বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মেয়েদের বিয়ের বয়স
বদলেও কর্তৃত্ব পুরুষের 
হারাধন চৌধুরী

দেশের নাম: আফগানিস্তান
রক্তমাংসের নারীর উপর হাজারো ফতোয়া চাপিয়ে দিয়েও স্বস্তি নেই তালিবানের। এবার তাদের কোপে পড়ল নিষ্প্রাণ পুতুলও। রেডিমেড গার্মেন্টস শোরুমে ম্যানিকিনের (নারী বা পুরুষের নকল মডেল) ব্যবহার সারা পৃথিবীর রেওয়াজ। সম্প্রতি তালিবান সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, শোরুমে মহিলাদের ফাইবার মডেলও রাখা চলবে না। নিতান্তই যদি রাখতে হয় তবে মডেলেরও ‘মুণ্ডচ্ছেদ’ করতে হবে! ২৬ ডিসেম্বর আফগানিস্তান সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর তরফে মেয়েদের কন্ট্রোলে রাখার জন্য একগুচ্ছ নয়া ফতোয়া জারি করা হয়েছে। অতঃপর সেগুলি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রাদেশিক সরকারগুলির কাছে। তার মধ্যে অন্যতম—মেয়েদের ফাইবার মূর্তিরও ‘মুণ্ডচ্ছেদ’ করতে হবে। তালিবানের এই বদ ফরমাশে মাথায় হাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। কারণ তাঁদের সঙ্কট দু-দিক থেকে। এক-একটি মডেল কিনতে তাঁদের মোটা টাকা খরচ হয়েছে। অন্যদিকে, মডেলে সাজিয়ে প্রদর্শন করতে না-পারলে দামি পোশাকগুলি ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণই-বা করবে কীভাবে? আরও আছে। খেলাধুলো, গান-বাজনা, অভিনয়, পড়াশোনা, চাকরি-বাকরি, জন্মনিয়ন্ত্রণের বারোটা আগেই বাজানো হয়েছে। এর বাইরেও মেয়েদের জন্য যে যৎসামান্য অধিকার ধুঁকছে, সেগুলিও সরাসরি ছেঁটে দেওয়ার অর্ডার জারি হয়েছে: ৭২ কিমির বেশি দূরে যাওয়ার সময় মেয়েদের অবশ্যই পুরুষ সঙ্গী নিতে হবে। পুরো সফরে নিজেকে অবশ্যই মুড়ে রাখতে হবে হিজাবে। ট্যাক্সি ও গাড়ির চালকদের এই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্কও করে দিয়েছে তালিবান।

দেশের নাম: পাকিস্তান 
পাকিস্তানে মেয়েদের অধিকারের হাল কী? সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে মার্কিন সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অফ পিস। তাদের বক্তব্য, উদীয়মান উইমেনস মুভমেন্ট সেখানে নতুনভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার রোষে পড়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ন্যায়বিচার ও শান্তি। তার জন্য দরকার নারীবাদের সামনে একটি গ্রহণীয় বার্তা। ২০২১-এ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে (৮ মার্চ) পাকিস্তান জুড়ে হাজার হাজার নারী সমবেত হন। নারী ও লিঙ্গভিত্তিক সংখ্যালঘুদের উপর নিকৃষ্ট-পুরুষদের হিংসা-আক্রমণ অবিলম্বে বন্ধের জোরালো দাবি জানান তাঁরা। পাকিস্তানের তালিবান এতে ভয়ানক রুষ্ট। ওই আন্দোলন-মিছিলে অংশ নেওয়া মহিলাদের তারা কড়া ভাষায় হুঁশিয়ার করেছে। নারী অধিকারের ওই বিরোধীরা মহিলা সমাবেশের একটি বিকৃত ভিডিও তৈরি করেও ছড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রতিপাদ্য—মহিলারা মহান আল্লাহের নিন্দা করেছেন! বলা বাহুল্য, হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এই সস্তার অস্ত্রটি পাকিস্তানে হামেশা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘আওরাত মার্চ’ শুরু হয় ২০১৮ সালে করাচিতে। দিনটি ২০২১ সালে বিশেষ আকারে পালিত হয়েছিল অন্তত সাতটি বৃহৎ নগরে। কারণ, এই আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন তাঁরা এমন একটি দেশের নাগরিক যেখানে অর্ধেক নারী অপুষ্টির শিকার। কয়েক কোটি নারী স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। বেশিরভাগের জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ নেই। সমান সুযোগ দূরে থাক, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার লাভেও মেয়েরা বহু যোজন পিছিয়ে। নানাবিধ হিংসারও শিকার তাঁরা। কোভিড মহামারী পরিস্থিতি পাকিস্তানের মেয়েদের আরও বিপন্ন করে তুলেছে। প্রতিবাদীদের বদনাম করতে তালিবান প্রচার করছে যে, ‘এই মহিলারা সক্রিয়ভাবে অশালীনতা এবং অশ্লীলতা ছড়াচ্ছেন!’  অন্যদিকে, ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা সূচক’-এ সবচেয়ে খারাপ ১২টি দেশের মধ্যে একটি পাকিস্তান। পুরো তথ্য পাওয়া মুশকিল। যতটুকু উদ্ধার করা গিয়েছে তাও শিউরে ওঠার মতোই। সর্বশেষ পাকিস্তান ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুসারে, অনূর্ধ্ব ৫০ বছরের মহিলাদের মধ্যে ২৮ শতাংশ শারীরিক নিগ্রহের শিকার। তাঁদের উপর এই নৃশংসতার বড় হাতিয়ার ধর্ম। নারীবাদকে ইসলাম-বিদ্বেষী চিন্তাধারা হিসেবেই চিত্রিত করেছে সে-দেশের প্রভাবশালী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।

দেশের নাম: বাংলাদেশ
‘ঘুরতে মন চাইছে—ভালো কথা, বাইরে যেও না, বারান্দা থেকে ঘুরে চলে এসো। মেয়ে-মানুষ অত বাইরে কী?’ বর্ষ শেষের দিনে ফেসবুকে এমনটাই লিখে পোস্ট করেছেন বাংলাদেশের এক তরুণী। তারপরই যোগ করেছেন, ‘মজা না? বাপ, ভাই, জামাই (স্বামী), প্রেমিক, বন্ধু নিয়ে গেলে ওই দূরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন। তাঁরা চিড়িয়াখানার ভিতর আপনার ‘আনন্দ’ দেখবেন!’ পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে এই মোলায়েম ভাষায় বিঁধে ওই তরুণী সখেদে একটি সমুদ্র সৈকতের ছবিও পোস্ট করেছেন। প্রবেশ পথে একটি নোটিস বোর্ড: ‘সংরক্ষিত এলাকা (নারী ও শিশুদের জন্য)। নির্দেশনায়: জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।’
উপর্যুক্ত তিন প্রতিবেশী দেশের চেহারার পাশে ভারত কতটা উজ্জ্বল? দেখে নেওয়া যাক, একইভাবে:

দেশের নাম: ভারত  
বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্রকেই বিয়ে করার উপদেশ দিলেন বিহার রাজ্য পুলিসের ডিজি এস কে সিঙ্ঘল। বর্ষ শেষে সমস্তিপুরে ছিল ‘সমাজ সুধার অভিযান’। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের উদ্যোগ। নীতীশ সরকারের এই কর্মসূচিটি মদ, পণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে। এনিয়ে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এমন একটি মহতী মঞ্চ থেকে পুলিস কর্তাটি বেফাঁস যে ‘উপদেশ’ বিতরণ করেছেন তা নিঃসন্দেহে আপত্তিকর। তাঁর কর্মজীবনের কিছু অভিজ্ঞতা দর্শক শ্রোতাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন ডিজি: বাড়ির অমতে বিয়ে করলে ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় মেয়েদের। কী সেই পরিণতি? খুন হতে হয় কিংবা দেহব্যবসায় পর্যন্ত নামতে হয়। জড়িয়ে পড়তে হয় অপরাধ জগতেও। মেয়েরা যাতে এমন ‘অবাঞ্ছিত’ প্রেম-পরিণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে না পড়ে তার উপায়ও বাতলে দিয়েছেন বিজেপি জোট সরকারের পুলিস প্রধান: পরিবারের তরফে ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তাদের ভিতরে মূল্যবোধ তৈরি হয়।  
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কাকে তাঁর জীবনসঙ্গী করবেন, সেটা রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে কেন? এটা একান্তভাবেই ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ। এ তাঁর অন্যতম মৌলিক অধিকারও। পুলিসকর্তা, দোহাই দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলার। বিবাহের পর একজন নারীকে কেন স্বামী বা তাঁর পরিবারের হিংসার শিকার হতে হবে? কেন তাঁকে মরতে হবে কিংবা অন্ধকার জগতে হারিয়ে যেতে হবে? এই পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নাগরিকের সুস্থ-শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের উপযুক্ত নয়। বক্তব্যটি জাতীয় মহিলা কমিশনের রিপোর্টের সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ: সারা দেশে ২০২১ সালে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা পুলিসে রেকর্ড হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার। তার মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার মোদি-শাহদের ‘রামরাজ্য’ উত্তরপ্রদেশে। গত সাতবছরের ভিতরে এটাই নিকৃষ্টতম অভিজ্ঞতা। ‘সুল্লি ডিলস’ বা ‘বুল্লি বাই’ নামক অ্যাপগুলিও এই কালচারের সঙ্গেই মানানসই। এসব কী? একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর পাপাচার। তারা মুসলিমদের শত্রু জ্ঞান করে। যেসব মুসলিম মেয়ে তাদের আক্রমণের লক্ষ্য তাঁদের ছবি ওইসব অ্যাপে আপলোড করে দেয় এই দুষ্কৃতীরা। তারপর ওই কন্যাদের তারা ‘নিলামে’ চড়ায়! ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নষ্টামির কারণে ইতিমধ্যেই অনেক নিরপরাধ সম্ভ্রান্ত নারীকে হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁদের সম্ভ্রম নিয়ে টানাটানি পড়ে গিয়েছে। বিরোধী রাজনীতিকদের একাংশের চাপে পড়ে সবেমাত্র মুম্বই ও দিল্লি পুলিস অ্যাপগুলির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে। সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কোম্পানি অ্যাপ দুটি ব্লকও করে দিয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে তাদের তরফেও। কিন্তু এই লেখা পর্যন্ত দোষীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার খবর নেই।        
উপর্যুক্ত চার দেশের ২০২১ সালের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা সূচক এইরকম: 
এই তথ্য থেকে পরিষ্কার, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পাকিস্তানের পরিস্থিতি উনিশ-বিশ। তুলনায় একটু ভালো পজিশন ভারত ও বাংলাদেশের। চার দেশের মধ্যে ভারতের পরিস্থিতি মন্দের ভালো। সবাই জানে, ‘মন্দের ভালো’ কথাটি মোটেই প্রশংসাসূচক নয়। এই প্রসঙ্গে জানানো যায়, দক্ষিণ এশীয় দশটি দেশের মধ্যে মেয়েদের স্কুলশিক্ষা, সেলফোনের ব্যবহার, আর্থিক স্বনির্ভরতা, সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, সামাজিক বিচার লাভ প্রভৃতি কোনও ক্ষেত্রেই ভারত সেরা দেশ নয়। মেয়েদের শিক্ষা ও বর্তমান সঙ্গিনীর উপর সর্বনিম্ন হিংস্রতায় শ্রীলঙ্কা; চাকরি, সংসদীয় ব্যবস্থায় অংশগ্রহণে, বৈষম্য দূরীকরণে ও আইনি সুবিধাদানে নেপাল; সেলফোন ব্যবহারে মালদ্বীপ; অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও গোষ্ঠী নিরাপত্তায় ইরান; পুত্র-কন্যার সর্বনিম্ন পক্ষপাতিত্বে ভুটান; সর্বনিম্ন সংগঠিত হিংসায় বাংলাদেশ সেরা দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিকৃষ্টতম দেশটির নাম আফগানিস্তান। আর তার যোগ্য প্রতিযোগীর নাম পাকিস্তান। কন্যার তুলনায় পুত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্বে সবচেয়ে খারাপ দেশ হল ভারত।  
এই কালচার থেকেই পরিষ্কার, ভারতীয় মেয়েদের বিয়ের নতুন বয়স নির্ধারণের সিদ্ধান্তটিও কেন পুরুষরাই নিতে চলেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠিত ৩১ জনের সংসদীয় প্যানেলে মাত্র একজন মহিলা সাংসদের ঠাঁই হয়েছে। হায় মহান ভারত, মেয়েদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার আজও তাঁদের হল না! ঠিক যেভাবে দারিদ্র দূরীকরণের যাবতীয় পরিকল্পনা তাঁদেরই হাতে রয়েছে, যাঁরা দারিদ্রের সংজ্ঞা ও খিদের জ্বালা ভারী ভারী বইতেই পড়ে থাকেন মাত্র। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কেন দারিদ্র ও নারীর দুঃখ পাহাড়প্রমাণ রয়ে গেল? এর উত্তর খোঁজার আর দরকার পড়ে কি? 

5th     January,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ