বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

হরিদ্বারে বিদ্বেষের বিষকুম্ভ!
মৃণালকান্তি দাস

পুরাণ বলে, মহাদেবের জটা থেকে মর্তে এখানেই পা রেখেছিলেন দেবী গঙ্গা। ভূগোল বলে, এখান থেকেই গঙ্গার পাহাড় পরিক্রমা শেষ, সমতলযাত্রা শুরু। গঙ্গোত্রীর গোমুখ হিমবাহ থেকে উৎপত্তির পরে ২৫৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে গঙ্গা পৌঁছায় হরিদ্বারে। তীর্থক্ষেত্র হরিদ্বারে যাঁরা যান, তাঁরা কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মনের সমস্ত কিছু বিলিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে চান। কিন্তু এমনই কপাল, কিছুতেই খালি হাতে ফেরা হয় না তাঁদের। অনাবিল আনন্দে দেহমন ভরিয়ে দেয় যে উদার-উদাসীন তীর্থ, তার নাম হরিদ্বার। অমৃতকুম্ভের সন্ধানে এখানেই তো ছুটে এসেছিলেন সাহিত্যিক সমরেশ বসু। মহামতি ভীষ্মের তর্পণক্ষেত্র। মহাভারতীয় যুগের গঙ্গাদ্বার। পৌরাণিক বিশ্বাস, সমুদ্রমন্থনের পরে গরুড় যখন অমৃতের কলসি নিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন, তখন উজ্জয়িনী, নাসিক, প্রয়াগরাজের মতো হরিদ্বারেও ছিটে পড়েছিল অমৃতের বিন্দু। ধর্মে মতি না থাকলেও ভারতবাসী আজও হরিদ্বার ছুটে যান ভারতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকতে। হরিদ্বারে এসে অমৃতকুম্ভের সন্ধান না করলে কার্যত অসম্পূর্ণই থেকে যায় বাঙালির লোটাকম্বলের বৃত্তান্ত।
২০০০ সালের আগে এই হরিদ্বার ছিল উত্তরপ্রদেশের অংশ। রাজ্য ভাগ হয়ে সেই তীর্থক্ষেত্র এখন উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ১৩ জেলার একটি। এখানে সন্ধ্যার হর-কী-পৌড়ী ঘাটে দাঁড়ালে আজও বোঝার উপায় নেই যে, গঙ্গা নিয়ে এত বিতর্ক, এত টানাপড়েন। এখানে কেউ গঙ্গার জল ভক্তিভরে মাথায় ছোঁয়ান, কেউ প্রদীপ ভাসান স্রোতে। কারও জুতো পরা পা যদি জলের কাছাকাছি চলে যায়, তাঁর বরাতে স্বেচ্ছাসেবকের বকুনি অবধারিত! ‘গঙ্গা মাঈয়া হ্যায়। জুতা হটাও ইধারসে!’ মোদি জমানায় সেই অমৃতকুম্ভের পীঠস্থানই এখন হয়ে উঠেছে বিদ্বেষের বিষকুম্ভ! যেখানে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় গেরুয়াবসনে সাধু-সাধ্বীরা দায়িত্বহীন হুঙ্কার তোলেন। সেই হুঙ্কারে মিশে থাকে বিষ!
এমনই হুঙ্কার শোনা গিয়েছে গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর এক ধর্ম-সংসদে। যার মূল আয়োজক ছিলেন ধর্মগুরু নরসিংহানন্দ সরস্বতী। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু রক্ষা সেনার প্রবোধানন্দ গিরি, বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী, সাধ্বী অন্নপূর্ণা এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। ভাইরাল একটি ক্লিপে দেখা গিয়েছে, সাধ্বী অন্নপূর্ণা বলছেন, ‘ওদের ধ্বংস করতে চাইলে মেরে ফেলতে হবে। আমাদের ১০০ লোক দরকার, যারা ওদের ২০ লাখ মানুষকে খুন করতে পারবে।’ প্রবোধানন্দ গিরি বলছেন, ‘মায়ানমারের মতো আমাদের পুলিস, সেনা, রাজনীতিবিদ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এবার ‘সাফাই অভিযান’ চালাতে হবে।’ সাফাই মানে? ‘ক্লিনজিং বা ‘নির্মূল’ করা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একজন ‘ধর্মপ্রাণ’ মানুষ কী করে অপর গোষ্ঠীর মানুষকে খুন করার আহ্বান জানাতে পারেন? মানুষ খুনের হুঙ্কারে ‘গঙ্গা মাঈয়া’-র হরিদ্বারের বাতাস কি অপবিত্র হয় না?
হরিদ্বারের তথাকথিত ধর্ম-সংসদ থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এহেন ভাষণে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের যে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার চলছে, তা দেশকে ‘টুকরো টুকরো’ করবার হিংস্র প্ররোচনা দেয়। অথচ, সাধু-সাধ্বীদের ঘৃণা-ভাষণের বিষয়টি নজরে এলেও কার্যত উদাসীন ভূমিকায় দেখা গিয়েছে প্রশাসনকে। পুলিসকে নীরব রেখে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রবোধানন্দ গিরি বলেছেন, ‘আমি যা বলেছি তাতে আমি লজ্জিত নই। আমি পুলিসকে ভয় পাই না। আমি আমার বক্তব্যে অটল।’ এরপরও নীরবতা যে কত বড় অন্যায়ের সূচক হতে পারে, নরেন্দ্র মোদি শাসিত ভারত তা অবাক হয়ে দেখেছে।
পুলিসের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, কেন সরাসরি খুন এবং গণহত্যার ডাক দেওয়ার পরেও মূল অভিযুক্ত হিসেবে রাখা হল শুধু সদ্য মুসলমান ধর্ম ছেড়ে হিন্দু হওয়া ওয়াসিম রিজভি ওরফে জিতেন্দ্র নারায়ণ ত্যাগীর একার নাম? কেন এফআইআরে এড়িয়ে যাওয়া হল অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা তথা একাধিক ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনায় অভিযুক্ত নরসিংহানন্দ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে খুনের ‘ইচ্ছে’ প্রকাশ করা ধর্মদাস মহারাজ, সংবিধানকে ‘ভুল’ বলা সাধ্বী অন্নপূর্ণা-সহ বাকি ঘৃণা-ভাষণকারীদের নাম? কেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ, দেশদ্রোহের মতো অভিযোগে মামলা দায়ের করল না বিজেপি-শাসিত উত্তরাখণ্ডের পুলিস?
এই সাম্প্রদায়িকতার প্রচার অহেতুক বা অপরিকল্পিত বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখেই যে প্রচারের এই নতুন মাত্রা— তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। এই প্রচার সমাজকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজিত করে নির্বাচনী রাজনীতির ফসল তোলার প্রক্রিয়া ছাড়া কিছু নয়। বিদ্বেষ ও হিংসার কারবারিরা এতে প্রশ্রয় পায়, যে প্রশ্রয় শুধু তাদের প্রচারে ইন্ধন জোগায় না, ইন্ধন জোগায় আক্রমণেও। আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য সংখ্যালঘুরা। যা উদার গণতন্ত্রের মর্মমূলে আঘাত হানে। সম্প্রতি দেশের প্রাক্তন সামরিক কর্তাব্যক্তি, প্রশাসক, সমাজকর্মী এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বহু মানুষ প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিসহ দেশের নেতাদের উগ্র হিন্দুত্বের এই আক্রমণের নিন্দা করতে এবং তা বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের চিঠির ভাষায় রয়েছে শুধুই গভীর উদ্বেগ। চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার। কয়েকজনের নামে এফআইআর দায়ের। কিন্তু ওই পর্যন্তই!
ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম শর্ত অন্য ধর্মের প্রতি সম্মানবোধ, সহিষ্ণুতা। সেই গুণটি ধ্বংস হলে ধর্মনিরপেক্ষতার খোলসটুকুই শুধু পড়ে থাকে। সেখানে প্রাধান্য পায় সঙ্কীর্ণ রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। প্রশ্ন ওঠে, চারপাশে ঘৃণার এই নিবিড় চাষকে নিশ্চুপ থেকে মদত দেওয়ার মাধ্যমে কি আদতে শাসকদলের রাজধর্মই টাল খাচ্ছে না? ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না ভাবমূর্তি? না কি গোটা বিষয়টিতে প্রচ্ছন্ন মদতের মাধ্যমে বার্তা এমনটাই যে, সংখ্যাগুরুই বলবে শেষ কথা।
হরিয়ানার করণী সেনার সভাপতি সুরজপল অমূর কথা মনে আছে? গত বছর করোনা আবহের মধ্যে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই রীতিমতো মহাপঞ্চায়েত ডেকে সেই মঞ্চ থেকে হিন্দুদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ওরা (মুসলিম) গোঁফ কাটে, আমরা গলা কাটতে পারি...এক এক জনকে ধরে ধরে মারব। সেই উস্কানিমূলক মন্তব্যের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনুষ্ঠানটির একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, প্রায় শ’খানেক পুলিসের সামনেই অমূ ওই বিদ্বেষের কথাগুলি বলছেন! অমূর বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেয়নি হরিয়ানার বিজেপি সরকারের পুলিস। উল্টে সেই অমূ এখন রাজ্য বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র।
ওই মঞ্চে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে অমূকেও ছাপিয়ে গিয়েছিলেন রামভক্ত গোপাল নামে এক যুবক। ২০২০ সালে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের উপর গুলি চালিয়ে ধরা পড়লেও বয়সের কারণে ছাড় পেয়ে গিয়েছিল সে। সেই রামভক্ত গোপাল ওই মঞ্চ থেকেই সরাসরি মুসলিম গণহত্যার ডাক দিয়েছিল। মুসলিম মহিলাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ডাকও দিয়েছিল জনতার উদ্দেশে। এমনকী এ কাজের জন্য রামভক্ত যে গর্বিত, তা-ও ফেসবুক লাইভ করে জানিয়েছিল। মোদি জমানায় কার হিম্মত আছে তাকে গ্রেপ্তার করার? নাগপুরের পাঠশালা এই শিক্ষাই দেয়। নাগপুর গোটা দেশে যে হিন্দুত্ববাদী চিন্তা-আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, এই আক্রমণগুলি তারই সুপরিকল্পিত অংশ।
১৯৬৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যখন গঠিত হয়েছিল, তখন থেকেই হিন্দুদের জন্য ফাঁদ পাতা হচ্ছিল। সেটা কিন্তু অনেকেই সেদিন বুঝতে পারেননি। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ‘সাধু’রাই যে ছদ্মবেশে এই হিন্দুত্বের মন্ত্র সমাজের মধ্যে ঢোকাবেন সেটা কিন্তু অনেকেই সেদিন আন্দাজ করতে চাননি। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কিন্তু একটি রাজনৈতিক সংগঠন যাকে চালানো হয়েছিল অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে। বজরঙ্গ দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এরা কিন্তু এসেছিল ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এবং ধীরে-ধীরে তারা হিন্দুদের সমস্ত ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কব্জা করার চেষ্টা করে গিয়েছে। একদিকে মানুষ এদেরকে ভেবে এসেছে সাধু বা বৈরাগী, যাদের কোনও সামাজিক বা অর্থনৈতিক চাহিদা নেই। আর অন্যদিকে এরাই গেরুয়া শিবিরের হয়ে রাজনৈতিক কাজ চালিয়ে গিয়েছে। প্রকারান্তরে যা বিজেপিকেই সহায়তা করেছে। কে না জানে, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে দেখা এক জিনিস। সেটি মানুষের ব্যক্তিগত। আর ধর্মকে রাজনৈতিক মতাদর্শে ব্যবহার করা অন্য জিনিস। দ্বিতীয়টি বিপজ্জনক বিষকুম্ভ। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
নরেন্দ্র মোদির জমানা নাগপুরের শিক্ষাকেও অতিক্রম করে ক্রমেই গোলওয়ালকরের আদর্শে উপনীত হচ্ছে। যে ভঙ্গিতে প্রধানমন্ত্রী অযোধ্যা-বারাণসী-কাশীতে শিলান্যাস বা উদ্বোধন করছেন, সেই মুদ্রারই অপর পৃষ্ঠে রয়েছে হরিদ্বার। গোলওয়ালকরের রাজনৈতিক কল্পনার হিন্দু ভারতকে খাতায়-কলমে না হলেও কাজে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এই দেশে মুসলিমরা এখন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তো বটেই, রাষ্ট্রশক্তি এখন লজ্জাহীনভাবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতেও হিন্দুত্ববাদীরা ছিল। যেখানে ক্ষমতা তাদের দখলেই ছিল। সেখানে উগ্রতায় প্রশ্রয়ও ছিল— কিন্তু সেই ভারতে করসেবকরা ভাঙাভাঙি করত। প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রশক্তি নয়। বর্তমান ভারতে কি তবে রাষ্ট্রই সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেখানে সংবিধান বর্ণিত দায়িত্বকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে হিন্দুত্বের প্রধান ধ্বজাধারী হয়েছেন, সেখানে হরিদ্বারের সাধু-সাধ্বীদের কাছ থেকে আর কী-ই বা প্রত্যাশা থাকতে পারে?
১৯ বছর আগে ভয়াবহ দাঙ্গার পরে দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ি। মুখ্যমন্ত্রিত্বের সিঁড়ি বেয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নরেন্দ্র মোদিকে আজ সেই মন্ত্র স্মরণ করাবেন কে?

6th     January,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ