্রাচীন দলটির প্রতি নরেন্দ্র মোদির একটা আলাদা রকমের আবেগ আছে। হয় কথায়, নয় কথায় তিনি কংগ্রেসকে আকাশ থেকে পেড়ে আনেন। গেরুয়া শিবিরের ঝান্ডাধারী কর্মসূচি হোক বা সরকারি অনুষ্ঠান। এমনকী আন্তর্জাতিক মঞ্চেও কংগ্রেসকে তিনি ভুলতে পারেন না। মার্কেটিংয়ে একটি শব্দবন্ধ রয়েছে, নেগেটিভ পাবলিসিটি। এ 
এক বিষম বস্তু। আপনার সম্পর্কে ভালো ভালো বললে, সেটা অবশ্যই প্রচার। কিন্তু কোনও একটি বিষয়ে বারবার নেতিবাচক বলতে থাকলে সেটাও শ্রোতার মনে ধীরে ধীরে একটা জায়গা বানিয়ে নিতে থাকে। কেন জানেন? কারণ, নিন্দামন্দ করলে প্রথমে শ্রোতা সেটা বিশ্বাস করে। কিন্তু তিল থেকে তাল—সর্বত্র খুঁত ধরতে থাকলে শ্রোতার মনেও খানিক ধন্দ জন্মায়। সে তখন নিজে যুক্তি সাজাতে শুরু করে। ভাবতে থাকে, সত্যিই কি ঠিক শুনছি? নাকি নেপথ্যে অন্য কোনও গল্প রয়েছে? তাই যখন বছর দুয়েক আগে নয়াদিল্লিতে ওয়ার মেমোরিয়ালের দরজা খুলেছিল, মানুষের মনে তা খুব একটা দাগ কাটেনি। আপামর ভারতবাসী ভেবেছিল, বাঃ... মোদি সরকার ভালোই করল। একটা মিউজিয়াম গোছের জিনিস হল। দিল্লি বেড়াতে গেলে দেখতে যেতে হবে ইত্যাদি... ইত্যাদি। নরেন্দ্র মোদি কিন্তু তখন বলেছিলেন, 
৭০ বছরেও এই ওয়ার মেমোরিয়াল হয়নি। আমরাই করলাম। কংগ্রেসের সরকার কিছুই করেনি...। লোকে শুনেছে। ভুলেওছে। কিন্তু গত সপ্তাহে শোনা একটি খবর ছবিটা কিছুটা বদলে দিল—ইন্ডিয়া গেটের অমর জওয়ান জ্যোতির চিরন্তন অগ্নিশিখা নিভতে চলেছে। সরকার সাফাই দিল, মোটেও নিভছে না। ওয়ার মেমোরিয়ালে একই রকম একটা শিখা রয়েছে। ওটাও কখনও নেভে না। অমর জওয়ান জ্যোতির আগুন মিশিয়ে দেওয়া হবে তার সঙ্গে। নিরন্তর জ্বলবে তা। কিন্তু মানুষের মন। সব সাফাই পছন্দ যে হবেই, তার কোনও মানে নেই। যুক্তি-তথ্যের ঝুলি উপুড় করে আরও একবার বসল ভারতবাসী। স্মৃতি ফিরল ৫০ বছর আগে—১৯৭১ সালে। 
ইন্দিরা গান্ধী... বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ... পাকিস্তান... উদ্বাস্তু। এই সবকিছু যে এদেশের মানুষের অন্তরাত্মার সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর যুদ্ধ ঘোষণার পর উপমহাদেশের ইতিহাস বয়েছে অন্য খাতে। ইন্দিরা চেয়েছিলেন, অমর হয়ে থাকুক শহিদ জওয়ানদের স্মৃতি। রাজধানীর বুকে, ইন্ডিয়া গেটে পা রাখা মাত্র প্রত্যেকটা মানুষ দেখুক তাঁদের শৌর্য। জ্বলে উঠুক অগ্নিশিখা। তাই অমর জওয়ান জ্যোতি। সেই শিখা জ্বলেছিল ১৯৭২ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসে। ৫০ বছর পর... আর এক সাধারণতন্ত্র দিবস। আর আচমকাই ভারত শুনেছে, সেই শহিদ স্মৃতি অপ্রাসঙ্গিক। কেন? ইন্ডিয়া গেট নাকি আমাদের ঔপনিবেশিক অতীতকে মনে করায়। ব্রিটিশ শাসকরা তা তৈরি করেছিল তাদের ভারতীয় রেজিমেন্টের শহিদদের উদ্দেশে। প্রায় ৯০ হাজার সেনা জওয়ানের স্মৃতি ধারণ করে ইন্ডিয়া গেট। ইন্দিরা গান্ধী কখনও ভাবেননি... এই ভারতীয় সেনারা লড়েছিলেন ব্রিটিশ শাসকের হয়ে। তিনি দেখেছিলেন, ভারতের এই সেনারা কেউ প্রাণ দিয়েছেন ফ্রান্সে, কেউ পারস্যে, কেউ শহিদ হয়েছেন পূর্ব আফ্রিকায়, আবার কেউ তৃতীয় ইন্দো-আফগান যুদ্ধে। হতে পারে তাঁরা স্বাধীন ভারতের হয়ে লড়াই করেননি। তা বলে কি তাঁদের এই বলিদান ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেতে পারে? এই মাটির সঙ্গেই যে ছিল তাঁদের যোগ। অমর জ্যোতি অন্য কোথাও জ্বলে উঠতে পারে, ভাবতে পারেননি ইন্দিরা। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি ভাবেন। তাই তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ভারতীয়দের নাম লেখা ছিল না ইন্ডিয়া গেটে। তাই অমর জ্যোতির ওয়ার মেমোরিয়ালে সরে আসাটা ‘মোদির লিখন’। ৪০ একর জমিতে ১৭৬ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে ওয়ার মেমোরিয়াল। কিন্তু ভারতে শহিদ-স্মরণ বললেই যে মানুষ বোঝে ইন্ডিয়া গেট... বোঝে অমর জওয়ান জ্যোতি। যতদিন ওই বেয়নেট মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে... হালে পানি পাবে না তাঁর সাধের ওয়ার মেমোরিয়াল। তাই নিভে যাক অগ্নিশিখা। ওই শিখা ইন্দিরা গান্ধীর। পরিবারতন্ত্রের। জ্বলে উঠুক মোদির মশাল। লোকে দেখুক, ইন্দিরা গান্ধী নন... শহিদের জন্য সব করেছেন এবং করছেন একজনই—নরেন্দ্র মোদি। 
এই এজেন্ডা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নয়, এই এজেন্ডা আজকেরও নয়। দশকের পর দশক ধরে এই ধারণা মানব মননে বদ্ধমূল করে তুলতে নেমেছে সঙ্ঘ। পৌরাণিক কাহিনি বা ভেলকির আড়ালে দমন করা ভারতের ঘটনাবহুল ইতিহাসকে... বিজ্ঞানকে। প্রমাণ করা, আমরাই ছিলাম, আছি, থাকব। আগের সরকার, আগের শাসক শুধুই ভাঁওতা দিয়েছে। আমরাই ভারতকে নিয়ে চলেছি সাংস্কৃতিক উন্নতির শিখরে। অটলবিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনও এতটা সম্ভব হয়নি। কারণ উনি ধর্মের আগে গুরুত্ব দিতেন মানবতাকে। পুরাণের আগে প্রশাসনিক দক্ষতাকে। আত্মগরিমার আগে রাজধর্মকে। এবার সম্ভব হয়েছে। এই নরেন্দ্র মোদিই ছিলেন হিন্দুত্বের পোস্টার বয়। লালকৃষ্ণ আদবানির সেই মহা বিতর্কিত হিন্দুত্বের রথে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। বাবরি সৌধ, সবরমতী, গোধরা... ইতিহাস যা বলেছে, তা মিথ্যা প্রমাণিত। সঙ্ঘের আদর্শকে আজ যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার অন্যতম কাণ্ডারী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বদলে দাও শহরের পরিচয়। বদলে দাও রাস্তার নাম। লেখো নতুন পাঠ্যপুস্তক। বদলে দাও ইতিহাস। হিন্দুত্বের মায়াজালে মুড়ে দাও আসমুদ্রহিমাচল। এটাই তো ছিল চাওয়া। এই মায়াজাল আজ জন্ম দিয়েছে অন্ধভক্তদের। তারা এক ইশারায় বেরিয়ে পড়বে পথে। হাতে লাঠি, তরবারি। ঢুকে পড়বে তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। চলবে ভাঙচুর। নিগৃহীত হবেন অধ্যাপক, ছাত্ররা। প্রতিবাদ তাঁরা করতে পারবেন না। সে যে সন্ত্রাসবাদের সমান! গির্জায় আছড়ে পড়ো... এখানে ধর্মান্তরকরণ হচ্ছে। সবাই আমরা হিন্দু। অন্য ধর্ম গজিয়ে উঠেছে। তার আবার সম্মান কী? আতঙ্কিত দেশ। উদভ্রান্ত মানুষ। তারপরও জাতীয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ৭০ বছরে এদেশের কিস্যু হয়নি। তিনি চেষ্টা করছেন... আর দেশে-বিদেশে কিছু লোক ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গির্জায় হামলা হলে এমনকী... ইউএপিএ-র যথেচ্ছ ব্যবহার হলে ক্ষতি নেই... করোনা মোকাবিলায় ল্যাজেগোবরে তো হতেই পারে সরকার... শুধু বিদেশি মিডিয়া লিখলেই দোষ। ভারতের সম্মানহানি হয় তাতে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি টি এস ত্রিমূর্তি যখন বলেন, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখরা ধর্মীয় আতঙ্কের, ঘৃণার শিকার হচ্ছে’... তখন ভারতের ভাবমূর্তির গায়ে আঘাত লাগে না? হরিদ্বার ধর্ম মহাসভার মঞ্চ থেকে বলা হয়, ‘হিন্দুত্ব বাঁচাতে হলে মুসলিমদের গণহত্যা করতে হবে। ওদের ধর্মীয় স্থল ভেঙে দিতে হবে...’। এরপরও কি দেশের সম্মানে দাগ লাগে না মোদিজি? এসব দেখেশুনেও আপনার সরকার চোখে ঠুলি এঁটে বসে থাকে, আর আপনি বলেন... বিদেশে ভারতের সম্মানহানি হচ্ছে! 
আসলে জানেন মোদিজি, ভারতের ঐতিহ্য বা সম্মান এত ঠুনকো নয়, যা ধর্মের নামে দালালি করা কিছু অশিক্ষিতের জন্য ধসে যাবে। এই ভারতকে মহান করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, এ পি জে আব্দুল কালাম বা এই দেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া সৈনিকরা। সেই কৃতিত্ব তাঁদেরই। আপনি, আপনার দল বা সরকার... তাঁদের কৃতিত্ব কেড়ে নিতে পারবেন না। মুছে দিতে পারবেন না ৭০ বছরের ইতিহাসও। ইন্ডিয়া গেটের সামনে গেলে আজও চোখ খুঁজবে ওই বেয়নেটকে। অমর জওয়ান জ্যোতিকে। 
আর হ্যাঁ, কংগ্রেস মুক্ত ভারতের কথা মোদিজি বারবার বলেন আপনি। কিন্তু সত্যি বলতে, আপনি যতদিন থাকবেন... কংগ্রেসও বেঁচেবর্তে থাকবে। নেগেটিভ পাবলিসিটির এটাই গুণ। তাই ভারতকে কংগ্রেস মুক্ত করার আগে মোদি-মুক্ত করতে হবে যে!

25th     January,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ