বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

নেতাজি: বহু অসম্মান
জয় করা এক মহাপ্রাণ
সমৃদ্ধ দত্ত

বন্দেমাতরমকে কি কংগ্রেসের অধিবেশনে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে? ১৯৩৭ সালে এই বিতর্ক তুঙ্গে উঠল। কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম নেতা কর্মী সদস্যরা আপত্তি তুললেন যে, এখানে সরাসরি মা দুর্গার সঙ্গে দেশমাতৃকাকে তুলনা করা হয়েছে। মুসলিম ধর্মবিশ্বাসে যেহেতু মূর্তিপুজোয় নিষেধ, তাই এরকম একটি সঙ্গীতকে সাংগঠনিক সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংশয় তৈরি হচ্ছে। এই নিয়ে কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী অংশ এবং মুসলিম নেতৃত্বের মধ্যে চাপা টেনশনও শুরু হল। কীভাবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব? সুভাষচন্দ্র বসু প্রস্তাব দিলেন, একজন ব্যক্তিত্বের কাছে পরামর্শ নেওয়া হোক। তিনি যা বলবেন, সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। সেই ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিবৃতি জারি করে জানালেন, বন্দে মাতরম উচ্চারণ করে বহু যুববিপ্লবী প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আত্মবলিদান দিয়েছেন। এটি একটি মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে গোটা সঙ্গীত এবং তার ইতিহাসটিতে মুসলিমদের আহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী একটি সংগঠনে এরকম হিন্দু বনাম মুসলিম বিরোধ রয়ে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। সবথেকে ভালো হয় প্রথম স্তবকটিকে যদি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কারণ, প্রথম স্তবকটি সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা হিসেবেই ভারতমাতার প্রতি এক শ্রদ্ধার নিবেদন রূপে ভাস্বর। সেটি এক অনুপ্রেরণা। রবীন্দ্রনাথের এই পরামর্শ কংগ্রেস গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবার থেকে বন্দেমাতরমের প্রথম স্তবকই কংগ্রেসের জাতীয় মঞ্চের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হবে। কিন্তু এই কারণে রবীন্দ্রনাথ এবং সুভাষচন্দ্র, দুজনকেই চরম আক্রমণ, সমালোচনা এবং অসম্মান করেছিল কংগ্রেসের অন্দরে এবং বাইরে থাকা অন্য হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্ব। কিন্তু সেই সমালোচনায় ভীত হননি সুভাষচন্দ্র। তিনি বন্দেমাতরম স্লোগান প্রতিটি ভাষণের শেষে দিয়েছেন। কিন্তু প্রথম স্তবককেই দলের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই ইস্যুতে দেখা গেল, কংগ্রেসের বাছাই করা কিছু নেতা কিংবা অন্য অকংগ্রেসি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের নেতাদের আচরণে কোনও পার্থক্য রইল না। তাঁদের সম্মিলিত টার্গেট হয়েছিলেন দুই বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ এবং সুভাষচন্দ্র।
২০২২ সাল স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মজয়ন্তী। অথচ ঠিক সেই বছরেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামাঙ্কিত ট্যাবলোকে সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে অংশ নিতে দেওয়া হল না। যে বাংলা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করেছে, অসংখ্য বাঙালি যুবক যুবতী আহুতি দিয়েছে প্রাণ, সেই বাংলাকে অনুপস্থিত রাখা হচ্ছে গণতন্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবে। ইতিহাস থেকে বাংলার অবদান কি এভাবে মুছে ফেলা যায়?
আজ যাঁদের সরকারের রাজত্বকালে নেতাজির ট্যাবলোকে বাতিল করে দেওয়া হল, তাঁরা সবথেকে বেশি ভিলেন এবং নেতাজি বিরোধী হিসেবে কাকে প্রতিপন্ন করেন? কার বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার করেন? পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। কিন্তু সত্যিই তাই? তিনি কি সবথেকে বেশি নেতাজি বিরোধী ছিলেন? দেখা যাক ইতিহাস কী বলছে। 
১৯৩৯ সালের ১৭ এপ্রিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু মহাত্মা গান্ধীকে একটি চিঠি লিখলেন। কিছুদিন আগেই কংগ্রেসের সভাপতি পদে আবার নির্বাচিত হয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু। কংগ্রেসের অন্দরের একঝাঁক নেতা যা অপছন্দ করেছেন। তাঁর সঙ্গে অসহযোগিতার বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এরকম সময়ে ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করাই সুভাষচন্দ্র বসুর পক্ষে সবথেকে কঠিন হল। প্রায় এক অচলাবস্থা। জওহরলাল নেহরু দীর্ঘ চিঠি লিখলেন গান্ধীজিকে। সেখানে তিনি বললেন, ‘একটু আগে সুভাষের একটি চিঠি পেলাম। সে বলেছে, কয়েকঘণ্টার জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।  বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য। যদিও আমার সংশয় আছে যে, আদৌ আমি কোনও ইতিবাচক সমাধান দিতে পারব কি না। কিন্তু দেখা করার প্রস্তাবে অবশ্যই আমি অরাজি হতে পারব না। তাঁকে কী বলব জানি না। সম্ভবত তাঁকে বলব, যাতে সে আপনাকেই বলে ওয়ার্কিং কমিটির সম্ভাব্য নাম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে।  হয়তো সে কিছু নাম প্রস্তাব করতে পারে। সেগুলি গ্রহণ কিংবা বর্জন করার সিদ্ধান্ত আপনার। ...যদি সুভাষ এরকম প্রস্তাবে রাজি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে কিন্তু সম্পূর্ণ দায়িত্ব আপনার এবং আপনি সেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তবে আমি এই দিল্লিতে বসে এটা মনে করি যে, সুভাষকে আপনার সভাপতি হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত।  তাঁকে কোণঠাসা করে দেওয়ার চেষ্টা হলে, আমার মতে সেটা হবে মাত্রাতিরিক্ত এক ভুল পদক্ষেপ..’’। 
ত্রিপুরী কংগ্রেসে সভাপতি হিসেবে গান্ধীজি প্রথমে দেখতে চেয়েছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে। গুজরাতের বরদোলিতে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে তাঁর নাম ঘোষণাও হয়ে যায়। প্রথমে তিনি আপত্তি করেননি। কিন্তু পরে নিজেই নাম প্রত্যাহার করেন। কারণ একটাই। সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে তিনি প্রার্থী হতে চান না। সুভাষচন্দ্র বসু দ্বিতীয়বার সভাপতি হন, এটা সবথেকে বেশি চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি প্রকাশ্যেই মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, তাঁর কাছে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দুজন মানুষই সবথেকে আধুনিক চিন্তাধারার। জওহরলাল এবং সুভাষচন্দ্র। গান্ধীজিকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতেও লিখেছিলেন যে, সুভাষের দ্বিতীয়বার সুযোগ পাওয়া উচিত। 
কিন্তু সুভাষচন্দ্রের সভাপতিত্বের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা প্রথম থেকেই ছিলেন সরব। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং অন্য ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা একাধিক যৌথ বিবৃতিও জারি করেন সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়ে। এরকম এক চরম বিরোধের মধ্যেই কংগ্রেস সভাপতির ভোটাভুটি হয়। গান্ধীজির প্রার্থী পট্টভী সীতারামাইয়া পরাস্ত হন সুভাষচন্দ্রের কাছে। কিন্তু এভাবে যে চরম বিদ্রোহ ও অসহযোগিতার আবহে তিনি সংগঠন চালাতে পারবেন না সেটা বুঝে জওহরলাল নেহরু ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিনিকেতেনে দেখা করেন সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনাও হয় (‘নেহরু অ্যান্ড বোস, প্যারালাল লাইভস’, রুদ্রাংশু মুখার্জি)। কিন্তু কী কথা হয়েছিল? পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। 
প্যাটেল ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ সালে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে চিঠি লিখে বলেন, এভাবে তাঁর (সুভাষচন্দ্র) সঙ্গে কাজ করা অসম্ভব এবং তাঁকেও আমাদের ফ্রি হ্যান্ড দেওয়া উচিত। তাঁর অনুগামী ওয়ার্কিং কমিটির সক঩লেই পদত্যাগ করেন। এরপর যখন মার্চ মাসে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সকলে মিলিত হন, তখন গোবিন্দবল্লভ পন্থ একটি প্রস্তাব ইস্যু করেন। যাকে বলা হয় পন্থ রেজোলিউশন। নামে পন্থ রেজোলিউশন হলেও সেটি আদতে লিখেছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। এমন সব প্রস্তাব দেওয়া হয় যা সুভাষচন্দ্রের পক্ষে ছিল চরম অসম্মানজনক। সেই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়ে যায়। একটা সম্মানজনক মধ্যস্থতার শেষ চেষ্টা কিন্তু করা হয়েছিল। সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র বসু প্যাটেলকে বলেছিলেন, সুভাষ ও তাঁর অনুগামীরা এই প্রস্তাবকেই সমর্থন করতে রাজি আছেন, যদি কিছু কিছু অংশ সংশোধন ও পরির্বর্তন করা হয় আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু প্যাটেল বলেছিলেন, একটা শব্দ, একটা কমাও পরিবর্তন করা হবে না। ক্রমেই পরিস্থিতি এমন এক অসহনীয় অসম্মানজনক জায়গায় চলে গেল যে, সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। 
জেনিভায় সুভাষচন্দ্র ও বল্লভভাই প্যাটেলের দাদা বিঠ্ঠল ভাই প্যাটেল ছিলেন একসঙ্গে। ছোটভাইয়ের মতোই ভালোবাসতেন বিঠ্ঠলভাই প্যাটেল সুভাষকে। তিনি যখন অসুস্থ ছিলেন, তখন সুভাষচন্দ্র দিনরাত সেবা করেছেন। মৃত্যুর আগে সেই বিঠ্ঠলভাই প্যাটেল নিজের উইলে সুভাষচন্দ্রকে নিজের সম্পত্তির কিয়দংশ দিয়ে লিখে যান যে, প্রবাসে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই অর্থ ব্যয় করবেন সুভাষ। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই উইলকে জাল হিসেবে মনে করেন। সুভাষচন্দ্রকে প্রতারক আখ্যা দিয়ে বম্বে হাইকোর্টে মামলাও করা হয়। 
সুতরাং, সুভাষচন্দ্রকে অসম্মান করা, তাচ্ছিল্য করা নতুন নয়। সুভাষচন্দ্রকে অবহেলায় কংগ্রেস, অকংগ্রেস, সব দলেরই একই সুর। তাই যে দলই দিল্লিতে বসুক, যত সরকারই বদল হোক, 
তাঁর অন্তর্ধান রহস্যের আজও কিনারা হয় না। 
সব গোপন ফাইল আজও উন্মুক্ত হয় না। যারা সাধারণতন্ত্র দিবসের ট্যাবলো বাছাই করেন এবং বাতিল করেন, তাঁদেরও নেতাজি ট্যাবলো বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তটিতে একটুও চোখের তারা কাঁপে না। ঠিক যেমন ভারতের সবথেকে উঁচু মর্মরমূর্তিটিও নেতাজির হয় না।  
সুভাষচন্দ্র বসু সমস্ত পদ কিংবা ক্ষমতালোভের ঊর্ধ্বে উঠে একটি একক নৌকায় সফর করেছেন বরাবর। যে নৌকার চালিকাশক্তি ছিল, সত্য ও স্বাধীনতা। ‘আমার জীবনদর্শন’ শীর্ষক রচনায় সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছেন, ‘‘আমার কাছে সত্যের অর্থ হল, সজ্ঞানে একটা উদ্দেশ্য সাধনে আত্মা দেশ ও কালের মধ্যে দিয়ে কাজ করে চলেছে।...আমার নিজের জীবনে একটি ‘ক্রমবর্ধমান উদ্দেশ্য’ লক্ষ্য করি’’। নেতাজি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন প্রত্যেকের জীবনে সত্যের পথে একটি উদ্দেশ্য স্থির করতে। 

21st     January,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ